অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বইটি প্রকাশিত হলো। এ বইয়ের বিষয়বস্তুর সাথে পূর্ব থেকেই হাজার হাজার পাঠক পরিচিত ছিলেন, এবং তারা অপেক্ষায় ছিলেন কখন এটি আলোর মুখ দেখবে। বহুল আলোচিত বই ‘আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র’-এর লেখক এখানে ২৯৬ পৃষ্ঠায় পরিবেশন করেছেন এক অভিনব ফিকশোনালাইজড নন-ফিকশন।
'আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র' এবং 'টয়োটা করোলা'র পর নতুন চমক 'ভোর হলো দোর খোলো খুকুমণি ওঠো রে'।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদের নাম ইদানীং বেশ আলোচিত হচ্ছে। এর আগে উনার কিছু পড়া হয়নি আমার যদিও রিভিউ মারফত জানা হয়ে গেছে যে উনি স্যাটায়ার বেশ ভাল লিখেন। যাইহোক, বাতিঘরে এই বই দেখে পড়তে বসে গেলাম। ভাবি নাই, একটানা পড়ে ফেলবো পুরো বই।
বইতে যে খুব নতুন কিছু আছে এমন না তবে এরকম বই লেখা অনেক জরুরী। হুমায়ুন আজাদের প্রভাব আছে লেখকের উপর। আজাদের মতোই ছুড়ির ফলার কাটা কাটা কথা তবে লেখকের গদ্য আরো প্রাঞ্জল, সুখপাঠ্য। বাঙালির চিরায়ত হিপোক্রিসি আর আমাদের সমাজ ব্যবস্থার শুভঙ্করের ফাঁকি লেখক বেশ হিউমার দিয়ে তুলে ধরেছেন জিব্রাইলের জবানীতে। লেখকের প্রায় চিন্তাভাবনার সাথেই একমত দেখে বেশ বিস্মিত হয়েছি। ঠিক সময়ে এরকম একটা বই একজন মানুষের চিন্তাধারা পাল্টে দিতে পারে কিংবা কিছু মানুষকে করে দিতে ক্রোধান্ধ। ভোর হলো দোর খোলো খুকুমণি ওঠো রে নামটি বেশ সার্থক। আশা রাখি বঙ্গদেশি খুকুমণিরা ঘুম ভেঙে আলোর জগতে পা রাখবে।
নিত্যদিনের অনেক অজনপ্রিয় ও উপেক্ষিত বিষয় নিয়ে লেখক তার ততোধিক অজনপ্রিয় মতামত দিয়ে গেছেন। আমার মনে হয় না, বাংলাদেশে এমন কাউকে পাওয়া যাবে যে এই বইটির দ্বারা অফেন্ডেড হবেন না। বরং সন্দেগ অধিকাংশ লোক কিছুদিন পর খেপে গিয়ে বইটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলতে পারে। তবে, বইটি এমন যে আপনি লেখকের যুক্তি মানতে না পারেন তাকে অস্বীকার করে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। লেখক নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন, তাদের কারন অনুসন্ধান করেছেন এবং তার নিজস্ব কিছু সমাধানও দিয়েছেন। এসব সমাধান উদ্ভট শোনালেও ভেবে দেখলে বাস্তবিক মনে হয়।
বাঙালী জাতি খুকুর মতো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। খুকুমণির ঘুম ভাঙলে সে কান্নাকাটি করবে, রাগারাগি করবে, কিন্তু তাই বলে তো তাকে সারাদিন বিছানায় রাখা যাবে না। এই বইটি সুষুপ্ত জাতির শীতনিদ্রায় ঠান্ডা পানির ঝাপটা।
'কোনো সমাজে যদি ভিন্নমতের লেখা বিকশিত হতে না পারে, সে সমাজ তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গোয়ালঘরে পরিণত হয়। গোয়ালঘরে ভনভন করতে থাকবে মাছি। কেউ গোবর সাফ করতে এলে বলা হবে, আপনি তো বিতর্ক সৃষ্টি করছেন! ' - মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
প্রচলিত চিন্তাকে আঘাত করতে পারা দুরূহ কাজ। আরও কষ্টসাধ্য সফলভাবে প্রথাগত ভাবনাজগতকে চ্যালেঞ্জ করতে পারা। এই কাজটিই সুন্দরভাবে করতে পেরেছেন মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর প্রায় তিন শ পাতার বইটি পড়ে তা-ই মনে হলো।
