বর্তমান সময়ে সামাজিক ক্রাইসিসের অঙ্গনে একটি বহুল উচ্চারিত একটি শব্দ হলো ডিপ্রেশন। আমরা যে সমাজব্যবস্থায় বসবাস করছি, তাই মূলত অনেক ঠুনকো মানসিক অস্থিরতা আর হতাশার কারিগর। এই সমাজে কেউ আমাদের মানসিক গঠনকে দুর্বল করে দিচ্ছে, কেউ আবার কৃত্রিম অস্থিরতার বীজ বুনে দিচ্ছে, কেউ-বা কৈশোর পেরোনোর পথকে এক সুদীর্ঘ চক্রে আটকে দিচ্ছে। ফলস্বরূপ আমরা এমন এক প্রজন্মের বেড়ে ওঠা দেখতে পাচ্ছি, যারা বয়সে যুবক, তবে মানসিকতায় শিশু!এই অসুস্থ সমাজ আর অসুস্থ জীবনাচারের ভিড়ে কোনোভাবেই একটা মানুষ পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ নিয়ে বড় হতে পারে না। ইসলামি জীবনব্যবস্থা আর ঐশী জ্ঞানের রুহানিয়্যাতই এর থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।লেখক ইসমাইল আরাফাহ তার বেস্টসেলার বই ‘আল হাশাশাতুন নাফসিয়্যাহ’-তে বর্তমান সমাজের এই বাস্তবতা এবং ইসলামের সমাধানকে যুগ ও প্রজন্মের ভাষায় তুলে ধরেছেন। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি তারই বাংলা সংস্করণ।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, দুটি নেয়ামত এমন রয়েছে, যাতে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় পতিত হয়। তা হলো, সুস্থতা ও অবসর।”
অবসর হলো শয়তানের জন্য মূল্যবান একটি প্রবেশপথ। সে এই প্রবেশপথ ব্যবহার করে মানুষের হৃদয়ে তার চিন্তাভাবনা ছড়িয়ে দিতে এবং কল্যাণ থেকে মানুষকে দূরে রাখতে। ইমাম শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তোমার হৃদয়কে যদি হকের সাথে জুড়ে না রাখো, তাহলে সে-ই তোমাকে বাতিলের সাথে জুড়ে দেবে!'
লেখক ইসমাইল আরাফাহ তার ‘ডিপ্রেশন : কারণ, উপসর্গ, প্রতিকার ও সুস্থ জীবনের গাইডলাইন’-বইতে বর্তমান সমাজের এই বাস্তবতা এবং ইসলামের সমাধানকে যুগ ও প্রজন্মের ভাষায় তুলে ধরেছেন। এই বইতে ডিপ্রেশনের কারণগুলো ধরে ধরে আলোচনা করা হয়েছে, বিশেষ করে যেগুলো আমাদের সমাজে খুব কমন। পাশাপাশি এগুলোর প্রতীকার করতে কী কী করণীয়, একটি সুস্থ জীবনের জন্য কেমন হবে আমাদের চিন্তা চেতনা ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে এই বইতে।
বর্তমান সমাজের সমস্যার মধ্যে সবথেকে ভয়াবহ আবার একই সাথে জনপ্রিয় শব্দ হলো ডিপ্রেশন। যে ডিপ্রেশন শেষ করে দিচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে। খবরের পাতা খুললেই দেখবেন, প্রতিনিয়ত আত্মহননের পথ বেঁচে নিচ্ছে অনেকে। ক্যারিয়ার, পারিবারিক, মানসিক অশান্তি, শিক্ষা জীবন কিংবা একাকীত্ব এসব সবকিছুর কোনো না কোনো প্রভাবে আমরা অকালে হারিয়ে ফেলছি আমাদেরই নিকট আত্মীয়দের।
আর এই ডিপ্রেশন নিয়েই লেখক ইসমাইল আরাফাহ'র মূল বই 'আল হাশাশাতুম নাফসিয়্যাহ' এর অনুবাদ হলো এই বইটি, যেখানে লেখক পরিবারিক ও সমাজের নানান অসংগতির মাঝে খুঁজে ফিরেছেন ডিপ্রেশনকে সেই সাথে এর কারণ, উপসর্গ, প্রতিকার ও সুস্থ জীবন অতিবাহিত করার গাইডলাইন হিসেবে বইটি উপস্থাপন করেছেন।
