ঢাউস সাইজের মোটা একখানা বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পড়ে ফেললাম চলচ্চিত্র বিষয়ক আঠারোটি মিঠে গদ্যের এই সংকলনটি। চলচ্চিত্রের ভাষা, নির্বাক ও সবাক যুগের চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রে আর্ট ও সাহিত্য ভাব, আবহসঙ্গীত ডিটেল ও সংলাপের সীমাবদ্ধতা এবং সোভিয়েত চলচ্চিত্রের প্রারম্ভ ও স্টালিন আমলের সিনেমা; আইজেনস্টাইন, পুদোভকিনের সিনেমার অভূতপূর্ব সব আলোচনা রয়েছে এই বইটিতে। তাছাড়া সত্যজিৎ রায়ের নিজের ছবির সমালোচনার জবাব, শুটিং অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে তুলে আনা কিছু চরিত্রের অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ডের কথা, ইন্দির ঠাকরুন ওরফে চুনিবালার মনোবলের কথা ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি ধাঁচের ফিল্ম করতে গিয়ে তাঁর (বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়) সঙ্গে যে কথোপকথন ও তাকে কিংবা বলা চলে তাঁর সৃষ্টিকর্ম প্রথম আবিষ্কারের কথা সত্যজিৎ রায় আমাদের শুনিয়েছেন একদম মিঠে ভাষায়। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের সাথে কথোপকথনের সময় একটা জায়গায় চোখ আটকে যায়। [এখানে বলে রাখা ভালো(যারা জানেন না) বিনোদবিহারীর জন্ম থেকেই একটা চোখ নষ্ট, আরেকটা দিয়ে যা দেখতেন তাও ঝাপসা। চিত্রপটের এক বিগত দূরে চোখ রেখে ছবি দেখতে ও আঁকতে হত। কিছুদিন পর ওই একখানা চোখও নষ্ট হয়ে যায়। সত্যজিৎ রায় যখন কথা বলেন ওঁনার সাথে তখন ওনি সম্পুর্ণ দৃষ্টি রহিত] তা এখানে তুলে দিলাম—
“ফিল্মে Blindness দেখানো হয়েছে ?” বিনোদদা জিগ্যেস করলেন । বললাম, “তা হয়েছে বই কি । বাংলা ছবিতেই হয়েছে । রবীন্দ্রনাথের ‘দৃষ্টিদান’ তো ছবি হয়েছে এককালে। ওদেশে আঁদ্রে জিদের উপন্যাস থেকে করা ‘La Symphonie Pastorale' ছবির কথা মনে আছে.”
“কি রকম অন্ধ দেখায় ? ঠিক জিনিসটা দেখায় ?”
“যেমন বোবা দেখায়, অন্ধও তেমনিই দেখায় আর কি। বেশ খানিকটা মোলায়েম করে দেখানো হয় । বিশেষ করে স্বয়ং নায়িকা যদি বোবা বা অন্ধ হন তাহলে তো কথাই নেই। বোবার ভাষা প্রকাশের ব্যর্থ চেষ্টা থেকে যে গোঙানির উদ্ভব হয়, সেটা কোনো ছবিতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।”
“তাহলে অন্ধের বেলাও হয়ত সহজ করে নেয়�� আসলে ব্যাপারটা খুবই কম্প্লেক্স । এটা তো আগে জানা সম্ভব ছিল না । Space সম্পর্কে একটা নতুন চেতনা হয়। Space টা হয়ে যায় একটা ঘন বস্তু— যেটাকে হাত দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে সামনে এগোতে হয় । যে জিনিসটা স্পর্শ করছি সেটা ছাড়া আর কোন কিছুর অস্তিত্বই থাকে না। তোমরা চেয়ার দেখলেই বুঝতে পারছ সেটা আছে, আমি চেয়ারে বসলে পরে তবে বুঝছি সেটা আছে । তাও তাতে হাতল আছে কিনা সেটা হাতলে হাত না ঠেকা পর্যন্ত বুঝছি না । তারপর হাতলটা কাঠের না বেতের, সরু না মোটা,পালিশ করা না এবড়োখেবড়ো, সেটা গোল হয়ে নেমেছে না রাইট অ্যাঙ্গলে নামছে, এসব হাত বুলিয়ে দেখে নিয়ে তবে বুঝতে হবে অপ্রত্যাশিত কিছু হাতে ঠেকলে চমকে উঠতে হয়। এই যে চেয়ারে বসে আছি, লাঠিটা আমার সামনে হাতলের উপর আড়ভাবে রাখা আছে—যদি লাঠিটার কথা ভুলে যাই, তাহলে সেটা হাতে ঠেকলেই শিউরে উঠি। এছাড়া আবার আরেকটা দিকও আছে। এই যে চায়ের গেলাসটা হাতে নিলুম—কাঁচ জিনিসটার স্পর্শগত অনুভূতি কোনোদিন আগে এভাবে Feel করিনি । এরকম সব বস্তু সম্পর্কেই একটা tactile feeling গড়ে ওঠে।”