|| রিভিউ ||
বইঃ অপদেবতা
লেখিকাঃ রুমানা বৈশাখী
প্রকাশকঃ বিদ্যাপ্রকাশ
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩
ঘরানাঃ হরর/সুপারন্যাচারাল
প্রচ্ছদঃ জাওয়াদ উল আলম
পৃষ্ঠাঃ ১৪৪
মুদ্রিত মূল্যঃ ৩৫০ টাকা
ফরম্যাটঃ হার্ডকভার
কাহিনি সংক্ষেপঃ চারিদিকে দিগন্তবিস্তৃত হাওড়। পানি থৈথৈ করছে। ভরা বর্ষায় আরো ভয়ঙ্কর রূপে নিজেকে মেলে ধরে এই হাওড়। হাওড়ের মাঝেই যেন একটুকরো ছোট্ট একটা গ্রাম। অনেকটা সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা কোন এক দ্বীপের মতো। এই গ্রামের মূল আকর্ষণ হলো প্রাসাদোপম একটা বাড়ি। রীতিমতো শান-শওকতে পরিপূর্ণ এই বাড়িটা বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এখানে সুখী মানুষরাই বাস করে; যাদের জীবনে কোন দুঃখ-দুর্দশা নেই। আদতে কি তাই?
এই বাড়ির প্রধান আলতাবানু। নব্বুইয়ের কাছাকাছি বয়সের এই বৃদ্ধা এই বয়সেও কতোটা সুন্দরী, তা কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না। সুন্দরী আর নিষ্ঠুর। বাড়িটার ছাদে কারো ওঠার অনুমতি নেই একমাত্র আলতাবানু ছাড়া। কেন? কারণ, এই ছাদে সহস্র বছরের প্রাচীন এক অপদেবতা বাস করে। প্রতিদিন দুপুরে তাকে নানা ব্যঞ্জন ও মিষ্টান্ন সহযোগে ভোগ দিতে হয়। আর ভরা বর্ষার পূর্ণিমা রাতে দিতে হয় মদ, মাংস আর কুমারী মেয়ে মানুষ। হ্যাঁ, এগুলো দিতে হয় এই ভয়ঙ্কর অপদেবতার ভোগ হিসেবে। বংশানুক্রমে এমনটাই হয়ে আসছে এই বাড়িতে যুগের পর যুগ ধরে।
সমাজ আর পরিবারের চোখে করা এক 'পাপ'-এর শাস্তি হিসেবে তরুণী নুসরাতকে নির্বাসনে পাঠানো হলো আলতাবানুর প্রাসাদসম বাড়িতে। ঢাকায় বড় হওয়া এই যুগের মেয়ে নুসরাত এই বাড়িটাতে পা দিয়েই বুঝলো আধুনিকতার ছোঁয়া এখানে আজও লাগেনি। মুখরা স্বভাবের আলতাবানুর নানা বাঁকা-ত্যাড়া কথা শুনতে শুনতেই দিন যেতে লাগলো তার। সে একটা কালো বিড়ালের বাচ্চা দেখতে শুরু করলো, যা এই বাড়ির অন্য কেউ কখনো দেখতে পায় না। শুধু সে দেখতে পায়। শুধু সে, নাকি আলতাবানুও দেখতে পান বিড়ালছানাটাকে?
