‘সাতকাহন’ যখন প্রথম পড়ি, তখন সম্ভবত ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। অবশ্যই সেটা এই উপন্যাস পড়ার যথাযথ বয়স নয়; কিন্তু আমি ছিলাম বুভুক্ষু পাঠক। বাছবিচার করে পড়ার মতো বিলাসিতা কিংবা শুধু বয়স অনুযায়ী বই পড়ার মতো সচ্ছলতা তখন ছিল না। যা পাওয়া যেত, তা-ই গিলে খেতাম—সেটা 'মকসুদুল মোমিনীন' হোক কিংবা সেবা'র রোমান্টিক 'চন্দনের বনে'।
মনে আছে, বোধহয় বেলা বারোটার দিকে বড় বা ছোট খালা কলেজ থেকে ফিরছিলেন এই বইটা নিয়ে। স্কুলফেরত আমি তখনই সেটা দখল করে বসলাম। বেলা তিনটা বা সাড়ে তিনটার দিকে চোখ-মুখ লাল, সেই স্কুল ড্রেস পরা অবস্থাতেই রীতিমতো নাক ডুবিয়ে প্রায় অর্ধেক পড়ে ফেলেছি! দিন-দুনিয়ার কোনো খবর নেই। এমন সময় মেজো খালা এসে বইটা কেড়ে নিলেন—"যা, আগে ফ্রেশ হ, খেয়ে নে! এভাবে কেউ বই পড়ে? চোখ তো যাবে!"
না, চোখ যায়নি। বয়স এবং আন্ডারওয়েট শরীরের তুলনায়, যে জীবনে কোনোদিন ছোট মাছ কিংবা কোনো ধরনের সবজি খায়নি, তার দৃষ্টিশক্তি এখনো অস্বাভাবিক ভালো, আলহামদুল্লাহ। আইস্পেশালিস্ট চেক করতে গিয়ে চশমার পাওয়ার বাড়াতে না পেরে রীতিমতো হতাশ হন।
কিন্তু ওই আউট বই পড়ে জীবনের সেরা সময়টা নষ্ট করে লাইফটা একদম গোল্লায় গেছে! যেটা টেক্সটবুক ঠিকমতো পড়লে হয়তো অন্যরকম হতে পারত। অনেক ঝড়ঝাপ্টা আর আগ্নেয়গিরি পেরিয়ে দীপা যেমন দাপুটে সরকারি অফিসার হয়েছিল, আমার জীবনে একবারও বিসিএস দেওয়াটাই হলো না। ডাক্তার কিংবা ডক্টরেট—কিছুই না হতে পেরে, টেনেটুনে জোটানো কেরানিগিরির দুই পয়সায় দিন গুজরান করি!
‘সাতকাহন’ কেমন লেগেছিল?
ওয়েল, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম। ১২ বছরে একরকম, ১৭ তে একরকম, ২৩ কিংবা ৩৩ এ এসে যখন পড়েছি আরেক রকম।
প্রতিবার রেটিং বদলেছে, নতুন নতুন করে বইয়ের একেকটা পার্ট নিয়ে রিয়ালাইজেশন কিংবা ক্রিটিসিজম এসেছে। দীপাবলীর যে আচরণে ১৩ বছরে মুগ্ধ হয়েছিলাম, ২৩ এ সেটা মনে হয়েছে বাড়াবাড়ি, ৩৩ এ এসে আবার মনে হয়েছে—শী ওয়াজ অন পয়েন্ট।
পাঠকের ম্যাচিউরিটির সাথে বেড়েছে বইয়ের অর্থ বোঝার দ্যোতনা।
শক্তপোক্ত, স্বাধীনচেতা মেয়েমানুষ হবার অনেক ঝামেলা। আমরা জানি কাঁধে ঢলে না পড়ে, প্লিজ বলে আবদার না করে নিজেরটা নিজে ম্যানেজ করার সুখ! জামাইয়ের পকেট কেটে বা আবদার করে নেয়া ভালোবাসার মতোই হয় নিজের এটিএম কার্ড দিয়ে কেনা শাড়িটা!
