১.
১৯৮৪ সাল। যুদ্ধের পর কেটে গেছে এক দশক। আর এই এক দশকে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। পাওয়া, না পাওয়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছে কিছু মানুষ, আর বাকিদের সে সম্পর্কে ভ্রূক্ষেপ নেই। তারা মেতে আছে তাদের নিজের দুনিয়ায়। এরই মাঝে এই দেশ আর তার মানুষেরা তাদের দুজন রাষ্ট্র-নায়ককে হত্যা করেছে। আর এখন চলছে সামরিক শাসন।
সিলভির মৃত্যু দিয়ে শুরু হয় 'দ্য গুড মুসলিম'। এই উপন্যাসে দুটো সময় সমান্তরালে চলেছে, একদিকে ১৯৮৪ সাল থেকে, আরেক দিকে ১৯৭১ এর পরবর্তী সময়। ১৯৮৪ সালে মায়া সাত বছর পর বাড়ি ফেরে। এই সাত বছর সে ঘুরে বেড়িয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত। শেষে থিতু হয়েছিল রাজশাহীতে। তারপর সিলভির মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়ি ফেরে মায়া।
যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পরিত্যাক্ত এক ব্যারাকে এক নারীর সন্ধান পায় সোহেল। পিয়া নামের মেয়েটিকে সে তার বাড়ি পৌঁছে দেয়। ফিরে আসার সময় সোহেল তাকে নিজের ঠিকানা লেখা এক টুকরো কাগজ দিয়ে আসে। আর একদিন পিয়া এসে উপস্থিত হয় ধানমন্ডিতে। অন্তঃসত্ত্বা পিয়াকে তার পরিবার গ্রহণ করতে চায় না। রেহানা থাকে আশ্রয় দেন। কিন্তু পিয়াকে নিয়ে সোহেলের মাঝে কোন একটা দ্বন্দ্ব চলে। এমনিতেও সোহেল অনেক বদলে গেছে। তারপর একদিন পিয়া হঠাৎ করে চলে যায়, যেমন হঠাৎ সে এসেছিল।
যুদ্ধের সময়েই সিলভি ধার্মিক হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সে যোগ দেয় তালিমে। বোরখা ছাড়া বের হয় না সে কোথাও। পিয়া চলে যাওয়ার অনেক পরে সোহেলের সাথে সিলভির বিয়ে হয়। ততদিনে সোহেলের মাঝেও এসেছে কিছু পরিবর্তন। যে ছেলে মার্ক্স পড়ত, মাথায় থাকতো চে গুয়েভারার টুপি, সে এখন কুরআনের বানী আওড়ায়। এমনকি একদিন সে পুড়িয়ে ফেলে তার সব বই। আর সেদিনই মায়া বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
মায়া ভেবেছিল, সিলভির জন্য তার ভাই বদলে গেছে। কিন্তু সোহেলের হাতে কুরআন তুলে দিয়েছিলেন রেহানা। যুদ্ধ-ফেরত ছেলের অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করবে আল্লাহর বানী, এই ভেবেছিলেন তিনি। প্রথমে তিনি সোহেলকে পরে শোনাতেন, তারপর সোহেল নিজে পড়তে শুরু করে। একসময় সে কুরআন আর আল্লাহ ছাড়া কিছুই বুঝবে না, এ কথা রেহানা ভাবেননি।
বাড়ি ছেড়ে দেশের উত্তর দক্ষিণ ঘুরে মায়া শেষে এসে উপস্থিত হয় রাজশাহী। সেখানেই থিতু হয়। নাজিয়া নামের এক মেয়ের প্রসবে সাহায্য করার পর নাজিয়া তার গ্রামে মায়ার প্রচুর প্রশংসা করে। মায়া আর নাজিয়া প্রায় বান্ধবী হয়ে ওঠে। তারপর গ্রামের মেয়েদের মাঝে সুস্বাস্থ্য, সন্তানের পরিচর্যা বিষয় নিয়ে কাটিয়ে দেয় মায়া। এর মাঝে নাজিয়াকে নিয়ে পুকুরে সাঁতার কাটাকে কেন্দ্র করে গ্রাম্য সালিশে বিচার হয় নাজিয়ার। মায়ার টিনের চালে ঢিল পড়তে শুরু করে। তারপর একদিন সিলভির মৃত্যুর খবর আসে।
