৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ই রবিউল আউয়াল। সূর্য তখনো ওঠেনি। পৃথিবী যেন একটু আগেই আলোকিত হয়ে গেল। জানা গেলো এ আলোর উৎস মক্কার বিখ্যাত হাশিম বংশের ছোট্ট একটি ঘর। সেখানে জন্মেছেন কোরাইশ গোত্রের প্রতাপশালী নেতা আবদুল মুত্তালিবের নাতি। খবর শুনেই নাতিকে দেখতে ছুটে যান তিনি। দেখেন নবাগত হাত-পা নেড়েছেড়ে খেলছেন। নবাগত'র চাঁদবহন দেখে তাঁর হৃদ-মাজারে এক স্বর্গীয় পরশ দোলা দেয়। তিনি অনুধাবন করেন- সেখানে কোনো এক ঐশ্বরিক বার্তা এসেছে। সে বার্তা অল্পক্ষণেই বাগযন্ত্রকে স্পন্দিত করে তুলল। নেচে উঠলো ঠোঁট। মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে এলো- 'মুহাম্মদ-প্রশংসিত!' সেই থেকে শুরু। তারপর আর থামেনি। তাঁর নামের মাহাত্ন্য একটু একটু করে বুঝতে শুরু করে পৃথিবী-বাসী। আজ অবধি সে ধারা চলমান। চলতে থাকবে যুগ-যুগান্তর ধরে। তিনি চির-প্রশংসীত-রূপে উদ্ভাসিত বিশ্বচরাচরে। তাঁর সে প্রশংসাধারায় ইতিবৃত্ত, পুণ্যময় জীবনের গতিপথ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য কিংবা অভীষ্ট, চূড়ান্ত পরিচয় ও পরিণতি- সহ নানান দিকের বর্ণনা এবং মাত্র ৬৩ বছরে পৃথিবীবাসী কীভাবে এই কল্যাণধারার সাথে পরিচিত হলো এবং কীভাবে যুগ যুগান্তরের সকল ধর্মের, সকল জাতের মানুষের কাছে তিনি চির-প্রশংসিত-রূপে উদ্ভাসিত হলেন? জানতে হলে ঢুকে পড়তে হবে ভেতরের পাতায়।
❛মুহাম্মদ❜ শব্দের অর্থ ❛প্রশংসিত❜। মক্কা নগরে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ ই রবিউল আউয়াল জন্ম নেন তিনি মা আমেনার উদরে। জন্মের আগেই পিতাকে হারানো শিশুনবীর অভিভাবক হলেন দাদা আব্দুল মুত্তালিব। জন্মের পরেই তাঁকে পাঠানো হলো দুধমা হালিমার ঘরে। নবী ﷺ শিশুকাল থেকেই ভিন্ন। মক্কায় ছোটো শিশুদের যখন দূরে লালনের জন্য পাঠানো হতো তখন তারা সেখানেই বেড়ে উঠতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। হালিমা শিশুনবীকে পালনের জন্য নেয়ার আগে তার কপাল ছিল অনিশ্চিত। তাঁকে লালনের জন্য নেয়ার পর হালিমার সংসারে যেন রহমতের ঝর্ণা বয়ে গেল। এত ছোটো শিশু তাও তার নীরব বুদ্ধি অবাক করার মতো। শিশুনবী হালিমার একটি স্তন পান করেন অন্যটা রেখে দেন। যেন তার দুধ ভাই বোনেরা সেটা পান করতে পারে। ছোট্ট শিশু অথচ তার আগ্রহ নেই খেলায়। সে কী জানি ভাবে!
❛শিশু নবী জন্মের পরে কীসের নামাজ পড়িলেন নামাজ শেষে কোন কারণে উম্মত বলে কাঁন্দিলেন❜
ছয় বছর বয়সে নবী ﷺ ফিরলেন তাঁর আপন ভূমিতে। কিন্তু দোহাজনের জন্য যিনি রহমত তাঁকে তো সুখে জীবন কাটালে হবে না। তার জীবনেও দুঃখ বয়ে আসলো। ছয় বছরের এতিম নবী ﷺ মা আমেনার সাথে তায়েফ ভ্রমণে গিয়ে হয়ে গেলেন মাতৃহারা। এত দুঃখ সয় কী করে?
