নায়কনায়িকার মিলনের পর আর কোনও গল্প বলবার থাকে কি? না, থাকে না। এ গল্পেরও প্রথম খণ্ডের শেষে শোভন ও ফরিদার মিলনের পর আর কোনও কথা বাকি থাকত না, যদি তারা এ কাহিনির নায়কনায়িকা হত। কিন্তু, এ কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে বাংলার মাটির গান, বা আরও খুঁটিয়ে বললে, বাংলার লোকসঙ্গীতের আত্মাটি। সময়ের সাথে সাথে উত্থানপতনের দোলায় দুলে, পরিবর্তনের ঢেউয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে, নিজের রূপকে বদলে, ক্রমাগত বাণিজ্যায়ণের কঠিন ধাক্কা সয়েও যে মহাকাব্যিক সংগ্রামটি করে নিজের অস্তিত্বকে সে বাঁচিয়ে নিয়ে চলেছে এক অন্তহীন যাত্রায়, ওই সদ্যপরিণীত যুবকযুবতী সে সংগ্রামের দুই যোদ্ধা মাত্র, তার বেশি কিছু নয়। তাদের লড়াই, ভালোবাসাবাসি, হারজিতকে অনুসরণ করে চলুন আমরাও সেই যাত্রাপথে পা রাখি। ভেসে চলি অজানা স্রোতের ঘূর্ণিপাকে অজানা পথের ধুলো বেয়ে।
যাত্রী - ১, ২ লেখক - দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রকাশনী - সৃষ্টিসুখ মূল্য যথাক্রমে ২৪৯ টাকা ও ১৯৯ টাকা
'যাত্রী', দুই খণ্ড মিলিয়ে রচিত এই বিস্তৃত উপাখ্যান আসলে ব্যক্তিগত যাত্রার আড়ালে সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও শিক্ষার বহুমাত্রিক রূপভেদকে অন্তর্নিহিতভাবে অনুসন্ধান করে। লেখক সুচারুভাবে দেখিয়েছেন, যাত্রা কখনোই একরৈখিক নয়; তার অসংখ্য বাঁক, মোড়, চরিত্র-সংঘাত ও ভাবনায় ক্রমাগত নতুন হয়ে ওঠে বিশ্ব ও মানুষ।
উপন্যাসের প্রথম খণ্ডে পাঠক প্রবেশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহে, যেখানে তরুণ-তরুণীদের জীবনের ছোট ছোট জয়-পরাজয় মানবজীবনের বৃহত্তর পথচলার প্রতীক হয়ে ওঠে। তাদের স্বপ্ন, দ্বন্দ্ব, প্রেম, হতাশা, সবকিছুই বৃহত্তর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর আভাস দেয়। আর এই অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে করেই পাঠক প্রবেশ করে গ্রামবাংলার বাউল-ফকির সংস্কৃতির গভীরতায়। শোভনের চরিত্র এখানে কেন্দ্রবিন্দু। স্থির, সংযত, এবং দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ এই মানুষটি শিক্ষাকে কেবল ডিগ্রি বা পেশার সিঁড়ি হিসেবে দেখে না। আরামদায়ক জীবনকে অস্বীকার করে প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষায় যুক্ত হওয়ার সংকল্প তাকে এক অনন্য মানবিক উচ্চতায় স্থাপন করে। তার চরিত্রে যেমন শিক্ষকের মমতা রয়েছে, তেমনই রয়েছে এক কঠোর নৈতিক দৃঢ়তাও; আবার সেই সঙ্গে পিতার মতো রক্ষণশীল কোমলতাও উপস্থিত। তার চরিত্রের এই পরিমিত সংযম, যুক্তিবোধ এবং মমতা, এক অনন্য মাত্রা যোগ করে, যা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে, "এই সমাজের জন্য আমরাও কী কিছু আত্মত্যাগ করতে পারি না?" ফরিদার নিজস্ব যাত্রাও এই অংশে সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফরিদার অস্তিত্বগত দ্বন্দ্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এক সফল ও সুচারু জীবনের হাতছানি এবং তার প্রিয় শিক্ষকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার টানাপোড়েন - উপন্যাসকে আরো মানবিক ও জটিল করে তোলে। ফরিদা ও শোভনের সম্পর্কের অনির্দিষ্টতা, শিক্ষক–মেন্টর ও পিতৃচ্ছায়ার মিশ্র অনুভব, আবার আকস্মিক প্রেমের স্বীকৃতি - এই বহুমাত্রিক আবেগচক্রের মধ্যেই চরিত্র দুটি পূর্ণতা পায়। বাউল-ফকিরের গান, পটচিত্র, গ্রামীণ লোকজ আচার, সব মিলিয়ে প্রথম খণ্ড যেন এক সঙ্গীতময় অভিযাত্রা। লেখক এখানে লোকসংস্কৃতিকে আবেগের অতিরঞ্জনে ভর করে উপস্থাপন করেননি; বরং মাটির নির্মল, স্বতঃস্ফূর্ত ও অন্তর্গত সৌন্দর্যকে তার বাস্তব রূপে তুলে ধরেছেন।
