নিখিলানন্দের Life of Sri Ramakrishna গ্রন্থটি শুধু একটি জীবনী নয়, এক অর্থে আধুনিক কালের জন্য রচিত এক প্রামাণ্য মহাকাব্য। শ্রীরামকৃষ্ণকে নিয়ে ইতিমধ্যেই অজস্র বই লেখা হয়েছে—ভক্তজনের ভক্তি-ভরা স্মৃতিকথা থেকে শুরু করে বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা পর্যন্ত। কিন্তু নিখিলানন্দের এই বই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তিনি জীবনকথাকে বর্ণনা করেছেন একদিকে নিরপেক্ষ ইতিহাসের স্বরে, অন্যদিকে গভীর আধ্যাত্মিক অনুভবের স্নিগ্ধতায়। এর ফলে বইটি হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে হৃদয়গ্রাহী ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
বইটি পাঠ করতে করতে প্রথমেই ধরা পড়ে এক আশ্চর্য পুরুষের প্রতিচ্ছবি—যিনি বিত্তবান নন, বিদ্বান সাহিত্যিক বা বিজ্ঞানী নন, সমাজসংস্কারক বলেও পরিচিত নন। অথচ তিনি হয়ে অচিরেই উঠলেন এক বিরল সর্বজনপ্রিয়তা ও অমোঘ আকর্ষণের কেন্দ্র। নিখিলানন্দ দেখিয়েছেন, রামকৃষ্ণের মূল শক্তি ছিল তাঁর স্বরূপ—আনন্দময় পুরুষ, আনন্দই তাঁর পরিচয়। এই আনন্দই তাঁর চারপাশে রূপ নিয়েছিল এক চিরন্তন আনন্দের হাট-এ, যেখানে বিনামূল্যে বিলি হতো প্রেম ও করুণা।
জীবনের দীর্ঘ সাধনাপথে রামকৃষ্ণ উপলব্ধি করেছিলেন যে, বিশ্বচরাচর মূলত চৈতন্যময়। তাঁর বাণীতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে উপনিষদের সেই চিরন্তন সত্য—সৎ-চিত্-আনন্দ। প্রতিটি মানুষের অন্তরেই লুকানো রয়েছে এই অমৃতকুম্ভ, যার স্বাদ পেলেই জীবন হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ। তিনি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে চেয়েছিলেন যে, মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ—“মানুষ কি কম গা?” তাঁর মতে, মানুষ একমাত্র সত্তা যে ঈশ্বরকে ভাবতে পারে, অসীমকে চিন্তা করতে পারে।
নিখিলানন্দ পাঠককে একাধিক জীবন্ত ঘটনার মাধ্যমে এই সত্য বোঝান। যেমন, মাঝিদের ঝগড়ার সময় এক দুর্বলের উপর আঘাত নেমে আসতেই শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে সেই আঘাত অনুভব করেছিলেন, তাঁর পিঠে ব্যথার চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। এ শুধু সহানুভূতি নয়, এটি এক বিরল ঐক্যবোধ, একাত্মতার সাধনা। একইভাবে তীর্থযাত্রায় গিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ দেখে তিনি মথুরবাবুকে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণের জন্য অনুরোধ করেন—তীর্থদর্শন বিলম্বিত হলেও জীবন্ত মানবদেবতার সেবা ছাড়া তাঁর গতি নেই। নিখিলানন্দ এই সমস্ত ঘটনার সূত্রে রামকৃষ্ণকে ব্যাখ্যা করেন করুণাময় প্রেমিক হিসেবে, যিনি মানুষের দুঃখে ব্যথিত হয়েছেন, আবার আনন্দ দিতে চেয়েছেন সীমাহীন আকাঙ্ক্ষায়।
বইয়ের বিশেষ সাফল্য এখানেই—শ্রীরামকৃষ্ণকে কেবল অলৌকিক আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে নয়, মানুষের আপনজন হিসেবে উপস্থাপন করা। তাঁর জীবনদর্শন কথামৃত-এর মতোই প্রাঞ্জল, সহজ, যুক্তিসিদ্ধ এবং বাস্তব। তাঁর রসিকতা, রঙ্গরস, অতি সাধারণ অথচ গভীর কথাবার্তা তাঁকে মানুষের ঘরে-ঘরে এক অন্তরঙ্গ উপস্থিতিতে রূপ দিয়েছে। নিখিলানন্দের বর্ণনায় আমরা দেখি একসঙ্গে দুই দিক—অপরিসীম আধ্যাত্মিক মহিমা এবং সহজাত মানবীয় স্নিগ্ধতা।
একই সঙ্গে গ্রন্থে গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর সাধনাপথের বৈচিত্র্য। তন্ত্র, বৈদান্ত, ভক্তি—প্রতিটি পথে তিনি পরমাত্মাকে উপলব্ধি করেছেন। শুধু তাই নয়, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম ধর্মের রীতিও গ্রহণ করে উপলব্ধি করেছেন যে সকল পথই একই ঈশ্বরের দিকে যায়। তাঁর উপলব্ধি সংক্ষেপে ধ্বনিত হয়েছে বিখ্যাত বাণীতে—“যত মত তত পথ।” নিখিলানন্দ এখানে রামকৃষ্ণের সার্বজনীনতাকে স্পষ্ট করেন; এ দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আধুনিক যুগের এক বিশ্বধর্মগুরুতে রূপান্তর করেছে।
একজন আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে তাঁর অবদান আরও প্রতিফলিত হয় নারী-সমাজকে পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে। মা সারদাকে দেবীরূপে পূজা করে তিনি এক গভীর বার্তা দিয়েছিলেন—মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের প্রকাশ। এভাবে নিখিলানন্দ তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে শুধু তথ্য নয়, মানবতার এক শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
অবশেষে বইটি পাঠককে মনে করিয়ে দেয় যে শ্রীরামকৃষ্ণ কোনও নির্দিষ্ট মত বা সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন। তিনি আনন্দ ও আকর্ষণের অবতার—‘রাম’ অর্থ আনন্দ, ‘কৃষ্ণ’ অর্থ আকর্ষণ। তাঁর ডাক আজও ধ্বনিত হয়, “তোরা কে কোথায় আছিস আয়।” নিখিলানন্দের ভাষ্যে এই আহ্বান কেবল অতীতের নয়, সমকাল ও ভবিষ্যতেরও।
তাই Life of Sri Ramakrishna গ্রন্থটি নিছক একটি জীবনীগ্রন্থ হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে প্রেম, সহমর্মিতা, সার্বজনীনতা ও মানবিক চেতনার এক শাশ্বত দলিল। গবেষকের কাছে যেমন এটি তথ্যের আধার, ভক্তের কাছে তেমনই এটি অনন্ত প্রেরণার উৎস। এই কারণেই এটি আজও বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষার পাঠকসমাজে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য।+
পড়ুন এই বই। পড়তে উৎসাহিত করুন অন্যদের।
অলমতি বিস্তরেণ।