নিখাদ বাঙালি- সম্পদ বারিক, (জন্ম- ১৯৮৪, রামপুরহাট, বীরভূম) পেশায় ইঞ্জিনীয়ার, নেশায় লেখা।.ফেসবুকে ‘নিখাদ বাঙালি' নামে তাঁর আত্মপ্রকাশ এবং ‘ফাজিলের মহাভারত’, ‘ফাজিলের গ্রীকচর্চা' ও ‘ফাজিলের বাইবেল' এর স্রষ্টা। তাছাড়াও পটেদা সমগ্র ও শান্তিদাদু সমগ্রের স্রষ্টাও বটে। কিছু সংকলনে তাঁর লেখা গল্পসমূহ প্রকাশ পেয়েছে।
বইয়ের নামটাই যখন উইয়ার্ড, তখন ভেতরের গল্প তো আরো অদ্ভুতুড়েই হবে!
অনেকদিন পর এমন একটা স্যাটায়ার পড়লাম। 'ফাজিলের মহাভারত', নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে ফাইজলামি টাইপ কিছুই হবে। কিন্তু তাই বলে ধর্ম নিয়ে ফাইজলামি! . . জি হ্যাঁ, লেখক কোথাও কোনো ঘটনাকে 'প্রায়' অবিকৃত রেখে মহাভারতের মতো বিশাল মহাকাব্যকে আমাদের নিত্যদিনের কথ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। মনে হবে কোনো বন্ধু আমাদেরকে মহাভারত পড়ে শোনাচ্ছে। আমরা যেমন কথায় কথায় স্ল্যাং ব্যবহার করি, সার্কাস্টিক হয়ে যায় বা ডার্ক জোক করি, এইখানেও তাই।
মহাভারত আগেও পড়েছি। মহাভারতের নাম শুনলে সবার মত আমার মাথায়েও চলে আসে রাম, হনুমান, ভীম, কৃষ্ণ, অর্জুন, পঞ্চপাণ্ডব, ঘটৎকচ, যুধিষ্ঠির– এমন সব মিথোলজিক্যাল ক্যারেক্টারের নাম। একদম অরিজিনাল মহাভারতের বিস্তৃত তো বিশাল। পড়তেও কঠিন লাগে। অনেক জিনিসই বুঝতে পারি না৷ তবে সেগুলোকেই সাধারণ মানুষের জন্য মোটামুটি সহজভাবে লিখে গেছেন বাল্মীকি, রাজশেখর বসু, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ আরো অনেকেই।
তবে 'ফাজিলের মহাভারত' সব থেকে ভিন্ন। কারণ এখানে সাধু-চলিত ভাষার কোনো মিশ্রণ নেই, খটমট শব্দ নেই। একদম টিপিক্যাল 'আমাদের' ভাষাতেই সব বোঝানো হয়েছে। . . কাহিনি যেমন হোক, লেখকের লেখায় মুন্সিয়ানা আছে বটে। একেকটা অধ্যায়ে লেখক মহাভারতের একেকটা ঘটনা তুলে ধরেছেন। সাথে আবার লেজুড় জুড়ে দিয়ে লিখেছেন, "যদি এমন না হয়ে তেমন হতো, তাহলে কেমন হতো?" প্রশ্নগুলো দেখলে মনে হয় অযৌক্তিক তো কিছু জিজ্ঞেস করেননি! প্রচুর ব্যঙ্গকৌতুক ও মজার মাধ্যমে প্রশ্ন ও আলোচনায় সমৃদ্ধ এই বই।
বইয়ের মধ্যে সুকুমার রায় আর নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রভাব যথেষ্ট লক্ষণীয় এবং লেখক নিজেও বইয়ের গোড়াতেই সেটা স্বীকার করে নিয়েছেন। . . তবে এত রসাত্মক লেখা পড়েও মাঝের দিকে এসে একঘেয়েমি চলে আসলো। জোক নেওয়া যায়, তাই বলে প্রতি লাইনে জোক, শ্লেষ এসব থাকার কারণে পড়ার ফ্লোটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল৷ আর একই জিনিস বারবার রিপিট হচ্ছিল। কতই বা এভাবে পড়া যায়? বানানেও অনেক ভুল ছিল। আবার ধর্মীয় ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে এমন জোক, গালাগাল নিজের মোরালিটিতেও হাল্কা টোকা দিচ্ছিল। অনেক জায়গাতেই মনে হয়েছে, এত উপমা না দিলেও চলতো।
