লাভক্র্যাফটের রচনার মহাজাগতিক আতঙ্ককে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিলেন অদ্রীশ বর্ধন। পরে আরও অনেকে সেই প্রয়াসে যোগ দিলেও আমাদের প্রজন্মের কাছে লাভক্র্যাফটকে সহজ অথচ সুললিত অনুবাদে পরিবেশনের কৃতিত্ব দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের। তাঁর সেই প্রচেষ্টার সাম্প্রতিকতম নিদর্শন হল আলোচ্য বইটি। এতে লাভক্র্যাফটের এমন পাঁচটি লেখা অনূদিত হয়েছে, যাদের সচরাচর 'লাভক্র্যাফটীয়' লেখার সংকলনে দেখা যায় না। কিন্তু কেন এরা এত ব্যতিক্রমী? তাহলে লিখি এই বইয়ে কী-কী কাহিনি রয়েছে। একটি মূল্যবান ও তথ্যনিষ্ঠ 'ভূমিকা'-র পর এতে এসেছে~ ১. সাদা জাহাজ: এ এক স্বপ্নিল ফ্যান্টাসি— যা অসীম কৌতূহল আর বাস্তবের রূঢ় সীমানার মধ্যে সংঘাতের কথা বলে। লাভক্র্যাফটের অসামান্য চিত্রকল্পের যে আভাস তাঁর স্তূপীকৃত গদ্যভাষার নীচে চাপা পড়ে থাকে, তার আসল রূপটি দেখা দিয়েছে এতে। ২. ঘুমের দেয়াল পেরিয়ে : তথাকথিত অসভ্য এবং অনাগরিক মানুষদের নিয়ে লাভক্র্যাফটের ধ্যান-ধারণার সম্বন্ধে আমরা ওয়াকিবহাল। কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই এই গল্পে তেমন এক চরিত্রকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে এক বিচিত্র উত্তরণের কথা বলা হয়েছে। ৩. রেড হুকের আতঙ্ক: এটি লাভক্র্যাফটের কুখ্যাততম এবং সবচেয়ে বেশি ভয়োৎপাদক লেখা। না; এই ভয়ের উৎস অলৌকিক বা মহাজাগতিক নয়। বরং লাভক্র্যাফটের নিজস্ব জাতিদ্বেষ এবং ধর্মদ্বেষের চরম নিদর্শন হিসেবেই এটি শিহরন জাগায়। ভিক্টর লাভালের 'দ্য ব্যালাড অফ ব্ল্যাক টম' এই কাহিনিকেই এক অন্য চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলে ২০১৬-র শার্লি জ্যাকসন পুরস্কার জিতেছিল— এটাই বোধহয় এই ভয়াবহ লেখা থেকে উঠে আসা একমাত্র ভালো জিনিস। ৪. অপমানব: সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা পরিবারের মধ্যে কী ধরনের বিকৃতি দেখা দেয় এবং সেই বিকৃতির বিকাশের জন্য পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক কীভাবে মঞ্চ গড়ে দেয়, তারই এক চমৎকার নিদর্শন এই আখ্যান। এই থিমটির শ্রেষ্ঠ সাহিত্যরূপ আমরা পাই স্টিফেন কিঙের 'জেরুজালেম'স লট'-এ। ৫. ইরাননের যাত্রা: এটি, আমার মতে, এই বইয়ের সবচেয়ে অ-লাভক্র্যাফটীয় এবং মায়াবি লেখা। অলীকের সন্ধান কীভাবে বাস্তবের রূঢ়তাকে অতিক্রম করতে চায়, আর সেই অলস মায়ার অঞ্জন চোখ থেকে মুছে গেলে কী হয়— তার অসামান্য রূপ ধরা পড়েছে এতে। অনুবাদ লা-জবাব। অলংকরণগুলো দেখলে সিরিয়াসলি গা ছমছম করে। কিন্তু বইটিতে প্রচুর টাইপো রয়েছে— যা আমরা 'জয়ঢাক'-এর বইয়ে দেখতে অভ্যস্ত নই। পরবর্তী মুদ্রণের আগে কড়া করে প্রুফ দেখিয়ে নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি বলেই আমার অভিমত। লাভক্র্যাফটের লেখা বাংলায় পড়তে চাইলে এই বইটিকে কোনোমতেই উপেক্ষা করবেন না।