হাওড়ের ভয়ঙ্কর সেই অপদেবতার নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধা আলতাবানু আর তাঁর পরিবার বহুবার দেখেছেন। সময়মতো পিশাচটাকে ভোগ চড়ানো না হলেই ভয়াবহ সব অঘটন ঘটতে শুরু করে। হাওড়ের বুকে দিনের পর দিন ধরে একটানা ঝরে পড়া বৃষ্টি যেন এই অপদেবতার ক্ষুধা আর লালসার জানান দিয়ে যায়। আর প্রত্যেকবারই আলতাবানুকে কোন না কোন উপায়ে অপদেবতাকে সন্তুষ্ট করার পথ বের করতেই হয়। না হলে যে ধ্বংস অনিবার্য।
নুসরাত আবারো ফিরে যেতে চায় নিজের শহরে, নিজের বাড়িতে। নিজের চিরচেনা গণ্ডীর মাঝে ফিরে সে একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিতে চায়। কিন্তু সে জানে না রহস্যময়ী আলতাবানু কি চান, হাওড় কি চায় আর প্রাসাদের ছাদে চক্কর কাটতে থাকা অপদেবতাই বা কি চায়। জানে না নুসরাত। জানে না।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ সেবা প্রকাশনীর রহস্যপত্রিকা যারা পড়েছেন, তাঁদের কাছে রুমানা বৈশাখী চেনা একটা নাম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি লেখালেখি করছেন। হরর ও সুপারন্যাচারাল ঘরানার ওপর তাঁর একটা সহজাত দখল আছে। এই ব্যাপারটা তাঁর লেখা পড়লে বেশ ভালোভাবেই বোঝা যায়। লেখালেখির স্বতন্ত্রতার জন্য আমি যে কয়জনের লেখা পছন্দ করি, তাঁদের মধ্যে রুমানা বৈশাখী অন্যতম। মোটামুটি একটা লম্বা গ্যাপের পর তাঁর কোন বই পড়লাম।
'অপদেবতা'-এর শুরু থেকেই লেখিকা একটা অজানা ভয়ের আবহের অবতারণা করেছেন। প্রাচীন এক অপদেবতা, যে হাজার হাজার বছর ধরে পূজিত হয়ে এসেছে নানা জাতের মানুষের কাছে। সেই পূজা কখনো এসেছে শ্রদ্ধা থেকে, আবার কখনো এসেছে নিখাদ আতঙ্ক থেকে। এরপর কাহিনিতে যখন রুমানা বৈশাখী আলতাবানু চরিত্রটাকে নিয়ে আসলেন, ব্যাপারটা যেন আরো খানিকটা জমে গেলো। তাঁর গল্প বলার ধরণ স্বতন্ত্র, আগেই বলেছি। যখন সেবা-তে তাঁর লেখা পড়তাম যে ফিল পেয়েছি, বহুদিন পর 'অপদেবতা' পড়তে গিয়েও সেই একই ফিল আবারো ফিরে এসেছে। লেখিকার গল্প বলার ধরণ বরাবরের মতোই সুন্দর ও সাবলীল লেগেছে।
'অপদেবতা'-তে আলোচ্য অপদেবতার কোন চেহারার বর্ণনা রুমানা বৈশাখী দেননি। কিন্তু উপন্যাসের কাহিনিটাকে তিনি এমনভাবে টেনে নিয়ে গেছেন যে এমনিতেও একটা ক্রিপি ফিল এসেছে বইটা পড়তে গিয়ে। গভীর রাতে পড়ার জন্য যদি কেউ কোন আদর্শ হরর উপন্যাসের সাজেশন চান, আমি 'অপদেবতা' সাজেস্ট করবো৷ এই উপন্যাসে যে শুধু ভয়ই আছে তা না। রুমানা বৈশাখী এতে যুগপৎ মিশ্রণ ঘটিয়েছেন বিশ্বাসঘাতকতা, নৃশংসতা, প্রেম সহ আরো কিছু মানবিক আবেগের। শেষটাও ভালো লেগেছে আমার কাছে।
ছোটখাটো বেশ কিছু বানান জনিত সমস্যা লক্ষ্য করেছি। মাত্রাতিরিক্ত না ব্যাপারটা। বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটিও চমৎকার। জাওয়াদ উল আলমের করা দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদটা 'অপদেবতা'-এর আবেদন বাড়িয়ে দিয়েছে আরো অনেকখানি। আগ্রহীরা চাইলে পড়ে দেখতে পারেন।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৩.৭৫/৫
গুডরিডস রেটিংঃ ৫/৫
#Review_of_2023_09
#Review_Apodebota
সমাপ্ত!
(২৩ এপ্রিল, ২০২৩, রবিবার, দুপুর ৩ টা ২০ মিনিট; নাটোর)