তবে বইটা পড়ে মহাভারতের অনেক অজানা কিসসার কথাও জানলাম যা আগে মিস করে গিয়েছিলাম হয়তো। লেখক আবার হাল্কা চালে একটা পার্টিকুলার রাজনৈতিক দলকেও লেখার মাধ্যমে ঠেস দিয়েছেন। . . লেখা দেখেই বোঝা গেছে যে উনি বেশ হোমওয়ার্ক করেই লিখেছেন৷ বেশ কিছু জায়গা পড়ে হো হো করে হেসেছি৷ লেখার ফাঁকে ফাঁকে চলে আসে সমাজচেতনা আর রাজনীতির কমেন্টরি। প্রতিটা ঘটনাই আধুনিক সময় বা দৈনন্দিন জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে বর্ণনা করেছেন। বেশ প্রাঞ্জল লেখা।
মহাভারত পড়তে যেয়ে মনে হয়েছে এখানে শুধু ধর্মই না, একইসাথে রয়েছে সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, রণনীতি, দার্শনিক, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি– সবকিছুই। সম্পূর্ণ বিষয়টা হাস্যরসের মাধ্যমে প্রকাশ করাটা কিন্তু বেশ দুরূহ। আর সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন নিখাদ বাঙালি।
আমার মোটামুটি লেগেছে, তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে এটা একটু আঘাত দিতেও পারে।
মহাভারতের কথা অমৃত সমান, নিখাদ বাঙালি কথে, শুন পুণ্যবান। হ্যাঁ, এ এক মহাভারতই বটে। ব্যাসদেবের মহাভারতের প্রায় সবটুকু, প্লাস বেশ কিছু আঞ্চলিক মহাভারত, প্লাস গীতা— এই বি...ই...ই...শা...আ...ল জিনিসটাকে প্রচুর ঠাট্টা-রসিকতা এবং নিজস্ব ব্যাখ্যা ও টিপ্পনির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়েছে এতে। ভূমিকা, তিরিশটি চ্যাপ্টার এবং একটি পরিশিষ্ট দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একে। তাদের সার-সংক্ষেপ করব না। বরং বলব, ধীরে-সুস্থে এই বইটার আদ্যোপান্ত পড়ে ফেলুন। কেন পড়বেন? তার কারণ ত্রিবিধ। প্রথমত, মহাভারত আর আমাদের মধ্যে বিশাল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার ভাষা। তাকে অতিক্রমের আশায় আমরা অমর চিত্র কথা পড়ি, নানা প্রবন্ধের বইয়ে মুখ গুঁজি, সর্বোপরি (সবচেয়ে সর্বনাশা ব্যাপারও বটে) সিরিয়াল দেখি। তার ফলে আমাদের অধিকাংশেরই মহাভারত-বিষয়ক জ্ঞান একেবারেই ভাসা-ভাসা। এই বই সহজ ও সরস ভঙ্গিতে কিন্তু আদত গল্পটা পুরোপুরি বলে দিয়েছে। এটা পড়লে অনেক তথ্যগত ভ্রান্তি দূর হতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, বিদেশি পুরাকথা পড়ে হাঁ হয়ে থাকা আমরা এই বইটা পড়লে বেশ বুঝব, কীভাবে আমাদের দেশের প্রাচীনতর উপাদানগুলো ছিনতাই করে অন্যরা সেগুলো 'নিজস্ব' বলে চালাচ্ছে। তারই সঙ্গে জেনে ফেলা যাবে অনেক গল্পের সামাজিক ও ঐতিহাসিক শিকড়। ভুল আর মিথ্যাতে আচ্ছন্ন অতীতের একটা স্বচ্ছতর ছবি কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্পষ্ট হবে দু চোখের সামনে। তৃতীয়ত, এই বইয়ে লেখক একেবারে সোজা-সাপটা ভঙ্গিতে দেখিয়েছেন, মহাভারত আসলে একটা পলিটিক্যাল কাহিনি— যাকে হাজার বছরেরও বেশি ধরে ধান্দাবাজির মিক্সার-গ্রাইন্ডারে ফেলে 'ধর্ম' প্রচারের মাধ্যমে পরিণত করা হয়েছে। সেই ধর্মও কোড অফ কনডাক্ট বা অন্য কোনো নিরিখে সদাচার নয়। বরং যুধিষ্ঠির অ্যান্ড কোং এবং তাদের দ্বারা পালিত পাবলিক ধর্মের নামে যা-ইচ্ছে-তাই চালিয়ে গেছে সবার সঙ্গে, এমনকি নিজের ও আত্মীয়দের ওপরেও! তবে এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ কী জানেন? হাসিঠাট্টার