কেমন ছিল আজকের এই দুঃসহ ঢাকা নগর? মীজানুর রহমান তাঁর স্মৃতি ঘেঁটে তুলে এনেছেন সেই ছবি। বিশেষত, পুরান ঢাকা আর তার বাসিন্দাদের কথা বিবৃত করেছেন ঝরঝরে ভাষায়। ঢাকা কীভাবে ধীরে ধীরে তাঁর চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে, তার চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন। যে অঞ্চলের কথাই বলেছেন, সে অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, নামকরণ আর বর্তমানের নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। স্বাদু গদ্য আর অসামান্য রসবোধের গুণে ঢাকা পুরাণ হয়ে উঠেছে এক অনন্য গ্রন্থ।
১৯২৮/৩১ সালের কথা। পুরানা পল্টনে তখন এবড়োখেবড়ো মাঠ, অল্প কিছু দালানের পাশে টিনের একটা তিন কামরার বাড়িতে। সে বাড়িতে থাকেন বুদ্ধদেব বসু। দক্ষিণ-পূর্বে জঙ্গল আর সামনে দিয়ে চোখে গেলে দেখা যায় নবাবপুর রেললাইন। চৈতালি দুষ্টু হাওয়া বুদ্ধদেব বসুর টেবিলের সব খাতাপত্র এলোমেলো করে ছত্রখান করে দিতো। নিভিয়ে দিতো হারিকেন/প্রদীপের আলো। পুরানা পল্টনে এখনটায় এমন ভাবা যায়? :v
১৯৪৭/৪৮ সালের কথা। বর্তমানের ব্যস্ত মতিঝিলের কোন অস্তিত্বই নেই। লেখক মীজানুর রহমান তখন ছোট। বড় ভাই সাইকেল চালানো শেখাচ্ছে মতিঝিলের নির্জন ধু ধু প্রান্তরে। ঢাকা শহর (!) তখন মর্যাদার দিক থেকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী হওয়া সত্বেও ছিল না তার মাঝে রাজধানী সুলভ গাম্ভীর্য। বিদ্যুতের আলো তখনও পৌছেনি সবখানে। সন্ধ্যা হলে ঘরে ঘরে জ্বলে উঠতো হারিকেন কিংবা প্রদীপের আলো। ক্বচিৎ কোন বাড়িতে যদি জ্বলে উঠতো বৈদ্যুতিক আলো, দেখা যেতো অনভ্যস্ততার দরুণ বিশ্রামরত কুকুরেরা লাফিয়ে উঠতো সহজাত প্রতিক্রিয়াবশত।
ও হ্যা! ঢাকায় তখন চিত্তবিনোদনের বেশ অভাব। গুটিকয় সিনেমা হল ছাড়া ছিলো না কিছুই। একটা জায়গা ছিলো বটে! কিন্তু সেখানে ছোটদের প্রবেশ বারণ। ফাঁকতালে গেলেও মুরুব্বীদের চোখে পড়লে ইঁচড়েপাকা উপাধির সঙ্গে কানমলা ফ্রি। কি এমন জায়গা ভাবছেন? আরেহ! রেসকোর্স ময়দান! প্রতি শনিবার ঘোড়দৌড় হতো সেখানে। এ হেন যখন অবস্থা তখন ভারত থেকে আগমন ঘটল কমলা সার্কাসের। সে কি আনন্দের জোয়ার ছেলে-বুড়ো নির্বিশেষে! দীর্ঘ একটা মাস মাতিয়ে গিয়েছিল তারা।
তখনকার রমনা পার্ক পার হয়ে হেয়ার রোড, মিন্টো রোড পার হয়ে এগিয়ে গেলে এরপর শুধু গ্রাম আর গ্রাম। কাকরাইল, সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, শান্তিনগর এলাকাগুলো সবুজে সবুজে সুশোভিত একেকটা গ্রাম। আর মালিবাগ থেকে কুর্মিটোলা যাবার পথের রাস্তাটায় সন্ধ্যার পর হাঁটলে গা ছমছমিয়ে উঠতো।
পুরোটা বই জুড়ে পুরানো ঢাকা নিয়ে আলোচনা থাকলেও ক্ষণে ক্ষণে লেখকের মনে উঁকি দিয়ে গেছে ছেলেবেলার শহর কলকাতা। ব্রিটিশরাজ তো খুব সহজে কলমের আঁকিবুঁকি করে ভাগ করে ফেললো ভারত আর পাকিস্তান। কিন্তু দেশগুলোতে বাস করা মানুষগুলোর কথা একটাবার ভেবে দেখেছিল কি? বড় হয়ে যাওয়া গাছের শেকড় তুলে আরেক জায়গায় স্থাপন করলে সে গাছ কি বাঁচে? সেই মানুষেরা অবশ্য বেঁচেছিল। বাল্যের বা যৌবনের সমস্ত সুখস্মৃতিকে একপাশে রেখে দিন যাপন করে যাওয়া। ৫২, ৭১ এর মর্মস্পর্শী স্মৃতির পাশাপাশি লিখেছেন লেখকের দেশ ছেড়ে চলে আসার বেদনার কথা। যে বেদনা কেবল ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারে। যদিও লেখকের আদি বাড়ি বিক্রমপুর, তারপরেও বাল্য আর কৈশোর কাটানো রমরমা কলকাতাই ছিল তার আপন। কাজেই, কলকাতার গন্ধ গায়ে মেখে, প্রতিদিন কলকাতার জন্য মন কেমন কেমন করতে করতে শুরু হলো ঢাকার সাথে মানিয়ে নেওয়া। লেখক ভর্তি হয়েছিলেন আর্ট স্কুলে। তার সহপাঠীদের নাম শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে বৈ কী! কাইয়ূম চৌধুরী, মূর্তজা বশীর, আলতাফ মাহমুদ। গল্পে গল্পে এসেছে হোমড়া চোমড়া সব চরিত্র। উঠে এসেছে এক কিশোর সম্পাদকের কথা, তার সন্তানতুল্য পত্রিকা 'ঝংকার'-এর ঝংকার ধ্বনি।
ঢাকা পুরাণ নিছক কোন গল্প নয়, নয় শুধুই আত্মজীবনীও। সম্পাদকের সম্পাদক উপাধিখ্যাত মীজানুর রহমানের কৈশোর আর যৌবনের স্মৃতিচারণার সাথে মিশেছে অল্প-স্বল্প ঢাকার ইতিহাস। কিছু পুনরাবৃত্তি লেখা ছাড়া বাদবাকি সবটাই কিন্তু সুখপাঠ্য!
