ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখ শুরু করে, মার্চ এর ১৩ তারিখ এসে শেষ করলাম "গোরা"। "গোরা"র রিভিউ লেখার মত সাহস আমার নাই। বই টা শেষ করার পর থেকে কিছু একটা না লিখা পর্যন্ত স্থির ও হতে পারছিলাম না। আমি আসলে কি পড়লাম, এক মাস ধরে কোন ঘোরের মধ্যে ছিলাম, সেটা একটু বলার চেষ্টা করি।
"শেষের কবিতা" দিয়ে মূলত আমি সত্যিকারের রবীন্দ্রনাথ কে চিনেছিলাম। তবুও, রবী ঠাকুর কে আর কতটুক চেনা যায়। কিন্তু তিনি আমার মনে যে একটা আলাদা জায়গা জুড়ে ছিলেন এতদিন, আজকে "গোরা" পড়ার পর সেটা যেন সারাজীবন এর জন্য স্থায়ী হয়ে গেলো। মাঝের বাকি উপন্যাস, গল্প গুলোর কথা আর বললাম না।
এবার আসি "গোরা"র কথায়। "গোরা" না কেবল প্রেমের উপন্যাস, না কেবল সামাজিক উপন্যাস, শুধুমাত্র জীবন দর্শনের উপন্যাস ও নয়। এক শতকেরও বেশি সময় আগেকার একটা গল্প এখনো কেমন ঝকঝকে লাগলো। চিরায়ত যে সত্যিই চিরায়ত "গোরা" নিঃসন্দেহে শক্তিশালী একটা উদাহরণ।
সর্বমোট ৭৬ টা অনুচ্ছেদ ছিলো। প্রতিদিন ২-৩ টা করে পড়েছি। শেষ তিন দিনে ক্লাইম্যাক্সে একটু বেশিই পড়া হয়েছে। সাধুভাষা পড়ে অভ্যস্ত আমি, তা সত্ত্বেও খুব ধীরেই পড়লাম "গোরা"। বইটায় চমৎকার কিছু দর্শন পেয়েছি আমি। আমার অনেক অনেক প্রশ্নের জট, যেগুলার কখনোই উত্তর পাবোনা ভাবতাম... কি সুন্দর করে রবী ঠাকুর ধরে ধরে বুঝিয়ে দিলেন।
একটু ব্যাক্তিগত ব্যাপার শেয়ার করি। সাধারণত একটা ভালো বই পড়ার পর আমাদের একটা কমন আফসোস থাকেনা? যে ইশশশ, এটা কেন এতদিন পড়লাম না! আরো আগে পরা উচিৎ ছিলো, কি মিস করে ছিলাম, ব্লা ব্লা... মজার ব্যাপার টা হচ্ছে, "গোরা" পড়ে আমার এমন মনে হয়নি। আমার মনে হলো, একদম সঠিক সময় টায় এসেই হয়তো সঠিক বই টা পড়ে শেষ করলাম আমি। অর্ধেক পড়তে পড়তেই ব্যাপার টা আমি টের পাচ্ছিলাম যে, আমার পার্সোনাল লাইফে এই বইটা বেশ বড় রকমের একটা প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। যদিও আমি যেকোনো ফিকশন আর ফিকশনাল ক্যারেক্টার একটু পছন্দ হলেই, সেটা কে খুব সিরিয়াসলি নেই, আর রিলেট করা শুরু করি।
"গোরা" উপন্যাস টা দিয়ে রবী ঠাকুর একটা আলো দেখানোর চেষ্টা করেছেন। আলো টা কতটুক দেখতে পেয়েছি জানিনা। কিন্তু যতটুক ই পাচ্ছি, ততটুকুই খুব স্পষ্ট। এমন স্পষ্ট আলো... শুধুমাত্র ঘোর বলে সেটাকে ছোট করতে পারছিনা।