পাশাপাশি এতে তৎসম ভাষায় যে গালিগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো একবার মুখস্থ করে জায়গামতো প্রয়োগ করতে পারলে পুরো ফাটিয়ে দেওয়া যাবে। কার কী ফাটিয়ে দেওয়া যাবে— এই ধরনের মেঢ্রসুলভ প্রশ্ন করবেন না প্লিজ। বরং বইটা পড়ে ফেলুন। বইটার এই চতুর্থ মুদ্রণ প্রকাশের আগেও ভালোমতো প্রুফ দেখানো হল না দেখে যারপরনাই ক্ষিপ্ত হয়ে আছি। তবে এই বিশেষ প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে এর বেশি কিছু আশাও করি না। শুধু নিখাদ বাঙালি এমন শাণিত কলমেই অতীতের নানা রহস্য আমাদের সামনে উন্মোচিত করে চলুন— এই প্রার্থনাই করি।
অভাজনের মহাভারত পড়ে থাকলে এই ভার্সনের মহাভারতের লিখনশৈলী সম্পর্কে পাঠকের ধারনা থাকার কথা৷ সরস বর্ণনা, স্ল্যাংয়ের ব্যবহার, কোথাও কোথাও অশ্লীল শব্দ মিলিয়ে লিখেছিলেন মাহবুব লীলেন।
নিখাদ বাঙালি নামের লেখক মহাশয় আরেক কাঠি সরেস, প্রচলিত ইংরেজি ব্যবহার করেছেন ব্যাপক। প্রচলিত ইংরেজি বলতে কিশোর তরুণরা তাদের সংলাপে যেরকম শব্দ ব্যবহার করে সেসব। কোথাও কোথাও মডার্ণ ডে কালচার অর্থ্যাৎ কিনা কলিযুগের সংস্কৃতি চলে এসে। মহাভারতের চরিত্ররা একে অপরের কাছে সিগারেট চাইছে, অ্যাঁ?
এই বিষয়গুলো অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লেগেছে৷ সরস আলোচনা, স্ল্যাংয়ের ব্যবহার ভালো লাগে, কিন্তু মহাভারতের চরিত্ররা মডার্ন কালচার প্রয়োগ করছে; এটা পুরো বইটার আমেজ নষ্ট করেছে।
“আপনি যদি একটা টিনএজারকে একটা বন্দুক দিয়ে বলেন ‘চালাবি না কিন্তু’, বা একটা ভিডিও গেম দেন, সেই ছেলেটা বা মেয়েটা কিন্তু শুধু ওটা ট্রায়াল করতে অন্ততপক্ষে একবার সঙ্গে সঙ্গে সেটা ব্যবহার করবেই। কুন্তীও তাই করল। ডাইরেক্ট সূর্যদেবকে ডাকল। মন্ত্রের জোরে সূর্যদেব কোলে একটা নিউবর্ন বাচ্চা এনে কুন্তীকে দিয়ে দিল। কুন্তীর তখন অ্যামাজনে অর্ডার করে ভুল প্রোডাক্ট পাওয়া কাস্টমারের মতো অবস্থা। সে কী করে বোঝায় যে সে শুধু ডেলিভারি ম্যান সূর্যদেবকে দেখতে আর ফ্রি ট্রায়ালের জন্য ওটা টেস্ট করছিল? সূর্যদেব বলল, ‘ওসব হবে না। অফার ডকুমেন্টসের নীচে পড়োনি? মন্ত্র ইজ অ্যা ম্যাটার অফ সলিসিটেশন। প্লিজ রিড দ্য অফার ডকুমেন্টস বিফোর আউড়ায়িং মন্ত্র। নিতেই হবে।’ এই বলে সূর্যদেব কেটে পড়ল। কুন্তীর কোলে একটা বাচ্চা। তাও আবার বর্ম আর কানে ইয়া বড়ো বড়ো দুল পরে। একেবারে ডেকোরেটেড রেডিমেড শিশু। এটা নিউবর্ন কর্ণ ছিল। মহাভারতে কৃষ্ণের পরে দ্বিতীয় হার্টথ্রব।”
এবার আপনারাই বলুন যে এই বই কি আর না পড়ে থাকা যায়! অসম্ভব রকমের হাসি পাচ্ছে! রাজশেখর বসু তাঁর ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পে সেই যে লিখেছিলেন, “......পুঞ্জীভূত হাসি সত্যব্রতের চোখ নাক মুখ ফাটিয়া বাহির হইবার উপক্রম করিল। সে তখন নিরুপায় হইয়া বিপুল চেষ্টায় হাসিকে কান্নায় পরিবর্তিত করিল এবং দু-হাতে মুখ ঢাকিয়া ভেউ ভেউ করিয়া উঠিল।…..” আমার অবস্থাও অনেকটা সত্যব্রতের মতো। এইভাবেই হাসির সাথে বিস্তর যুদ্ধ করতে করতে শেষ করলাম এই বই, নিখাদ বাঙালির লেখা ‘ফাজিলের মহাভারত’।