সুন্দর, পড়তে বেশ আরাম। কিন্তু যতই এগিয়েছে পুনরাবৃত্তি ততই বেড়েছে। একটা লেখায় তো মনে হয় ৭০+ শতাংশই আগের লেখা থেকে তুলে দেয়া। ভাষা আন্দোলন নিয়ে নিজের চাইতে অন্যদের লেখাই তুলে ধরেছেন বেশি। সবচেয়ে বিরক্তির অবশ্য একই লেখার মধ্যে পুনারাবৃত্তি। এসবের জন্য কি আমার লেখককে দোষ দেয়া ঠিক হবে? মারা যাওয়ার পরে এই বই প্রকাশিত হয়েছে। লিখছিলেন পত্রিকায়। বই আকারে প্রকাশিত হওয়া কালে নিশ্চয় লেখক এসব ঠিক করে দিতেন। ধুম করে সম্ভবত মারা গিয়েছিলেন, বোঝা যাচ্ছে আরো লেখার ইচ্ছা ছিল, সহায়ক গ্রন্থপঞ্জির একটা তালিকাও দেয়ার কথা লিখেছেন এক লেখায়, কিন্তু সেটা নেই। কাইয়ুম চৌধুরীর একটা ভূমিকা আছে, যেটায় লেখকের কিছু ভুল ধরে দেয়া হয়েছে। প্রকাশকের পক্ষ থেকে একটা লেখা বেশ দরকার ছিল। তিরিশ লাখ সংখ্যাটা এক রাশান কুটনৈতিকের এ কথা উনার বেশ মনে পড়ে, কেন আর কেউ বলেনি? বঙ্গবন্ধু এসেই কি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বিহীন রাজাকার-আলবদর-আলশামস -কে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন? ইন্ট্রেস্টিং বিষয় হচ্ছে, লেখক বর্ণান্ধ ছিলেন, আকাশের রং করতেন সবুজ, পাতার রং লাল। দুই বছর পরে চারুকলার পাঠ চুকিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আহারে! পরে বলেছেন, ভ্যান গগের ছবিতে এত হলুদের প্রাধান্য কেন? উনিও কি বর্ণান্ধ ছিলেন?
লেখকের শৈশব আর কৈশোরের একটা বড় অংশ কেটেছিল কলকাতায়। দেশভাগের পরপর সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি নিজে দেখেছেন চল্লিশের শেষের ঢাকাকে, দেখেছেন পঞ্চাশ-ষাট করে এই শতাব্দীর শুরুর দিকটাও। তিনি বড় হয়েছেন যেন ঢাকার সাথেই।
দেশভাগের পরেও ঐ সময়টায় ঢাকা আদতে কলকাতার তুলনায় একটা মফস্বলই ছিল। মোঘল আমলের, অন্তত ভিক্টোরিয়ান যুগের তো বটেই, ঢাকা শহরের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য তখনো ছিল। এই শহরের উপর বঙ্গভঙ্গ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগের প্রভাব তখনো পুরোপুরি স্পষ্ট। সেই সময়টায় শহরটা আসলে ছিলই বা কতটুকু! মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর এসব তখনো গ্রাম। বনানী উত্তরা এসবও... শহরটা ছিলই তো আজকের "পুরান ঢাকা"। এদিকে নীলক্ষেত, ওদিকে পল্টন, অন্যদিকে বুড়িগঙ্গাই যেন ছিল ঢাকার সীমানা, শহরের সীমানা।
সেই সময়টায় বড়জোর পাঁচ-সাত লাখ মানুষ হয়ত থাকে এই শহরে। এরপরে ঢাকা সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে চারদিক দিয়ে... একটার পর একটা গ্রামকে শহর বানিয়েছে, অংশ করেছে নগর, মহানগরের। এইসব নিয়েই স্মৃতি... আজকের দিনে এসে পড়লে মনে হয় যেন, কোন একটা পুরাণ পড়ছি সত্যিতেই। ঐ ঢাকারে তো আমরা চিনি না। আমরা ঐ ঢাকার খানিকটা স্বাদ হয়ত পেয়েছিলাম, আমরা যারা অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকায় বড় হয়েছিলাম নব্বইয়ের দশকের একেবারে শেষ দিকে। পড়তে পড়তে আক্ষেপ জেগেছে অনেক কিছুতেই, নিজের ছেলেবেলাটাও বারকয়েক মনে পড়েছে। সময়টা ভিন্ন হলেও স্বরূপ তো একই...
ঢাকা বিষয়ক বেশ কিছু প্রবন্ধ পত্রিকায়, বিভিন্ন বইয়ে এবং ব্লগে পড়া হলেও, এটাই ঢাকা বিষয়ক আমার পড়া প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই। লেখাগুলো শুরুতে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ধারাবাহিক হিসেবে। বই প্রকাশ হবার আগেই লেখকের মৃত্যু হয়। তাতে সম্পাদনা হয়নি ঠিক করে। অযথা পুনরাবৃত্তি পাওয়া যায় অহরহ। এইটুকুন বাদ দিলে সুখপাঠ্য এবং চমৎকার একট�� বই। লেখকের রসবোধ চমৎকার... রনবীর করে দেয়া ইলাস্ট্রেশনও!
মঙ্গোলদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক রাজধানী দেবাগিরীতে স্থানান্তর করেন। সাবেক আর পরবর্তী রাজধানীর মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১৫০০ মাইল।
এরকম রাজধানী বদলের ঘটনা ত অহরহই হতো, কিংবা এখন হচ্ছে। কিন্তু এই ঘটনার বিশেষত্ব হচ্ছে, রাজধানীর অধিবাসীদেরকেও নতুন রাজধানীতে স্থানান্তর হতে নির্দেশ দেয়া হয়। ঘর-দুয়ার ফেলে বিপুল সংখ্যক মানুষ গাটরি-বোঁচকা নিয়ে হিজরত করলো নতুন শহরে।
সেই থেকে দক্ষযজ্ঞ বা হুলস্থূল কান্ড বাঁধিয়ে দেয়ার সমর্থক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে 'তুঘলকি কান্ড' বাগধারাটি।
তবে '৪৭ সালে ভারতবর্ষের নেতারা যে পন্থায় ভারতকে ধর্মের ভিত্তিতে দু ভাগ করালেন, এবং মানুষকে স্বীয় ধর্মানুযায়ী একটা দেশের ভীড়ে যেতে বাধ্য করলেন, স্বয়ং মুহম্মদ বিন তুঘলকও এ দৃশ্য দেখে লজ্জ্বা পেতেন।
এইভাবেই সপরিবারে কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় আসেন মীজানুর রহমান। ঢাকা তখন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজধানী। নামকাওয়াস্তে রাজধানীর গা থেকে তখনো মোছে নি মফস্বল মফস্বল গন্ধ। পরবর্তীকালে 'সম্পাদকদের সম্পাদক' নামে খ্যাত হওয়া মীজানুর রহমান চোখের সামনেই সোমত্ত হয়ে উঠতে দেখেছেন তিলোত্তমা ঢাকা শহরকে। স্বাদু গদ্যে সেই বেড়ে ওঠার গল্পই তিনি লিখেছেন 'ঢাকা পুরাণ' এ।
