#Book_Mortem 239
দ্য ফাইনাল কার্টেইন
সেন্দাইয়ের বাসিন্দা মিচিকোর লা*শ পাওয়া গেল টোকিওর এক অ্যাপার্টমেন্টে। শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে তাকে। মিচিকো এখানে কেন এসেছিল জানে না কেউ। পুলিশের হাতে কোনো সূত্র নেই, অ্যাপার্টমেন্টের মালিকও উধাও। কানাগলিতে গিয়ে ঠেকা পুলিশের তদন্ত নতুন আলোর মুখ দেখল ডিটেকটিভ কাগার কারনে। অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া একটা ক্যালেন্ডারে ১২ মাসে নিহোনবাশির ১২টা ব্রিজের না��� লেখা ছিল। একই রকম লেখা একটা চিরকুট কাগা পেয়েছিল প্রায় বছর দশেক আগে তার মায়ের অ্যাপার্টমেন্টে। যেখানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় একাকী মারা গিয়েছিল তার মা। এই দুটো জিনিস কীভাবে জড়িত একে অপরের সাথে?
আমি মনে করি সমাজে পরিবর্তন আনতে হলে মানুষের মাঝে যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হলো মানবিকতা তথা অপরের দুঃখ কিংবা কষ্টটা বোঝার ক্ষমতা। অন্যের দুঃখগুলো যদি নিজে অনুভব করতে পারে, তাহলে সেই মানুষটা জেনে বুঝে কাউকে কষ্ট দিতে পারে না। ডিটেকটিভ কিয়োইচিরো কাগা ঠিক এমনই একজন মানবিক পুলিশ অফিসার। আর এ কারনেই কাগা আমার খুবই পছন্দের একজন ফিকশনাল চরিত্র। সিরিজের আগের বইগুলো হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই পড়ে ফেলেছিলাম। এই পঞ্চম বইটা সংগ্রহ করতেও দেরি হলো, আর পড়তেও। তবে বরাবরের মতোই হিগাশিনো দূর্দান্ত একটা বই উপহার দিয়েছেন আমাদেরকে।
খু*ন আর তদন্ত
ইদানীং ব্লার্ব না পড়েই বই পড়া শুরু করি। এটা আসলে বইটা উপভোগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। আমি জানতাম না এই বইতে কাগার মা আছেন। আর তাই প্রথম অধ্যায়টা পড়েই বেশ অবাক হয়েছি। তবে এই অধ্যায়ের সুতো যে এভাবে শেষে গিয়ে জোড়া লাগবে তা তখনো একটুও বুঝতে পারিনি৷
দ্বিতীয় অধ্যায় থেকেই মূল গল্প শুরু। যথারীতি একটা খুন, কাছাকাছি সময়ে ভিন্ন জায়গায় অন্য আরেকটা লাশ আবিষ্কার। এবং পুলিশের তদন্ত শুরু। এবারের বইটা কাগার অন্যান্য বইয়ের তুলনায় বেশ আলাদা। কারন এখানে কাগার ফুফাত ভাই মাতসুমিয়ার বেশ ভালো ভূমিকা রয়েছে। বইয়ের তদন্ত আলাদা আলাদাভাবে বেশ কয়েক জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে চলতে থাকে। যার কিছু হয় মাতসুমিয়ার মাধ্যমে, কিছু কাগার মাধ্যমে। আবার কয়েক জায়গায় দুজনেই একসাথে থাকে।
তদন্তের ব্যাপারে বলতে গেলে একেবারেই নিখুঁত তদন্ত প্রক্রিয়া যাকে এক্সেক্টলি সেটাই দেখানো হয়েছে বইতে। ভিকটিমের পরিবার, সহকর্মী ও বন্ধু বান্ধবকে জিজ্ঞেস করা থেকে ছোট কোনো সুতো পাওয়া, আবার সেটা ধরে নতুন তদন্ত শুরু করা, সেখান থেকে আবার অন্য দিকে ঘটনার মোড় নেয়া; এভাবেই চলতে থাকে। পুরো বইটা বলতে গেলে এসব খুঁটিনাটি সূত্র আর তদন্ত নিয়েই এগিয়েছে। এতো ধরণের ডালাপালা ছড়িয়ে তদন্ত করা হয়েছে যে এত