একটা বিষয় আগে জানিয়ে রাখি, কেউ যদি মনে হয় ডিপ্রেশনে ভুগছে, তাহলে তার সেই ডিপ্রেশন কিন্তু এই বই বা অন্যকোনো ডিপ্রেশন থেকে বের হওয়ার প্রতিকার সম্পর্কে বই পড়ে সেখান থেকে বের হওয়া বেশ কঠিন। ঠিক সেই মূহুর্তে এসব বই আসলে কোনো কাজে লাগে না। বরং সুস্থ সবল মানুষদেরই ডিপ্রেশন সম্পর্কে জানা উচিত, যাতে নিজ এবং আশপাশের মানুষের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হতে পারে। সেই সাথে কোনটা ডিপ্রেশন আর কোনটা জীবনের স্বাভাবিক দুঃখ সেটাও জেনে রাখা যায়।
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখক বইটিতে সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যে সকল বিষয়গুলো আমাদের যুবসমাজকে যেমন দিনকে দিন অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে আছে ক্যারিয়ার, সোশ্যাল মিডিয়া, ডিভাইস, পরিপক্ব হওয়ার পরও বাস্তবিক জীবন সম্পর্কে অবগত না হওয়া বা হতে না পারার কারণও বর্তমান সমাজের ডিপ্রেশনের কারণ। সেই সাথে আজকাল দুঃখ আর ডিপ্রেশন দুটোকেই যে গুলিয়ে ফেলাও ডিপ্রেশনের একটা কারণ মনে করেন লেখক।
শুধু তাই নয়, বর্তমান সময়ের ছোটোখাটো বিষয়কেও বড়ো করে দেখার যে প্রবণতা বর্তমান সমাজের প্রজন্মের মাঝে দেখা যাচ্ছে তাও তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে ডিপ্রেশনে, এবং কী এর জন্য লেখক আমাদের সমাজকেও দায়ী করেছেন যেখানে অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের বাস্তবতার সম্মুখীন হতে দেন না, কিংবা জীবনের নানান কিছু চাপিয়ে দেন তাদের উপর। সেই সাথে অনুকরণ প্রিয়তা, তুলনা আর সবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে গিয়েও মানুষ ব্যর্থ হয়ে ডিপ্রেশন ভুগছে। সেই সাথে প্রতিটি বিষয়কে সমাজে মানসিক রোগ হিসেবে দেখার প্রবণতাও এর একটা কারণ বলা যায়। যার ফলে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে ঠিকই কিন্তু মানসিকতায় রয়ে যাচ্ছে শিশু। লেখক বইটিতে এসব অসংগতি বিস্তারিত ভাবে তুলে এনেছেন সেই সাথে দ্বীনের পথে থেকে এর থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজেছেন।
বইটি পুরোটা একটা নন-ফিকশন বই, যেখানে লেখক ডিপ্রেশনের স্বরুপ নিয়ে যতটুকু আলোচনা করেছেন তার চেয়েও বেশি আলোচনা করেছেন বর্তমান সমাজের যুব সমাজের অসংগতি, তাদের বেড়ে উঠা নিয়ে। সেই সাথে সেইসব অসংগতির প্রভাব আলোচনার পাশাপাশি উক্তিতি কিংবা উদাহরণ টেনেছেন নানান বিখ্যাত জনের। তবে লেখকের প্রতি পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় অমুখ তমুখের এসব রেফারেন্স টেনে আনাটা আমার বিরক্তিকর লেগেছে।
বইটিকে ডিপ্রেশন নিয়ে একেবারে নির্মোহ আলোচনা আছে এমন বই বলা যাবে না, বরং লেখক এখানে পুরে সমাজ ব্যবস্থা এবং আমাদের যুব সমাজের বর্তমান সমাজের অবস্থাগত কারণের নানান অসংগতি তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেই হারে ডিপ্রেশন থেকে উত্তরণের উপায় বলে গেছেন অতি সামান্য। তাও ডিপ্রেশনের স্বরুপ আর সমাধান সব একই সাথে আলোচনা করায় কিছুটা গোঁজামিলও লেগেছে।