❛শিশুনবী জন্মের পরে না দেখিলেন পিতার মুখ ছয় বছরের এতিম নবী হারাইলেন তার মায়ের মুখ❜
মাকে হারানোর পর নবীজী ﷺ দাদার কাছে মানুষ হতে লাগলেন। পিতামহ তাকে পরম মমতায় লালন করতে লাগলেন। কিন্তু নবী ﷺ এর প্রিয় মানুষগুলোর তাড়া হয়তো বেশি ছিল, আল্লাহর ইচ্ছাই ছিল হয়তো তাঁর আপনজনদের থেকে আলাদা করে দেয়া। তাই আট বছর বয়সে নবী ﷺ হারালেন তার অভিভাবক পিতামহকেও। এরপর চাচা আবু তালিবের কাছে তার জীবন অতিবাহিত হতে লাগলো। বছর অতিক্রান্ত হতে লাগলো এরমধ্যেই তিনি মক্কায় পরিচিত হলেন ❛আল আমিন তথা বিশ্বাসী❜ নামে। অন্যদের থেকে আলাদা। চাচার সাথে বাণিজ্য যাত্রায় যাকে পাদ্রী বহিরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ছোটোকালে যার কলবের কালি ফেরেশতারা মুছে দিয়েছিল। যার পিঠে ছিল নবুয়তের চিহ্ন। ভদ্র, নম্র স্বভাবের মুহাম্মদ ﷺ ধীরে ধীরে নাম তৈরি করতে লাগলেন তাঁর সুন্দর ব্যবহার, সততার কারণে। একসময় তিনি চোখে পড়লেন মক্কার মহিয়সী নারী খাদিজা (রাঃ) এর। তখন নবীজীর ﷺ পঁচিশ আর খাদিজা (রাঃ) চল্লিশ। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন দুজনে। নবীজির ﷺ সাথে সকল সময়ে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন তিনি। আল্লাহর বাণী আসার পর বিশ্বাসীদের প্রথমে ছিলেন তিনি, যিনি নবীজীর ﷺ কথায় কোনো সন্দেহ প্রকাশ না করেই ইসলাম কবুল করে নিয়েছিলেন। জীবনসঙ্গিনী তো এমনই হওয়া উচিত।
বিবাহের পর দুইজনের ধন, মান সম্মান বৃদ্ধি পেলো। সকলের বিপদে নবীজী ﷺ এগিয়ে থাকেন। তবুও কোথায় যেন একটা হাহাকার। কী যেন ঠিক হচ্ছেনা। উদাস নয়নে আকাশ পানে চেয়ে থাকা। একসময় পাহাড়ে গুহায় ধ্যানে বসতে থাকেন। আর তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে পান ঐশীবাণী। কিন্তু তিনি ভয় পেয়ে যান। যা শুনলেন তা কল্পনা নয় তো? কিন্তু আগত বাণীতে যেন শান্তি ফিরে এলো। তাঁর প্রিয় সাথিও তাঁকে বিশ্বাস করলেন। এভাবেই সুন্দর এক যাত্রা কিন্তু কন্টকাকীর্ণ পথের শুরু হলো। নবুয়্যত প্রাপ্ত হলেন তিনি। গোপনে প্রচার শুরু করলেন। কিন্তু আকাশে চাঁদ উঠবে অথচ বাসিন্দাদের খোঁজ হবে না তাই কি হয়? গোপনে হলেও কানাঘুষা হতে লাগলো মুহাম্মদ ﷺ নাকি পূর্বপুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করছে। লাত ওজ্জা মানাতদের অস্বীকার করছে। এভাবে কি চলা যায়? ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ বাড়তে লাগলো। গোপনে অনেকেই ইসলাম ধর্ম কবুল করে নিলেন। কিন্তু ওহী এলো আর গোপনে নয় এবার প্রকাশ্যেই আল্লাহর বাণীর প্রচার করতে হবে। এ যেন মৌমাছির চাকে ঢিল দেয়ার মতো অবস্থা। আরববাসী যেখানে মূর্তিপূজায় নিমজ্জিত, জাহেলিয়াতের সাথে সুসম্পর্ক করে ফেলেছে তাদের এ পথ থেকে ফেরানো মুশকিল। কিন্তু নবীজীর ﷺ সাথে উপরওয়ালা