পাঁচশো টাকার নোট ভাঙতি করার জন্য ১০ টাকার লটারির টিকিট কিনে এরপর যদি সেই টিকিটে ১০ লাখ টাকার পুরস্কার পেয়ে যান, তাহলে যে অনুভূতিটা হওয়া উচিত, এই বইটা পড়ে আমার অনুভূতিও সেরকম। ধীরগতির হলেও এত দারুণ একটা গোয়েন্দা কাহিনী (সে যে ভাষাতেই হোক) বেশ অনেকদিন পড়িনি। চরিত্রগুলো লাইকেবল, সময় নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে, ব্যাকগ্রাউন্ডও বোঝা যায়। কাহিনীতে উত্তেজনা আনার বদলে লেখক গল্প বলতেই আগ্রহী ছিলেন, সেজন্য চরিত্র এবং গল্প দু'টোই অনেক কাছের মনে হয়েছে। কেউ কেউ দেখলাম রিভিউতে বলেছেন রহস্য তেমন জমজমাট নয়, আগে থেকেই বোঝা যায়, তা আমার সেরকম কিছু মনে হয়নি; হয় আমার বুদ্ধি কম, আরেকটা কারণ হতে পারে আমি গোয়েন্দা গল্পে কখনোই অপরাধী কে সেটা গল্পের ধরণ বা হিন্ট দেখে বোঝার চেষ্টা করি না (সেটারও কারণ হতে পারে যে, আমার বুদ্ধিসুদ্ধি কম কাজেই মাথা খাটাতে ভাল লাগে না।)। গোয়েন্দা সাহেব (বা মেমসাহেব) গল্পের শেষে অপরাধীর মুখোশ খুলে দেবেন, সেটাই তো মজা! তবে মুখোশ খোলার সময় গোঁজামিল দিলে চলবে না, যুক্তির জাল ঠিকমত বোনা হতে হবে, ব্যস। এই গল্পে আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, তা হলো অহেতুক ট্যুইস্ট দেয়ার চেষ্টা নেই, যেটা আজকাল প্রায়ই করতে দেখি, এবং নানা জায়গায় ট্যুইস্ট দিতেই হবে এমন একটা প্রবণতার কারণে অনেক সময়ই মূল গল্পের বারোটা বেজে যায়, বিশ্বাসযোগ্যতাও নষ্ট হয়। গল্পে আসি। গোয়েন্দা আদিত্য মজুমদার শখে গোয়েন্দা নয়, পেটের দায়ে বেসরকারি গোয়েন্দা। বড় জমিদারবাড়ির ছেলে ছিল, পড়াশোনা থেকে সঙ্গীতচর্চা সবকিছুই ছোটবেলা থেকে হয়েছে, কিন্তু পিতৃদেব বেঁচে থাকতেই এত খরচ করে গেছেন যে, তিনি গত হবার পর ধারদেনায় সবই চলে গেছে, উচ্চশিক্ষাও বন্ধ। নানা ঘাটের পানি খেয়ে শেষে এক উকিল বন্ধুর হয়ে টুকটাক তথ্য যোগারের কাজ করতে করতে নিজের ব্যবসা খুলে বসা (এই গল্পটা অবশ্য সিরিজের তৃতীয়, ব্যাকগ্রাউন্ডটা কিছুটা প্রথম বই পড়ে জানা)। মক্কেল খুব বেশি না, তবে চলে যায়। তো, তার এবারের মক্কেল এক বড় ব্যবসায়ী, তার ২০ কোটি টাকা তিনি খাটাতে দিয়েছিলেন এক মহাজনের কাছে, কিন্তু মহাজন এখন বলছে যে, সে টাকা পায়নি, যে টাকা বহন করছিল সে-ই মেরে দিয়েছে। গোয়েন্দাকে এখন সত্যিটা উদ্ধার করতে হবে। এখানে দারুণ একটা জিনিস এসেছে; ইনফর্মাল মানি লেন্ডিং মার্কেটের ব্যাপারস্যাপার গুলো। লেখক নিজে অর্থনীতিবিদ বলেই সম্ভবত বিষয়টা নিয়ে বেশ ইন্টারেস্টিং তথ্য আনতে পেরেছেন, কোন জোড়াতালি না দিয়ে এবং বেশ বিশদ ব্যাখ্যাসহ (তবে লেকচার নেই, কাহিনীর প্রয়োজনেই