বইটির অনুবাদ প্রসঙ্গে আসলে, অনুবাদ অনেকটা চড়াই-উতরাই রাস্তার মতো লেগেছে, কখনও সাবলীল তো কখনও ভাঙ্গা গর্তে ভরা। তার উপর অনুবাদে ভাব গাম্ভীর্য ভারী করতে গিয়ে ভারী শব্দের প্রয়োগে পড়তে গিয়ে সাবলীলতা থেকে ছিটকে গেছে। সবমিলিয়ে এই বই উপভোগ করতে পারাটা বেশ কঠিন, প্রথম এবং শেষটা পড়ে আরামবোধ করলেও মাঝের অংশটা শেষ করতে কষ্ট হয়েছে অনেক। সেই সাথে নন-ফিকশন আর কাটখোট্টা আলোচনার কারণে টানাও পড়ে শেষ করার মতো বই এটি নয়। আর নতুন পাঠকদের ক্ষেত্রে এই পড়াটাও বেশ কঠিন হবে। তবে ডিপ্রেশনের নানা দিক, আর সমাজের এবং জীবনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বইটি পড়লে আপনার চিন্তাধারা বদলে যেতে পারে।
ডিপ্রেশন শব্দের অর্থ হিসেবে আমরা যেটা বুঝি, কিছুটা বিকৃত আছে তাতে। তবুও মানুষের মানসিকতায় যেহেতু অর্থটা স্থির হয়ে গিয়েছে, সহজলভ্য ভাবে বুঝাতে সামান্য বিকৃত অর্থটাকেই ব্যবহার করে অনেক লেখক। উল্লেখ যোগ্য একটা উদাহরণ (কমেন্টে) উল্লেখ করছি।
অনুবাদ বেশ সহজ-সরল ভাষায় করেছে। বুঝার উপায় নেই বইটি অনুবাদ করা এমন দেশীয় ভাষায় রসালো করে লিখেছে। বইটিতে ডিপ্রেশনের কারণ, তিল কে তাল ভেবে বসা, অতিরঞ্জিত করা, মানসিকতার বয়স এবং এসবে কেনো ডিপ্রেশন তৈরি হচ্ছে সেসব বিষয় ব্যাখ্যা করা। কয়েকটি পয়েন্ট; ১/ তরুণ-তরুণীরা নিজ জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট সমস্যাগুলোকে অতিরঞ্জন হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে । যা দিয়ে বুঝাতে চায় এগুলো তাদের অস্তিত্বগত বিপর্যয়। ২/ বয়ঃসন্ধিকাল ১৪ বছর বয়স থেকে ১৮ বা ১৯ বছর বয়সের দিকে শেষ হয়। বর্তমান গবেষণায় তরুণ তরুণীরা ২৫ বছর বয়সে গিয়ে বয়ঃসন্ধিকাল শেষ হওয়ার লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে।আমেরিকান ফিলোসফিস্ট ডক্টর জেন টুয়েং তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন,মস্তিষ্কের একটি অংশ 'Frontal cortex' যা বিচার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক, তা ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত পূর্ণ হচ্ছে না। মূল কারণ তারা বড় হতে চায় না, দায়িত্বগ্রহণে প্রফুল্ল নয় কেউ। ৩/ বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা জীবনযুদ্ধের প্রতিরোধ ক্ষমতায় অক্ষম হওয়ার কারণে তারা ছোট ছোট সমস্যার বিষয়গুলোকে গুরুত্বর ভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। সাইকোলজিতে একে বলে 'pain catastrophizing'। যৌবনের তেজ ও দৃঢ়তা বিকাশের সময়েও এরা কাঠের পুতুল সাদৃশ্য। ইত্যাদি ইত্যাদি...
বইটিতে আবেগি যুক্তি নেই বললেই বলে। সুক্ষ্ম ভাবে উদাহরণ স্বরূপ প্রতিটার বর্ণনা। কিছুক্ষেত্রে যেমন প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ, প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার গুরত্বপূর্ণ হয়ে পরে, তেমনই কিছু কথা কড়া ভাষায় সরাসরি বলে বিষয়বস্তুর গুরত্ব বুঝাতে হয়। প্রত্যেকের সতর্কতা মূলক এবং সন্তানদের গাইডলাইন হিসেবে প্রস্তুত থাকার জন্য, কোন কোন দিক দিয়ে অসুবিধা আসতে পারে সেসব সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা রাখতে, ডিপ্রেশন বইটি অবশ্যই পড়া উচিত। বইটার শুরুতেই অভিভাবকদের জন্য চমৎকার একটি ঘটনা উল্লেখ আছে। স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে মানসিক বিকাশ ঘটনাতে বইটির তথ্যগুলো অনেক উপকারে আসবে।