মাঝে মাঝে মনটা কেমন ছটফট করে।
মাঝে মাঝে চেনা শহরটাও কেমন একঘেয়ে লাগে। বিভূতিভূষণ আর ক্রিস ম্যাকান্ডলেসের প্রেতাত্মা ভর করে। আমি এক অন্য মানুষ হয়ে যাই। আদিম মানুষ। বন্য মানুষ। আশেপাশে যাকে পাই তাকেই ধরে জিজ্ঞেস করি, ও দাদা, ডুয়ার্সের দিকে যাবেন নাকি? চলুন না একটু বন জঙ্গল দেখে আসি। লোকে শোনে। হাসে। উড়িয়ে দেয়। আড্ডা চলে। তবে আমার ডুয়ার্সের প্রস্তাবনা চাপা পরে। চাপা পরে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সিনেমাটিক আলোচনার নিচে।
আমি কেটে পরি। কেটে পরি এই সব আঁতেলমার্কা সভ্যদের থেকে।
আমি ঘরে যাই। একটা কাঁধ ব্যাগ নিই। যে বইটা সবে শুরু করেছি সেই বইটা ব্যাগে পুরি। অতঃপর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরি।
ঠিক এভাবেই বেড়িয়ে পরি একদিন সকালে। কাওকে কিচ্ছু না বলে। কোজাগর বইটা শুরু করেছি দুদিন হল। তাই সেটাই তুলে নিই ব্যাগে। আর কলম নোটবুক। এই সম্বল করে বেড়িয়ে পরি।
পাসপোর্ট আছে। স্রেফ কোজাগর বই বগলে নিয়ে বর্ডার পেরতে পারব না। টাকা নেই। যা আছে তাতে যতদুর যাওয়া যায় তত দূর যাব ঠিক করি। ঠিক করি ডুয়ার্স না হলেও কাছাকাছি যাব । ঠিক করি তাৎক্ষণিকভাবে। অত ভেবেচিন্তে নয়।
মাথার মধ্যে টাকা গুনি। নিজেকে আশ্বাস দিই। আরে চলবে, চ! চ!
শহরের ষ্টেশনটাতে পৌঁছতে বেশি সময় লাগে না। টিকেট কাউন্টারে গিয়ে পয়সা ফেলি, দ্বিধাহীনভাবে বলি—একটা রাজশাহীর টিকিট দিন!
রাজশাহী আমার গন্তব্য নয়। আমার গন্তব্যের শুরু।
সেই গন্তব্যের শুরুতে তিন চার ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাই। রাজশাহী গিয়ে আবার নতুন করে ভাবি—আমি ঠিক কোথায় যাচ্ছি? ডুয়ার্সে তো নয় নিশ্চয়ই! তবে কোথায়? যেখানে যেতে চাইছি সেটাকে ঠিক জঙ্গল বলা চলে না। একটা নিরিবিলি জায়গা। একটা চর। ময়নামতির চর।
রাজশাহী থেকে পঞ্চগড় তিনশো কিলোমিটারের পথ। কুচ পরওয়া নেই বলে টিকিট কেটে ফেলি। রাত ন’টায় ট্রেন। ততক্ষন ষ্টেশন টার্মিনাল লাইব্রেরি জাদুঘর ঘুরে টুরে দেখি। বরেন্দ্র রিসার্স মিউসিয়ামে ঢুকলে আমার এমনিতেই কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বাড়ি থেকে রাজশাহী আসবার সময় ট্রেনে ‘কোজাগর’ বইটা কিছুটা পড়ি। রাজশাহী থেকে পঞ্চগড় যেতে অনেক সময় লাগে বুঝতে পারি। বুঝতে পারি সেই সময়টা কাজে লাগবে। রাতের ট্রেনে কিছুটা ঘুমোব আর বই পড়বো বলে ধরে নিই।
ঘোরাঘুরি শেষে ফিরে আসি ষ্টেশনে। ষ্টেশনে মানুষ দেখি। আমার মতো কয়েকশ মানুষ ট্রেনে উঠে পরে। সবাই কি ডুয়ার্সের জঙ্গলে যাবে? নাকি ময়নামতির চর? নাকি শুধু আমিই একা? হ্যাঁ, সত্যিই সেদিন আমি শুধু একা ছিলাম গোটা দেবীগঞ্জে। কেও যায়নি ময়নামতির চরে। আচ্চা, সে কথা না হয় পরেই বলি।
ট্রেনে উঠে বই নিয়ে বসব ভেবে রাখি কিন্তু পড়া হয়না। আমি মানুষ দেখি। পুরুষ মানুষ। নারী মানুষ। বৃদ্ধ মানুষ। শিশু মানুষ। হিজড়া মানুষ। পুলিশ মানুষ। হকার মানুষ। শ্রমিক মানুষ। ট্রেনের জানালার ঘষা কাঁচে নিজেকে দেখতে পাই—আদিম মানুষ কী?