চিলতে এসেছে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের অনেক অনেক যশস্বী ব্যক্তির কথা। ঘুরেফিরেই এসেছে তাঁর সম্পাদিত কিশোর ম্যাগাজিন 'ঝংকার' এর গল্প, সভ্য সমাজের আঁশ মিটিয়ে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া গণিকাদের কথা। দু একবার গল্পের পুনঃআবর্তনাও হয়েছে। শিরোনাম ছেড়ে আড্ডা দেয়ার তালে মশগুল হয়ে ঘুরে এসেছেন শিরোনাম থেকে অনেক দূর। আবার ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছেন 'প্রাচীনের এই এক দোষ' ধুয়া তুলে।
জবড়জং হয়ে যাওয়া এই ঢাকার সবুজ যৌবন দেখেছি মীজানুর রহমানের সরেস কলমে। প্রাচীনের কলমে অভিযোগ আছে, অনুযোগ আছে, আরও আছে সমাজ-সমস্যার প্রতি কটাক্ষ। তবে মূল রচনার হানি ঘটার আশঙ্কায় হয়তো লেখক কোনোটাই প্রকট করেন নি।
মীজানুর রহমানের নাম সর্বপ্রথম খুঁজে পাই পল্টনের ফুটপাথে। জরাজীর্ণ একটা ঢাউস লিটলম্যাগ, সেটার নামটা বড়ই অদ্ভুত। মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক! পক্ষী সংখ্যা! উলটে পালটে দেখলাম সূচীতে রথী-মহারথীদের নাম। কিনে নিলাম।
ক'দিন বাদেই ছোটচাচার কাছে শুনলাম একজন মীজানুর রহমান ও তাঁর 'মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক' এর কথা। তিনি একটা ব্যাগ নিয়ে বের হতেন, সারাদিন লেখকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্ণা দিয়ে লেখা নিতেন। লেখা আদায় করে তবেই বের হতেন। ভারী কাঁচের চশমা, কোমরে ব্যাগ আর ধূলিবালি সহ এই মীজানুর রহমানকেই শামসুর রাহমান বলেছিলেন 'সম্পাদকদের সম্পাদক'। এমন তরো সম্পাদকের নিজের লেখা কেমন হবে তা বলাই বাহুল্য।
প্রাণের শহর ঢাকা। ঢাকা ছেড়ে যাবার পরই একমাত্র আমি বুঝতে পারি এ শহর আমার কতটা জুড়ে বসে আছে। ব্যস্ত রাস্তার ভিড় ভাট্টা, ধুলা-বালি, ট্রাফিক জ্যাম, খানাখন্দ সব প্রিয় যতই তার নিন্দা করি না কেন ঘরে বসে। ঢাকার বাইরের যারা ঢাকাকে নিয়ে বদনাম করে তাদের সাথে কিন্তু কোমর বেঁধে তর্কে নেমে পরি ঠিকই সময়মতো। সেই ঢাকাকে নিয়ে লেখা বই পড়বোনা এটা হয় নাকি? তাও কিন্ডলে লোড করা প্রথম বই। :p তা পাতার পর পাতা পড়তে গিয়ে খুব করে ঘুরে বেড়ালাম ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। বায়ান্ন হাজার তিপ্পান্ন গলির এ শহর তো রন্ধে রন্ধে মিশে আছে তাই খুব আনন্দ পেয়েছি চেনা জায়গাগুলোর পুরতন গল্প শুনে, জায়গার নামের পেছনের শানে নুযূল আনন্দ দিয়েছে খুব। শুধু কয়েকবার করে একই গল্প ঘুরে ফিরে আসায় খানিকটা বিরক্তি জেগেছে। বইটার লেখাগুলো কি আগে কলাম হিসেবে ছাপা হয়েছে কোথাও? হলে এটাই হয়তোবা কারণ। ঝরঝরা লেখাটা এতো আরাম দিয়েছে টুপ করে রসগোল্লার মতো গিলে ফেলেছি। হার্ডকপিটা বাগাতে হবে।
অনেক কথাই পরে বলা হবে বলে লেখক আর বলেনই নাই, সুখপাঠ্য বই, কিন্তু প্রচণ্ড অসম্পূর্ণ, আর ছাড়া ছাড়া। লেখকের হাত বেশ ঝরঝরে হইলেও কিছু জায়গায় সেই হাত একই বাক্যে হাত-হাতি-হাতাহাতি পরপর ব্যবহার করার মতো কাজ করছেন। বাড়ায়ে বলতেছি না, অনুপ্রাসের ব্যবহার কিছু জায়গায় এতটাই বেশি। তবুও, ভালো বই, ইংরেজি হইলে হয়তো গোগ্রাসে পড়তাম, এই সন্দেহে এর পরে হাতে নিবো তৈফুর সাহেবের বইটা।
ঢাকা নিয়া সংঘবদ্ধ কাজ পাই না, এইটা যা পড়তে মজা ছিলো, কিন্তু ঘটনা বলেন আর তথ্য বলেন, লটারী করে জুড়ে দেয়া। অথচ একটা উপন্যাস, এই বইটা থেকে যদি হইতো ...... ঢাকা নিয়া কেউ কিছু না লিখলে, এইসব বই ঘুণে খেয়ে ফেলবে একদিন। শুধু ফ্যাসিনেশনের বেসাতি দিয়ে এদেরকে নিয়ে যাওয়া যাবে না কোথাও।
দ্রুত বদলে যায় শহরের চেহারা। ঠিক ২ বছর আগের সাথেই যেন এখনের মিল পাওয়া কষ্টকর। আর ঠিক এই জিনিসগুলোর উপরেই আমার আগ্রহ বেশি। ভাবি, যদি একটা টাইম মেশিন থাকতো, তাহলে কখনো ১০০ বছর, কখনো ১০০০ বছর পিছনে গিয়ে দেখে আসতাম, কেমন ছিলো আমার শহর, আমার পছন্দের জায়গাগুলো। কিন্তু সেটা তো সম্ভব না। তবে আমার এই ইচ্ছার কিছুটা পূরণ হলো এই বইটা পড়ে! সেই মোঘল আমলে ঢাকার বিভিন্ন জায়গাগুলোর অবস্থা, নামকরণ এসব জানতে পারলাম। ভালোই লাগলো। কিন্তু বইয়ের মাঝামাঝি জায়গা থেকে পুনরাবৃত্তি করাটা বিরক্তিকর লেগেছে। এজন্যেই এক তারা কম দিতে হল।
স্বাদু, মসৃণ গদ্য মীজানুর রহমানের। এখন যারা বাংলায় লেখেন, তাদের মাঝে এ শৈলী বিরল। পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখা সংকলন করলে নানা পুনরাবৃত্তি চলে আসে, এ বইটিও সে ত্রুটিতে কাবু। ঢাকা কী করে তার অস্তিত্বের মফস্বলপর্ব মুছে রাজধানী হতে গিয়ে সংরক্ষণীয় অনেক কিছু মুছে ফেললো, তার খানিক আভাস বইটিতে মেলে।
