১৩৪৪ সালে, 'রাণুর প্রথম ভাগ' গ্রন্থখানি প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থ হাতে নিয়েই বিভূতিভূষণ বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে প্রথম পদার্পণ করেন। এবং প্রথম পদার্পণেই বাঙালী সাহিত্যপাঠক ও সাহিত্যরসিকদের চিত্তজয়ে সমর্থ হন। পরবর্তীকালে প্রকাশিত ২য়, ৩য় ও ৪র্থ খণ্ড নিয়ে 'রাণু সমগ্র' গ্রন্থখানি প্রস্তুত হয়। বিশুদ্ধ হিউমারের একটা প্রধান লক্ষণ হাসি, অশ ও অন্তর্দৃষ্টির শিল্পসঙ্গত সংমিশ্রণ। বিভূতিভূষণ 'রাণুর প্রথম ভাগ' গল্পটিতে এই সংমিশ্রণ-নৈপুণ্যের যে পরিচয় দিয়েছেন একমাত্র তাঁর নিজের রচনাতে ছাড়া তার তুলনা বাংলা সাহিত্যের আর কুত্রাপি খুঁজে পাওয়া যায় না। শিশুমনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্কষা বড় হওয়ার আকাঙ্কফাএই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার আংশিক পরিতৃপ্তি শিশু লাভ করে বড়দের অনুকরণের দ্বারা। রাণুর পরম কৌতুকাবহ গিন্নীপনার মূলে আছে এই আকাঙ্ক্ষাএই জন্যই সে পুতুল খেলা পছন্দ করে না, বিপন্ন-গম্ভীর মুখ নিয়ে সংসারের সব কিছু তদারক করে বেড়ায়, পাকা পাকা কথা বলে, প্রথম ভাগ ভাল করে আরম্ভ করার আগেই দ্বিতীয় ভাগ পড়তে চায়। সবই হাসির কথা সন্দেহ নেই, কিন্তু যেটা বিশেষ করে লক্ষ্য করার বিষয় সেটা হল বিভূতিভূষণের বর্ণনার অবিচল বাস্তবতাকোথাও বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন নেই, উদ্ভট রসের ছিটেফোঁটাও নেই। শিশুদের সঙ্গে সংসার করায় যারা অভ্যস্ত তাঁরা সবাই আমার সঙ্গে একমত হবেন এ বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ। সহৃদয় অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন শিল্পী ছাড়া আর কারও পক্ষে বস্তুনিষ্ঠার সঙ্গে হাস্যরসের এই অপরূপ সংমিশ্রণ কিছুতেই সম্ভব হত না। তারপর শেষ দৃশ্যের কথা। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার প্রাক্কালে মেজকাকার সামনে একগাদা 'হারিয়ে-যাওয়া প্রথম ভাগ নিয়ে হাজির হওয়া, অপরােধ স্বীকার, অনুতাপ ও প্রায়শ্চিত্তের অঙ্গীকারসমস্ত ব্যাপারটা সত্যই হাস্যকর।