এসেছে, এটা আরেকটা পজিটিভ দিক)। ভারতের পাবলিক ফাইন্যান্স ইন্স্টিটিউটে একটা প্রশিক্ষণে গিয়ে জেনেছিলাম যে, ভারতের আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমির আয়তন নাকি মূলধারার ইকোনমিরই সমান, যেটা আমার ধারণা, বাংলাদেশেও তাই। এরকম একটা বিষয় নিয়ে লেখা সোজা নয়, বিশেষ করে মূল চরিত্র যখন একজন ছা-পোষা গোয়েন্দা, কোন ইন্টেলেকচুয়াল বা অতি স্মার্ট ডিজিটাল জেন-জি নয়। কিন্তু লেখক সাফল্যের সাথে সেটা করেছেন। আবারও বলি, রহস্য হয়তো অতটা জমাট নয়, গল্পের গতিও ধীর, খুব একটা ওঠানামা নেই, এমনকি শেষেও সেই একই গতি ধরে রেখে মসৃণভাবে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে, গুডরিডসেও খুব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা নেই (হয়তো এখনকার পাঠক যে চমক বা ট্যুইস্ট চায়, সেটা নেই বলে), কিন্তু সেজন্যই আমার ভাল লেগেছে। আর সবচেয়ে ভাল লেগেছে গল্প বলার ভঙ্গি আর চরিত্রনির্মাণ। ফিকশন লেখককে ভাল গল্পবলিয়ে হতেই হয়, এই সহজ ব্যাপারটা এখনকার অনেক লেখক-প্রকাশক মাথায় রাখেন না বলেই ভাল প্লট নিয়ে শুরু করেও বেশিরভাগ বই রাবিশে পরিণত হয়। অভিরূপ সরকার এখানে জিতে গেছেন, অনেকদিন পরে, এবং ইদানিংকার শত শত ভুঁইফোঁড় থ্রিলার-গোয়েন্দা-ফ্যান্টাসি-হরর লেখকদের ভিড়ে একজন ভাল গল্পকথক (কৌশিক মজুমদার এবং রাজর্ষি দাশ ভৌমিকের মত) পেয়ে ভাল লাগছে। সিরিজের বাকি বইগুলোও পড়ার চেষ্টা করতে হবে।
আদিত্য মজুমদারের চতুর্থ কেস তথা তৃতীয় বইয়ে পৌঁছে বেশ কয়েকটি জিনিস লক্ষ করলাম। প্রথমত, ক্লায়েন্টের ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে শুরু হলেও ক্রমে সময় ও সমাজের মস্ত বড়ো কিছু অপরাধের কথা বলার একটি ধারা লেখক সেই 'ভূতুড়ে টেলিফোন' থেকেই শুরু করেছিলেন। তা এবার একটি মোক্ষম ইস্যু তুলে ধরল৷ এই ইস্যুটি নিয়ে এপার বাংলায় লেখালেখি করার সাহস খুব বেশি মানুষ দেখান না। দ্বিতীয়ত, আদিত্য'র ব্যক্তিগত জীবন একটা পূর্ণতার সন্ধান পেল। তবে তার মতো মানুষ একে পূর্ণতা বলে মনে করবে, না দাসত্ব— তা সময়ই বলবে। তবে রহস্য হিসেবে গল্পটা তেমন জমাট নয়। অনেক কিছু অনেক আগে থেকেই বোঝা গেছে। লেখাকে কিছুটা অনাবশ্যক ভাবেই বর্ধিত করা হয়েছে। ক্লাইম্যাক্সও বেশ ঢিলেঢালা ভঙ্গিতে পরিবেশিত হয়েছে। শেষ অভিমত: প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের উপযোগী রহস্য কাহিনি হিসেবে এটিকে স্বচ্ছন্দে একবার পড়া চলে।