মহাভারত সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করার মতো ধৃষ্টতা দেখানো আমার অনুচিত। কয়েক হাজার বছর আগে লেখা এক মহাকাব্যের প্রাসঙ্গিকতা এবং জনপ্রিয়তা আজও অত্যন্ত প্রবল। রামায়ণ বা মহাভারতের মতো প্রাচীন টেক্সটগুলোই হয়তো একমাত্র বই, যা সম্পূর্ণ বা আগাগোড়া পড়েছেন খুবই কম মানুষ, অথচ তার কাহিনী বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত নন এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমার মতে, এই টেক্সটগুলোকে নিয়ে নতুন করে কোনো কিছু লেখাই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। লেখক এমন একটা বিষয় নিয়ে তাঁর বই লিখছেন যার বিষয়বস্তু পাঠকের অজানা নয়। তাহলে প্রশ্ন আসে যে, কেন একজন পাঠক পয়সা খরচ করে এমন বই কিনবেন? ঠিক এখানেই আসে এই অসাধারণ বই, ‘ফাজিলের মহাভারত’। কেন একজন পয়সা খরচ করে এমন বই কিনবেন তার যৎসামান্য উদাহরণ শুরুতেই দিয়ে রেখেছি।
আমার, এবং সম্ভবত আমার মতো অনেকেরই, জীবনে মহাভারতের সঙ্গে প্রথম পরিচয় উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর হাত ধরে। একটু বড়ো হয়ে আমরা তুলে নিই রাজশেখর বসুর করা মহাভারতের সারানুবাদ। কাশীদাসী মহাভারত বা কালী সিঙ্গির মহাভারত খুব কম মানুষই ধরার এবং ধরে সম্পূর্ণ করার দুঃসাহস দেখান। যারা এই বিষয়ে গবেষণা করেন, তাঁদের কাছে অন্যতম পছন্দের ভি.এস. সুখতাঙ্কারের করা ১৯ খন্ডের বিশাল ক্রিটিক্যাল এডিশন অফ মহাভারত। এছাড়াও, অমরচিত্রকথা তো একসময় আমরা প্রায় সকলেই পড়েছি। এইসবের মাঝেই স্বচ্ছন্দে এবং অত্যন্ত সাবলীল ভাবে স্থান করে নিতে পারে এই বই, ‘ফাজিলের মহাভারত’।
অনেকেই বলতে পারেন যে, মহাভারতের মতো অত্যন্ত গুরুগম্ভীর এবং সিরিয়াস বিষয় নিয়ে ফাজলামি বা স্যাটায়ার লেখার প্রয়োজন কী, যেখানে মহাভারতের মতো টেক্সট বিশেষ করে হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হয় এবং এই বইয়ের সাথে 'ধর্ম' নামক বিষয়টা অত্যন্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িত? স্যাটায়ার লেখার বিষয় কি কম পড়িয়াছে? এর কারণ লেখক বইতে নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন এবং এই বিষয়ে আমিও তাঁর সঙ্গে একমত। না, স্যাটায়ার লেখার বিষয় কম পরেনি ঠিকই, কিন্তু মহাভারত বা পৌরাণিক টেক্সট নিয়ে এই ধরণের বই লেখার প্রয়োজনীতা আজ যথেষ্টই বেশি। আজ থেকে ১৫ কি ২০ বছর আগে হলেও এই নিয়ে কথা বলার আগে দু বার ভাবা যেত, কিন্তু আজ সেই প্রয়োজনীতা নেই। আজ প্রায় প্রত্যেক মানুষই ডিজিটাল, সবাই ফোনে ব্যস্ত। বইয়ের সাবসিডারি হিসেবে পিডিএফ এসেছে বটে (যদিও কোনো কিছুই হাতে ধরে পড়া বইয়ের পরিপূরক হতে পারে না), কিন্তু তাও বেশিরভাগ মানুষ আজ পিডিএফের থেকে শর্ট স্প্যানের ভিডিওকেই অধিক গুরুত্ব দেন এবং হার্ডকভার বই বাড়ির বৈঠকখানার সজ্জা ও সৌন্দর্য বর্ধক হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুলভাল ভিএফএক্স দিয়ে মহাভারতের যেসব চলচ্চিত্রায়ণ হচ্ছে তাতে স্ক্রিপ্টে ব্যাস বাবুর