বই পড়াকে অনেকেই মহিমান্বিত করার চেষ্টা করি। কিন্তু মোটেই এটি মহত্তম কােনো কাজ নয় ; যদি না তা আমাদেরকে চিন্তা করতে শেখায়। নিজের মতের বাইরের মতামতের ভালোমন্দ কীভাবে বিচার করব, তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদের সঙ্গে সবক্ষেত্রে একমত নই। তিনি কিছুক্ষেত্রে যুক্তিতর্কের গণ্ডি পেরিয়ে আক্রমণ করেছেন।
'গরু রচনাসমগ্র' মহিউদ্দিন মোহাম্মদের সেরা কাজ। দ্বিতীয় সেরা লেখা এই বইটা। অবশ্যই পড়া উচিত। মহিউদ্দিন মোহাম্মদকে বাতিল করে দেওয়ার জন্য হলেও পড়তে হবে বইটা।
১৬৩২ খ্রীস্টাব্দে গ্যাব্রিয়েল পৃথিবীতে নেমে আসেন। কয়েকবার পুনর্জন্মের পর তাঁর দেখা হয় ডেভিলের সাথে বাংলাদেশে। শুরু হয় তাদের ফোনালাপ। ডেভিল জিজ্ঞাসু মনমানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকেন গ্যাব্রিয়েলকে। একের পর এক সব প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকেন এই ঈশ্বরদূত।
পাঠক কি চমকে উঠলেন? লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ এবার 'টয়োটা করোলা' এর মতো বিমূর্ত বাস্তবতার কাছাকাছি কিছু নিয়ে লিখেন নি। বাংলাদেশের বহু বহু ভ্রান্তিময় চিন্তার নির্মাণের বিরুদ্ধে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন।
বইটি ছয়টি অংশে বিভক্ত। সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে গ্যাব্রিয়েল একধরণের সাক্ষাৎকারই দিয়েছেন ডেভিলকে। ধর্মতান্ত্রিক রক্ষণশীলতা এবং জাতিবাদের কঞ্জার্বেটিভ ক্ষতিকর চিন্তার প্রভাবের সমালোচনা করেছেন গ্যাব্রিয়েল।
বই পড়া, শিক্ষাব্যবস্থা, বিয়ে, সাহিত্য, ধর্মের নামে রাজনৈতিক স্বার্থোদ্ধার, তারুণ্যের প্রতি সমাজের রক্ষণশীল এবং আক্রমনাত্মক আচরণের কারণ এবং এসব থেকে সমাধানের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন লেখক। তাছাড়া আরো কিছু অমানবিক আচরণ যা দেখতে দেখতে সমাজ-রাষ্ট্রের মানুষজনের অনেকেই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তাদের অনভ্যস্ত করতে চেয়েছেন মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। সিম্বলিক চরিত্র শুধুমাত্র গ্যাব্রিয়েল এবং ডেভিল।
বইটির প্রোজ এক কথায় অসাধারণ। ভাষা বিষয়ে অতি পিউরিটান মনোভাব না রাখার কারণে মহিউদ্দিন মোহাম্মদ পাঠকের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সফল হওয়ার জোর সম্ভাবনা রাখেন। তাছাড়া তাঁর গদ্য তো চমৎকারই।
প্রথাবিরোধী লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ, তবে মনে হয় এ বইয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী নন। বরঞ্চ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিকঠাক মতো রান করতে দেখতে চান রাইটার।
আরেকটি বিষয় বরাবরের মতোই এপ্রেসিয়েট করার মতো এ লেখকের। সেটি হলো শুধুমাত্র বাঙালি জাতিকে চাবুক মারা ক্রিটিক করা নয় সমান্তরালে পারস্যু করার একটা চেষ্টা চলমান উক্ত বইয়ে। বাংলাদেশ এখনো একটি কঞ্জার্বেটিভ সমাজ ও রাষ্ট্রের করাতকলে পিষ্ট এলাকা। সেই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনার জন্য লেখক অনেক ক্ষেত্রে 'ডাম্ব ডাউন' করে বিভিন্ন বিষয়াবলী বুঝানোর ট্রাই করে গেছেন।
'ভোর হলো দোর খোলো খুকুমনি ওঠো রে' পড়ার পর অনেকে অফেন্ডেড হতে পারেন। আবার ইয়াং জেনারেশনের অনেকের চোখ খুলে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে গ্রন্থটি।