কুমুদিনী বিত্ত নিগম নামটা পড়েই আমার কেনো জানিনা মনে হয়েছিল খুব পাতি প্লট হবে হয়তো। কিন্ত এ বই প্রতি পরিচ্ছদেই দায়িত্ব নিয়ে আমার ভুল ধারণা ভাঙতে সফল হয়েছে। খুব একটা থ্রিলার পড়িনি যদিও তবু বলতে পারি এই বই বাজারচলতি অন্যান্য গল্পের চেয়ে ঢের উন্নত। যেভাবে গল্প এগিয়েছে, রহস্য ঘনিয়েছে, পরপর একেকটা খুন হয়ে যাচ্ছে শহরে, কুড়ি কোটি টাকা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, চোরা কারবার, অবৈধ সম্পর্ক — সবমিলিয়ে এই কাহিনী যেভাবে বাঁক নিতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত আদিত্য মজুমদার যেভাবে কুমুদিনী বিত্ত নিগম রহস্যের উন্মোচন করেন সেটা এককথায় মারাত্মক। ⭐️⭐️⭐️⭐️⭐️
🍂বইয়ের নাম - কুমুদিনী বিও নিগম রহস্য🍂 ✍️লেখক - অভিরূপ সরকার 🖨️প্রকাশক - দীপ প্রকাশন 🧾পৃষ্ঠা সংখ্যা - ৩০৩ 💰মূল্য - ৩০০₹
উপন্যাস এর প্রধান চরিত্র আদিত্য মজুমদার,পেশায় একজন বেসরকারি গোয়েন্দা।সম্প্রতি কুমুদিনী বিত্ত নিগম কেসটার দায়ভার আদিত্যর উপর আসে। হালিশহরের নামী বিড়ি কম্পানির মালিক জাহাঙ্গির খানের সম্প্রতি একটা বড়সর টাকার গড়বড় ধরা পড়েছে । প্রায় ২০ কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে । জাহাঙ্গির আদিত্য কে হারিয়ে যাওয়া টাকা আর ফিরদৌসের খোঁজ এনে দেওয়ার ভার দেন। জাহাঙ্গিরের কাছ থেকে আদিত্য জানতে পারে ফিরদৌস কুমুদিনী বিত্ত নিগম নামে কলকাতার একটা শেয়ার কেনা বেচার কম্পানিতে কাজ করতো। যাদের আসল কাজ বড় বড় বিজনেসম্যানদের কাছে থাকা কোটি কোটি কালো টাকা সংগ্রহ করে, সেই টাকা কুমুদিনী বিত্ত নিগম যাত্রা, সিনেমা, নাইট,ক্লাবে টাকা খাটানো। আদিত্য এও জানতে পারে বর্তমানে কলকাতা পুলিশ কুমুদিনীর অফিস রেড করে সিল করে দিয়েছে । কুমুদিনী মালিক বটুক সামন্ত সমেত বেশ কয়েকজন কর্মী কে পুলিশ আটক করেছে ।আদিত্য বিষয়টা নিয়ে তদন্ত শুরু করে। এই উপন্যাস পড়তে পড়তে কিছু প্রশ্ন উঠে আসে কে টাকাটা চ���রি করেছে?গোয়েন্দা আদিত্য মজুমদার হঠাৎই জানতে পারল ফিরদৌস খুন হবার কিছুদিন আগে রাজারহাটের একটা নির্জন ফ্ল্যাটে এক তরুণী খুন হয়েছিল। খুনগুলোর মধ্যে কী সম্পর্ক? জাহাঙ্গির খানের পাঠানো কুড়ি কোটি টাকা কোথায় গেল? নাকি জাহাঙ্গির খান আসলে কোনও টাকাই পাঠায়নি? ফিরদৌস রহমানকে কে খুন করল? কেন খুন করল? এই সব রহস্যের সমাধান হলো কি করে জানতে হলে অবশ্যই উপন্যাস টি পড়তে হবে। উপন্যাসটিতে টানটান রহস্যের পাশে সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকে একটা মিষ্টি প্রেম কাহিনি , যা পাঠককের জটিল রহস্য পড়ার একঘেয়েমি অনেকটাই দূর করে । এই প্রেম কাহিনির পাত্র অবশ্যই গোয়েন্দা আদিত্য মজুমদার পাত্রী কেয়া বাগচি। শেষ পর্যন্ত এদের প্রেম কি পরিনতি পেল ? সেটা জানার জন্য অবশ্যই উপন্যাসটি পড়তে হবে!