গরম রসগোল্লা মুখে পুরে চোখ বুজে আহা-উঁহু করে খাওয়ার যে মোহনীয় তৃপ্তি, সেটা এই বইটা পড়া শুরু করতেই পেয়ে গেছিলাম। ঢাকা-কলকাতা এই দুই জায়গার ইতিহাস আমাকে খুব টানে। পুরান ঢাকা নামটা শুনলে বা ওখানে গিয়ে পড়তে পারলেই বেশ একটা ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে উঠার ফিলিংস হয়। আর স্বাদু গদ্যতে সেই অনুভূতিটাই আরো বেশি মূর্ত হয়ে গেল মীজানুর রহমান সাহ��বের লেখাতে৷ নারিন্দার নাম কেন নারিন্দা, ফুলবাড়িয়াতে কি হত, চকবাজারের ইতিহাস ইত্যাদি এসব তো আছেই, সাথে তাঁর কলকাতা থাকাকালীন কিছু স্মৃতিও উঠে এসেছে। উঠে এসেছে ঝংকার পত্রিকার কথা, উঠে এসেছে বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের কথা। এসেছে চারুকলা, কাইয়ুম চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদের কথা। উঠে এসেছে দূরদর্শী মুক্তিযোদ্ধা আহসানউল্লাহ এর কথা। বইটা পড়তে পড়তে এত ভালো লাগছিল, যেন দেখছিলাম ইতিহাস চোখের সামনে। শামসুর রাহমানের ' স্মৃতির শহর' বইটি পড়েও ঠিক এই রকমই মুগ্ধ হয়েছিলাম। এই মিষ্টি মুগ্ধতার রেশটুকু টিকে থাকুক আজীবন।
কলকাতার আলো-হাওয়ায় বেড়ে উঠতে উঠতে দেশ ভাগের কারণে নিতান্ত অনিচ্ছায় 'ঢাকা'-কে পেয়েছিলেন তিনি। তারপর এই শহরের মধ্যে ফেলে আসা কলকাতাকে খুঁজতে খুঁজতে একসময় তিনি এই শহরটাকেই ভালোবেসে ফেললেন! অতিমাত্রায় সরস এবং ঐতিহাসিক হয়েও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসমুক্তই থাকলো বইটা। কিন্তু নাতি ঘুমিয়ে পড়লে দাদু যেমন মাঝটায় গল্প বলা থামিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ার আয়োজন করেন, তেমনি অসম্পূর্নও থাকল বইটা। আরো কি পাবো সামনে? কে জানে? নাতি কিন্তু ঠিকই জেগে আছে, দাদু।
ঢাকা নিয়ে জানার একটা প্রচন্ড ইচ্ছা ছিলো আমার। এই বইটা তার অনেকখানিই পূরণ করে দিলো। এমন এমন সব ইতিহাস, দৃশ্যাবলি চোখের সামনে ভেসে উঠলো প্রতিটা পাতায়। যে মনে হলো লেখকের সময়কার সেই সহজ, সুন্দর, শান্ত ঢাকার বুকে যদি ফিরে যেতে পারতাম।
ঢাকা নিয়ে পড়তে আমার অসম্ভব ভালো লাগে। আর এই বইটার গদ্য খুবই মিঠা। বেশ কিছু পুনরাবৃত্তি আছে, কিছু জায়গায় লেখকের আলংকারিক গদ্য সুর কেটে দিয়েছে বাক্যের। কিন্তু বইটা তো আমাকে পুরো ঢাকা শহর ঘুরে ঘুরে দেখালো, রাফ্লি চারশো বছর ধরে। সেই ইসলাম খার সময় থেকে, মীর জুমলা হয়ে, ব্রিটিশ ফরাসি আর্মেনিয়ান দের সময় পেছনে ফেলে ঘুরে ফিরে আন্টাঘর ময়দানের ট্র্যাজেডি, তারপর বায়ান্ন, কিছুটা একাত্তর, খানিক কলকাতা, আর ঢাকার শরীর জোড়া সব দরদী কিসসা- বইটা অবশ্যপাঠ্য।
৪৭ এর দেশ ভাগের পর ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করেন তিনি। সে সময়ের ঢাকার চিত্র এমন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, আমার মনে হচ্ছিলোনা যে এই ঢাকা, সেই ঢাকা, এক ঢাকা। ঢাকার ইতিহাস চর্চায় এটা একটা বেশ সহায়ক বই হতে পারে। অলি গলির নামগুলোর ইতিহাস পর্যন্ত বেশ রসিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। শুরুতেই একটা চমৎকার তথ্য পেয়ে আমি সত্যিই চমৎকৃত। সে সময়ে ঢাকায় মানুষ ছাড়াও অন্য এক জাতির সিটিজেন বাস করতো। বানর! হ! সেই সিটিজেনরা নাকি পাড়া মহল্লা হাট বাজার ঝোপঝাড়ের আশেপাশে কঠিন রকমের মস্তানি করতো। মানুষ সিটিজেনদের নানা ভাবে ত্যাক্ত করতো।
যাই হোক, এরকম ঘটনাবলী ছাড়াও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির স্মৃতিচারণ করেছেন যাঁদের আমরা বিশেষভাবে চিনি।
বাহাদুর শাহ পার্কের পূর্বনাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক, তৎকালীন মহাপরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহারাণী ভিক্টোরিয়ার নামানুসারে। তবে তারও আগে ভিক্টোরিয়া পার্কের স্থানটা পরিচিত ছিল আন্টাঘরের ময়দান নামে। এই অদ্ভুত নামকরণের পেছনে ইতিহাস আছে। অস্টাদশ শতকে ঢাকায় আর্মেনীয়বাসীদের একটা ক্লাবঘর ছিল এই জায়গায়। এই ক্লাবের সদস্যরা বিলিয়ার্ড খেলতেন। ডিমের মত দেখতে বিলিয়ার্ড বলগুলোকে ক্লাবের নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীরা আন্ডা বলত। এই আন্ডাই পরবর্তীতে বিকৃত হয়ে আন্টা রুপ ধারন করল। যে ক্লাবঘরে এমন আন্ডাসদৃশ বল দিয়ে খেলা হতো, তাকে ওই কর্মচারীরা আন্টাঘর বলত। ভিক্টোরিয়া পার্কের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত আন্টাঘরের ময়দান হিসেবেই পরিচিত ছিল ঢাকাবাসীর কাছে। এই আন্টাঘরের ময়দান তথা ভিক্টোরিয়া পার্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক করুণ কলঙ্কজনক কাহিনি। ১৮৫৭ সালের ২৩ জুন যখন সিপাহি বিদ্রহের আগুন জ্বলে উঠেছিল ভারতবর্ষের সেনাশিবিরগুলোয়, একটু দেরিতে হলেও সেই আগুনের আঁচ এসে লেগেছিল ঢাকাতেও। তখন ঢাকার লালবাগ দূর্গে পাঠান ও শিখ সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত ২৬০ সদস্যের ছোটখাট একটা রেজিমেন্ট ছিল। তবে ঢাকায় বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঢাকার তৎকালীন ইংরেজ অনুগত কাপুরুষ নবাব খাজা