‘মানুষ সাধারণত নতুনত্বে ভয় পায়,পরিবর্তনকে ভয় করে। কিন্তু ইতিহাসের অপরিবর্তনীয় সত্য হচ্ছে সবকিছুই পরিবর্তনশীল।’ এসব বই পড়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টিই বারবার উপলব্ধি করি৷ ইতিহাসের পাতা উল্টালে অহরহ দেখতে পাই এরকম ঘটনা। কোনো একটা দল, একটা আদর্শ, ভিন্ন এক জীবন দর্শন নিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসবার পর নিজেদের শাশ্বত, একমাত্র সত্য মনে করে। তাদের 'সত্য মনে করা' ধারণাটাকে সঠিক রূপদানের চেষ্টায় তারা সরে আসে আদর্শ এবং ভিন্নধর্মী সেই দর্শন থেকেও। নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য আদর্শের বিপরীত কাজটাও করতে হয় প্রায় সকল ক্ষমতাশীল দলকে। ফলস্বরূপ ইতিহাসের অমোঘ অপরিবর্তনীয় সত্যের মতো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এসব দল বা গোষ্ঠীর পতন ঘটে।
কার্ল মার্কস প্রচলিত সকল দর্শন পাশ কাটিয়ে 'হাতে কলমের' যে নিজস্ব দর্শন দাঁড় করিয়েছিলেন সেই দর্শন বাস্তব জীবনে প্রয়োগের আকাঙ্ক্ষায় সমবেত হয়েছিল অনেকেই। তমসাচ্ছন্ন মানুষদের জীবনে সুদিন ফেরার আকুলতায় জীবন বাজি রেখেছিল অনেক মহৎ মানুষ। আলবার্ট রিস উইলিয়ামসের এই বইটিও সেরকম একজন মানুষকে নিয়ে। লেনিন। বেঁটেখাটো, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন এই মানুষটি মার্কসের দর্শনের প্রয়োগ ঘটানোর মধ্য দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন নিজস্ব দর্শন। রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব বা অক্টোবর বিপ্লবের প্রদান কারিগরও ছিলেন লেনিন। বইটি মুলত লেনিনের সান্নিধ্যে কাটানো সময়ের তিন বছরের বর্ণনা। আলবার্ট রিস উইলিয়ামস মার্কিন নাগরিক। বলশেভিকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রাশিয়ায় গিয়ে যুক্ত হন। বছর খানেক কাটানোর পর রুশ ভাষা আয়ত্তে এনে নেত্তৃত্ব দেন অনেক বছর। লেনিনের সাথে ছিল তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। লেনিনকে অনেক কাছ থেকে দেখবার সুযোগ হয়। লেনিন সম্পর্কে বলতে গিয়ে কমিউনিজমের টুকটাক বেসিক জিনিসই তুলে ধরেন, হালকার উপর পুরো অক্টোবর বিপ্লবের ছাপ মেরে দেন লেখক। ছোট্ট বই, অনেক সহজভাবে লেখা, আর অনুবাদ তো পুরোই মাখন। লেখক বইয়ে সুন্দরমতো তুলে ধরেন লেনিনের আচার আচরণ, জনগণের সাথে তাঁর সম্পর্ক, সংকটের সময় তাঁর সংকট সমাধানের নিপুণ দক্ষতার পরিচয়। কিন্তু লেখক একতরফাভাবে শুধু গানই গেয়ে গেলেন লেনিনের (একই দলের কারো কাছ থেকে ভিন্ন কিছু আশা করাও আসলে একধরনের বোকামি)। আত্মবিশ্বাসের সাথে লেখেন সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়জয়কার আর নিজেদের শ্বাশত মনে করা মনোভাব। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর তাদের এইসব আত্মবিশ্বাসী মনোভাবের কথা পড়লে হাসিও পাই, কষ্টও লাগে। তুলে ধরেন লেনিনকে নিয়ে ছড়ানো পুঁজিপতিদের গুজবগুলোও। এরকম মজার একটা ঘটনা দিয়ে ভংচং এই লেখাটি শেষ করা যাক_
“বুর্জোয়াদের প্রতি লেনিন ছিলেন স্বেচ্ছাচারী, লৌহমুষ্টি। এ সময় তাঁকে প্রধানমন্ত্রী লেনিন না বলে বলত ‘জালিম লেনিন’ কিংবা ‘ডিক্টেটর লেনিন’। আর দক্ষিণপন্থি সোস্যালিস্টরা বলতে, পুরনো রমানভ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের জায়গায় এসেছেন নতুন জার নিকোলাই লেনিন; তারা বিদ্রুপ করে বলত, 'আমাদের নতুন জার ৩য় নিকোলাস জিন্দাবাদ!’একজন কৃষককে দিয়ে একটা মজার ঘটনাকে তারা পরমানন্দে লুফে নেয়। কৃষক প্রতিনিধি সোভিয়েত নতুন সোভিয়েত সরকারের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে যেদিন মসল্নির হল-ঘরে প্রীতি-ভোজের সমারোহ বসিয়েছিল সেই রাত্রের ঘটনা। আগে বুদ্ধিজীবীরাই গাঁয়ের কথা বলেছে, তারপর দাবি উঠল গ্রাম নিজেই নিজের কথা বলুক। কৃষকের পোশাক-পরা এক বৃদ্ধ উঠলেন মঞ্চে। সাদা দাড়ির ভেতর দিয়ে চোখে পড়ছিল তার গোলাপি মুখটা। চোখ মিটমিট করছিল তাঁর; বললেন গ্রাম্য চলিতভাষায়। ‘কমরেডসব, ঝাণ্ডা উড়িয়ে, বাজনা বাজিয়ে আজ রাত্রে এই যে আমরা এলাম, এতে ভারি আনন্দ হলো। মাটির ওপর দিয়ে হেঁটে আসিনি, এসেছি হাওয়ায় উড়ে । আমি হলাম একটা অন্ধকার গ্রামের অশিক্ষিত মানুষের একজন। তোমরা আমাদের আলো দিয়েছ। কিন্তু আমরা সবটা বুঝে উঠতে পারিনি – তাই দেখে-বুঝে যাবার জন্য সবাই আমাকে পাঠাল। কিন্তু, কমরেডসব, আশ্চর্য এই বদলটার জন্য সবাই খুব খুশি। পুরনো আমলে সরকারি আমলারা ছিল ভারি কড়া, আমাদের পিটতো, কিন্তু এখন তারা খুব নরম। পুরনো আমলে আমরা দেখতে পেতাম প্রাসাদগুলোর শুধু বাইরের দিকটা, এখন সোজা তার ভেতরেই ঢুকে পড়তে পারি। পুরনো আমলে জার সম্বন্ধে আমরা শুধু কথাই বলতাম, কিন্তু, কমরেডসব, শুনেছি কাল খোদ "জার লেনিনের” সঙ্গে আমরা করমর্দন করতে পারব। ইশ্বর তাঁকে বাঁচিয়ে রাখুন।”