বইটি ১০০–১৫০ পৃষ্ঠার একটি সংক্ষিপ্ত নভেলা হিসেবে প্রকাশিত হলে অনেক বেশি উপভোগ্য হতে পারত। অযথা ৩০০ পৃষ্ঠায় বিস্তৃত হওয়ায় কাহিনি প্রবাহ অকারণে ঠাসা হয়ে পড়েছে এবং গতি হারিয়েছে।
মূল চরিত্রটি দুর্বলতম দিক। তিনি এমন এক অদ্ভুতুড়ে “গুফ”—তার মধ্যে না আছে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, না আছে চারিত্রিক গভীরতা, যা পাঠককে টেনে রাখবে। ফলে সম্পূর্ণ বই পাঠ করেও তার সঙ্গে কোনো সংযোগ গড়ে ওঠে না। তার সিদ্ধান্ত ও আচরণও অযৌক্তিক, অথচ সেগুলো সমর্থন করার মতো প্রেক্ষাপট বা মনস্তত্ত্ব লেখক দেখাননি।
আরও একটি বড় সমস্যা হচ্ছে—নায়ক যাকে-ই মুখোমুখি হন, হোক বন্ধু, প্রেমিকা কিংবা রাস্তার পথচারি—অলৌকিকভাবে সবাই মূল রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এ‑রকম কাকতালীয় ঘনঘটা গল্পটিকে অবিশ্বাস্য করে তোলে এবং পরিকল্পিত আন্তঃসংযোগের বদলে জোর করে বসানো যোগসূত্রের মতো লাগে।
সব মিলিয়ে, ধীরগতির বর্ণনা, চরিত্রের অপরিপক্কতা ও অতিশয় কাকতালীয় ঘটনা বইটির সম্ভাবনাকে খর্ব করেছে। আরও কঠোর সম্পাদনা আর শক্তিশালী চরিত্র গঠনের মাধ্যমে এটিই অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারত।
হয়তো আমার এই ৫ স্টার রেটিং টা একটু অন্য ধরনের কারণ দুটো বই এত তারাতারি শেষ করার পর তৃতীয় বইটা এখন পড়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না কিন্ত হুট করেই বই এর একটা রিভিউ চোখে পরে "আদিত্য এর একটা হিল্লে হল ।"
এই হিল্লে টা আগের বই এর সাথে কানেকশন আছে নাকি সেটা দেখার জন্যই এত তারাতারি বইটা পরা। এই পুরো বইটায় আমি আদিত্য এর পার্সোনাল লাইফ নিয়ে এতটাই ইন্টারেস্টেড ছিলাম যে অন্য দিক গুলো বিশ্লেষণ করার সুযোগ পাইনি ।
যেটা আমার পরপর এত গুলো ডিটেকটিভ গল্পের মধ্যে খুবই রিফ্রেশিং লেগেছে । এমনিতেই তথাকথিত রোমান্স বই আমি ভালবাসিনা তবে ডিটেকটিভ এর একটু একটু কিউপিড গেম বা রোমান্স ভালই লাগে । তার উপর ম্যাচিউর বয়সের রোমান্স আলাদাই হয় । তাই আমার ৫ স্টার আদিত্য এর পার্সোনাল লাইফ টাকে এত সুন্দর করে গোছানোর জন্য । এই গল্পটা বিশেষ করে আমি এই দিকটার জন্যই মনে রাখবো ।
অভিরুপ সরকারের লেখার প্রধান সমস্যা চা এবং গান বিষয়ক চর্বিত চর্বন। গোয়েন্দা আদিত্য চা খাচ্ছেন, চা খাওয়াচ্ছেন, চা এর অর্ডার করছেন, গান শুনছেন, গান শোনাচ্ছেন, গান শুনতে যেতে চাচ্ছেন, গানের সাজেশন দিচ্ছেন এ সকল বিবরণ বাদ দিলে এই বই ২০০ পৃষ্ঠায় নেমে আসতো বলে আমার মনে হয়। কাহিনী তো অনেক আগেই শেষ হয়ে যায় যখন আপনি হোটেলের সিসিটিভির ফুটেজ নিয়ে ঠিকমতো ইনভেস্টিগেট করবেন। এটাও টেনে লম্বা করা হয়েছে। আর শেষের দিকে তো একটা জোড়াতালি ছিলোই।
কুমুদিনী বিত্ত নিগম যাত্রা-সিনেমা-নাইট ক্লাবে টাকা খাটায়। হালিশহরের বিখ্যাত বিড়ি কোম্পানির মালিক জাহাঙ্গির খান লোভের বশবর্তী হয়ে কুড়ি কোটি টাকা কোনো এক সিনেমার প্রোডিউসারকে দেওয়ার জন্য কুমুদিনীর অফিসে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু সেই টাকা নাকি কুমুদিনীর মালিক বটুক সামন্ত পাননি। তবে ফিরদৌসের মাধ্যমে পাঠানো খান সাহেবের অতগুলো টাকা গেলো কোথায়? কে মিথ্যে বলছে? ফিরদৌস নাকি বটুক সামন্ত? ওদিকে কুমুদিনীর অফিসে পুলিশ রেড করেছে। ঘটে চলেছে একের পর এক খুন। এই খুন গুলো কি একসূত্রে গাঁথা? বেসরকারি গোয়েন্দা আদিত্য মজুমদার নেমে পড়ে এক নতুন রহস্য উন্মোচনে।
রহস্য হিসেবে ভালোই। তবে আদিত্যর ব্যক্তিগত জীবন বড্ডো বেশি কলেবর বৃদ্ধি করেছে উপন্যাসের। যারা রহস্য কাহিনী পড়তে ভালোবাসেন, তারা একবার পড়ে দেখতেই পারেন।