ইতিমধ্যে বইটি নিয়ে প্রচুর কথা হয়ে গেছে। যারা ফেসবুকের সাহিত্য ভিত্তিক গ্রুপগুলিতে ঘোরাফেরা করেন, তারা হয়তো বইটির ব্যাপারে অনেক কথাই শুনে ফেলেছেন। অনেকে পড়েও ফেলেছেন।
শুরুতেই বলি, বইটির মলাট এবং আকার আকৃতি খুবই আকর্ষণীয়। দেখলেই লোভ হয়। সেই দিক দিয়ে প্রকাশকদের অভিনন্দন। পৃষ্ঠার মান, ফন্ট সাইজ বেশ ভালো। কিন্তু তাও ভেতরটা যেন কেমন একটা কাঁচা কাঁচা লাগছে। ১৫ নম্বর পাতায় ইলাস্ট্রেশনটি যেন পাতা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এরকম মনে হল।
এবার আসি লেখায়,
সত্যি কথা বলতে কী বইটি খুলে যদি একবার পড়তে শুরু করেন তাহলে ছেড়ে উঠতে পারবেন না। মাত্র ১১৮ পাতার বই, বেশীক্ষণ লাগবে না শেষ করতে। অন্তত যারা আমার মত ফেলু ভক্ত তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য।
শুরু থেকেই চমক রয়েছে। লেখককে কুর্নিশ করতেই হবে, তিনি অসাধারণ দক্ষতার সাথে কল্পনা আর বাস্তবের দুনিয়াকে মিলিয়েছেন। উপেন্দ্রকিশোর থেকে শুরু করে নেতাজি থেকে উত্তমকুমার সাথে সাথে ভূতাণ্বেষী বরদা, তারিনীখুড়ো দ্যা গ্রেট এবং সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ সবাইকে একই সুত্রে গেঁথেছেন লেখক। সত্যিই পড়তে পড়তে লেখককে বাহবা দিচ্ছিলাম। শুধু এখানেই শেষ নয়, ফেলুদার গল্পের বিভিন্ন সময় উঠে আসা নানা চরিত্রদেরও এই গল্পে রেখে ফেলুভক্তদের তাক লাগিয়েছেন লেখক। ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গল্পের সেই রাজেন মজুমদার, সাথে ফেলুদার বাবা জয়কৃষ্ণ মিত্তির এবং তারিনী বাঁড়ুজ্যে, এই তিন বন্ধুর ছেলেবেলায় শেয়ালের গর্ত থেকে ছানা চুরি করার প্লটটা দারুণ লেগেছে আমার।
এছাড়া সিধু জ্যাঠার পরিবারের উপস্থিতি, স্বদেশী আন্দোলন, ফেলুদা এবং তোপসের জন্ম এই ঘটনাগুলিও সুন্দর ভাবে সাজিয়েছেন লেখক।
আরও যেটা ভালো লাগবে সেটা হচ্ছে জটায়ুর জন্ম বৃত্তান্ত এবং ছেলেবেলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। লেখকের প্ল্যানিং কে সত্যিই কুর্নিশ করতে হয়।
ফেলুদার গল্প নিয়ে আমার বরাবরের অভিযোগ ছিল যে গল্পগুলি কিশোর সাহিত্য গন্ডির বাইরে রাখা যায় না। কিন্তু এই বইতে তার একটি সুন্দর ব্যাখা আছে। আসলে ফেলুদা নিজের কিশোর সাহিত্যের উপযুক্ত এডভেঞ্চারগুলোই সত্যজিৎ রায় মশাইকে ছাপতে দিতেন। উনি এমন অনেক দুর্ধর্ষ কেস সলভ করেছেন যেগুলো কিশোর মনের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। সেগুলি তিনি ছাপতে দেন নি। সেরকমই কিছু কেসের বর্ণনা এই বইতে পাবেন। চমকপ্রদ লেগেছে আমার।
লেখনি ঝরঝরে। কোথাও অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বরপূর্ণ কথাবার্তা নেই। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান।
সত্যি কথা বলতে কী বইটি আমার ভালোই লেগেছে, কিন্তু কিছু বিষয় নিয়ে আমার কিছু বক্তব্য রয়েছে।
বজ্রযান তন্ত্র নিয়ে ফেলুদার পূর্বপুরুষদের যোগসুত্রটা না রাখলেও চলত, ঠিক জমল না ব্যাপারটা। এছাড়া জয়কৃষ্ণ মিত্তিরের মৃত্যুটা রহস্যজনক না হলেও চলত। বৈকুন্ঠ মল্লিকের সাথে জয়কৃষ্ণ মিত্তিরের পূর্বপরিচিতিটাও বড় অতিনাটকীয় লাগল। ফেলুদার গল্পে পড়ার চরিত্রগুলির উল্লেখ মাঝেমধ্যে পেতে ভালোই লাগে, কিন্তু সবার সাথেই ফেলুদার পরিবারের সম্পর্ক থাকতে হবে সেটার কোনো মানে নেই। যাইহোক, তবুও এগুলো মেনে নেওয়া যায়। যেটা মেনে নেওয়া যায় না সেটা বইয়ের শেষটা। ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক যে ঘটনার উল্লেখ করেছেন সেটি মেনে নেওয়া যায় না। হ্যাঁ মানছি একজন সুপারহিরো কে মানবিক করতে চেয়েই আপনি ট্র্যাজিক হিরো করতে চেয়েছেন, কিন্তু আরও একটু ভাবনা চিন্তার দরকার ছিল। শেষের দিকটা বড় তাড়াহুড়ো করেছেন লেখক। এটা যদি লেখকের নিজস্ব চরিত্র নিয়ে গল্প হতো তাহলে ক্লাইম্যাক্স নিয়ে কোনো আপত্তি থাকত না, কিন্তু যেহেতু ফেলুদা, আপামর বাঙালীর আবেগ এবং ভালোবাসা যাকে নিয়ে, তার অন্তিম পরিণতির কথা লেখার সময় আরো একটু "ক্রিয়েটিভিটি" আশা করেছিলাম। শেষটা জমেনি। দুঃখিত!
তবুও বলব প্রত্যেক ফেলুপ্রেমী তথা সত্যজিৎ ভক্তের একবার অন্তত পড়া উচিত "তোপসের নোটবুক"। রোমাঞ্চিত হবেন এটুকু বলতে পারি। এছাড়া বইচই ১৪২৬ পূজাবার্ষিকীতেও কৌশিক বাবুর " রুদ্র…প্রখর রুদ্র" লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন। বলাই বাহুল্য এটি জটায়ুকে নিয়ে লেখা স্ট্যান্ড অ্যালোন পিস। এটিও চমকপ্রদ!