যুদ্ধের সময় নিয়ে সোহেল একদমই কথা বলতো না মায়ার সাথে। কখনও রেহানার সাথেও বলেছে কিনা, মায়া জানে না। সোহেল নিজের মধ্যে গুটিয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের পর মায়া আর রেহানা স্বেচ্ছাসেবকের কাজ শুরু করে। তখন, যুদ্ধ-শিশুদের গর্ভে নিয়ে মেয়েরা আসতে থাকে তাদের কাছে। কেউ নিষ্কৃতি পেতে চায়, আবার কেউ চায় সেই সন্তান। বঙ্গবন্ধু এদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েছেন, কিন্তু এদের প্রায় কাউকেই চায় না তাদের পরিবার। কিছু কিছু মেয়ে তাই, সব ফেলে যুদ্ধ-বন্দী পাকিস্তানী সেনাদের সাথে চলে যায় বারশ' মাইল দূরে।
শহীদ মিনারে একদিন মায়ার সাথে জয়ের দেখা হয়। জয়, সোহেলের বন্ধু। যুদ্ধে সে হারিয়েছে নিজের ভাইকে, আর তার হাতের আঙ্গুল। জয়ের সঙ্গে মায়া একদিন একটা সভায় যায়। সেখানে জাহানারা ইমামের সাথে দেখা হয়। তখন স্বৈরশাসন চলছে দেশে। তারা কয়েকজন মিলে কিছু একটা করতে চান স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে। সেই সঙ্গে শাস্তি দিতে চান যুদ্ধাপরাধীদের।
সোহেল এখন পুরদস্তুর একজন পাক্কা মুসলমান। জোব্বা পরিহিত সোহেল এখন অনেকের সম্মানের পাত্র। তাবলীগ জামাতের সবাই সোহেলকে চেনে। নিজেদের বাড়ির দ্বিতীয় তলাটা সে ব্যবহার করে তাবলীগ জামাতের আলোচনার জন্য। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে নানা মানুষ আসে। সিলভি-আর সোহেলের একটি ছেলে আছে, জাইদ। সে বালতি বালতি পানি পৌঁছে দেয় দ্বিতীয় তলায়। পুণ্যবান পিতা থাকা সত্ত্বেও ছয় বছর বয়সী এতিম একটি ছেলে, যে প্রচুর মিথ্যা বলে এবং চুরি করে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সোহেল আর পড়াশোনায় ফেরেনি। মায়া ফিরেছিল। সার্জন হতে চেয়েছিল সে। জয় চলে গিয়েছিল আমেরিকায়। সেখানে ট্যাক্সি চালাত। জয়ের আমেরিকায় যাওয়া নিয়ে মায়ার ক্ষোভ ছিল। কিন্তু, জয় দেশ ছেড়েছিল বাধ্য হয়ে। কেননা, "স্বাধীন দেশ কখনও জীবিত গেরিলা চায় না"। জয়ের মাধ্যমেই মায়ার সাথে শাফাতের দেখা হয়। পুরান ঢাকায় সে এক ঘিঞ্জি বাড়িতে বসে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে। মায়াও যোগ দেয়। প্রথমে সে রাজশাহীতে থাকা অবস্থায় তার দেখা গ্রামের কথা লেখে।
রেহ��নার ক্যানসার ধরা পরে। কেমোথেরাপি চলতে থাকে। জাইদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে চেয়েছিল মায়া, কিন্তু সোহেল তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে চাঁদপুরে কোন মাদ্রাসায়। রেহানা যখন অসুস্থ তখন একদিন মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে আসে জাইদ। কিন্তু ফিরে এসে মায়া তাকে খুঁজে পায় না। রেহানা অসুস্থ থাকা অবস্থায় মায়া মাঝে মাঝেই তাবলীগের নারীদের মাঝে গিয়ে বসত। সে বুঝত না কেন সে সেখানে যাচ্ছে। কিন্তু খাদিজা ন���মের দলনেতা মহিলার আসেপাশে থাকলে তার নিজেকে নির্ভার মনে হতো।
সোহেল ছিল মায়ার একমাত্র বন্ধু। পাকিস্তানে, তার চাচার বাড়িতে থাকা অবস্থায় সোহেল ছিল মায়ার বাবা, মা এবং ভাই। মায়া সোহেলকে চেনে তুখোড় বক্তা হিসেবে, তার্কিক হিসেবে, যোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু ১৯৮৪ সালে এসে জোব্বা গায়ে আল্লাহ রাসুলের কথা বলা মানুষটিকে তার অচেনা লাগে। এই সোহেল কোন যুক্তি তর্ক বোঝে না। তার আছে কেবল বিশ্বাস আর গোঁয়ার্তুমি। আর সেই গোঁয়ার্তুমির ফলে শেষমেশ মারা যায় সোহেলের একমাত্র সন্তান, জাইদ।
২.
মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস, আমার যেটুকু পড়া, তার অশিকাংশই ১৯৭১ সালের কথা বলে। নিয়াজি, টিক্কা খান, ইয়াহিয়া। কিন্তু যুদ্ধের পরেও যে দেশে আরেকটা নীরব যুদ্ধ চলছিল সে সম্পর্কে আমাদের দেশে ক'টা উপন্যাস লেখা হয়েছে জানি না। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একজন যোদ্ধার মানসিক অবস্থা নিয়ে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের একটা উপন্যাস পড়েছিলাম, নাম সম্ভবত 'আকাশ বাড়িয়ে দাও'। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা হয়েছে, এর বাইরে আর কিছু পড়িনি। 'দ্য গুড মুসলিম', সেই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের গল্প বলে।
সোহেল ফিরে এসেছিল প্রচণ্ড একটা মানসিক টানাপড়েন নিয়ে। ফেরার পর যে আদর্শ সে মনে রেখেছিল, তার বাস্তবায়ন দেখতে পায়নি। একসময় বদলে যেতে শুরু করে সোহেল। আসলে সোহেলের বদলের মাধ্যমে ওই সময়ে দেশের বদলের কথাই বুঝিয়েছেন লেখিকা। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর দেশের পরিবর্তন, এই দেশের মানুষের মনের পরিবর্তন, এসব সোহেলের পরিবর্তন এবং পারিপার্শ্বিকতার বর্ণনায় রূপকের মাধ্যমে দেখিয়েছেন লেখিকা।
আবুল ফজল তার 'পরাবর্তন' উপন্যাসে এক জায়গায় লিখেছেন যে স্বাধীনতার পর দেশের মানুষ আস্তে আস্তে ইসলামের দিকে ঝুঁকছে। এমনকি তাদের মুখের ভাষাও বদলে যাচ্ছে। 'দাদা' বলে এখন আর তেমন কেউ ভাইকে ডাকে না, বলে 'ভাইজান'। সত্যি সত্যি এরকম একটা পরিবর্তন এসেছিল। আচারে-বিচারে, বচনে পোশাকে। সেই গল্প লেখিকা বলেছেন, কিন্তু তার সবিস্তার কারণ আলোচনা করেননি। উপন্যাসে সে আলোচনা করার কথাও না।
নাম পরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির অলিখিত নিয়ম। সরকার বদল হলেই নাম বদলের হিড়িক দেখা যায়। এই উপন্যাসে এরকম নাম বদলের কথা বলা হয়েছে। লেখিকার ভাষায় 'স্বৈরশাসক', ঢাকার বিভিন্ন রাস্তার নাম বদলে দেন। বদলে দেওয়া হয় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেরও নাম। এমনকি তিনি দেশের নাম 'ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ' রাখতে চেয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বইটির নাম, 'দ্য গুড মুসলিম' কেন? তাহমিমা আনামের বই নিয়ে আমি ফেসবুক গ্রুপে কোন বিশদ আলোচনা পাইনি। তবে এক জায়গায় একজন 'দ্য গুড মুসলিম' নামটি নিয়ে আপত্তি করেছেন। তার কথা, 'গুড মুসলিম আবার কি জিনিস?' বইটি প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। এবং ইংরেজি ভাষায়। আমরা জানি ৯/১১ এর পর থেকে বর্তমানে ইউরোপ আমেরিকা এবং আরও অনেক দেশে মুসলমানদের অনেকেই একবাক্যে 'সন্ত্রাসী' বলে জানে। অনেকের ধারনা এরা সবাই 'প্রতিক্রিয়াশীল'। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, এই উপমহাদেশেই প্রচলিত আছে যে 'ইসলাম কায়েম হয়েছে তলোয়ারের জোরে'। তাহলে মুসলিম মানেই যাদের কাছে 'টেরোরিস্ট', তাদের কাছে 'গুড মুসলিম'কে পরিচয় করিয়ে দেওয়া বোধয় নাজায়েজ হবে না।
উপন্যাসের 'গুড মুসলিম' আসলে সোহেল। সে এমন একজন মানুষ, যে কেবল তার ধর্মে বিশ্বাস করে দৃঢ়ভাবে। সোহেল এবং তার সঙ্গী সাথীদের আমরা কেবল দেখি, নিজেদের বিশ্বাস, আর ইবাদতে মশগুল। ইসলামের বানী আরও অধিক মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়াই তাদের কাজ। সেখানে তাদের মাঝে রাজনীতি নেই, অস্ত্রের কারবার নেই। এমনকি মায়া যখন তার মায়ের অসুখের সময় তাবলীগের মাঝে কেবল বসে থাকে, তার মনে বিশ্বাস জাগে যে তার মা বেঁচে যাবে। অর্থাৎ, কেবলই এক বিশ্বাস, যা আসে ধর্মীয় একটা পরিবেশের মাঝে, সেই অনুভূতি নির্মল। এরকম মুসলিম ছড়িয়ে আছে অনেক জায়গায়। সেই সঙ্গে, যে সময়ের কথা বলা হয়েছে সে সময়ে তাবলীগ জামায়াত বিস্তৃত হচ্ছিলো। এমনকি স্বৈরশাসক, যার একাধিক প্রেমিকা ছিল, তিনিও ইসলামের কথা বলতেন, সেই সময়ের গল্প এই উপন্যাস। ধর্ম বেঁচে খাওয়া চলছিল অনেক আগে থেকেই, তার মাঝেই থাকে কিছু বিশ্বাসী মানুষ। কিংবা শুধু মুসলিম নয়, মানুষ মাত্রেই তার ভেতরে একটা ভালো স্বত্বা থাকে। সবাই লালন করে না।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বই পাওয়া যাবে, অনেক লেখা পাওয়া যাবে, কথা বলার মত অনেক মানুষ পাওয়া যাবে। কিন্তু এরশাদের শাসনামল নিয়ে কথা আসলে 'নূর হোসেনে' ঘুরপাক খাই। এই উপন্যাসে যে এরশাদের শাসনামলের ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে তা নয়, তবে কিছুটা চেষ্টা লক্ষ করা যায়। সেই সঙ্গে আছে জাহানারা ইমামের তৈরি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কথা। সেখানে এসেই উপন্যাস শেষ হয়, যখন মায়া এগিয়ে গিয়ে পিয়াকে আলিঙ্গন করে।
এই বইটিও অনুবাদে পড়া। তবে, 'সোনাঝরা দিন'-এর চেয়ে অনুবাদ ভালো। মশিউল আলম ভালো কাজ দেখালেও কিছু হাস্যকর ভুল করেছেন। যেমন, মায়া জয়কে হঠাৎ দেখতে পেয়ে বলে, "জয়, এটা তুমি?" ইংরেজিতে, "Joy, it's you?" এর এহেন বাংলা আক্ষরিক অনুবাদ পড়তে হাস্যকর লাগে।