মানুষ কি জঙ্গলে জীবন যাপন করলে আদিম হয়ে যায়? আমি যেদিন আরণ্যক বইটা শেষ করি, মনের মধ্যে একটা হাহাকার ছিল। অস্বীকার করিনি কারও কাছে, আমার মনে হয়েছিল, সত্যচরণের স্থলে আমি হলে ভানুমতীকে বিয়ে করে বাকি জীবন জঙ্গলেই কাটিয়ে দিতাম। সেটা হয়তো ছিল আমার কিশোর মনের ভাবালু চিন্তা। এই সময়ে এসে পড়লে বোধহয় মনে হবে—নাহ, বিভূতিবাবু ঠিকই করেছেন।
কোজাগর পড়তে বারবার আরণ্যক বইটার কথা মনে হয়েছে। মনে মনে ভাবছি, বোধহয়, লেখক অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবেন, কিছুদূর পড়বার পর দেখি সত্যি লেখক উপন্যাসের মধ্যেই সেটা স্বীকার করেছেন। শুধু তাই না, প্রেক্ষাপট এবং চরিত্র কাঠামোতে একটা আশ্চর্য মিল রেখেছেন। তবে, গুহবাবু তাঁর নিজের স্টাইলে গোটা উপন্যাস লিখেছেন—তাঁর লেখার ধরণ যেমন।
আরণ্যকের সত্যচরণের মতোই সায়ন মুখার্জি ঝাড়খণ্ডে থাকেন কর্মসূত্রে। সেখানকার আদিবাসীদের কাছে তিনি বাবু। বাঁশের কারবার নিয়ে কাজ বলে লোকে তাঁকে বাঁশবাবু বলে ডাকে। সায়নের দিনলিপি থেকে আমরা দেখতে পাই আদিবাসীদের জীবন যাপন। তাঁদের দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, বেদনা। উপন্যাসটি শেষ অবধি পড়লে বোঝা যায় গল্পটা মূলত দাঁড়িয়ে আছে একটা শক্ত সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির উপর। একদিকে বনজঙ্গলের প্রতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি লেখকের প্রেম নিবেদন অন্যদিকে সচেতনভাবে তুলে ধরেছেন বনজঙ্গলের আদিম অধিবাসীদের প্রতি সভ্য মানুষের শোষণ আর নিপীড়নের চিত্র, তুলে ধরেছেন আদিবাসী জনমানসে শ্রেণী সংগ্রামের বীজ কীভাবে নিহিত হয় আর কীভাবে বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে তা সমাধানের দিকে এগিয়ে যায়।
লেখকের সব দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা উপন্যাসটির সবকিছু ভালো লেগেছে বলা যায় না। তবে কিছু কিছু কথা ভালো লাগতে বাধ্য করেছে।
আদিবাসী নারী কাছ থেকে দেখিনি কখনও। দুই একটা চাকমা দেখেছি। শহরে তো ওরা বাঙালিদের সাথে একেবারে মিশে যায়। ওঁরাও জাতি তো দেখিই নি জীবনে। একজন ওঁরাও নারীর জীবন তাঁর সুখ দুঃখ যেভাবে লিখেছেন, মনে হল—আদিবাসী হোক কি বাঙালি, সব নারীর দুঃখ কষ্ট যেন একই।
ট্রেনে ‘কোজাগর’ বইটাতে মুখ গুঁজবার চেষ্টা করছি। আমার পাশের সিটটা ফাঁকা। মনে হল কেও আমার পাশ থেকে টোকা দিল। আমি মুখ তুলে চাইলাম। পাশে একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার দিকে তাকাতেই সে হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। বুঝলাম আমি সান্তাহারে এসে গেছি। এইসব এলাকায় এগুলো বেশি হয় জানি। ‘কেও’ এসে হাত পাতে। টাকা চায়।
আমি মুখ তুলে চাইতেই সে তার বুকটা মেলে ধরে। আমি অবাক হয়ে তার বুক আর মুখের দিকে চেয়ে থাকি। কেও এসে দাঁড়িয়েছে আমার পাশে নারীর ছদ্মবেশে!