আছেন। যার প্রতি আস্থা অসীম। কঠিন পথ হলেও কাজ করে গেলেন। সাথে ছিল সঙ্গী খাদিজা (রাঃ), আলী (রাঃ) সহ অনেকেই। ইসলাম কবুল না করলেও ঢাল হয়ে তাঁকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন চাচা আবু তালিব। পক্ষের লোক যেমন ছিল তেমনি বিপক্ষেও ভার ছিল অনেক। স্বয়ং চাচা আবু জাহেল, লাহাব তার কঠিন বিরোধিতা করেন। প্রাণ নেয়ার হুমকি দেন। কাফেরদের ক্ষেপিয়ে তোলেন। আব্দুল্লাহর পুত্র পা গল, জাদুকর, ভন্ড নানা গঞ্জনায় তাঁকে গুঁড়িয়ে দিতে চান। নির্যাতন নেমে আসে ইসলাম কবুল করা লোকদের উপরেও। সময় যায় তাঁকে বয়কট করে নানা কষ্ট দিতে থাকেন। তবুও আল্লাহর নবী অবিচল। শত কষ্ট সহ্য করেও আল্লাহর বাণী প্রচার করেন। এর মধ্যেই মিরাজের যাত্রা, নামাজের নিয়ম নিয়ে আসলেন। আল্লাহর দিদার লাভ করলেন। জেনে আসলেন মহাবিশ্বের অনেক কিছু। যার কিছু উম্মতদের জানালেন, কিছু রয়ে গেল আলাহ আর তাঁর প্রিয় রসূলের গোপনীয়। আবার বিয়োগের কষ্ট। হারালের চাচা আবু তালিবকে। সেই কষ্টের ঘায়ে মলম না পড়তেই ইহকালের যাত্রায় ইস্তফা দিলেন নবী পত্নী খাদিজা (রাঃ)। একসময় গেলেন তিনি তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে। সেই তায়েফ যেখানে তাঁর বাল্যকালের অনেকটা সময় কেটেছে। কিন্তু হায়! তায়েফবাসী নবীজীকে ﷺ আপ্যায়ন করলেন পাথর ছুঁড়ে!
❛নবীজী তায়েফ গেলেন ইসলাম প্রচার করিতে তায়েফবাসী মা রলো পাথর আমার নবীজীর গায়েতে❜
অত্যাচার যখন মাত্রা ছাড়িয়ে গেলো তখন তিনি আল্লাহর আদেশে সিদ্ধান্ত নিলেন হিজরত করবেন। এছাড়া উপায় নেই। কোরাইশদের অত্যাচারে মুসলিমরা বিপর্যস্ত। স্থান নিবেন ইয়াসরিব তথা মদিনায়। সেই হিজরতের আগেও নানা পরিকল্পনা জাহেলের। এবার তাঁকে চিরতরে সরিয়েই দিতে হবে। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে স্বয়ং রক্ষা করেন, তাঁর বিপদের ভয় কী? এরই মধ্যে ইসলামের ছায়াতলে এসেছেন উমর (রাঃ), উসমান (রাঃ) সহ অনেকেই। অনেককে ইতোমধ্যেই পাঠানো হয়েছে ইয়াসরিবে। নবীজিও ﷺ আল্লাহর নির্দেশনা পেয়ে পাড়ি জমালেন মাতৃভূমি ছেড়ে সেখানে। শুরু হলো হিজরী সাল গণনা।
ইসলামের প্রচার ঘটলেও বিপক্ষ দল সবসময়ই প্রস্তুত ছিল তাঁকে নাস্তানাবুদ করতে। পেরে উঠলেও জিতে গেলো না কেউই। সাময়িক আনন্দ লাভের পরে আল্লাহর বিজয় ঠিকই হলো। অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটলো। এগিয়ে এলো উহুদের যু দ্ধ, বদরের যু দ্ধ, খায়বারের যু দ্ধ। সবগুলোইতেই চোখে পড়ার মতো কম সৈন্য নিয়ে বিজিত হলেন নবী ﷺ এর সঙ্গে থাকা দল। কঠিন অত্যাচার, ষ ড়যন্ত্র সহ্য করেও তাঁর কাছে নিয়মিত আসতে লাগলো আল্লাহর বাণী। বাইরের অনেক রাজ্যই ইসলাম কবুল করে নিলো। তবে জন্মভূমির লোকেদের মন জয় করাই যেন কঠিন দেখা দিল। একসময় মক্কা বিজয়ও হলো। কেউ সত্যিই ইসলাম