“আল্লাহ যাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে চান, তাকে সত্যের জন্য তাঁর হৃদয় খুলে দেন।” — (সূরা আল-আন'আম ৬:১২৫)
বয়সের সাথে সাথে আমাদের জ্ঞান বাড়ে, চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটে, আশেপাশের জিনিসগুলো নিয়ে আমরা ভাবতে শুরু করি। কখনো কখনো পুরনো জিনিস গুলোই আমাদের সামনে নতুন করে ধরা দেয় বা বলা ভালো, নতুন রূপে ধরা দেয়। অনেক কিছুই আমাদের কাছে সঠিক মনে হয় না। ধরা যাক ধর্মের কথা। আমাদের চারপাশে এমন মানুষ অহরহ আছে যারা এক ধর্ম থেকে আরেক ধর্মে রূপান্তরিত হচ্ছে, ধর্মবিদ্বেষী হয়ে উঠছে। এমনই দুজন ধর্মান্তরিত মুসলিম বোনের গল্প এই “ফেরা” বইয়ে উঠে এসেছে। যারা বয়স আর জ্ঞানের বিস্তৃতির সাথে সাথে জীবনে নতুন পথ, নতুন আলো খুঁজে পেয়েছেন।
স্টেফানি ছোটবেলা থেকে একজন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান। ছোট থেকেই তার স্বধর্মের প্রতি ছলি অগাধ আনুগত্য আর শ্রদ্ধা। পরিবারের অন্যরা নামে ধর্মপালন সঠিকভাবে না করতে পারলেও স্টেফানি ছিল ব্যতিক্রম। তার ছোট বোনও অবশ্য তারই মতো ছিল। স্টেফানির স্কুলে তার অন্য হিন্দু, মুসলিম সহপাঠীরাও ছিল। মুসলিম সহপাঠীদের মিলাদ পড়া দেখে সে খুব মজা করত। দাড়িওয়ালা কাউকে দেখলে তাচ্ছিল্যের সুরে কথা বলত। আজান শুনে সেটাকে মজা করে পুনরাবৃত্তি করত। কিন্তু একদিক থেকে স্টেফানি ভালো ছিল। সে সবসময় বই পড়ার মধ্যেই ডুবে থাকত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার মা তাকে বাড়ির বাইরে যাওয়া থেকে আটকাতো। এর পেছনেও অবশ্য বিশাল কাহিনি আছে৷ স্টেফানির বাবা একজন মুসলিম ছিলেন। পরবর্তীতে প্রেমের টানে খ্রিষ্ট ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে স্টেফানির মাকে বিয়ে করেন৷ এজন্য স্টেফানি যে তার অন্যান্য মুসলিমদের সাথে মিশে উল্টো মুসলিম হয়ে যাবে না, এর ভরসা নেই। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।
এসবের জন্যই মূলত স্টেফানির বাসা থেকে বের হওয়া হতো না। আর অগত্যা বাসায় এমনি বসে থেকে তো লাভ নেই। তাই সবসময় বইয়ের মধ্যেই ডুবে থাকত সে। সবকিছু এমনিতে ভালোই চলছিল কিন্তু তার সকল ধরে বই পড়া হলেও নিজ ধর্ম নিয়ে কখনোই পড়া হয়নি। ছোট থেকে আশেপাশে দেখে যা শিখেছে, তাইই অন্ধের মতো পালন করত। কিন্তু এখন তো জানতে হবে নিজের ধর্মকে! এরমধ্যে একটা বাইবেলও তার সংগ্রহে চলে আসলো। কিন্তু সেটাই হলো তার কাল। সে যতই সামনে পড়ছে ততই অবাক আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছে। এসব সে কী পড়ছে? ছোট থেকে এতদিন ধর্মীয় যেসব রীতিনীতি, উৎসব পালন করে আসছে সেগুলোর ছিটেফোঁটাও তো বাইবেলে নেই। বরং রয়েছে উল্টো। এখানে মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করা হয়েছে কিন্তু তারা ছোট থেকেই মূর্তিপূজা করছে। শূকরের মাংসা খেতে নিষেধ করা আছে কিন্তু সেটা তার অন্যতম প্রিয় খাবার। এসব কি তার বাবা, মা, আত্মীয় স্বজনরা জানে না? জানলে কেন তার বিপরীত কার্যকলাপে উদযাপিত হয় তাদের উৎসব? সবাই কি অন্ধ?
এখান থেকেই শুরু হয় স্টেফানির নতুন জগতে চলা। জ্ঞানের দুনিয়ায় গা ভাসানো, নতুন কিছুর সন্ধান। মন যেন সর্বদা কোনোকিছুর জন্য আকুল। শান্তি নেই। আশেপাশে কাউকে ধর্মপালন করতে দেখলেও রাগ হত। এরা কি আসলেই ধর্ম সম্পর্কে কিছু জানে? তাদের ধর্ম যে নিতান্তই মানুষ দ্বারা তৈরি, তা কি এরা বোঝে না? নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করে?