এই ছদ্মবেশী নারীদের নিয়ে কেও কবিতা লেখেনা? কোন উত্তরাধুনিক রবীন্দ্রনাথ? রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা, কালো শাড়িতে পেটুনিয়া ফুলের মতো রাঙ্গা, মনে হল, কালো রঙের শাড়িতে একটা গভীর দূরত্ব, যে দূরত্ব ভুট্টোক্ষেতের শেষ সীমানায়, আর শাল-মহুয়ার বনে…আসলে এগুলো কিছুই না, আপনাদের চাঙ্গা করার জন্য একটু বিরতি নিলাম আর কি। আসল কথা (সভ্যদের মতো করে) বলতে, ‘দশটা টাকা দিয়ে হিজড়েটাকে বিদেয় করলাম’
রাত ন’টায় রাজশাহী থেকে ট্রেন ছাড়ে। পঞ্চগড়ে নামি ভোর ছ’টায়। অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল ট্রেনের ভেতর থেকে সূর্যোদয় দেখার। প্রকৃতিদেবী যে তার রূপের ডালি আমার সামনে মেলে ধরবে কল্পনাও করিনি।
ভোর তখন চারটা বেজে পেরিয়ে গেছে। দিনাজপুর ষ্টেশনে ট্রেন থেমে আছে। দূর থেকে আজান শুনতে পাই। আজানের সুরে হারিয়ে যাই কোথাও। আমার শহরের আজান আর এই আজানের মধ্যে যেন কত তফাত। হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের সাথে কর্ণাটকী সঙ্গীতের যেমন তফাত।
আমি জানালা দিয়ে অধীর অপেক্ষায় আছি সূর্যোদয় দেখব বলে। দিনাজপুর থেকে যখন ট্রেন ঠাকুরগাঁও রোডে তখন দেখি এক আশ্চর্য দৃশ্য। কুয়াশা। ঠিক কুয়াশা নয় ধুয়াশা। যেন মনে হয় আমি এসেছি শীতের দেশে। বৈশাখ মাস তবু আমার ভীষণ শীত শীত করে। ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখি অন্ধকার কেটে একটা নীল কুয়াশায় চারিদিক ভরে যাচ্ছে। আধো আলোতে সারি সারি ভুট্টোর ক্ষেতের মাঝে দুএকটা গাছের সারিকে মনে হয় ভিনগ্রহের কাকতাড়ুয়া। এতো বড় কাকতাড়ুয়া হয় না যে!
হঠাৎ কাকতাড়ুয়াগুলো উড়ে যায়। ডেকে তোলে সূর্যদেবকে। ক্লান্ত সূর্যদেব একটু একটু করে বিছানা ছাড়ে। আমি তখন রাতের আঁধার কেটে কি করে প্রকৃতিদেবী দিনের আলো মেলে ধরে সেই রূপ দেখছি। হঠাৎ খেয়াল হল। গোটা ট্রেনে আমি একা। আমি উঠে দাড়াই। প্রচণ্ড জোরে ট্রেন ছুটে চলে। আমি ট্রেনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে চেয়ে থাকি, আমি অব���ক হয়ে দেখি, হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া সবাই নেমে গেছে কে কখন, আমি কিচ্ছুটি টের পাইনি। পঞ্চগড়ে যখন আমি নামি, তখন গোটা বিশেক মানুষ নামে কি না সন্দেহ। লোকেরা কোথায় নামে কখন নামে টের পাই না কেন? Perhaps I was utterly alone on the Banglabandha express, flying on the scarecrow's wings to call upon the Helios!
সত্যি এতো দূর কখনও যাইনি। এখনও পঞ্চগড় থেকে দেবিগঞ্জ যাওয়া বাকি। দেবী চৌধুরানীর দেবীগঞ্জ।
ট্রেন থেকে নেমে ভ্যানে চড়ি। বিপত্তি ভ্যান থেকে শুরু। পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক ভাষার সাথে আমার কোনরকম পরিচয় নেই। ভ্যানচালক আমায় কি জিজ্ঞেস করেন আমি বুঝি না। তিনি আমায় কয়েকটি প্রশ্ন করেন, আমি শুধু একটি বুঝতে পারি, ট্রেন লেট করেছে কি না। আমি আর কিছু বুঝি না। আমি বুঝি আমায় দেবিগঞ্জের বাসে উঠতে হবে।
কয়েক মিনিট বাদে উঠে পরি একটা ফাঁকা বাসে। বাস আমার নিয়ে চলে দেবীগঞ্জে।
দেবিগঞ্জ থেকে খুব অল্প সময়ে চলে যাই ময়নামতির চরে।
কি এক অপূর্ব জায়গা! জায়গাটা করতোয়া নদীর তীরে একটা বেশ দ্বীপের মতো। সেখানে অসংখ্য গাছপালা, মনে হয় গভীর কোন এক অরন্যে চলে এসেছি, দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে বলি, I now walk into the wild!