থেকে প্রযোজক ও পরিচালকের লেখা গল্পই অধিক প্রাধান্য পায়। অবশ্য এই ঘটনা আজকের নতুন কিছু নয়, সেই ৮০ র দশক থেকে চোপরা ভ্রাতৃগণের হাত ধরে এসবের সূচনা হয়েছিল। বর্তমানের এমন পরিস্থিতিতে যখন মানুষ বই বিমুখ (প্রত্যেকে অবশ্যই নন, কিন্তু অধিকাংশই), তাঁদের জ্ঞান আহরণের মূল উৎস্য যেখানে সোশ্যাল মিডিয়াতে কয়েকশো বার ফরোয়ার্ড হওয়া কোনো ছবি বা মিম এবং তার তলার দু’লাইন লেখা, তখন এই ধরণের বইয়ের আবশ্যিকতা আছে বইকি! যদি সেই জটিল ও সিরিয়াস বিষয়কে হালকা মজা বা ইয়ার্কির ছলে এবং কোনো তথ্য বিকৃতি না ঘটিয়ে (যেটা এই বইয়ের সবচেয়ে ভালো এবং আকর্ষণীয় বিষয়) আসল ও সঠিক তথ্যকে যথাযথ রূপে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করা যায় এবং তাঁকে পুনরায় বইমুখী করা যায়, তাহলে তার মধ্যে আর যাই থাকুক কোনো ‘পাপ’ থাকে না। ধর্মগ্রন্থকে কেবল আলমারির সবার ওপরের তাকে তুলে রেখে দিলে বা ঠাকুরঘরে পুজোর সরঞ্জামের সঙ্গে রাখলে অথবা মাথার বালিশের পাশে নিয়ে শুলেই পূণ্য লাভ হয় না। সেটাতে যা লেখা আছে তা নিজের মধ্যে আত্মস্থ করতে না পারলে সেই ধর্মগ্রন্থের কোনো ধর্মীয় সারবত্তা থাকে না। বরং তার চেয়ে যদি তাতে হাস্যরস মিশিয়ে সহজ প্রাঞ্জল ভাষায় তা উপস্থাপন করা যায়, তাহলে তার মাধ্যমে অনেক বেশি পূণ্য লাভ সম্ভব।
বইয়ের বিষয়বস্তু মহাভারত। এছাড়া আর কিছু বলবো না। ভাষা ও বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা কেমন সেটার সামান্য নমুনা শুরুতেই দিয়ে দিয়েছি। একটি ভূমিকা, তিরিশটি পর্ব এবং শেষকালে মহাভারতের অস্ত্রশস্ত্র বিষয়ে একটি বিশেষ স্পিন অফ রচনা নিয়ে এই বই। প্রত্যেকটা অধ্যায় আলাদা আলাদা ভাবে উল্লেখযোগ্য। মূল মহাভারতে এবং অন্যান্য বহু টেক্সটে যেসব বিষয়কে কেবলমাত্র ‘ভগবানের লীলা’ বলে চালানো হয় অথবা যেসব অন্যায় ঘটনাকে দীর্ঘ দিন ধরে ধর্মের বর্মের পিছনে রক্ষা করা হচ্ছে সেই সমস্তকে লেখক ধারালো যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন এবং সকল বিষয়কে প্রশ্ন করেছেন। এইখানে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির থেকে শ্রীকৃষ্ণ, মহামতি ভীষ্ম থেকে ব্যাসদেব কেউ ছাড় পাননি। এবং ঠিক এই বিষয়টাই মহাভারত নিয়ে লেখা আর পাঁচটা বইয়ের থেকে ‘ফাজিলের মহাভারত’ কে আলাদা করেছে। এই বই লিখতে গিয়ে লেখককে যে কি পরিমাণ পড়াশোনা করতে হয়েছে তা প্রত্যেক অধ্যায়ের ছত্রে ছত্রে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। তিনি কেবল বাজার চলতি অথবা মহাভারতের সবচেয়ে বিক্রিত সংস্করণগুলো থেকেই নয়, মহাভারতের কোনো না কোনো ঘটনার উল্লেখ আছে বা মহাভারতের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এমন পৌরাণিক গ্রন্থ এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত মহাভারতের আঞ্চলিক ভার্সনগুলোকেও যথেষ্ট স্টাডি করেছেন। এই ভয়ানক শ্রমসাধ্য কাজের জন্য লেখককে একটা কুর্নিশ। আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের কাছে এই ধরণের কোনো প্রাচীন টেক্সট পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সমস্যার জায়গা হলো এর অতি জটিল ভাষা, যে সমস্যাটা লেখক এখানে অত্যন্ত সচেতন এবং সুচারুরূপে সমাধান করে দিয়েছেন।