আব্দুল গনির কূটকৌশলে দমন করা হয়। তবে সামান্য যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল, তার খেসারত সিপাহী এবং স্থানীয় এলাকাবাসীকে ভালভাবেই দিতে হয়েছিল। বিদ্রোহী সেনাদের উৎসাহ, সাহায্য-সহযোগিতা ও আশ্রয়দানের অভিযোগে শতশত নিরীহ মহল্লাবাসীকে পলায়নপর ধৃত সেনাদের সঙ্গে আন্টাঘরের ময়দানের বৃক্ষসারিতে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়। ঢাকায় সফলভাবে বিপ্লব দমন করার পর নবাব খাজা আব্দুল গণি সাহেবের বাসভবন আহসান মঞ্জিলে ইংরেজ অফিসারদের জন্য বলনাচের আয়োজন করা হয়! বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক মীজানুর রহমানের লেখা বই ঢাকা পূরাণ পড়তে পড়তে যেন লেখকের সাথেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম ঢাকা শহরের ইতিহাসের অলিতে গলিতে। চমৎকার কিছু অজানা তথ্যও জানা হয়ে গেল ফাঁকেফাঁকে। নারিন্দা শব্দটি যে নারায়ণ দিয়া শব্দের অপভ্রংশ সেটি জানা হল, জানা হল ঐতিহ্যবাহী ধোলাইখালের আদিরুপের কথাও। লেখক তার স্মৃতি ঘেঁটে তুলে এনেছেন সব ছবি। বিশেষ করে পুরান ঢাকা আর তার বাসিন্দাদের কথা বর্ননা করেছেন ঝরঝরে ভাষায়। ঢাকা কিভাবে তাঁর চোখের সামনে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, তাঁর চমৎকার বিবরন দিয়েছেন। লায়ন সিনেমা হল, চকবাজারের ইফতারির মেলা, পুরনো ঢাকার বানরদের বাদরামি, রমনা পার্কের রমনীয়তা, রেসকোর্সে ঘোড়দৌড়, ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎসব - সমস্ত কিছুর বর্ননা করেছেন সরস ভাষায়। লেখার সাথে শিল্পী রনবীর স্কেচগুলও চমৎকার মানিয়ে গেছে। অনেকদিন থেকেই টু রিড লিস্টে ছিল বইটা। আজ শেষ করে ফেললাম। ঢাকা শহর আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে কেমন ছিল? - এ বিষয়ে যাদের জানার আগ্রহ আছে তাঁরা পড়ে দেখতে পারেন বইটি।
সেগুনবাগান, ঠাটারিবাজার, বংশাল, সূত্রাপুর, তাঁতিবাজার কিংবা লালবাগ হয়ে নীলক্ষেতের পরে যে নিউ টাউন ঢাকার জন্ম হয়েছে, চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে সেই নিউ টাউন ছিল নিছকই গ্রাম এবং জঙ্গল। সেই চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে দেশভাগের পরে কলকাতা থেকে আগত লেখকের আদি ঢাকা বা পুরনো ঢাকার ওয়াক ডাউন দ্য মেমোরি লেইন হল ঢাকা পুরাণ। আর্মেনিটোলা, জিন্দাবাহার কিংবা ওয়ারী ছিল তখনকার ঢাকা, যেইখানে অনেক কিংবদন্তী, ঐতিহাসিকরা থাকতো, থাকতো মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও প্রভাবশালীরাও। সবাই একসাথে। এমনকি বরাঙ্গনা পল্লিতে ছিল ভদ্রলোকের সহবাস। ওয়ার স্ট্রীট কেন ওয়ারী হলো বা ঢাকার নামের পিছনের ইতিহাস, কিংবা কোন স্থাপত্যের ইতিহাস এক নাগাড়ে বলে যাওয়া হয়নি বইটিতে। প্রতিটি ইতিহাসের বুলি আওরাতে আওরাতে লেখক স্মৃতিচারণ করেছেন কিছু না কিছুর। কখনো স্থান, কখনো ব্যক্তিত্ব, মাঝে মাঝে নিছক কোন ঘটনার। ইতিহাস বিষয়ক বই এর মত মনোটোনাস নয়।
আজকের দুঃসহ ঢাকা আজ থেকে ৫০ বছর আগেও এমন ছিল না। দেশ বিভাগের পর আঙ্গুল ফুলে রীতিমত কলাবাগান হয়ে যাওয়া নগরীটির স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক। এমন একটি বই লেখার জন্য লেখকের চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি সম্ভবত আর দ্বিতীয়টি নেই। লেখকের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা কলকাতায়। দেশবিভাগের কোপানলে পড়ে নিতান্ত অনিচ্ছায় ঢাকাবাসী হতে হয়েছে তাকে। ঢাকার মাঝে তিনি প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়িয়েছেন কলকাতা, এবং অতঃপর নিজের অজান্তেই ভালবেসে বসেছেন এই নগরীকে। প্রাচীন নগরীর অলিগলিতে তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন রূপকথা। রূপকথাই বটে - আব্দুর রাজ্জাক, মোতাহার হোসেন, জসীমউদ্দিন, কামরুল চৌধুরী, শামসুর রাহমান, যোগেশ, সত্যেন্দ্র, বুদ্ধদেব, অজিত, অচিন্ত্যরা আলো ছড়িয়ে গিয়েছেন যে শহরে, তাকে রূপকথার নগরী বললে যে এতটুকুও বাড়িয়ে বলা হয় না!
ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে সবসময় আমার কৌতূহল ছিল এই শহরের ইতিহাস সম্বন্ধে।কিন্তু এই পর্যন্ত যেসব বই পড়েছি এই বিষয়ে তার সবগুলোতে পুঁথিগত ইতিহাস ছিল,ছিল না মানুষের গল্প।কিন্তু "ঢাকা পুরাণ" পড়ার পর এই আক্ষেপ ঘুচেছে।লেখক ঢাকার ইতিহাস তুলে ধরেছেন গল্পের ছলে।ঢাকার সাধারণ মানুষের ইতিহাস জানার জন্য এই বইটি অবশ্য পাঠ্য।
কবি হাসে, টাকা ভাসে গঙ্গাবুড়ির শহরে আসমান তুই কাঁদিস কেন অট্টালিকার পাহাড়ে মিছে হাসি, মিছে কান্না পথে পথের আড়ালে...
এই শহর জাদুর শহর... ঢাকা সত্যিই যেন এক জাদুর শহর! এই জাদুর শহরের স্পর্শে এসে বদলে যায় সব কিছু। এমনকি এই পরিবর্তনের হাত থেকে রেহাই পায়নি খোদ জাদুর শহরটিও! নিজের জাদুতেই বদলে দিয়েছে এবং এখনো বদলে দিচ্ছে নিজেকে। কিন্তু পরিবর্তনের আগে কেমন ছিল এই ঢাকা?
