বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের অন্যতম সম্পদ অন্নদাশঙ্কর রায়ের ''পথে প্রবাসে"। লেখক আইসিএস পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বিলাতে যান প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য। এরই ফাঁকে ঘুরে দেখেন ইউরোপ। আর, তা নিয়েই সৃষ্টি হয় অমর ভ্রমণকাহিনি "পথে প্রবাসে"। অন্নদাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে দেবেশ দাশের সাযুজ্য রয়েছে। তিনিও আইসিএস পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বিলাতে যান এবং ছুটিতে দেখতে থাকেন জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালির মতো বিভিন্ন দেশ। অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতো দেবেশ দাশের গদ্য অত্যন্ত উচ্চমার্গীয়। কাব্যের মতো করে লিখেছেন তিনি। দেবেশ দাশের " ইউরোপার"র ভূমিকা লিখেছেন স্বয়ং রবিবাবু। তিনি বইটি নিয়ে লেখেন,
"কল্যাণীয়েষু,
তোমার ইয়োরোপা পড়ে বিশেষ আনন্দ লাভ করেছি তার প্রধান কারণ আমাদের দেশের অনেক লেখকের মতো তুমি য়ুরোপকে খর্ব করবার চেষ্টা করনি। তুমি তার মাহাত্ম্য ও সৌন্দর্য সর্বান্তঃকরণে স্বীকার করেছ।- দৃষ্টিকে প্রসন্ন না রাখতে পারলে কোনো সুসভ্য দেশকে সত্য করে দেখতে পাওয়া যায় না। তুমি আনন্দিত মনে য়ুরোপকে দেখেছ এবং সেই আনন্দ পাঠকদের বিতরণ করেছ। আমার দুর্বল লেখনী অধিক লিখতে অক্ষম। "
দেবেশ দাশের জার্মান ভ্রমণের মাধ্যমে বইটির সূচনা। তখনো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠেনি। তবে লক্ষণ ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেমন: হিটলারের অনুগত বাদামি শার্ট বাহিনীর দবদবা সর্বত্র। লেখক দেখেছেন, হিটলার জার্মানিতে অসম্ভব জনপ্রিয়। তার অনুগত সৈনিক বাদামি শার্টের কর্মীরা নারীদের নয়নমণি। তখন রোববার যে কোনো হোটেলে একপ্রস্থ লাঞ্চের পয়সা দিয়ে আধখানা খাবার মিলত। কারণ বাকি টাকা যাবে হিটলারের ফান্ডে। দেবেশ দাশ আবিষ্কার করেছেন সকল জার্মান অত্যন্ত খুশি মনে এই ত্যাগ স্বীকার করছে।
আনন্দনগরী প্যারিস লেখককে মুগ্ধ করেছে। তিনি মনোমুগ্ধকর গদ্যে সেই নগরীর বর্ণনা দিয়েছেন। তবে তা অন্নদাশঙ্কর রায়ের পারীর মতো হয়নি।
ইতালির শিল্প ও প্রত্নসম্পদের অনবদ্য বয়ান দেবেশ দাশের লেখায় পাই। একইসাথে বিলাতের সঙ্গে পারী ও ইতালির তফাতটুকু ভালোভাবেই বোঝাতে পেরেছেন দেবেশ দাশ।
মাত্র দেড় শ পাতারও কম বইটির কলেবর। বেশ সুন্দর বইটির ভাষা। আর, লেখকের একমাত্র খামতি তার গদ্য। কৃত্রিমভাব প্রবল। তাই অনেকক্ষেত্রে পড়তে গিয়ে ভালো লাগছিল না।