বইয়ের নাম যদিও দেবদাসী কিন্তু এখানে একাধারে সতী,দেবদাসী ও বিষকন্যাদের জীবন কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে। এই তিন কন্যার জীবনের ধরন-ধারণের ইতিহাস রচিত হয়েছে বইটিতে।
কত অজানা কথা, কত বিস্ময়, অজ্ঞতা আর পাপ!
একে একে এই এই দুঃখিনীদের কথা বলা যাক।
সতী : প্রাচীন ভারতে প্রচলিত নিয়ম ছিল, স্বামী যখন মারা যাবেন সাথে তার স্ত্রী ও সহমৃতা হবেন অর্থাৎ স্বামীর শিবদেহের জন্য প্রজ্জ্বলিত চিতায় স্ত্রীও সঙ্গিনী হয়ে ঝাপ দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেবে।এই সহমৃতা স্ত্রী গণ এই সতী নামে পরিচিত। আমরা সকলেই সতীর সাথে পরিচিত ভারতীয় উপমহাদেশে তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের এই নিকৃষ্ট ও নারকীয় প্রথা পালন করার মাধ্যমে। কিন্তু আদতে শুধু সনাতন কুলেই নয়, প্রাচীন মিশর,গ্রীস,চীন,হেরুলিদ,ব্যবিলনীয়দের মধ্যেও এই প্রথা চলিত ছিল। সেই যুগের স্বামীরা ছিলেন স্ত্রী সংখ্যার প্রতিযোগী। সেই সুবাদেই যখন কোন স্বামীর মৃত্যু হতো তার সাথে প্রাণ দিত একের অধিক স্ত্রী অর্থাৎ যার যতটি অর্ধাঙ্গিনী আছে। সেই সংখ্যা যে হাজার কে স্পর্শ করেছে এটা শুনে অবাক লাগতেই পারে। কিছু নারী সহমরণে যেতেন স্বেচ্ছায়।কিন্তু সেটা হবে একশো জনে মাত্র দুই ভাগ।বাকিরা??বাকিদের জোর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হতো।এর কারণও বিচিত্র। বিধবা এই নারীকে আত্নীয় কুল ভরণপোষণ দিতে নারাজ, বিধবা বিবাহের কঠোর বিরোধিতা, সম্পত্তির অধিকার, পরিবারের সুনাম ইত্যাদি।স্বামী মরে যাওয়ার পর নারীর কিই বা রইল আর জীবনে।তাই স্বামীকে মৃত্যুর পরেও পরলোকে সঙ্গ দিতে এই ব্যবস্থা। কারণের শেষ নেই। আর যারা সেই অভিশপ্ত কুপ্রথা থেকে নিজেদের কোনমতে বাচাতে পেরেছিল তারা 'অসতী' উপাধি লাভ করলেন।
দেবদাসী: দেবের সেবায় নিয়োজিত সকল দাসী।এই দেবতা মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত। দেবদাসীগণ নৃত্য,সংগীত, নাট্যকলা, শিক্ষায় সমান ভাবে পারদর্শী। তাদের কাজ মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দেবতার সম্মুখে নৃত্য গীত পরিবেশন করা, দেবতার সেবায় নিজেকে সমর্পণ করে, কিছু জায়গায় দেবতাকে বিবাহ করে তাকে স্বামী রূপে গ্রহণ করেই তারা সেবাদাসী। কিন্তু তারা পণ্যা। এই দেবদাসূ বা সেবাদাসীরা বহুভোগ্যা হওয়ার হাত থেকে নিস্তার পায়নি। ধর্মের বিকৃতি পুরোহিত শ্রেণির মানুষদের যে পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে অনেক গুলো ঘৃণ্য প্রথার মধ্যে অন্যতম ছিল এই দেবদাসী। কোন এক কালে কেউ একজন খুশি হয়ে এক দেবদাসীকে জমু উপহার দিয়েছিল, সেই সুবাদে তার বাকি প্রজন্মকেও দেবদাসীই হতে হবে।অনেকটা নানকারদের মত।মন্দিরের সেবায় নিয়োজিত থেকে যে মাসোহারা পাওয়া যেত তা পেট ভরানোর জন্য যথেষ্ট না হওয়া এই বহু ভোগ্য পণ্যায় পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ।হায়্রে কুসংস্কার! কত মেয়ে বিয়ের পূর্বে নিজের কুমারিত্ব অর্পণ করতে এসেছে নিচ পুরোহিত সম্প্রদায়ের কাছে। শুধু মেয়েরাই নয়,ছেলেরাও এই পদে নিযুক্ত ছিল। তারা নৃত্য গীতের সময় বাদ্যযন্ত্র বাজানোর কাজে নিয়োজিত ছিলো । এই প্রথা শুধু ভারতেই নয়, প্রচলিত ছিল আরো অনেক স্থানেই, সেই সতী প্রথার মতই।প্রাচীন মহেঞ্জোদারো, প্যারিস, ইউরোপ,ফেরুসালেমেও তাদের আবির্ভাব ছিল।
বিষকন্যা: বিষকন্যা অর্ধেক মানবী,অর্ধেক কল্পনা। বিষকন্যাদের জন্মের পর থেকেই বিষের ছোয়ায় লালন পালন করা হয়।তাদের নিঃশ্বাসে বিষ,নজরে বিষ,আলিঙ্গনে বিষ।যেখানে মানুষ অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধ করতে বা প্রাণ নাশ করতে সেখাবে বিষকন্যারা নিজেরাই একেক্টি ধারালো অস্ত্র।তারাই তাদের শত্রুর একমাত্র কাল। আলেকজান্ডারকে খুন করার জন্য একাকাধিবার প্রেরণ করা হয়েছিল বিষকন্যাদের।গুরু সক্রেটিস এর বিচক্ষণতায় সে একাধিকবার এই রেহাই পান।তৎকালে নারী লোলুপ রাজ রাজারাজড়াদের জীবন অবসান করতে এই বিষকন্যাদের অব্যর্থ প্রয়োগ ছিল খুবই জনপ্রিয়। তাদের এই বিষকন্যা হয়ে ওঠার পদ্ধতিও বিচিত্র যা অনেকটাই কল্পকাহিনীর মতো।
এই তিন কন্যার মধ্যে বিষকন্যা অর্ধেক কল্পনা হলেও বাকি দুইজন 'সতী' ও 'দেবদাসী' সম্পূর্ণভাবে বাস্তব।আর স্বস্তির বিষয় এই যে এই দুই প্রথা নির্মূলে ভারতবর্ষ অগ্রমুখী হয়ে তা প্রতিরোধ করতে চেয়েছে এবং এই দুই কুপ্রথার অস্তিত্ব অবসানে, উচ্ছেদে সফল হয়েছে।সতীদাহ প্রথা বিনাশে রাজা রামমোহন রায় এবং দেবদাসী প্রথা বিলুপ্ত করণে মুথুলক্ষ্মী রেড্ডীর অবদান চির অম্লান হয়ে আছে।