একটা চরিত্রের কথা না বললেই হচ্ছে না। আনন্দময়ী। গোরা আর বিনয়ের মা আনন্দময়ী। যার জীবনে আনন্দময়ীর মত একটা ছায়া, একটা আশীর্বাদ আছে তার চেয়ে ভাগ্যবান আসলে কেউ হয়না। আনন্দময়ী ���ুধুমাত্র গোরা বা বিনয়কেই মানুষ করেছেন তা নয়। তিনি যে আমারো কত ডিসিশন নিয়ে দিলেন! হাহাহা! তার পরেই আছেন পরেশবাবু। তারা দুইজন আসলে মুদ্রার এপিঠ- ওপিঠ। গোরা-বিনয় কে নিয়েই যদিও সব কিছু, তবুও এনারা দুইজন পুরো বইটায় সবচেয়ে বেশি দাপট নিয়ে রাজত্ব করে বেড়িয়েছেন। মেয়েদের মধ্যে ললিতা কে ভালো লেগেছে, সুচরিতা কে ভালোবেসেছি। সতীশ খুব পছন্দের বন্ধু হয়ে গেছিলো আমারও।
রবী ঠাকুরের সঙ্গে লালন সাই এর দর্শনের মিল আছে সেটা শুনেছিলাম আগে। আলাদাভাবে দেখা হয়নি। "গোরা" পড়ার পর, মিল আছে না বলে, একই বলাটাই সম্ভবত শ্রেয় মনে হচ্ছে। গোরার সুবাদে আমার এ ক'দিনে ফোক গান শোনার মাত্রা বেড়ে গেছে, যদিও কোথাও ফোক গানের কথা বলা নাই।
স্পয়লার বিহীন প্রিয় একটা অংশ দিয়ে শেষ করি। ___ "আজকাল গোরা নিজের হৃদয়ের মধ্যে যে-একটি আকাঙ্ক্ষা, যে-একটি পূর্ণতার অভাব অনুভব করিতেছে, কোনোমতেই কোনো কাজ দিয়াই তাহা সে পূরণ করিতে পারিতেছে না। শুধু সে নিজে নহে, তাহার সমস্ত কাজও যেন উরধের দিকে হাত বাড়াইয়া বলিতেছে, ‘একটা আলো চাই, উজ্জ্বল আলো, সুন্দর আলো ! যেন আর-সমস্ত উপকরণ প্রস্তুত আছে, যেন হীরামানিক সোনারূপা দুরমূল্য নয়, যেন লৌহ বজ্র বর্ম চর্ম দুর্লভ নয়, কেবল আশা ও সান্ত্বনায় উদ্ভাসিত স্নিগ্ধসুন্দর অরুণরাগমণ্ডিত আলো কোথায় ! যাহা আছে তাহাকে আরও বাড়াইয়া তুলিবার জন্য কোনো প্রয়াসের প্রয়োজন নাই— কিন্তু তাহাকে সমুজ্জ্বল করিয়া, লাবণ্যময় করিয়া, প্রকাশিত করিয়া তুলিবার যে অপেক্ষা আছে। বিনয় যখন বলিল, কোনো কোনো মাহেন্দ্রক্ষণে নরনারীর প্রেমকে আশ্রয় করিয়া একটি অনির্বচনীয় অসামান্ততা উদ্ভাসিত হইয়া উঠে, তখন গোরা পূর্বের ন্যায় সে কথাকে হাসিয়া উড়াইয়া দিতে পারিল না। গোরা মনে মনে স্বীকার করিল, তাহ সামান্য মিলন নহে, তাহা পরিপূর্ণতা, তাহার সংস্রবে সকল জিনিসেরই মূল্য বাড়িয়া যায় ; তাহা কল্পনাকে দেহ দান করে ও দেহকে প্রাণে পূর্ণ করিয়া তোলে ; তাহা প্রাণের মধ্যে প্রাণন ও মনের মধ্যে মননকে কেবল যে দ্বিগুণিত করে তাহা নহে, তাহাকে একটি নূতন রসে অভিষিক্ত করিয়া দেয়।"
আর আমার শেষ কথা__ হ্যাটস অফ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!