একদম সকাল সকাল পৌঁছে যাই তাই বোধহয় কোন মানুষ নেই। মনে হয় বিস্তীর্ণ অরন্যে সত্যিই আমি এক আদিম মানুষ। আমলকী, দেবদারু, আম, মেহগনি, কত বিচিত্র রকমের বৃক্ষ আর কত পাখির আনাগোনা। আমলকীর মতো কি একটা ফল পরে থাকে, কেও কুড়োয় না। সারি সারি গাছের আড়ালে হঠাৎ মানুষ দেখে চমকে উঠি। শ্রমিকের মতো দেখতে এক মানুষ শিমুল তুলা কুড়োয়। খেয়াল করি বাতাসে শিমুল তুলার ভেসে চলা। আমি শিমুল গাছ খুঁজি। আশ্চর্য! চারিদিকে শিমুল তুলা ভেসে বেড়াচ্ছে অথচ আমি শিমুল গাছ খুঁজে পাইনা। বৃক্ষগণ আমার সাথে লুকোচুরি খেলে। আতা, নিম, মেহগনি, জারুল, সেগুন সবাই আমার সাথে লুকোচুরি খেলে, শিমুলকে লুকিয়ে রাখে। আমি শিমুলকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পরি। বসে পরি একটা জারুল গাছের ছায়ায়। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য জারুল ফুল। নিজেকে মনে করি জীবনানন্দের দুপুর বেলার চিল। একটু বিশ্রামের পর বই খুলে বসি। পড়তে পড়তে মনে হয় কেও বোধহয় আমায় আড়াল থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। আমি অস্বস্তি বোধ করি। খেয়াল করি, একটা তের চৌদ্দ বছরের ছেলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। আমার বিস্ময়সূচক চাহনির জবাব পাই—একলা আইসেন? মাইয়া আসে নাই?
এই বলে সে হাসতে হাসতে চলে যায়। আমিও হেসে ফেলি। উঠে দাঁড়াই।
চর থেকে নদীতে নারী পুরুষ আর শিশুদের কর্মতৎপরতা চোখে পরে। কি করছে ওরা ভেবে এগিয়ে যাই। দূর থেকে মনে হয় নদীর চরে তাঁরা কিছু একটা চাষ করছে। কাছে গেলে বোঝা যার চাষ নয় ওরা নদী তীরের বালি থেকে পাথর কুড়চ্ছে। আশ্চর্য হই দেখে এটা ওদের জীবিকা নির্বাহের একটা পথ। পঞ্চগড়ের অনেক মানুষ এই পাথর উত্তলনের পেশায় জড়িত। শহরে প্রবেশ করলে করতোয়া ব্রিজ থেকে নিচে তাকালে দেখা যায় ছোট ছোট শিশুরা নদীতে নেমে খেলা করে। আপাত দৃষ্টিতে খেলা মনে হলেও ওরা ওদের পরিবারের জন্য পাথর কুড়োয়। আমি অনেকক্ষণ নদীর পাড়ে বসে থাকি। ওদের জীবন যাপন বোঝবার চেষ্টা করি।
আর এভাবে আমার ময়নামতির চর দর্শন শেষ হয়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি করতোয়ার জলে। দুহাতে জল তুলে তর্পণ করি। তর্পণের মন্ত্র পাঠ করি—I'm going to paraphrase Bibhutibhushan here... rather than love, than money, than faith, than fame, than fairness... give me truth.
Post Script 1: আপনাদের ট্রেনে বই পড়তে ভালো লাগে? বেড়াতে গেলে বই নিয়ে বের হন?
Post Script 2: লিলিকে আমি কথা দিয়েছিলাম কোজাগর বইটা একসাথে পড়বো কিন্তু আমরা কেও কারো কথা রাখতে পারিনি। বেচারি লিলি!