পূর্ব বাংলার প্রথম কিশোর পত্রিকার সম্পাদক মীজানুর রহমান কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন চল্লিশের দশকে। সেই দশকের পুরনো ঢাকাকে দেখেছেন কাছে থেকেই। সেসবের স্মৃতিগুলোকে নিয়েই দুই মলাটের এই বই 'ঢাকা পুরাণ'। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো লেখক শুধু স্মৃতির কথাই লিখেননি, লিখেছেন সেই সম্পর্কিত ইতিহাসও।
ঢাকার নানান এলাকার নানান নাম, গলি থেকে রাজপথ বিভিন্ন নামে নামাঙ্কিত। এই নামগুলো এমনি এমনিই দেওয়া হয়নি। কোনো এলাকার বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক সেটার নামকরণের ইতিহাস, সেখানকার গলি কিংবা লেনের নামের কারণ, অতীত ইতিহাস, এমনকি নামের অপভ্রংশের অর্থ কী তা-ও লিখেছেন।
এই ঢাকায় এসেই প্রকাশিত হওয়া শুরু হয় ঝংকার। সেসব নিয়ে অভিজ্ঞতার কথাও লেখক লিখেছেন। ঝংকার-এর জন্য বিজ্ঞাপনের টাকা চাইতে গিয়েছিলেন যোগেশবাবুর কাছে। যোগেশবাবুকে চিনলেন না? ছোটোবেলায় বিটিভিতে প্রতি শুক্রবার ছায়াছবি শুরু হতো সাধনা ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে- এই বিজ্ঞাপনটি আসা মানেই ছবি শুরুর ইঙ্গিত। সেই সাধনা ঔষধালয়ের যোগেশচন্দ্র ঘোষ। ঝংকার-এর জন্য নিজ হাতে বিজ্ঞাপনের খসড়া লিখে দিলেন। শুধু যোগেশবাবু-ই নন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্সহ আরও অনেক নামীদামী মানুষের কাছ থেকেই চাঁদা পেয়েছে ঝংকার।
এছাড়া জসীমউদ্দিন থেকে ছড়া নিয়ে ছাপানোর পরে যখন একই ছড়া ভিন্ননামে অন্য পত্রিকায় দেখলেন তখন সম্পাদকীয়তে এ নিয়ে সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। এই নিয়ে জসীমউদ্দিনের সাথে একচোট হাতাহাতি হতে গিয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন।
সেকালের ঢাকায় বিনোদনের একটা মাধ্যম ছিল সিনেমা হল। বেশ কিছু সিনেমা হল গড়ে উঠেছিলো ঢাকার বুকে। এর মধ্যে ব্রিটানিয়া, মানসী, রূপমহল, লায়ন, গুলিস্তান, চিত্রামহল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। গুলিস্তানের এই পুরনো সিনেমা হলের কাছে থেকেই বাসে উঠতাম। তবে তখন অব্দি জানতাম না যে এটা ছিলো সেকালের মানুষদের অন্যতম বিনোদনের খোরাক!
একবার লেখক নিউ পিকচার হাউসে গিয়েছিলেন যুদ্ধের সিনেমা দেখতে। ছবির নাম কমান্ড ডিসিশান। কিন্তু সিনেমা শুরু হওয়ার পরে কোথাও কোনো ফাইট সিন নেই! সিনেমা শুরু হয়ে ইন্টারভ্যালও শুরু হয়ে গেলো। কিন্তু মারামারি কিংবা যুদ্ধের কোনো দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে না। দর্শকরা অধৈর্য। কখন শুরু হবে মারামারি? বাইরে তো ছবির বিশাল ব্যানারে যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাবওয়ালা ছবি টাঙানো ছিল! তাহলে যুদ্ধটা কোথায়? এরপর হঠাৎই গায়েবী আওয়াজ- 'মার হালারে, ধর ধর!' তারপর কী থেকে কী হয়ে গেল, দর্শকরা নিজেরাই মারামারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো! সিনেমা হলের চেয়ার, পর্দা সব ভাঙচুর শুরু করলো। গেটকীপারের কপালের দু' চারটা ঘুষি জুটলো। অবস্থা বেগতিক দেখে দুই লরি পুলিশ এসে হাজির!
ঢাকার কথা আসবে কিন্তু চকবাজারের ইফতারির কথা আসবে না তা কি করে হয়! আর এখন তো রোজার মাসও চলছে! লেখক যেসকল ইফতারির আইটেমের নাম উল্লেখ করেছেন তা পড়তে গিয়েই মুখ দিয়ে জল বেরিয়ে একাকার হয়ে গেছে! কাজেই অনুরোধ থাকবে অন্তত রোজা রেখে ইফতারির এই অধ্যায়টি পড়বেন না! বড় চিনির রসে ডোবানো রসবড়ি, দুধের মালাই দিয়ে তৈরি মালাই দুধ, এক থেকে দুই কেজি ওজনবিশিষ্ট বড় জিলিপি, গজা, দইবড়া, পেস্তা শরবত, ফালুদা, সুতি কাবাব, শামি কাবাব, নার্গিস কাবাব, জালি কাবাব, ডিম পিঠা, ক্রেসবুন্দিয়া, পায়েস, মুরগির কাবাব, আস্ত খাসির রোস্ট, হালিম, মালাইয়ের লাচ্চি, তেগারি, মোরগ পোলাও... কী পাওয়া যায় না এই চকবাজারের ইফতার বাজারে! এরমধ্যে স্পেশাল আইটেম হলো 'বড় বাপের পোলায় খায়'! ঢাকায় একসময়ে বানরের খুব উৎপাত ছিল। রয়েছে সে কথাও।
সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর একটা বই। তবে একই তথ্যের বারবার পুনরাবৃত্তি ও সরাসরি অন্য বইয়ের রেফারেন্স টানায় কিছুটা বেখাপ্পা লেগেছে। খুব সম্ভবত লেখা অধ্যায়গুলো পূর্বে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকা থেকে সংকলিত হয়েছে বলে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি রয়ে গিয়েছে। লেখকের সাবলীলতা প্রশংসনীয়। বইয়ের পাতায় পাতায় সূক্ষ্ম রসিকতাগুল��� বেশ দারুণ লেগেছে। আর রফিকুন নবীর অলংকরণগুলো এক কথায় অসাধারণ। বেশি বড় পোস্ট হয়ে যাওয়ায় আপাতত এখানেই ইতি টানছি!
.
