উনিশ শতকের শেষার্ধের গল্প। খোকাদা এলাকায় নতুন একটা "ভয়ংকর বস্তু" এনেছেন। সেই ভয়ংকর বস্তু দেখতে পুরো গ্রাম জড়ো হয়েছে। সবার মধ্যে তুমুল আগ্রহ, সাথে চাপা ভয় আর উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত সেই ভয়ংকর বস্তুটিকে সবার সামনে উন্মোচন করা হোলো। ভয়ে কেউ সেই বস্তুর সামনে যেতে সাহস পাচ্ছিলো না (যদি অপমৃত্যু হয়?!) জিনিসটা কী জানেন? জিনিসটা "ক্রাচিন" বা কেরোসিন তেল; সাথে চিমনি বা হারিকেন। এই চিমনির সলতেতে কেরোসিন দিয়ে আগুন ধরাতেই একেকজন ভয়ে অস্থির। এর আগে কেউ "ক্রাচিন" এর নামই শোনে নাই! কী হাস্যকর শোনাচ্ছে না এখন? কিন্তু নতুন কোনো কিছুর উদ্ভাবনের বা ব্যবহারের গোড়ারদিকের গল্প এমনই হয়। ১৫/২০ বছর বয়সী কেউ বিশ্বাস করবে কি না সন্দেহ, গ্রামে বসে ২০০৮ সালে ইন্টারনেটে কারো নাম লিখে সার্চ দিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতাম কখন সার্চ রেজাল্ট আসবে! একঘণ্টার মধ্যে চলে আসলে ব্যাপক খুশি হয়ে যেতাম। এখন শুনতে উদ্ভট লাগলেও এমনই ছিলো চিত্র।
"সেকালের কথা" বইতে জলধর সেন উনিশ শতকের শেষার্ধের বিবিধ বিষয় নিয়ে লিখেছেন। আছে বাল্যবিবাহ, আছে শিক্ষাপদ্ধতি, আছে ছাত্রদের শাস্তি দেওয়ার অভিনব সব পদ্ধতির বিবরণ, আছে অদ্ভুত এক মাঠের গল্প, আছে কলকাতায় চা পানের অভ্যাস চালু করার গল্পও। শেষ গল্পটা আলাদাভাবে বলি। ইংল্যান্ডের এন্ড্রু ইউল কোম্পানি কলকাতায় চায়ের ব্যবসা করে বিশেষ লাভ করতে পারছিলো না। শেষে এই কোম্পানি চাললো এক মোক্ষম চাল। কলকাতার মোড়ে মোড়ে বিনামূল্যে চা খাওয়ানো শুরু করে দিলো তারা। লোকজন তো চা পান করে চায়ের মহাভক্ত হয়ে উঠলো। কোম্পানি যখন দেখলো লোকজনকে ভালোই চায়ের নেশায় পেয়েছে তখন তারা বিনামূল্যের ব্যবসা গুটিয়ে নিলো। এদিকে কলকাতার লোক কি আর করবে!তারা কিনে চা খেতে শুরু করলো। এই না হলে ব্যবসায়িক বুদ্ধি!
জলধর সেনের গদ্য অত্যন্ত স্বাদু। পড়তে পড়তে সবকিছু চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে।বইয়ের আয়তনও ছোট।সবারই ভালো লাগার কথা।
একালের সব ভালো, আর সেকালের সব খারাপ যেমন হয় না। ঠিক তেমনই একালের সব খারাপ, আর সেকালের সব ভালো, এটাও হয় না। খারাপ ভালো সব মিলিয়েই চলে সবসময়। এই খারাপ ভালো নিয়েই টুকরো টুকরো সেকালের কিছু ঘটনা উঠে এসেছে এই বইতে।
"দুনিয়া জিনিয়া চূড়া যম-জিনিতে যায়, তোরা দেখবি যদি আয়। যম্ জিনিতে যায় রে চূড়া যম জিনিতে যায়।” নিজের অফিসে বসে চূড়ামণি দত্তের কলম কাটতে গিয়ে ছুড়িতে আঙ্গুল কেটে সামান্য রক্ত ঝড়ায় পালকিতে চেপে একশো ঢাক নিয়ে শোভাযাত্রা বের করে গঙ্গাতীরে পৌঁছায়। গঙ্গাতীরে পৌঁছে যখন তার পার্থিব খেলা শেষ হয়, তখন সবাই একসাথে জয়ধ্বনি করে ওঠে, "জয় যম-বিজয়ী চূড়ামণি দত্তের জয়!" আজকাল বিসর্জনের সময় যে বাজনার তাল শোনা যায়, তা এখান থেকেই এসেছে। চূড়ামণি দত্তই এর সৃষ্টিকর্তা। নিজের মৃত্যুর যাত্রার এমন মজার আখ্যান সত্যি সেকালেই কেবল সম্ভব ছিল।
