"ঠগী" নিয়ে কৌতূহল আমার অনেকদিনের। শ্রীপান্থের এই বইটির খোঁজ পাই প্রায় বছর তিন আগে। কিনবো কিনবো করে আর কেনা পড়া কোনটাই হয়নি। অপেক্ষায় ছিলাম অনেকদিন। কিন্তু অপেক্ষা যে এতটা মধুর হবে ভাবতে পারিনি। এ যেন এক রূপকথার গল্প। অবিশ্বাস্য কাহিনী অথচ বাস্তব। আর এক যাদুকরের গল্প।
বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায় মূলত ১৩ থেকে ১৮ শতক জুড়ে ভারতবর্ষে ঠগীদের উৎপাত চলে। তখন ভারত ছিল যেন এক অবিশ্বাস্য দেশ। তার ঘর থেকে বের হলে মানুষ আর ঠিকানায় পৌছাতো না, তারা হারিয়ে যেত। পথিক হারিয়ে যেত, সিপাই হারিয়ে যেত, জমিদার হারিয়ে যেত, বণিক হারিয়ে যেত, নারী হারিয়ে যেত, শিশু হারিয়ে যেত। কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না তাদের। এই হারিয়ে যাওয়াই যেন ছিল প্রায় ৫ শ বছরের ভারতের প্রতিদিনের নিয়ম।
তখনও ডাকাত দল ছিল জলে-স্থলে। সামান্য কিছুর জন্য মানুষ মেরে ফেলতো তারা। ছিল ধুতুরিয়া, ঠ্যাঙ্গারে, তুসমাবাজ ঠগ, মেকফানসা, ছেলেধরা। কিন্তু সবচেয়ে বিভৎস আর ভয়ঙ্গকর ছিল "ঠগী"।
কারণে অকারণে তারা পথে নিরীহ পথিকদের খুন করত। শুধু খুন বললে ভুল হবে, খুন করে হাওয়ায় মিলিয়ে দিত। কেউ কোনদিন তার কোন চিহ্ন পেত না। ঠগীরা শুধু খুনীই নয়, ঠগী এক বিচিত্র বিশ্বাস।ঠগী যেন একটা ধর্ম। ওদের দেবী ভবানী বা কালী। হিন্দু মুসলমান উভয়েরই। ভবানীর নির্দেশেই তারা নাকি নিরীহ মানুষ খুন করত। শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ। তাদের ছিল সতন্ত্র ভাষা, ইশারা, সংকেত।
ঢাল, তলোয়ার, বন্দুক বা ছুড়ি দিয়ে নয়। তারা খুন করতো হলুদ রঙের ছোট্ট একটা রুমাল দিয়ে। বন্ধু হয়ে নিরীহ পথিককে ভালোবেসে পাশে বসিয়ে এই রুমাল দিয়েই দিত ফাঁস। করে ফেলত গায়েব। কিন্তু প্রায় ৫ শ বছর ধরে চলা ঠগীদের এই নৃশংসতা তখনও দমাতে পারেনি কেউ।
আঠারো শতকের শুরুতেই সদ্য কুড়ি পেরুনো ইংরেজ যুবক উইলিয়াম হেনরী স্লীম্যান কলকাতায় পা রাখার আগে কেউ ভাবতেও হয়তো পারেনি ভারতবর্ষ কখনো ঠগীমুক্ত হবে। ভারতে আসার কিছুদিন পর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লাইব্রেরীতে ফরাসী পর্যটক এম থিভেনটের লেখা ভ্রমণকাহিনীতে প্রথম ঠগীদের কথা জানতে পারেন এই স্লীম্যান। তখন থেকেই শুরু হয় তার ঠগী খোঁজার সাধনা। এতটাই নিমগ্ন হয়ে পরেন যে তার নামই হয়ে যায় ঠগী স্লীম্যান। কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা আর নিরন্তর প্রচেষ্টায় বছরের পর বছর ধরে একেকটা ঠগী দলকে করায়ত্ত করেন স্লীম্যান। তাদের মুখে শোনেন ঠগীদের সবকিছু। সব লেখা হয়। সব খুনের ঘটনা, বিভৎসতা, পরিকল্পনা, বিশ্বাস সব। উদ্ধার করেন হারিয়ে যাওয়া হাজার হাজার পথিকের অস্থি। প্রায় ৩০ বছর ধরে দিনের পর দিন লেগে থেকে হিন্দুস্তানকে ঠগীমুক্ত করেন স্লীম্যান।
প্রায় ৪ শ বছর ধরে ঠগীদের নির্মমতার নানা ঘটনার পাশাপাশি স্লীম্যান নামের এক যাদুকরের গল্প বিস্ময় নিয়ে পড়েছি এই বইয়ে। স্লীম্যানের আত্মজীবনীতে আছে, ৩ শ বছরে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষকে ঠগীরা খুন করেছে। স্লীম্যান এই ঠগীদের দমন করতে না পারলে হয়তো সেই সংখ্যা কোটি কোটিতে পৌঁছাতো।
ইংরেজরা ভারতবর্ষের জন্য ভালো যা কিছু করেছে তার মধ্যে সে সময়ের সিভিল সার্ভেন্ট স্লীম্যানের এই ঠগী দমন অত্যন্ত গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস।
স্লীম্যান ভারতবর্ষকে ভালোবেসেছিলেন। ভালোবেসেছিলেন এখানকার কৃষকদের। সাধারণ মানুষদের। বইটি শেষ হতে না হতেই ভারতীয় উপমহাদেশকে ভালোবাসা এই ইংরেজের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসবে নির্দ্বিধায়।
আর শ্রীপান্থ আমার বরাবরই পছন্দের লেখক। তবে ঠগী যেন তাকে আরো উপরে তুলে দিয়েছে। দুর্দান্ত ঝরঝরে ভাষায় ঠগীদের নিয়ে একেবারে আগাগোড়া সব যেন উঠে এসেছে দুই মলাটের মাঝে। ইতিহাসের বাস্তব ঘটনা লিখেছেন, অথচ মনে হবে দাদীর মুখে শুনছি রূপকথার গল্প।
কয়েক শতাব্দী আগে ভারতীয় উপমহাদেশের যা বাস্তবতা ছিল, আজ তা রূপকথার গল্পের মতই মনে হয়। অথচ এ-ও সত্যি ঘটনা। ঠগীদের মুখ থেকেই শোনা। আজকে কী ঠগী নেই? আছে। হয়তো অন্য নামে, অন্য সিস্টেমে। আজও সমাজে গুম হয়, খুন হয়, লুন্ঠণ হয়। আজ থেকে আরো এক শতাব্দী পর যখন নতুন প্রজন্ম আসবে, আর আজকের সমাজের এই কাহিনী যদি লেখা হয়, তাদের কাছেও হয়তো তা রূপকথার গল্পের মত শোনাবে। আজকের সমাজের বর্বরতার কাহিনী পড়ে তাদেরও হয়তো আমাদের মতই গা শিউড়ে উঠবে।