ঢাকা পুরাণ মীজানুর রহমান প্রথমা প্রকাশন মূল্য: ৪০০ টাকা পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২১৬
একদিন নিশিরাতে বেডসাইডেই টেবিলের উপর রাখা মৃদু হলুদ রঙের রিডিং ল্যাম্প জ্বালিয়ে মাথার বালিশে হেলান দিয়ে এই বইয়ের ভূমিকা অংশ পড়ে ফেলি। পড়ার পর বুঝলাম এ বই শুয়ে শুয়ে পড়ার বই না। এ বই পড়তে হলে টেবিলের সঙ্গে চেয়ার পেতে পেন্সিল, লাল কালির কলম আর হাইলাইটার নিয়ে বসতে হবে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এক বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক শহর। এই শহর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়ে আজকের ঢাকা নগরী। ঢাকাকে বলা হয় জাদুর শহর, প্রাণের শহর। জাদুর শহরের অলিতে গলিতে সন্ধান মিলবে অসংখ্য গল্পের। একেবারেই নিছক কাল্পনিক নয় এ গল্পগুলো। বরং বাস্তব এবং জীবন্ত এ গল্পগুলো এ শহরকে চেনায় অন্যরূপে। লেখক মীজানুর রহমানের শৈশব, কৈশোর কেটেছে কলকাতায়। যৌবন এবং প্রৌঢ় বয়স কেটেছে ঢাকায়। স্মৃতিকাতর মীজানুর রহমান ছেড়ে আসা কলকাতার জন্য তাঁর ভালোবাসার কথা গভীর মমতার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন ‘কমলালয় কলকাতা' গ্রন্থে। তেমনি ঢাকার জন্য, বিশেষ করে পুরান ঢাকার জন্য তাঁর ভালোবাসা ‘ঢাকা পুরাণ’- এ সততার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। এ বক্তব্য আমার নয়। লেখককে খুব কাছ থেকে চেনা, তখনকার আর্ট কলেজের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারু ও কারুকলা ইনস্টিটিউট) লেখকের সহপাঠী প্রচ্ছদশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর ভূমিকা অংশে লিখিত কথা এগুলো। পুরান ঢাকার অনেক চেনাজানা জায়গার সাথে নতুন করে পরিচিত হয়েছি লেখকের লেখায়। পরিচিত রমনা এলাকাকে চিনেছি অন্যরূপে। বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ মিত্র, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন-দের মতো বাঘা বাঘা সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের কথা বলেছেন নিজস্ব পারস্পেকটিভ থেকে। স্কুলের বন্ধুদের সাথে আমার চকের ইফতার বাজারে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো একবার। তার নেপথ্যে এতো কিছু যে লুকিয়ে আছে তা এই বই পড়ে জানলাম। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামের কথাও বলেছেন নিজস্ব আঙ্গিকে। স্মৃতিকাতর এসব কথাবার্তায় কখনো তুলে এনেছেন ইতিহাসের প্রসঙ্গ কখনোবা আশ্রয় নিয়েছেন শোনা কথার। অনেক (বেশিরভাগ) জায়গায় কথাগুলো গুরুগম্ভীর ঠেকেছে। কয়েকবার পড়ে পাঠোদ্ধার করতে হয়েছে আমাকে। পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে কথাগুলো অনেক ছাড়া ছাড়া, অসম্পূর্ণ। ভূমিকা অংশের কাইয়ুম চৌধুরীর একটা কথা আমার এ কথার সত্যতা আরো গাঢ়ভাবে প্রমাণ করে। “কিছু কিছু বর্ণনায় মীজান যদি আরও গভীরে যেতেন ঘটনাবলী আরও হৃদয়গ্রাহী হতো।” কালের পরিক্রমায় অনেকটা বিবর্তিত হয়ে ঢাকা শহর তার আজকের রূপে এসে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যত প্রজন্ম আরো অনেক পরিবর্তনের সম্মুখীন হবে এ শহরের। ঢাকা পুরাণ বিগত চারশো বছরের ঢাকার পরিবর্তনের অনেকটা সাক্ষী হয়ে থাকবে। পরিচিত নগরীর সাথে লেখকের চোখে নতুন করে পরিচিত হবেন এই বইটি পড়ার পর।
পঞ্চাশ-ষাটের দশকের ঢাকা এবং ঢাকার ইতিহাস স্বাদু গদ্যে পড়ার জন্য ভালো বই। তবে বলে রাখা ভালো এটা 'ব্যক্তির চোখে দেখা' ঢাকা। বর্ণনাও সেভাবেই। পাশাপাশি এক সময় পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হওয়ার কারণে বই হিসেবে পড়ার সময় পুনরাবৃত্তি চোখে পড়বে যেটা বই কিংবা লেখকের দোষ নয়। 'ঢাকা পুরাণ'-এর প্রাণ ছিল এর সঙ্গে সংযুক্ত স্কেচ। কিন্তু সম্প্রতি মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত 'রচনাবলি'তে সেই স্কেচ রাখা হয়নি। ব্যপারটা দুঃখজনক।
আজ আমি যদি আপনাকে গল্প শোনায় যে ঢাকার বুকে একসময় এই ট্রাফিক জ্যাম নামক বস্তুর কোনো উৎসই ছিলো না, যদি বলি এই ঢাকার প্রায় ৫৬ শতাংশ গ্রামের মতোন ঘেরা ছিলো উত্তরা পুরোপুরি গ্রাম ছিলো! এই ঢাকার যে চুয়াপট্টি নামক জায়গা আছে সেখানে সত্যিকার অর্থেই একসময় ইদুর বিক্রি করা হতো কিংবা ইফতার বাজার এর এই জমজমাট আয়োজন এর শুরুটা কখন বা কোথা থেকে? এই ঢাকার বুকে আমাদের বেড়ে চলা নিজেদের নিয়ে চলা এই ঢাকার মাঝেই তারপরও আমরা ঠিক কতটুকুই বা জানি এর সম্পর্কে? এরকম নানান জায়গার উৎপত্তির সাথে বর্তমান মিলাতে গেলে নিজেদের খই হারিয়ে ফেলার মতোন অবস্থার সৃষ্টি হয় নিজেদের মাঝে! যখন কোনো প্রিয় খাবার অনেকদিন পর খাবার সময় চোখ বুজে আহা-উঁহু করে খাওয়ার যে মোহনীয় তৃপ্তি, সেটা এই বইটা পড়া শুরু করতেই পেয়ে গেছিলাম। মসৃণ গদ্য মীজানুর রহমানের। এখন যারা বাংলায় লেখেন, তাদের মাঝে এ শিল্প দেখাই যায় না! কলকাতার আলো-হাওয়ায় বেড়ে উঠতে উঠতে দেশ ভাগের কারণে নিতান্ত অনিচ্ছায় 'ঢাকা'-কে পেয়েছিলেন তিনি। তারপর এই শহরের মধ্যে ফেলে আসা কলকাতাকে খুঁজতে খুঁজতে একসময় তিনি এই শহরটাকেই ভালোবেসে ফেললেন! যারা ঢাকা নিয়ে বেশ পরিতৃপ্তিকর একটা বই পড়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে চাচ্ছেন তাদের জন্য মাস্টরিড একটি বই। প্রতি বই এর পাতায় রফিকুন নবীর আঁকা ছবিগুলো গল্পের রুপরেখাকে আরও বাস্তবিক করে তুলেছে! warning :- এই বইটি পড়ার সময় বা আসে পাশে যে সময়ই হোক "কিংবদন্তির ঢাকা" এবং "জিন্দাবাহার" বইগুলো কালেক্ট করে রাখবেন কারণ এটা শেষ করে ওই দুটি বই শুরু না করে থাকতে পারবেন না!
