বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ভূতে বিশ্বাসী ছিলেন। বিচিত্র সব উপাদানের সমাহারে গড়ে উঠে তাঁর অলৌকিক কাহিনী। সেখানে ছায়ামূর্তি আছে, প্রেতাত্মা আছে, আছে তন্ত্র-মন্ত্র, আছে আতঙ্ক। বিভূতিভূষণের যাবতীয় ভয়ের গল্পকে এক মলাটে নিয়ে প্রকাশিত হল তাঁর বৃহত্তম সংকলন ‘ভয়-সমগ্র’ যাতে স্থান পেয়েছে চৌত্রিশটি ভয়ের গল্প।
Bibhutibhushan Bandyopadhyay (Bangla: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bangali author and one of the leading writers of modern Bangla literature. His best known work is the autobiographical novel, Pather Panchali: Song of the Road which was later adapted (along with Aparajito, the sequel) into the Apu Trilogy films, directed by Satyajit Ray.
The 1951 Rabindra Puraskar, the most prestigious literary award in the West Bengal state of India, was posthumously awarded to Bibhutibhushan for his novel ইছামতী.
মধুমতী নদীর ওপরেই সেকালের প্রকাণ্ড কোঠাবাড়িটা। রাধামোহন নদীর দিকের বারান্দাতে বসে একটা বই হাতে নিয়ে পড়বার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু বই-এ মন বসাতে পারল না।
কেমন সুন্দর ছোট্ট গ্রাম্য নদীটি, ওপারে বাঁশবন, আমবন—বহুকালের। ফলের বাগান যেন প্রাচীন অরণ্যে পরিণত হয়েছে। একা এত বড় বাড়িতে থাকতে বেশ লাগে। খুব নির্জন, পড়াশোনা করবার পক্ষে কিংবা লেখালিখির পক্ষে বেশ জায়গাটি। তাঁদের পৈতৃক বসতবাড়ি বটে, তবে কতকাল ধরে তাঁরা কেউ এখানে আসেনি, কেউ বাস করেনি।
রাধামোহনের বাবা শ্যামাকান্ত চক্রবর্তী তাঁর বাল্যবয়সে এ গ্রাম ছেড়ে চলে যান। মেদিনীপুরে তাঁর মামারবাড়ি। সেখানে থেকে লেখাপড়া শিখে মেদিনীপুরে ওকালতি করে বিস্তর অর্থ উপার্জন করেন এবং সেখানে বড় বাড়িঘর তৈরি করেন। স্বগ্রামে যে একেবারেই আসেননি তা নয়, তবে সে দু-একবারের জন্যে। এসে বেশি দিন থাকেননি। অতবড় পসারওয়ালা উকিল, থাকলে তাঁর চলত না।
গ্রামের বাড়িতে জ্ঞাতিভাইরা এতদিন ছিল, তারা সম্প্রতি এখান থেকে উঠে গিয়ে অন্যত্র বাস করছে, কারণ গ্রামে বসে থাকলে আর সংসার চলবার কোনো উপায় হয় না।
পাশের বাড়ির বৃদ্ধ ভৈরব বাঁড়ুজ্যে দুইদিন খুব দেখাশোনা করছেন। তিনি জোর করে তাঁর বাড়িতে রাধামোহনকে নিয়ে গিয়ে ক-দিন খাইয়েছেন। নইলে রাধামোহন নিজেই রেঁধে খাবে পৈতৃক ভিটেতে, এই ঠিক করেই এসেছিল।
ভৈরব বাঁড়ুজ্যের বড় ছেলে কেষ্ট এসে বললে—দাদা, চা খাবেন, আসুন।
—তুই নিয়ে আয় এখানে কেষ্ট। বেশ লাগছে সন্ধেবেলাটা নদীর ধারে।
গ্রামের সবাই অবশ্য আত্মীয়তা করেছে, ভালোবেসেছে। বৃদ্ধ লোকেরা বলেছে আহা! তুমি শ্যামাকান্তদার ছেলে, কেন হাত পুড়িয়ে রেঁধে খেতে যাবে। আমরা তো মরিনি এখনও। এসো আমাদের বাড়ি। রাধামোহন সকলের কাছেই কৃতজ্ঞ।
কেষ্ট চা দিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করে চলে গেল। খুট করে কীসের শব্দ শোনা গেল। রাধামোহন দেখল, একটি দশ-এগারো বছরের টুকটুকে ফর্সা মেয়ে ঘরের দাওয়ার আড়াল থেকে উঁকি মারছে। ঘরের মধ্যে হ্যারিকেন জ্বলছে, বারান্দাতে সামান্য আলো এসে পড়েছে, সুতরাং একেবারে অন্ধকারে সে বসে নেই।
ভৈরব বাঁড়ুজ্যে একবার ছেলে পাঠায়, একবার মেয়ে পাঠায়, লোকটা খুব যত্ন করছে বটে। মেয়েটির সাথে ছোট ছোট অনেক কথাবার্তা হলো রাধামোহনের। এবং ক'দিনের মধ্যেই বেশ ভাব হয়ে গেল। মেয়েটি রোজ এভাবে আসে। কী কী রান্না হচ্ছে বলে দেয়। রাধামোহন বসে গল্প করে ওঁর সাথে।
খুকি একদিন বলল তুমি একা এসেছ কেন?
