অবশেষে ২০২১ সালের প্রথম বই হিসেবে শেষ করলাম আহমদ ছফার বিখ্যাত স্যাটায়ারিকের উপন্যাস, গাভী বিত্তান্ত। এডমিশন সিজন চলছে, এই একটা বই পড়েই বোধ হয় সন্তুষ্ট থাকতে হবে!
গাভী বিত্তান্ত বইটার অনেক প্রশংসা শুনেছি আগে। তবে, সেসব প্রশংসা দ্বারা প্রভাবিত না হয়েই বইটা শুরু করি। আমি ক্ষুদ্র পাঠক, জীবনে মোটে ক’খানা বই পড়েছি; সেই কারণেই হয়, শুরুর দিকে আহমদ ছফার লেখনীর ধাঁচ খুব একটা আহামরি কিছু মনে হয় নি। মনে হয়েছে, এসব তো ফেসবুকীয় লেখকের লেখনী!
পরে আস্তে আস্তে যখন তাঁর লেখার ন্যরেটিভটার সাথে খাপ খাওয়াতে শুরু করলাম, তখন আস্তে আস্তে মজাটা পাওয়া শুরু করলাম। লেখকের satirical punch-lineগুলো যত ধরতে পারছিলাম, ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। সত্যিই স্বীকার করতে হয়, এমন বই আগে পড়িনি।
বইয়ের কাহিনী গড়ায়, একজন শান্তশিষ্ট গড়পড়তা শিক্ষকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়াকে কেন্দ্র করে। উপাচার্য সাহেব একটি গাভী পুষতে চান, সেই থেকেই বইটির নামকরণ। তাঁকে গাভী ক্রয় করাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অসঙ্গতিপূর্ণ সংস্কৃতিকে লেখক যেভাবে দুই মলাটের ভেতর বন্দি করেছেন, সেটা সত্যিই দুষ্কর! অবশ্য একদম সবই যে একদম তাঁর লেখায় চলে এসেছে, ব্যপারটা এমন নয়। কিন্তু এমন ভঙ্গিতে তিনি সবকিছু উপস্থাপন করেছেন; যা বইটাকে বাংলা সাহিত্যের আর দশটা বই থেকে আলাদা করবে!
বর্তমানের সার্টিফিকেটধারী মুর্খসমাজের মানুষের বিভিন্ন আচরণ যদি ব্যাখ্যা করে যদি একটা রিসার্চ পেপার বের হয়, তাহলে এই বই থেকে বিভিন্ন রেফারেন্স নেয়া যেতেই পারে!
বইটার রচনাভঙ্গি বেশ সাবলীল এবং সুখপাঠ্য। তবে, উপন্যাসের অনেক গুণই হয়ত এখানে অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত করবেন অনেকেই। তবে আমার মনে হয়, সংজ্ঞানুসারে সার্থক উপন্যাস হোক বা না হোক, আহমদ ছফা যে উদ্দেশ্যে বইটি লিখেছেন, যা বোঝাতে চেয়েছেন, পাঠকেরা তা ধরতে পেরেছে!
বইটা আমি অডিওবুক শুনেছি। তাই বানান বা অন্য কোনো গুণ সম্পর্কে আলোচনা করা গেল না। বইটার ন্যারেটিভটা আসলে অডিওবুক শোনার জন্য উপযুক্ত! তাই, কাগজের বইয়ের চেয়ে অডিওবুকের বইটার মাহাত্ম্য খুব একটা কমে নি!
আরেকটা কথা না বললেই নয়! বইটা শেষ করে আমি কিছু মানুষের রিভিউ পড়ছিলাম। অনেকেই বলেছেন, আহমদ ছফা এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অসঙ্গতি নিয়ে ব্যাঙ্গ করে দারুণ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন! আমার তা মনে হয় না! বইটা লেখার পেছনে সাহস যতটা দায়ী, তার থেকে বেশী দায়ী আমার মনে হয় আহমদ ছফার দৃষ্টিভঙ্গি। বর্তমান সমাজে যেসব টপিক নিয়ে কথাই বলা যায় না, ’ধর্ম, নাস্তিকতা, ছাত্র রাজনীতি’ এইসব বিষয়ে উনার বর্ণনাভঙ্গিটা একটু লক্ষ্য করলেই সেটা টের পাবেন। তিনি চাইলেই একজন নাস্তিককে উগ্রবাদী বা অতি ভালো মানুষ, কিংবা একজন ইসলামী লেবাসধারীকে উগ্রবাদী, বা অতি ভালোমানুষ – এরকম পরিচয় দিতে পারতেন, পক্ষপাতিত্ব করতে পারতেন, এবং এতে দোষের কিছু ছিল না, যেহেতু এটা ফিকশন। তিনি কিন্তু সেটা করেন নি। ইভেন, একটা ভুল মানুষের ভুল মতবাদকেও তিনি সেই ভুল মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যঙ্গ করেছেন। সঠিকটা কি, সেটা আর বলেন নি। সেটা পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন।
এই ধরণের মানসিকতার কারণেই আহমদ ছফা আমার প্রিয় লেখকদের তালিকায় জায়গা করে নিলেন।
রিভিউটি শেষ হলো। ধন্যবাদ।