এই গল্পটা দুই বোনের। যারা অনেক অনেক সংগ্রামের মাধ্যমে ইসলামে প্রবেশ করেছিল। তাদের সেসব সংগ্রাম, মানসিক কষ্ট, হাজারো বাধার গল্প জানতে হলে বইটি পড়ে ফেলতে হবে। এই বইটিকে আমি কোনো উপন্যাস কিংবা গল্পের বই বলার চেয়ে স্মৃতিকথন বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব। কারণ এখানে গল্পের পরিবর্তে তাদের জীবনের সংগ্রাম নিয়েই কথা হয়েছে। গল্পে যেমন একটা ধারাবাহিকতা, অবজেক্টের বর্ণনা ইত্যাদি থাকে এই বইয়ে সেসব নেই। এখানে লেখিকারা তাদের নিজের মতো করে লিখে গিয়েছেন। তবে এটার জন্য যে গল্পের স্বাদ হারিয়ে গিয়েছে কিংবা গল্পের প্রতি আমি আকর্ষিত হইনি, ব্যাপারটা এমন না। বরং এভাবে লেখার কারণেই বেশি ভালো লেগেছে। যেটা একদম সত্য ও বাস্তব সেটাই পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে তুলে ধরেছেন। ফলে বাড়তি মেদ নেই। উল্টো সংক্ষেপে তাদের জীবনের ছোট ছোট গল্পগুলো জানতে পেরেছি।
বলে রাখা ভালো, এই বইয়ের যে দুজন লেখিকা তাদের নিজেদের জীবনের গল্পই কিন্তু এই বইয়ে রয়েছে। আমার রিভিউ পড়তে গিয়ে আমার গোলমাল পাকিয়েন না। যাকগে, আলোচনায় আসা যাক। একজন বিধর্মী যখন ইসলাম ধর্মে আসে তখন কিন্তু সে সবকিছু জেনেশুনেই আসে। তারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয় বেশি। কিন্তু আমরা যারা জন্মগত মুসলিম তাদের সিংহভাগ মানুষের মধ্যে নিজেদের ধর্ম নিয়ে জানার স্পৃহা নেই। এই গল্পে যে জিনিসটা আমার কাছে সবচেয়ে খারাপ লেগেছে, বলা যায় যেটা আসলে বাস্তব, তা হলো এই বোনেরা তার আশেপাশের মুসলিমদের দেখে কখনোই ইসলামের প্রতি আকর্ষিত হয়নি। উল্টো যখন তারা ইসলামের প্রাথমিক বিষয়গুলো ও ইবাদাহগুলো সম্পর্কে জেনেছে তখন দেখেছে যে তার পরিচিত বা আশেপাশের মুসলিমরা এসব পালন করা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায় না। উল্টো যেসব ইসলামে নিষেধ সেগুলোই বুক ফুলিয়ে করে বেড়ায়।
তো আমি যেটা বোঝাতে চাচ্ছি সেটা হলো, আমরা নিজেরাই ইসলাম সম্পর্কে ঠিকমতো জানি না। তাহলে আমাদের উপর যে অন্য ধর্মের মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার এক গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটা কীভাবে আমরা পালন করব? কোথায় কেউ ইসলামে আসতে চাইলে তাদেরকে গিয়ে আমরা সাহায্য করব, তা না বরং আমাদের দেখে কোনো মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে যে ভালো ধারণাটুকু থাকে সেটাও নষ্ট হয়ে যায়। তাই আগে আমাদের ঠিক হতে হবে। লেখিকা নিজেও বইয়ের শেষে এই সম্পর্কে একটু কথা বলেছে।
এই বোনেদের গল্প পড়তে গিয়ে ছোটখাটো কিছু বিষয় সামনে আসবে ইসলামের নীতিমালার মধ্যে। এগুলো পড়ার সময় আমি নিজেও ভাবছিলাম যে আসলে আমি এসব নিয়ে কতটুকু জানি? এই বোনেরা যতটুকু মনোযোগ নিয়ে সালাত আদায় করে আমি সেরকম সালাত শেষ কবে আদায় করেছি, জানি না। অথচ আল্লাহ আমাকে দ্বীন সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান দিয়েছেন। এই যে ইসলাম একটা পূর্ণ জীবনব্যবস্থা, এই জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে আমরা কতটুকু অবগত। অতসব বাদ যাক, আমরা সাধারণ ইবাদাহগুলো সম্বন্ধেই ভালোমত অবগত নই। আসলে এতসব কথা বলছি কারণ আমার নিজের উপর আফসোস হচ্ছে। এই জাতির উপর আফসোস হচ্ছে। হায়!
সবশেষে, এই বইটি পড়তে আমি সবাইকে উদ্বুদ্ধ করব। বিশেষত যারা ইসলামিক বই পড়তে পছন্দ করেন তাদের বলছি। বইটা শুধু পড়ার জন্যই পড়বেন না৷ বরং পড়ার সময় ছোটখাটো যেসব কথা, ঘটনা উঠে আসবে সেগুলো উপলব্ধি করতে চেষ্টা করবেন। প্রতিটা জিনিস কল্পনায় দেখবেন। এরপর নিজেকে প্রশ্ন করবেন সেই অবস্থায় আপনি থাকলে কি করতেন? উত্তর সন্তুষ্টিজনক হলে ভালো, আর না হলে এর উত্তর আপনার কাছেই।
🔶 ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৮/৫
বই : ফেরা
লেখিকা : সিহিন্তা শরীফা, নাইলাহ আমাতুল্লাহ
প্রকাশনী : সমকালীন প্রকাশন
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১১৭
মুদ্রিত মূল্য : ১৯০৳