This entire review has been hidden because of spoilers.
Quite nice as a memoir...the descriptions are detailed and feel nice to read. However, there's this problem of repetition and points where it felt like the writer had kinda lost the flow of events...but overall, not bad to understand the changes of Dhaka city over time....
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় সাত বছর কাটানোর সুবাদে পুরান ঢাকার অলিগলি বেশ চেনা। ভাগ্যিস বইটার দেখা পেয়েছিলাম, নইলে হয়তো এত চমৎকারভাবে এই এলাকার চমকদার ইতিহাস অজানা রইতো।
বইঃ ঢাকা পুরাণ লেখকঃ মীজানুর রহমান জনরাঃ স্মৃতিকথা প্রকাশনীঃ প্রথমা প্রকাশন প্রকাশকালঃ জানুয়ারি ২০১১ প্রচ্ছদ ও অলংকরণঃ রফিকুন নবী মুদ্রিত মূল্যঃ ৪০০ টাকা পৃষ্ঠাঃ ২১৬
বইয়ের কাভারটা দেখেই অনেক মনে ধরে গিয়েছিল। ঠিক করছিলাম কভারের জন্যই এ বইটা কিনবো তাতে পরে হা হুতাশ যাই করি না কেন। অবশেষে কিনেই ফেললাম এবার।কিন্তু বইটা পড়ার পর কোনো আফসোস নেই কভার যেমন সুন্দর তেমনি ভিতরের প্রতিটা অনুচ্ছেদ ও ইলাস্ট্রেশন। এখানে বইটার ভিতরে মোট ২৭ টা অনুচ্ছেদ আছে। প্রতিটায় লেখক ঢাকার দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে হওয়া পরিবর্তন কে বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে তিনি পুরাণ ঢাকার বাসিন্দা আর তাদের বৈশিষ্ট্য র চাক্ষুষ বর্ণনা দিয়েছেন। সাথে তার কিছু কিছু স্মৃতি ও উল্লেখ করেছেন। ঢাকার যে এলাকা বা ঢাকাইয়াদের যে ট্র্যাডিশন এর কথাই বলুক না কেন সাথে তার ইতিহাস, নামকরণের পিছনের চাঞ্চল্যকর কোনো ঘটনা বা অর্থ সাথে বর্তমানের কিছু তুলনামূলক ঘটনা জুড়ে দিয়েছেন সাথে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ গদ্য লিখার ঢং আর সাথে লেখকের অসাধারণ রসবোধের কারণে বইটা পড়তে গিয়ে খুব ভালো লেগেছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় বারবার একই কথা চলে এসেছে তখন সামান্য বিরক্ত লেগেছে। আর বইয়ের মাঝে হুটহাট অন্য বইয়ের রেফারেন্স আর উক্তি একটু খাপছাড়া লাগলেও ঐ বইগুলো (নাজির হোসেনের কিংবদন্তীর ঢাকা, যতীন্দ্রমোহন রায়ের ঢাকার ইতিহাস) পড়ার ইচ্ছাও জেগেছে। ঢাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে আর যদি বোরিং তত্ত্বকথা পড়তে একটু অনীহা থাকে, এই বইটা একদম পারফেক্ট হবে। বইটায় একাধারে ঢাকা সম্পর্কে স্মৃতিকাহিনী, ঢাকার প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস, ব্যক্তিগত প্রবন্ধ আর রম্যর মিশেল।
কথিত আছে, সুবে বাংলার প্রথম মোগল শাসনকর্তা ইসলাম খাঁ যখন নয়া রাজধানীর স্থান নির্বাচনের জন্য বর্তমান ইসলামপুর এলাকায় বজরা থেকে অবতরন করেন, তখন তিনি দেখতে পান, সেখানে হিন্দুরা ঢাকঢোল বাজিয়ে পূজা অর্চনা-করছে। মজা পেয়ে তিনি বাদকদের খুব জোরে ঢাকঢোল বাজানোর নির্দেশ দিয়ে তিন দিকে তিনজনকে পাঠালেন। একদিকের সীমানা থাকলো নদী। যে তিনজন তিন দিকে গেল, তাদের বলে দেয়া হলো, যেখানে গিয়ে তারা আর ঢাকের শব্দ শুনতে পাবে না, সেসব স্থানে তিনটে সীমানা পতাকা স্থাপন করবে। এবং এ স্থানগুলোই পরে সীমান্তস্তম্ভ নির্মানের মাধ্যমে চিহ্নিত হলো রাজধানীর সীমানা হিসেবে।
ঢাকের শব্দে মন্দ্রিত এলাকা নিয়ে গঠিত বলেই রাজধানীর নাম হলো ঢাকা। আবার কেউ বলেন, সীমানাচিহ্নিত এলাকায় ঢাকা নামের সবচেয়ে বড় পল্লির নামেই ঢাকার নামকরন। কেউ কেউ ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নামও উল্লেখ করেন। কেউ বলেন রাজধানী বিক্রমপুর ও সোনারগাঁয়ের নিরাপত্তার জন্য যে স্থানটি ঢেক্কা বা ঢাক্কা তথা ডাক চৌকি হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সে স্থানই ঢাকা নাম ধারন করেছে। আবার কারও মতে, বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত প্রাচীন একটি ঢাক বৃক্ষের কারনেই শহরটির নাম ঢাকা। নানা মুনির নানা মত, ঢাকার নামকরন নিয়ে।
এমনই আরো অসংখ্য তথ্যে ভরপুর এই বইখানা। আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, বিনট বিবির মসজিদ, ইসলামপুর ইত্যাদি আরো অনেক স্থানের ইতিহাস, নামকরনের তাৎপর্য উঠে এসেছে। ব্রিটিশ, মোগল ইত্যাদি সাম্রাজ্যে ঢাকার চেহারা কেমন ছিলো তার অনেকটা ধারনা পাওয়া যায় 'ঢাকা পুরাণ' থেকে। এছাড়াও লেখকের স্মৃতিচারনে দেখা পাওয়া যায় বুদ্ধদেব বসু, কাইয়ুম চৌধুরী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমরেশ বসু প্রমুখের। নাজির হোসেনের 'কিংবদন্তীর ঢাকা' ও পরিতোষ সেনের 'জিন্দাবাহার' বইয়ের অসংখ্য রেফারেন্স আছে এই বইয়ে। এই বইয়ে ঢাকার ইতিহাসের অসংখ্য তথ্য যেন সেই সময়ে পরিভ্রমন করতে সাহায্য করবে।