📜 বইয়ের নাম এবং প্রচ্ছদ দেখে নিশ্চয়ই বুঝেছেন এটি একটি আদ্যোপান্ত প্রেমের উপন্যাস । কিন্তু, শুধুই কি প্রেম ? এই উপন্যাস জুড়ে একই সমান্তরালে চলেছে দুটো ভালোবাসা আর বিষাদের গল্প । এই গল্প পড়তে পড়তে মনে হবে, আসলেই কি গল্প !! নাকি আমাদের চোখে দেখা পারিপার্শ্বিক কয়েকটি মানুষের জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের কাহিনী । তাই ভালোবাসার গল্প হয়েও, এই উপন্যাস আসলে কয়েকটি মানুষের হৃদয়ে অনুভব করা সুখ-দুঃখের মিশেল, ক্লান্তি-বিষাদ, অপ্রাপ্তি আর দুঃসহ দুঃখবোধের গল্প ।
📝 গল্প-সংক্ষেপ : এই গল্পের একটি মুখ্য চরিত্র নদী, সে পেশায় অভিনেত্রী । তার বাবা আদিবুর রহমানের দূর্ঘটনার পর, তরুণ নির্দেশক রায়হান পরপর অনেকগুলি নাটকেই কাস্ট করে ফেলে নদীকে । নাটকগুলির মধ্যে বেশ কিছু নাটকই মেয়েদের সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট, রেপ্ এইসব বিষয় নিয়ে । এই বিষয়গুলি ঠিক করে দেন সদরঘাটের একজন মাছ ব্যবসায়ী, ফজলু মিয়া । নদীর মনে সংশয় দানা বাঁধে, কে এই মাছ ব্যবসায়ী ? এইসব প্লট নির্ধারণ করে একজন মাছ ব্যবসায়ীর নাটক প্রযোজনায় বিনিয়োগ করার উদ্দেশ্য টা কি ?
এইসময় নদীর জীবনের ক্যানভাস রঙিন করে তোলে সজলের উপস্থিতি । অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝি পেরিয়ে তাদের সম্পর্ক পরিণত হয় প্রণয়ে । কিন্তু, তারপরেই এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে সবকিছু...
▪️নদী’র গল্পের পাশাপাশি সমান্তরালে ঘটে চলে নীতুর জীবনের এক ভীষণ করুণ ঘটনা । নদী’র বোন নীতু, কলেজের ছাত্রী । নীতুর গল্পের শুরু হয় তার জীবনের ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা দিয়েই । যে নীতু নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করে গুটিয়ে নিয়েছে, তাকে আবার প্রচন্ড ভালোবাসে অন্তু । কিন্তু অতীতের কোনো এক অপরাধের কারণে নীতুর অবুঝ মনের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছাতে পারে না অন্তুর অনুভূতি, নীতুর চোখে কেবলই ভেসে বেড়ায় অন্তুর করা একটি ভুল । নীতু কি অন্তুর সেই ভুল ক্ষমা করবে ?
এছাড়াও আছে আকিব, সেও ভালোবাসে নীতুকে । নিজের একাকী জীব��ে কি কাউকে ঠাঁয় দেবে নীতু ?
📝 পাঠ-প্রতিক্রিয়া : এই উপন্যাস বড়ো মায়াময় । গল্পের প্রতিটি চরিত্রের সাথে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত মায়া । কো��ো একজনের যন্ত্রণায় মায়া, বিচ্ছেদে মায়া, ভালোবাসার স্বীকৃতি স্বরূপ যে চাদর নদীর গায়ে জড়িয়ে দেয় সজল... তার কারণও তো মায়াই । বিচ্ছেদের পরেও আরেকবার হাতটা ছুঁতে চাওয়া, সজলের জন্য নদীর বা নদীর জন্য সজলের যে কান্না, নীতুকে পেতে চেয়ে অন্তুর যে নিরন্তর প্রচেষ্টা... সেই সবকিছু তো মায়াই ।
▪️এই উপন্যাসের চরিত্রায়ন আমার বেশ ভালো লেগেছে । গোটা উপন্যাস জুড়ে একদম অল্প কিছু চরিত্র ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার... সেই প্রতিটি চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ, নিজের মতো করে স্বতন্ত্র । কিন্তু... নদী, নীতু, সজল, অন্তু, আকিব - এই সবকটি চরিত্রকে ছাপিয়ে গেছে ফজলু মিঞার চরিত্রটি । অদ্ভুত এই মানুষটিকে ভালো-মন্দের চিরাচরিত মাপকাঠিতে ফেলা যায় না, বরং তার চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পাঠক হিসেবে দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়তে হয় বারবার । সমগ্র কাহিনি আবর্তিত হয়ে চলেছে এই মানুষটিকে কেন্দ্র করেই... অথচ কারোর স্পষ্ট ধারণা নেই মানুষটি আসলে কে, এমনই ‘ধূসর’ এই চরিত্র তৈরি করেছেন লেখক ।
▪️এই উপন্যাসের গল্প এবং লেখকের লেখনী এতটাই যথাযথ যে পড়তে পড়তে পাঠকের মন আচ্ছন্ন না হয়ে পারে না । কিন্তু আমরা পাঠকরা সবসময়ই আমাদের ‘প্রিয় লেখক’এর থেকে ‘আর একটু বেশি কিছু’র প্রত্যাশায় থাকি... তাই বোধহয় মনে হয়েছে, গল্পের শেষ অংশে কঠোর সত্যের মুখোমুখি হয়ে নদী’র অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ আর একটু বিষদে পেলে আরও ভালো লাগতো । আবার, নারী নির্যাতকদের প্রতি ফজলু মিয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণ হিসেবে আরও একটু ব্যাখ্যা গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারতো । কিছু কিছু দৃশ্যে লেখকের বর্ণনা একটু অতিরিক্ত মনে হয়েছে, অর্থাৎ এক-দুই স্তবকের মধ্যেই রেখে দেওয়া যায় এমন কিছু কথা লেখক প্রায় এক পাতা ধরে বর্ণনা করেছেন । তবে... সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে যে বিষয়টি তা হলো লেখকের ‘মানবমনের বিশ্লেষণ’, বিশেষত যে কোনো নারীর বয়সোচিত মননের যথাযথ উপস্থাপন শুধুমাত্র যে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাই নয়, রীতিমতো অবাক করে দেয় ।
📜 সত্যি বলতে কি, বইটি শেষ করতে ইচ্ছে করছিল না কিছুতেই । বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম নির্দিষ্ট কিছু পাতায় । সাদাত হোসাইনের বিশেষত্ব হল গদ্যের মাঝে মাঝে ছোট ছোট কবিতার সুন্দর ব্যবহার । আর এই বইটিতে ঐ কবিতাগুলি ছিল বড়োই বেশি প্রিয়...
“আমায় দিয়ো একটুখানি ছুঁয়ে,
আমায় দিয়ো একটুখানি মন,
এই জনমের জন্ম মৃত্যু জানে,
তুমি মানেই আমার সমর্পণ !”