বইতে উঠে এসেছে আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগের এক অন্নপ্রাশন বাড়ির খাদ্যের তালিকা। যেখান থেকে সেই সময়ের ভোজের আন্দাজ করা যায়। সাথে সেই সময়ের দ্রব্যমূল্য সম্পর্কেও আন্দাজ পাওয়া যায়। যেমন সেকালে উপযুক্ত চালের মূল্য ছিল এক টাকা দশ আনা মণ, খাঁটি দুধ পাওয়া যেত এক টাকা সওয়া ছয় আনা মণ-এ, মাছের দাম ছিল পাঁচ মণ চালের সমান ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, খাদ্যের তালিকা থেকে বোঝা যায় সেই সময় ছানার সন্দেশের সেরকম প্রচলন ছিল না। তার জায়গায় নারকেল ও চিনি দিয়ে তৈরি নারকেলের সন্দেশই ভোজনে ব্যবহৃত হতো।
"তোমরা সবাই আরও স'রে যাও—এখন য বা'র ক'রব, সে অতি ভয়ানক জিনিস। তার নাম হচ্ছে 'ক্রাচিন" 'ক্রাচিন' অর্থাৎ হল কেরোসিন তেল। এখনকার দিনে কেরোসিন তেলের ব্যবহার হয় না বললেই চলে। কিন্তু ছোটোবেলায় লোডশেডিং হলেই কেরোসিন তেল ব্যবহার করে হ্যারিকেন জ্বালাতে দেখতাম। সেই সময় প্রায় সব বাড়িতেই এর ব্যবহার হতো। আর হ্যারিকেনের সেই মৃদু আলোয় ভূতের গল্প পড়া বা শোনার মজাটাই ছিল অন্যরকম অনুভূতি। তবে ১৫০ বছর আগে, তখন কিন্তু কেরোসিন তেল সম্পর্কে গ্রামের মানুষ ওয়াকিবহাল ছিল না। তাই লেখকের গ্রামে যখন এক লোক শহর থেকে কেরোসিন তেল নিয়ে গ্রামে ফেরে, তখন সেটা দেখার জন্য প্রায় গোটা গ্রাম তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। যদিও সবার মনে ছিল কেরোসিন তেলকে নিয়ে সাংঘাতিক ভয়।
এইসকল অভিজ্ঞতার সাথে উঠে এসেছে সেকালের ছাত্রদের শাসন পদ্ধতির চিত্রও। এখনকার দিনে শিক্ষকরা ছাত্রদের শাসন সেভাবে করে না বললেই চলে, আর করলেও তা খুব হালকা। কিন্তু আজ থেকে ১০০/১৫০ বছর আগে ছাত্র শাসন ছিল অনেক আলাদা। তখন শিক্ষকরা পড়া না করে আসলে বা স্কুল কামাই করলে শুধু মুখে শাসন করেই ছেড়ে দিতেন না। মুখে তো কথা শুনতেই হতো, তবে সাথে চলতো কঠোর শাস্তি। যেমন দু হাতের তালুর উপর ইট রেখে রোদে দাঁড়িয়ে থাকা, কিংবা এক ফোঁটা জল না খেয়ে রোদে দাঁড়িয়ে থাকা। এছাড়া বেতের মার তো আছেই।
এছাড়াও এই বইতে উঠে এসেছে লেখকের প্রথম চা খাওয়ার অভিজ্ঞতা, বিজয়ার লড়াই, সাথে সেকালের পাঠশালার চিত্র, সেকালের বাল্য বিবাহের ও বালিকা বিদ্যালয়ের চিত্র এবং লর্ড মেয়োর অপঘাতে মৃত্যুর দিনের চিত্রের মতো নানান অভিজ্ঞতা।
টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতা নিয়েই বইটিতে পুরনো কলকাতা সহ মফস্বলের চিত্র ফুটে উঠেছে। পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল ঘড়ির কাঁটা যেন সেই সময়তেই পৌঁছে গেছে, আর সরছে না সেখান থেকে এক ঘরও। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছিল যেন ঘটনাগুলো। এরকম লেখা পড়ে স্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে কার না ভালো লাগে। আর তাই ভীষণই ভালো লাগলো এই ছোটো গদ্যের বইটি। এক সিটিংয়েই শেষ হয়ে গেল। সাথে উপরি পাওনা ছিল সঞ্জয় কুমার দে- এর প্রচ্ছদ এবং শোভন ভৌমিকের নজরকাড়া অলংকরণ।
সবশেষে বলবো, ভীষণ ভালো একটি বই এটি। পাঠকরা পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।