ফিক্সড মাইন্ডসেটের মানুষজন হয়তো আরো কঞ্জার্বেটিভ হয়ে উঠতে পারেন। তবে যারা গ্রোথ মাইন্ডসেটের অর্থাৎ লার্ন, আনলার্ন এবং রিলার্নের আকাঙ্ক্ষা এবং ক্ষমতা রাখেন তারা হয়ে উঠতে পারেন আরো লিবারাল। লেখক অবশ্য ছদ্মপ্রগতিশীলদেরও ছেড়ে কথা বলেন নি।
প্রথাবিরোধী গ্রন্থ আগেও পড়া হয়েছে বেশ কিছু্। মহিউদ্দিন মোহাম্মদের এ বই হয়তো বাংলা সাহিত্যে স্মরনীয় কিছু হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যতই বলে দিবে হয়তো অনেক কিছু।
বই রিভিউ
নাম : ভোর হলো দোর খোলো খুকুমনি ওঠো রে লেখক : মহিউদ্দিন মোহাম্মদ প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০২৩ প্রকাশক : জ্ঞানকোষ প্রকাশনী প্রচ্ছদ : সব্যসাচী মিস্ত্রি জনরা : নন-ফিকশন রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
"বইয়ের প্রধান কাজ মানুষের চিন্ত���কে মুক্ত করা। বই পড়তে গিয়ে যিনি বইয়ের ভেতর বন্দী হয়ে পড়েন, তিনি বইয়ের কয়েদী। যে-বই তার পাঠককে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে ফেলে, সে-বই কোনো বই নয়। এটি বইয়ের ছদ্মবেশে জেলখানা। বইয়ের লেখক ও জেলখানার লেখক এক নয়। বইয়ের লেখকের সাথে দ্বিমত পোষণ করা যায়, কিন্তু জেলখানার লেখকের সাথে দ্বিমত পোষণ করা যায় না। এ জন্য বই পড়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যে-বইটি পড়া হচ্ছে, তার বিষয়বস্তু নিয়ে দ্বিমত ও সন্দেহ পোষণ করার সুযোগ আছে তো? যে-বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যায় না, যে-বইয়ের প্রতিটি বাক্য মেনে নিতে হয় বিনা প্রশ্নে, সে-বই মূলত হাতুড়ি। হাতুড়ি ভয়যোগ্য হলেও সম্মানযোগ্য নয়। হাতুড়ি তো পাঠযোগ্যও নয়। হাতুড়ির কাজ হলো মানুষকে হাতুড়ি বানানো। যারা হাতুড়ি পাঠ করে হাতুড়ি হয়ে গেছে, তাদের থেকে শিশুদের সাবধানে রাখতে হবে।"
আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র পড়ার পর যতটা আগ্রহ ছিল এই বইটি পড়ার জন্য তার চাইতেও বেশি হতাশ হয়েছি এই বইটি পড়ে। প্রথম কয়েকটি লিফলেট বাদ দিয়ে বইয়ের বাকি অংশ বই কম 'বিষ' বেশি মনে হয়েছে (if not বিষ্ঠা)। মনে হয়েছে শয়তানের প্রশ্নের উত্তর শয়তানের অল্টার ইগো দিচ্ছিল, জিব্রাইল না। অবশ্যই, লেখকের চিন্তাকে আনঅর্থোডক্স দাবি করা যায়; কিন্তুু আনঅর্থোডক্স মানেই Awesome এরকম ভাবা ঠিক না। অনেক চিন্তা করেও বইটাকে ভালো লাগাতে পারি নি।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদ এর লেখার সাথে পরিচয় তাঁর একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে, যেখানে এই বইয়ের থেকে কিছু অংশ তিনি শেয়ার করেছিলেন। ঐ পোস্টটি পড়েই আমি রকমারিতে গিয়ে বইটি অর্ডার করে দেই, এবং আশাহত হতে হয় নি।
এ বইতে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সাধারণত এসব আলোচনার পক্ষ/ বিপক্ষ - উভয় দিকের আলোচকরা জ্ঞান/ যুক্তির চাইতে আবেগের প্রয়োগটাই বেশি করে থাকেন। "ভোর হলো দোর খোলো খুকুমণি ওঠো রে" বইটি পড়লে পাঠক বুঝতে পারবেন যে লেখক তাঁর উল্লেখিত বিষয়বস্তু সম্পর্কে যেমন পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন, ঠিক ততটাই তিনি সফল হয়েছেন সেই জ্ঞানকে যুক্তি দিয়ে, রূপক গল্প/ চরিত্র দিয়ে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে উপস্থাপন করায়।