বাংলায় গ্রিক পুরাকথার বই খুব বেশি নেই। যা আছে তার বেশিরভাগই হ্যামিল্টন বা তাঁর পূর্বসূরিদের কাজের সংক্ষেপিত বা জোলো রূপান্তর। কিন্তু আলোচ্য বইটি সে-সবের তুলনায় একেবারে অন্য জিনিস। এটি বহু গ্রিক পুরাকথার প্রাপ্তমনস্ক অথচ রম্য রূপান্তর। তারই সঙ্গে এটি কম্পারেটিভ মাইথলজি (তুলনামূলক পুরাকথা)-র একটি থিসিস বললেও অত্যুক্তি হবে না। আগে লিখি এতে 'ভূমিকা'-র পর কী-কী আছে। ১. বাপ-ছেলের মারপিট; ২. প্রমিথিউস ও প্যান্ডোরা; ৩. জিউসের কেচ্ছাসকল; ৪. জিউস বনাম টাইফন; ৫. পার্সিফোন, আর্টেমিস ও অ্যাথেনা; ৬. মিনোস, মিনোটর, ইকারিস ও থিসিয়াস; ৭. সাইক, ইরোস ও অরফিউস; ৮. সিরিঙ্কস, নারশিসাস আর হারমাফ্রোডাইটিস; ৯. সিসিফাস, মিদাস, আর ইদিপাস; ১০. হেরাক্লিস বা হারকিউলিস— বারোটি; ১১. শেষের কথা। গল্পগুলো লেখার সময় লেখক সচেতনভাবে একটি 'থার্ড ওয়াল'-ভাঙা স্টাইল অনুসরণ করেছেন। ফলে পুরাকথার আলোচনায় দেদার দেখা দিয়েছে সমকালীন ভারত, বিশেষত বাংলা। তবে এমন রসিকতার ছলে বলতে গিয়েও লেখক মূল কাহিনিগুলো থেকে বিশেষ কিছু বাদ দেননি। বরং এই একান্ত নিজস্ব কথনের মাধ্যমে তিনি তিনটি জিনিস সাব্যস্ত করতে চেয়েছেন~ প্রথমত, শ্বেতাঙ্গ পণ্ডিতেরা এবং তাঁদের এদেশি চ্যালারা তারস্বরে যতই বলুন যে আমাদের 'অসভ্য' পুরাকথাগুলো আসলে 'ক্লাসিক' নানা কাহিনির বিকৃত রূপ, আদতে উল্টোটাই বহুলাংশে সত্যি। দ্বিতীয়ত, দেবতা বা ঈশ্বর সম্বন্ধে আব্রাহামিক ধর্মগুলোর ভাবনা তৈরির পেছনে গ্রিক পুরাকথা বহুলাংশে দায়ী। তৃতীয়ত, পণ্ডিতেরা এইসব পুরাকথার রূপক আর সত্যকে আলাদা করতে গিয়ে ব্যাপারগুলোকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করেছেন। আদতে গল্পগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে আর্থ-সামাজিক ইতিহাস— যাদের সেভাবে দেখাই উচিত। সরাসরি লিখি, বাংলায় কোনো পুরাকথা নিয়ে এই ধরনের কাজ আমি এযাবৎ পড়িনি। এই অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ বইটিকে উপভোগ করার পাশাপাশি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করাও তাই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু... এমন চমৎকার একটি বইয়ের প্রুফ থেকে বানান, প্রচ্ছদ থেকে লে-আউট— সবকিছুতেই এত আলগা ভাব কেন? সর্বোপরি, এর মধ্যে অলংকরণ নেই কেন? গ্রিক পুরাকথার বইয়ে যদি অলংকরণ আর মানচিত্রই না থাকে, তাহলে তো সবটাই কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যায়। স্টিফেন ফ্রাইয়ের সৌজন্যে গ্রিক পুরাকথা বিদেশে নতুন করে জনপ্রিয় হয়েছে। এই বাংলাতেও এমন একটি বই ঠিক ততখানি গুরুত্ব ও যত্ন সহকারে পরিবেশিত হওয়াই উচিত বলে আমি মনে করি। তাই আগামী দিনে লেখক এই বইটিকে পুনর্বিন্যস্ত করে, সম্ভব হলে হার্ডকভারে প্রকাশ করতে উদ্যোগী হবেন বলে আশা রাখি। অলমিতি।