ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা গ্রাম নয়। এইসব গল্পে গ্রাম রয়েছে তার রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে। নদী, মাঠ, ধানখেত, জ্যোৎস্না ও রোদ্দুর নিয়ে। তার অস্থি মজ্জা নিয়ে। ক্রমশ বদলে যাওয়া গ্রামীণ সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম ও সংস্কারের ভিতরে হাঁসফাঁস করতে থাকা গ্রামের মানুষের জীবন আড়ালের বাইরে এসে কথা বলে এইসব কাহিনিতে। বলে এই দেশেরই আরও অনেক গ্রামের গল্প, নগর যাদের সরিয়ে রেখেছে দেখতে চায় না বলে। এই সময়ের পৃথিবীর সঙ্গে তার যোগ এক অদৃশ্য অথচ অনিবার্য সুতোয়। সেই ওঠাপড়াও দেখিয়ে দিয়ে তা হয়ে ওঠে ব্যাপ্ত জীবনের গল্প।
Hamiruddin Middya, born on January 14, 1997, in Bankura, West Bengal is Bengali fiction writer known for his deep insights into human emotions and rural life. An agriculturist by profession, Hamiruddin began writing in 2016 and has since published two acclaimed short story collections, Azrailer Daak and Mathrakha. His storytelling vividly captures the rich diversity of rural Bengal, particularly the 'Rath' region, and touches on themes of communal harmony and transformation. His use of the local dialect, 'Rarh Banga,' adds an authentic flavor to his work. His short story Kabar was adapted into a short film.
Mathrakha, his second collection, has brought him widespread recognition, earning him the prestigious Sahitya Akademi Yuva Puraskar in 2023. His literary achievements include the Sandipan Chattopadhyay Smriti Puraskar and the Ila Chand Smriti Puraskar from Bangiya Sahitya Parishad. Known for his ability to express complex ideas with simplicity, Hamiruddin's work is celebrated for its portrayal of rural folk elements and its creative commentary on social transformation, making him a significant voice in contemporary Bengali literature.
"মাঠরাখা"য় বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক গল্প আছে। শুরুতে ভালো লাগা গল্পগুলোর কথা বলি। "ডাকপুরুষ" গল্পে কৃষকদের লৌকিক বিশ্বাসের সঙ্গে ধর্মীয় আচারের সংঘাত দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। "নিশিকাব্য"তে গ্রামীণ পটভূমিতে আটপৌরে কিন্তু প্রাণোচ্ছল রোমান্সও মন কাড়ে। "নাবাল ভূমি" গল্পে প্রযুক্তির উন্নয়নে পুরনো পেশার অনিবার্য বিলোপ নিয়ে আবেগঘন বর্ণনা ভালো লেগেছে।
ব্যক্তিগতভাবে, বেশিরভাগ কাহিনিতে উপযুক্ত দ্বন্দ্বের অভাব বোধ করেছি। "পীর সাহেবের আস্তানা" নামে একটা গল্প আছে। সেখানে মাজারকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত তৈরি হয় তা শেষ হয় ভাবালুতায়, স্মৃতিকাতরতায়। অথচ এই প্লটে সুযোগ ছিলো অনেক প্রশ্ন তোলার। প্রায়ই লেখক বিভিন্ন সমস্যা বা সংঘাত উপস্থাপন করলেও তা ঠিক আমাদের স্পর্শ করে না। যেমন - "ফাঁস" গল্পে যৌতুকপ্রথার কথা থাকলেও তাতে কোনো আলাদা মাত্রা বা ভাষ্য নেই।