তবে অনেকগুলো ভালো গুণের সঙ্গে বইটার কিছু ড্রব্যাকও নজরে এসেছে। ভালো বিষয় হলো অধিকাংশ জটিল ঘটনাকে, যাদের এতদিন সব জায়গায় কেবল ধর্মের চশমা পরে দেখা হত, সেই সবকে লেখক বিভিন্ন আধুনিক উপকরণ এবং উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেছেন। ঠিক এই জিনিসটাই কিছু কিছু জায়গায় অতিরিক্ত বলে মনে হয়েছে। এই বাড়াবাড়িটা হয়তো সব জায়গায় না করলেও চলত। যেটা সাধারণভাবেই বোঝা যাচ্ছে সেটাকেও ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অহেতুক বইয়ের কলেবর বৃদ্ধি ব্যাতীত আর কিছুই লাভ হয়নি। কয়েকটা জায়গা পড়ে তো বিশেষ ভাবে মনে হয়েছে যে, আরে! আগের অধ্যায়েই তো এই জিনিসটার ব্যাখ্যা পড়লাম, তাহলে আবার এখানে কেন! এই একটা সমস্যা ছাড়া আর কোনো ব্যাপারে আমার কোনো অভিযোগ নেই।
আর বিশেষ কিছু বলার নেই। এইটুকুই বলবো যে, চোখ বন্ধ করে এই বই কিনতে পারেন। তবে একটু ধীরে ধীরে পড়লে স্বার্থক রূপে এই বইয়ের রসাস্বাদন করতে পারবেন। লেখককে ধন্যবাদ, এমন দুর্দান্ত একটা বই পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্য। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এমন একটা বইয়ের খুব প্রয়োজন ছিল। এইভাবেই ফাজিলের কলম চলতে থাকুক, এই কামনা করি।
বিঃদ্রঃ- গতবার ‘ফাজিলের হরিবংশ’ এর পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখার সময়েও বলেছিলাম, আর এখন আবারও বলছি, প্লিজ এবার ‘ফাজিলের রামায়ণ’ টা নামিয়ে দিন! এটার জন্য বহুদিন ধরেই তীর্থের কাকের মতো বসে আছি.......
কোন পৌরাণিক কাহিনী কে যে রকের আড্ডায় বসে গল্প করে বলা হয়েছে, আর আড্ডা টা এমন ছিল যেন মনে হয়েছে চলুক আরও লম্বা সময় ধরে, অসাধারণ সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করলেন লেখক তাঁর লেখনী তে। অবশ্যয় পাঠ্য একটি বই হয়ে থাকবে আমার তালিকায়।
প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত হাস্যরসে মোড়া একটি বই। হাস্যরসের আড়ালে মহাভারত এর যুগের সমাজ ও প্রতিটি চরিত্রের অসামান্য বিশ্লেষণ ও flaws লেখক দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন।
It was an entirely new & exciting experience to read this book. We all more or less are familiar with the stories of the Epic Mahabharata, and this book did not alter that tale. What it does though, is to narrate the story with a comedic relief that would keep the readers engrossed. The language is lucid, and free flowing, and the way it is written definitely shows that the author has done thoroughly researched the material. Satire intertwined with philosophy is what gives the author the edge. And it certainly questions some of the well known events that we clearly fail to notice. An enjoyable read overall.