বছরের থ্রিলার পড়ার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও চমকে উঠেছি। আরিব্বাস!! এভাবেও তদন্ত করা যায়? এই সামান্য জিনিসটাও ধরা যায়? দুনিয়াতে এমনও পুলিশ আছে যারা কোনো প্রাপ্তির আশা ছাড়াই দিনের পর দিন লাগাতারভাবে ছুটে চলে একটা রহস্য সমাধানের আশায়? একটা মৃত মানুষকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে এত কষ্ট আসলেই করে পুলিশেরা? টোকিও পুলিশ ডিপার্টমেন্ট আমাকে মুগ্ধ করে দিয়েছে এখানে। এর আগে কাগা-কেই একাকী তদন্তের জন্য ছোটাছুটি করতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু এই বইতে পুরো পুলিশ ফোর্স একত্রে কাজ করে।
ধৈর্যহীন পাঠকদের কাছে এতদিকে ছোটাছুটি করে, এত ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তদন্ত করার ব্যাপার একঘেয়ে কিংবা ধীর গতির মনে হতে পারে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে ভীষণ উপভোগ করেছি। কোথা থেকে, কীভাবে, কোন জিনিসটা ধরে যে এরা তদন্ত এগিয়ে নেয় তা পড়ে যাওয়াটা নিজের কাছে একটা ট্রীট মনে হয়েছে।
টুইস্ট?
না, এই বইতে হিগাশিনোর সেই মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো টুইস্ট নেই। বইয়ের শুরুতে আমরা পাঠকেরা বুঝে যাব সব ঘটনার সাথে কে জড়িত। দুই তৃতীয়াংশ পড়ার পর অনেকটাই ধারণা করে ফেলেছিলাম কী ঘটেছিল। তবে এরপরেই লেখক একটা চমক দিয়েছেন। এই জায়গায় এসে আবার নড়েচড়ে বসতে হয়েছে৷ এরপর স্রেফ গোগ্রাসে গিলে গিয়েছি বইটা। কারন আরো কিছু ছোটখাটো চমক একটানাই দিয়েছেন লেখক। আর শেষ পর্যন্ত রহস্যের যে খোলাসা হলো, তা আসলে ভীষণ মন খারাপ করিয়ে দেবার মতো। এই গল্পে ভিকটিমের জন্য মায়া লাগবে, মায়া লাগবে অপরাধীর জন্যও। মন খারাপ হবে বেঁচে থাকা মানুষটার জীবন ভেবে, এমনকি কষ্ট লাগবে ডিটেকটিভ কাগার জন্যেও। বড্ড বিষন্ন একটা গল্প। বইয়ের শেষ পাতায় কাগার কাছে লেখা একটা চিঠি পড়তে চোখ ভিজে উঠেছিল। আহারে! একজন মায়ের কী ভয়ানক মানসিক কষ্টের জীবন।
হিগাশিনোর গল্পগুলো সবসময়েই কেমন যেন ধাক্কা দেয় বুকের মাঝে। জাপানিজদের জীবনবোধ অনেক চড়া সুরে বাঁধা। এদের চালচলন কিংবা কথাবার্তা বলার নমুনা পড়তে বড্ড ভালো লাগে৷ কী সভ্য একটা জাতি। ওহ, আরেকটা কথা, বাটারফ্লাই ইফেক্টের উদাহরণ হিসাবেও বইটাকে ধরা যায়। অনেক আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন শহরের, ভিন্ন এক মানুষের করা একটা কাজের কারনে কীভাবে অনেক বছর পরেও অন্য শহরে থাকা অন্য আরেকটা মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে তার একটা ধারণা পাওয়া যাবে বইটা পড়লে।
ডিটেকটিভ কিয়োইচিরো কাগা
