'পুরানো পৃথিবীতে আলো তখন কম ছিল সত্য, সভ্যতার চেহারাও ছিল অনুজ্জ্বল, কিন্তু সে পৃথিবীতে হারেম ছিল না। হারেমের আদি- ঐশ্বর্য, বল, আর শান্তি । এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুতর শর্ত শান্তি । যতক্ষণ না স্থির হয়ে বসতে পারছেন যোদ্ধা, ততদিন জীবনে তার ভোগের অবসর নেই। শান্তির দিন যখন এলো, প্রতিষ্ঠিত হলো আপন প্রভুত্ব, তখনই শুরু হলো মনের কোণে রকমারি বাসনার আনাগোনা। এলো প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অট্টালিকা, এলো হাজার রূপসী। এলো হারেম। '
হারেম। সেখানে রাশি রাশি ফুল, লঘু পাখায় গুঞ্জন করে ফিরছে একটি মাত্র ভ্রমর, নরক আর স্বর্গের মধ্যে ব্যবধান মাত্র একটি দেওয়াল। এখানে কান্না, ওখানে হাসি৷ এইখানে খুদা, ওখানে আহারে অরুচি। এখানে প্রেতিনীর মেলা, ওখানে হুরীদের খেলা। বন্দীর দীর্ঘশ্বাস দেয়ালের ওপারে পৌঁছায় না, কিন্তু বাতাসে ভেসে আসে ওপারের খিল খিল হাসি, নুপুর নিক্কন, আতর গন্ধ।
হারেম সর্গ। সত্যিই সেখানে কোন সুখই নাগালের বাইরে নয়। হারেম স্বর্গ, সুখের স্বর্গ। দেশে দুর্ভিক্ষ হতো কিন্তু হারেমে খাবারের অভাব ঘটতো না কোনদিন। কেবল খাদ্য নয়, খাদ্য আর পানীয়ের মতোই পোষাক, গয়না, ভোগ বিলাসের জন্য কোনো কিছুর ই অভাব ছিল না কখনো। কমপক্ষে ৩০ টি হামাম(স্নানঘর) ছিল একসময় তুরস্কের সুলতানের অন্দরে, হারেমের এক অভিনব আয়োজন এই হামাম। মুঘল হারেমে সুন্দরীদের অবগাহন এজন্য যমুনার টলটলে নীল জল বয়ে আনা হতো অন্দরে।
'এখানে সবকিছুই ছিল। আবার অনেক কিছুই ছিল না। সুখ ছিল। দুঃখও ছিল। আনন্দ ছিল। ছিল বেদনাও। কিন্তু ছিল না স্বাধীনতা। নিঃশর্ত স্বাধীনতা পৃথিবীর কোথাও নেই। কিন্তু হারেমে কেবলই শর্ত, স্বাধীনতা এখানে স্বপ্ন হিসাবেও নিষিদ্ধ যেন।'
হারেমে কিছুই নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত নয়। নিষ্ঠুরতার নানা কাহিনী ইতিহাসের পাতায় পাতায়। হারেম যেন কান্নার আর এক নাম।
হারেমের জের টেনে অবশেষে এল খোজা
হারেমে সর্বত্র ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে রাশি রাশি মানুষ। কিন্তু তারা সম্পূর্ণ মানুষ নয়। খোজা নামে এক আশ্চর্য অদ্ভুত বিকৃত অস্তিত্ব মাত্র।
পুরুষকে বিকলাঙ্গ করে শতকের পর শতক ধরে হারেমে হারেমে অলংকার হিসেবে ছিল এই খোজার দল।
হারেমে যদি কান্নায় ইতিবৃত্ত হয়, তবে খোজারা সেখানে তীব্র আর্তনাদ। উত্থান কাহিনী এখানে অনেক। অবিশ্বাস্য সব কাহিনী ।
হারেমে আসল দুঃখী বোধ হয় এই নকল স্বর্গের অধিপতি নিজেই। অনেক ক্ষমতা তাদের, অফুরন্ত ধন দৌলত। বিশ্ব তোলপার করে সংগ্রহ করে এনেছিলেন অমূল্য রত্ন রাজি। হারেমে কোন অলংকারই বাদ ছিল না,
আয়োজনে কোন বাসনার কথাই ভুলেন নি ওরা। কিন্তু আশ্চর্য নিয়তি! রিক্ততায় হারেম যেন তবু এক ধূ ধূ মরুভূমি। সবই ছিল। কিন্তু হায়! তারপরও বোধ হয় গলা ছেড়ে বলা যাবে না, সুখী জীবনযাপন করে গেছেন এই পৃথিবীর সুলতান বাদশা, রাজা এবং রাজচক্রবর্তীরা।
অবশেষে ১৯০৯ সালে তুরস্কের নবীন বিদ্রোহী মুস্তফা কামাল তুরস্কে হারেম নিষিদ্ধ করে দেন। বেগমদের মুক্তি দেন। এ মুক্তি একজন ভাইয়ের উদ্যোগে একজন বোনের মুক্তি নয় সকলের মুক্তি শত শত বছরের প্রাচীন ব্যথার অবসান।