দ্বিতীয় খণ্ডে উপন্যাস এক নতুন মাত্রা পায়। এখানে লেখক পাঠককে সরাসরি নিয়ে আসেন বাংলার রাজনীতির কদর্য দৈনন্দিনতায়, যেখানে মানবিকতা, নীতি ও সংস্কৃতি ক্ষমতার লোভে প্রতিদিন ক্ষতবিক্ষত হয়। নগরায়ণের কারণে গ্রাম উজাড় হয়ে যাওয়া, বাউল-সংস্কৃতির মৃত্যু, লোকগানের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া, এই বাস্তব চিত্রায়ণ পাঠককে কেবল বিষণ্ণ করে না; বরং ভয়াবহ সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। নেতাদের ক্ষমতার রাজনীতিতে মানুষের স্বপ্ন কীভাবে অবলীলায় ধ্বংস হয়ে যায়, লেখক তা অত্যন্ত সংবেদনশীল অথচ কঠোর ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। শোভন যখন রাজনৈতিক আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন গল্প শ্বাসরুদ্ধ করা এক মাত্রায় পৌঁছে যায়। ক্ষমতার অন্ধকার খাঁচায় মানুষকে কীভাবে কোণঠাসা করা হয়, লেখক তা নিখুঁত দৃশ্যায়নের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। ফরিদা, সমাদৃতা, উত্তম - প্রত্যেকের জীবন, আকাঙ্ক্ষা ও হতাশা এক নিরন্তর সংগ্রামের রূপক হয়ে ওঠে। সমাজের প্রতিটি স্তরে যে অবক্ষয়, বিভাজন এবং স্বার্থপর রাজনীতির আধিপত্য ছড়িয়ে পড়েছে, লেখক তা নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন; অন্যদিকে মানুষের গান, ভালোবাসা এবং মানবিকতার প্রতি গভীর বিশ্বাসের রেখাও আঁকতে ভোলেননি। দ্বিতীয় খণ্ড শুধু অন্ধকার নয়, প্রতিরোধের আলোও।
উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সাংস্কৃতিক গভীরতা। উভয় খণ্ডেই বাউল সঙ্গীত, লোকগান, হারিয়ে যাওয়া পদাবলী - এই উপাদানগুলি উপন্যাসটির প্রাণশক্তি। লেখক যেন একদিকে সমাজকে পাঠ করছেন, আর অন্যদিকে এক বিলীনপ্রায় সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। ভুবন বৈরাগীর মতো চরিত্ররা লোকসংস্কৃতির মূল বাহক, এই চরিত্রটি উপন্যাসে এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে। শোভন, ফরিদা বা ব্রতীনের মতো চরিত্রদের সঙ্গীতনিষ্ঠা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ভালোলাগা নয়; বরং এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম।
উপন্যাসের ভাষা সুপরিচ্ছন্ন, শৈলীমণ্ডিত ও সংবেদী। লেখকের বর্ণনাশৈলী কখনও গীতিময়, কখনও সরল, কখনও সাংবাদিকতার নির্মোহ প্রতিবেদন, কিন্তু সবই অত্যন্ত রুচিশীল। গল্পের গতি ধীর–দ্রুতের বুনটে তৈরি, যা চরিত্রের মানসিক অবস্থা ও বর্ণনার থিমের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শিল্প সফলতা হলো: ব্যক্তিগত যাত্রা ও সামাজিক বাস্তবতাকে এক সুসংহত বয়ানে রূপ দেয়া, যা বিরল।
সবশেষে এটুকুই বলার, ‘যাত্রী’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি মানুষের মূল্যবোধ, স্বপ্ন, সাংস্কৃতিক শিকড় এবং দমবন্ধ রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক অবিচল প্রতিজ্ঞার বহমান দলিল। এই গ্রন্থে লেখক যে জগত নির্মাণ করেছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলার লোকঐতিহ্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর তার বিপরীতে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে থাকা অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে উজ্জ্বল প্রতিবাদ। এখানে ‘যাত্রা’ বলতে শুধু পথ অতিক্রম নয়; বরং মানুষ, সঙ্গীত, সমাজ ও প্রেমের প্রতি নিঃশর্ত আস্থার দীর্ঘ অনুসন্ধান। প্রথম খণ্ডের সুরভরা মমতা এবং দ্বিতীয় খণ্ডের তীব্র রাজনৈতিক রোমাঞ্চ মিলে উপন্যাসটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছে। দুই খণ্ডের পরতে পরতে গড়ে উঠেছে এমন এক সাহিত্যভুবন, যা সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে নতুন ব্যঞ্জনা যোগ করেছে। শেষ পৃষ্ঠা ছুঁয়ে পাঠকের মনে জন্ম নেয় এক গভীর বোধ, যার যাত্রা কোনওদিন শেষ হয় না। এটি বহমান থাকে মাটির গন্ধে, মানুষের লড়াইয়ে, স্মৃতির অনুরণনে এবং অগণিত অম্লান সুরে।
মানুষের অন্তর্গত আলো–অন্ধকার, সমাজের ভাঙন–প্রতিরোধ এবং সংস্কৃতির বিলুপ্তি–উদ্ধারের একই প্রবাহে ‘যাত্রী’ আজ বাংলা সাহিত্যে এক দৃঢ়, বিস্তৃত দিগন্তের ইঙ্গিত বহন করে।