কাগা সিরিজের বইগুলো নিয়ে পাঠকদের মাঝে অন্যতম একটা আফসোস ছিল যে খোদ কাগা'কেই কোথাও ভালোভাবে জানা যায় না। তদন্ত করতে গিয়ে আশেপাশের মানুষদের প্রতি কাগার যতটা মনোযোগ দেখা যায়, নিজের বা পরিবারের কাছের মানুষদের প্রতি সে যেন ততটাই উদাসীন। তার পরিবার বা অতীত নিয়েও এক ধরণের ধোঁয়াশা থেকে গিয়েছে। একটু একটু করে জানতে জানতে অবশেষে এই বইতে এসে কাগার ব্যক্তি জীবনের ব্যাপারে একটা পরিপূর্ণ ধারণা পাওয়া গেল। কাগাকেও বেশ অন্যরকম লেগেছে এখানে। আরো একটু খোলামেলা, হাসিখুশি, চ্যালেঞ্জিং এবং হালকা রোমান্টিকও!! কাগার ভূমিকা আগের বইগুলো থেকে কম হলেও, যথারীতি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিষয়ে তার নজরদারি করা এবং অল্প যে ক'টা সূত্র পাওয়া যায় সবগুলোকে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জোড়া লাগানোর ব্যাপারটা বরাবরের মতোই দারুণ লেগেছে। বইয়ে একটা সিকুয়েন্স আছে যেখানে কাগা জানে তার সামনে বসা মানুষটাই অপরাধী, সেই মানুষটাও জানে কাগা ইতোমধ্যেই সব জেনে বসে আছে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। আর তাই তাদের ওই কথোপকথনটা অনেকটা ডুয়েল লড়ার মতো হয়। ওই জায়গাটা বেশ ইনটেন্স আর আমার কাছে চমৎকার লেগেছে।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৯/১০ (আমি সবকিছুকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি। তবে লিওনেল মেসি আর হুমায়ুন আহমেদের ক্ষেত্রে আমার মাঝে এক ধরণের অন্ধত্ব কাজ করে। সম্ভবত সেই তালিকায় হিগাশিনোও ঢুকে গেলেন। ইনার যাইই পড়ি তাই ভালো লাগে আমার কাছে। তবুও এই অন্ধত্ব বাদ দিয়েই বলতে পারি, এই বইটা সিরিজের অন্যতম ভালো একটা বই। যারা রহস্যোপন্যাস পড়তে পছন্দ করেন, তাদের নিশ্চিতভাবেই ভালো লাগবে। )
অনুবাদ: সালমান হকের অনুবাদ বরাবরের মতোই বেশ ভালো হয়েছে। তবে কেন যেন মনে হয়েছে এখানে উনার সেরাটা ছিল না। উনার অনুবাদ পড়ার সময়ে একটা স্মুথ, মাখন টাইপ ফীল হয়। বইটার কিছু জায়গায় এই ব্যাপারটা মিস করেছি। বইয়ে টুকটাক কিছু টাইপো ছিল। তবে সব মিলিয়ে পড়তে গিয়ে মেজর কোনো অসুবিধা হয়নি।
অসুবিধা: তবে অসুবিধা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক থেকে। যদিও এটাও বড় কিছু নয়। তবে এর আগে আসলে কোনো জাপানিজ বই পড়তে গিয়ে এই ঝামেলা হয়নি। কিন্তু এই বইটাতে প্রচুর চরিত্র আর জানেনই তো জাপানিজদের নামগুলো আমাদের জন্য কতটা খটমটে। তার উপর কয়েকটা নামও বেশ কাছাকাছি ধরণের। বইয়ের শুরুতে কিছু চরিত্র পরিচিতি দেয়া থাকলেও এর বাইরেও আরো অনেক অনেক চরিত্র এসেছে গল্পে। আমি দুই বসায় বইটা শেষ করেছি। প্রথমবার বই রেখে পরেরবার পড়তে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। খাইছে!! এইটা জানি কে!! অতএব জাপানিজ নাম নিয়ে যাদের সমস্যা হয়, তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে যতটা সম্ভব হাতে ফ্রী সময় নিয়ে বইটা একটানা পড়ে ফেলার।
🎲 লেখক: কেইগো হিগাশিনো
🎲 অনুবাদ: সালমান হক
🎲 প্রকাশনী: শিরোনাম প্রকাশনী
🎲 প্রচ্ছদ: ওয়াসিফ নূর
🎲 পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৮৮
🎲 বর্তমান মূদ্���িত মূল্য: ৫০০