রাধামোহন হাসতে হাসতে বললে—কেন বলো তো?
—বউ-ঝিদের নিয়ে এসো। এত বড় বাড়ি পড়ে আছে। আমোদ করুক।
—তোমার তাই ইচ্ছে খুকি?
—খু-উ-ব। আমি তো তাই চাই।
—কেন?
—কতকাল এ বাড়ি এমনই পড়ে আছে না! কেউ পিদিম দেয় না।
রাধামোহন মেয়েটির এমন পাকা পাকা কথা শুনে মনে মনে খুব হাসলো। খুকি বারবার তাঁকে অনুরোধ করতে লাগলো সে যেন আবার আসে। এই পৈত্রিক ভিটায় আবার পিদিমের আলো জ্বলেছে বলে সে খুব খুশি। রাধামোহন মেয়েটিকে শহরে নিয়ে যেতে চাইলো সে তা যাবে না।
কালে কালে যাবার দিন এসে গেল। যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছে, ভৈরব এসে বললেন—বাবাজি, কাল কত রাত্রে এলে? খেলে কোথায়? আমাদের ডাকা তোমার উচিত ছিল। তুমি তো ঘরের ছেলে। এত লজ্জা করো কেন? ছিঃ—। আসলে রাধামোহন এই কয়দিন সত্যিই ব্যস্ত ছিলেন।
রাধামোহন বললে—আপনার খুকিটিকে একবার ডেকে দিন না?
—বেশ বেশ। এখুনি ডাকছি—দাঁড়াও—
একটু পরে একটি আট বছরের কালো মতো মেয়ের হাত ধরে ভৈরব বাঁড়ুজ্যে সেখানে নিয়ে এলেন। রাধামোহন বললে—এ খুকি তো নয়, এর দিদি!
ভৈরব বাঁড়ুজ্যে বললেন–এর দিদির তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সে তো শ্বশুরবাড়ি আছে। তুমি তাকে দেখোনি।
রাধামোহন আশ্চর্য হয়ে গেলেন। আরো শুনলেন এ পাড়ায় ওই বয়সী কোনো মেয়ে নেই। তাহলে ওই মেয়েটি কে? এত অনুরোধ করে কেনোই বা তাঁকে আবার আসতে বলেছিল এখানে? রাধামোহনের কাছে উত্তর নেই। তবে বছর দুই পরে হঠাৎ ঘটে গেল একটা ঘটনা....................।
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন এরকমই কালজয়ী কিছু উপন্যাস। কিন্তু ভূতের গল্পেও তাঁর দক্ষতা আসলে কোনো অংশে কম ছিল না।
"তারানাথ তান্ত্রিক " এর কথা একবাক্যে স্বীকার করেন সবাই। ভয়, ভৌতিকতা মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য এই বইটি। তেমনি রয়েছে ছোটগল্প বেশ কিছু। এবং তাও বেশ ভালো।
"পৈতৃক ভিটা" গল্পটি আমার বেশ ভালো লেগেছে এর শেষটার জন্য। শেষের অংশে আমি নিজেও একেবারে চমকে গেছি। বেশ ভালো লেগেছে।
এখানে গা ছমছমে, হাড়হিম করা অনুভূতি না থাকলেও অলৌকিকতা বা ভৌতিক ব্যাপার যাই বলুন সেটার ছাপ অবশ্যই পাবেন পাঠক।
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের লেখনী স্বস্তিদায়ক লাগে বরাবরই। এবং এখানেও ব্যতিক্রম হয়নি। সব মিলিয়ে বেশ ছিলো। স্পয়লারের ভয়ে বরং একটা ইন্টারেস্টিং সময়ে টুইস্ট রেখে লেখার ইতি টানলাম।
বইয়ের নামঃ "পৈতৃক ভিটা" লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৫/৫