না না, শাহবাগী 'নেড়ী'বাদী হিসেবে ফেমিনিজম কপচাচ্ছি না, সেলফ-এস্টিমওয়ালা মেয়েদের প্রবলেমটার কথা বলছি। আমরা ঘাড়ে চাপা জিনিসটা হজম করতে পারি না তো, আটকে যাই সেই এক জায়গায়।
দীপারও হয়তো এতটা চাঁছাছোলা নারীবাদী হবার দরকার ছিল না; জলপাইগুড়ির চা বাগানের বাবুর মেয়ে হিসেবে আরেকটু পড়াশোনা করে টিপিক্যাল সাদামাটা সুখের একটা সংসার তার হতেই পারত। অঞ্জলি তখন মা হয়েই থাকতেন, মাসির সম্পর্কে ফিরে স্বার্থের নির্লজ্জ চেহারাটা আর দেখতে বা দেখাতে হতো না কোনো পক্ষকেই। কিন্তু ১২ বছরে পা দেওয়ার সাথে সাথেই নিয়তি যার জীবনে বাঁক বদলের ঢেউ এঁকে রেখেছিল, সে অদৃষ্ট খণ্ডাবে কে?
দীপা তাই অকালে পাত্রস্থ হয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর মৃতপ্রায় পুত্রের সাথে।
শৈশব বোঝার আগেই তাকে বোঝানো হয় যৌনতা, সিঁথির সিঁদুর মুছে আসে বৈধব্য, পেঁয়াজ আর আমিষ সরে যায় জীবন থেকে।
তারপর দাঁতে দাঁত চেপে আসে ফার্স্ট ডিভিশন, স্কুল ফাইনালে।
এরপর শুধু সিঁড়ি ডিঙানো, একটার পর একটা। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সর্বভারতীয় পরীক্ষায় সাফল্য। পাশ থেকে সরে যান লোভী শ্বশুর ও তার উপপত্নী, বাবা অমরনাথ, ঠাকুমা মনোরমা, অসীম, অমল কুমার, প্রিয় বন্ধু মায়া, শমিক...
এমন কী অনেক ভেবেচিন্তে বরণ করা জীবনসঙ্গী অলোকও।
শেষ অবধি থাকে দীপার অতিরিক্ত মর্যাদাবোধ, ত্যাড়ামো, মানিয়ে না নেওয়ার ঔদ্ধত্য আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয় বটে, কিন্তু শুধু রান্নার স্বাদ নিয়ে কাইজ্জা করে প্রেম ধীরে মরে যায়? অ্যাডাল্টহুড মানেই তো অ্যাডজাস্ট করা, সে তো হোস্টেলে দুটো মানুষ রুম শেয়ার করে থাকতে গেলেও হয়।
নাকি দীপার জীবনে এই একাকীত্বটাই ছিল অবশ্যম্ভাবী?
যদি ভালোবাসাই নাই থাকে, শুধু একা একা লাগে.. কোথাও শান্তি না পাওয়া গেলে অবশ্য একা থাকাই শ্রেয়।
রুমিন ফারহানা সাধে বলেননি—"সৃষ্টিকর্তা আর শিক্ষা ছাড়া নারীর নিজের কিছু নেই।"
আমি কি দীপাবলী হতে চেয়েছিলাম?
নাহ, আমি দীপা হতে চাইনি কোনো বয়সেই; গর্ভধারিণীর জয়িতাও না।
সমরেশ স্বাধীন নারীর ছবি আঁকতে গিয়ে বাউন্ডারি টানতে পারেননি, ফাইন লাইনের বদলে ভদ্রলোকের রেশিওটা বিদঘুটে হয়ে দাঁড়ায়; এমনটা মনে হয়েছে মাঝে মাঝেই..
তাও নেকুপুশুমিনি বাঙালি ললনাদের মারা খাওয়া বহু চরিত্রের হিসেবে দীপাবলী উত্তম।
৪/৫।