যৌতুকপ্রথার নির্মমতা বা নারীদের দুর্দশা কিছুই সেখানে ফুটে ওঠে না। প্রসঙ্গত, বানু মুশতাকের "হার্ট ল্যাম্প " এর কথা বলতে পারি। এটা বেশ উচ্চকিত গল্প। কিন্তু স্বামীর দুর্ব্যবহারে,অত্যাচারে তিক্ত এক নারীর অভিজ্ঞতা ভয়াবহ নির্মমতার সাথে তুলে ধরেছেন লেখিকা, যা আমাদের মর্মমূলে আঘাত হানে। নামগল্প "মাঠরাখা"তেও একই সমস্যা। দ্বন্দ্ব আছে, কিন্তু সাইডনোট হিসেবে; শেষ অংশ তরল। আমাদের চেনা জগতের বাইরে থাকা বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষদের হামিরউদ্দিন মিদ্যা পরম যত্নে তার গল্পে স্থান দিয়েছেন, এজন্য তিনি অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। কিন্তু প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হলো না পাঠক হিসেবে।
গ্রামকে উপজীব্য করে গল্প লিখে গ্রামের সঙ্গে সংস্রবহীন পাঠককে মুগ্ধ করে দেওয়া সহজ, সম্ভব এক সময় গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও এখন আর নেই এমন পাঠককে স্মৃতিকাতর করে ফেলা, লেখায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবনাচার তুলে এনে সমালোচকদের মন জয় করে নেওয়াও কঠিন কিছু নয় (বইটির একাধিক পুরস্কার জেতা, প্রতিষ্ঠিত লেখকদের অকুণ্ঠ প্রশংসা এবং ফলশ্রুতিতে বড় প্রকাশনা সংস্থা থেকে বই প্রকাশিত হওয়া দ্রষ্টব্য), কিন্তু এসবকিছু গল্প ভালো হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। গ্রাম আর প্রান্তিক মানুষজনকে নিয়ে লেখক ভালো ভালো দৃশ্য তৈরি করতে পেরেছেন, ভালো গল্প না। ছোটগল্পের কাছে আমার যা প্রত্যাশা থাকে তার ছিটেফোঁটাও পেলাম না আঠারোটি গল্পের এই সংকলনে। কোনো একটি গল্প পড়ে মনে হলো না যে কিছুটা হলেও ভিন্ন কিছু পেয়েছি। প্রথমদিকের কিছু গল্প যদি ভালো লেগেও যেত তাহলেও আমি নিশ্চিত শেষদিকে এসে বিরক্ত হতাম একঘেয়ে বিষয়বস্তু এবং একই রকমের চরিত্রচিত্রণের কারণে। নিকট অতীতে কোনো বই পড়ে এত হতাশ হয়েছি বলে মনে পড়ে না।
মাঠরাখা নামক কাকতাড়ুয়া টি যেন দাঁড়িয়ে আছে আষাঢ়ের মাটি ভেদ করে আমন ধানের মতন। যার হলদে গন্ধে বাতাস হাল্কা হয়ে নেমে আসে শরীরে। কিন্তু কাকতাড়ুয়া আর মাঠরাখা তো এক নয়। মাঠরাখা রাতের মালিক। দিনের আলো ফুটতেই মালিকানা পরিবর্তন হয়ে যায়। হারিকেনের আলোর জমিদারি সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায়। গল্পের সাথে যে কোনো লেখক চিত্র ফুটিয়ে তোলেন অবলীলায়। কিন্তু লেখকের এই গল্পগুলো থেকে এক ধরণের গন্ধ পাওয়া যায়। একবিংশ শতাব্দীর লেখা হয়েও এখানে উনবিংশ - বিংশ শতাব্দীর নিপুণ ছোয়া রয়েছে। গ্রাম্য কথা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গন্ধ রয়েছে। রয়েছে নস্টালজিয়ার গন্ধ।
হামিরউদ্দিন মিদ্যা নামে কোনো গল্পকার আছে এটা আমার জানা ছিল না, তার গল্প পড়া তো আরো দূরের ব্যাপার। মাঠরাখা'তে আমাদের চেনাজানা কোনো মানুষের গল্প নেই। আধুনিক সময়ে বাস করেও আধুনিকতার গা বাঁচিয়ে এই মানুষেরা জীবন চালিয়ে নিচ্ছে। এসব গল্পের কুশীলবরা আমাদের সমাজের ঘনিষ্ঠ অংশ, কিন্তু মূলধারার মধ্যবিত্ত সাহিত্যে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
হামিরউদ্দিনের গল্পের চরিত্রেরা বাতাসের মতো আমাদের ঘিরে রেখেছে, তাদের যেন দেখেও দেখি না আমরা, তবে এদের অস্তিত্ব অস্বীকার করার এতটুকু সুযোগ নেই। এই মেটে মানুষগুলোর নির্ঝঞ্ঝাট উপস্থিতির জন্যেই আমাদের আধুনিক জীবনের চিত্রকর্মগুলো এত উজ্জ্বল, মসৃণ! মাঠরাখা'র গল্পগুলো চমৎকৃত হওয়ার মতো। আমাদের মাঝে থেকেও আমাদের থেকে অনেক দূরে থাকা মানুষের গল্প।
ভীষণ ভালো লাগলো বইটা পড়ে। আর একই সাথে অনেকটা উদাস ও হয়ে গেলাম। দু তিনটে বাদ দিয়ে প্রত্যেক টা গল্পই অসাধারণ। আর আমার মত গ্রামের সাথে যাদের শিকড় এর টান আছে , এ গল্প তাদের জন্যই। অনেকদিন মনে রাখার মত একটা বই। লেখকের অন্যান্য বই পড়ার আগ্রহ রাখলাম।
গ্ৰাম্যজীবনকে কেন্দ্র করে গ্ৰামের মানুষদের নিয়ে লেখা আঠেরোটি ছোট গল্পের সংকলন 'মাঠরাখা'। গ্ৰাম নিয়ে গল্প উপন্যাস আগেও অনেক লেখা হয়েছে , তবুও এই গল্পগুলি পড়বার পর মনে হলো আজকের এই কর্মব্যস্ত শহরের জীবনে এই লেখাগুলি পড়া খুব দরকার ছিল। গল্পগুলিতে সেভাবে কোন টুইস্ট অথবা রোমাঞ্চকর কোন ব্যাপার নেই কিন্ত রয়েছে সহজ সরল গ্ৰামীন জীবনের স্বাদ যা কখনো ধানক্ষেতের আল ধরে, নদী, জ্যোৎস্নার আলোর মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে। হ্যাঁ এটাও ঠিক আজকালকার গ্ৰাম অঞ্চল এখন হয়তো অনেক দিক থেকেই বদলে গেছে ও যাচ্ছে তবুও এই ধরনের জীবন জীবিকা লৌকিক বিশ্বাস,সম্পর্কের বাঁধন এখনো হয়তো আছে সেই কারনেই লেখক এই অচেনা অজানা জীবনকে গল্পের মাধ্যমে পরিচয় করিয়েছেন, যা সচরাচর আমরা জানতে পারিনা, দেখতে পাইনা। কৃষিকাজ, নদী ,মাঝি ,হাটবাজার ,বহুদিন ধরে চলে আসা চাষবাস সম্পর্কিত জীবিকা ,লোকাচার প্রথা কিভাবে গ্ৰাম্যজীবনের সাথে মিলেমিশে থাকে এই গল্পগুলি পড়লে বোঝা যায়।
গ্ৰাম্য প্রকৃতির কথা গল্পে আসলেও চরিত্রগুলোর মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনের কথা,সমস্যা, দারিদ্রতা , দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য পরিশ্রম, লোভ ,সুখ দুঃখের অনুভূতি, মানবতা বোধ ভালোবাসার কথা , সম্প্রতির কথা বেশী গুরুত্ব পেয়েছে সেই জন্যই পড়তে ভালো লেগেছে। সাধারণ জীবনযাপনের গল্প শুধুমাত্র লেখনীর গুনে হয়ে উঠেছে অসাধারণ। কিছু গল্পে প্রকৃতি ও মানবজীবনের কথা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে আবার কিছু গল্প কঠিন বাস্তবকে তুলে ধরেছে। নাবালভূমি, জলকুলি , মেহেরুন্নেসার ভারতবর্ষ গল্পগুলি সেরকমই কঠিন বাস্তব পরিস্থিতিকে চেনালো যা মনখারাপ করে দেয়। করোনার সময়ের উপর লেখা গল্প 'জোনাক জ্বলে উঠবে' বুঝিয়ে দেয় যে মহামারীর সময়ে শহরের পাশাপাশি গ্ৰামের মানুষের জীবন জীবিকা ও সংসারের উপর চরম সমস্যা নেমে এসেছিল। ফাঁস গল্পে জোৎস্না ও তমীজের কাহিনি পড়ে সত্যি কষ্ট হয়। ফসলের ঘ্রান গল্পে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাবা ছেলের সম্পর্কের দৃঢ়তা পড়তে খুব ভালো লাগে। এইভাবেই ডাকপুরুষ,নিশিকাব্য,কবর, ডালিম গাছের ছায়া,মাঝি,পীর সাহেবের আস্তানা, মাঠরাখা গল্পগুলি সরল সাবলীল ও স্পষ্টভাবেই গ্ৰামের সাধারণ মানুষের জীবনের নিজস্ব অনুভব বিশ্বাস ও গ্ৰামের মর্ম কথা বলে।
বই এর প্রচ্ছদ চিত্রের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। শিল্পী এতো সুন্দর ভাবে চাঁদের আলোয় আলোকিত এক গ্ৰামের রাতে ও লাঠি হাতে সম্ভবত এক চাষীর ছবি এঁকেছেন যা এই সংকলনের বিষয়ের সাথে পুরোপুরি মানিয়েছে। নীল রং যেন পরিবেশকে মায়াবী করে তুলেছে।
ধন্যবাদ লেখক , গ্ৰাম্যজীবনের রূপ,রস ,গন্ধ নিয়ে আপনার লেখা গল্প সংকলন পড়ে খুবই ভালো লাগলো এক নতুন ধরনের পাঠ অভিজ্ঞতা হলো।আপনার কলম চলতে থাকুক এইভাবেই।