কবুল করলো, কেউ আছে উপায় না দেখে করলো। কিন্তু নবীজীর ﷺ সততা, বৈষম্যহীন আচরণে সকলেই মুগ্ধ। রোজার বিধান, হজের বিধান, কেবলা কাবার দিকে নেয়া সহ নানা নিয়ম মুসলিমরা অবহিত হতে লাগলো। ধীরে ধীরে বয়স বাড়তে লাগলো। ইসলামের ছায়ায় এখ�� পুরো আরববাসী প্রায় এসে পড়েছে। যারা আসেনি তাদের প্রতি কোনো জুলুম হয়নি। সময়ের ফেরে আবু সুফিয়ান, খালিদের মতো ঘোর শ ত্রুও ইসলামের শক্তি রূপে পরিণত হলো। সময় হয়ে এলো আবার হজের। যখন মক্কা বিজয়ও হয়েছে। শেষ ভাষণ তথা বিদায়ী হজের ভাষণ দিলেন তিনি। দীর্ঘ ২৩ বছর সময় নিয়ে নাযিল হলো কুরআন শরীফ, নবুওয়তের আলো ছড়িয়ে গেলো। এরপর সময় এলো ওফাতের। বিদায়ী হজের ভাষণ দিয়েই যার ইঙ্গিত তিনি দিয়েছিলেন। তাঁর ওফাতের পরও নিভে যায়নি ইসলামের আলো। ছড়িয়েছে বরং আরো। যু দ্ধ বিগ্রহ হয়েছে, মুসলিমের হাতে মুসলিমের জান গেছে এরপর। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৪৫৫ বছর আগে আবির্ভাব হওয়া শেষ নবীর প্রচলিত ধর্ম পালন করছে একটা বিশাল জনগোষ্ঠী। তাঁর শেখানো পথে জান্নাতের আলো খুঁজছে অনুসারীরা। পারস্যের কবি শেখ সাদীর কলমেই সেই ধ্বনি হয়তো দারুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে,
তিনিই আল্লাহর প্রেরিত শেষ নবী এবং রাসূল। যাঁকে আল্লাহ করেছেন চির প্রশংসিত, ❛মুহাম্মদﷺ❜
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝প্রশংসিতﷺ❞ মুহাম্মদ সৈয়দুল হকের লেখা প্রথম বই। বইটির উপজীব্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর জীবনী। লেখক একে ঠিক সীরাত আকারে উপস্থাপন করেননি। এটাই মনে হয় বইটির সবথেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য। নবীজীর ﷺ জীবনপাঠ করতে গেলে থেকে সময় কঠিন লেখার খপ্পরে পড়ে পাঠ উপভোগ্য হয়না। তবে এর মধ্যেই বেশ কিছু সীরাত পড়েছি, ভিন্ন দেশী লেখকের নবীজী ﷺ নিয়ে লেখা জীবনী পড়েছি। বেশিরভাগ লেখাই বেশ লেগেছে। মূল ঘটনাগুলো একেক লেখক নিজেদের মতো করে সাজিয়ে পাঠকের কাছে দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত পড়া নবীজীরﷺ জীবনীগুলো থেকে মাত্র পড়ে শেষ করা বইটি অনেকক্ষেত্রেই একেবারে ভিন্ন। শুরুতেই লেখক বলেছেন তিনি প্রথাগত সীরাতের অনুসারী হয়ে লিখেননি। চেষ্টা করেছেন উপন্যাস আকারে লিখতে। সেক্ষেত্রে কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। এসেছে কিছু নাটকীয়তা, এসেছে সংলাপ। তবে মূল বিষয়কে অক্ষুন্ন রেখেছেন। বিভিন্ন উদ্ধৃতির সহায়ক ফুটনোট দিয়েছেন। যা পড়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হয়েছে। লেখক প্রায় বেশ একটা সময় নিয়ে নিজের জীবনের প্রথম মলাটবদ্ধ বইটি এনেছেন শ্রেষ্ঠ মানবের জীবনী দিয়ে। আমার কাছে লেখকের শব্দচয়ন, বর্ণনাভঙ্গি খুবই ভালো লেগেছে। তিনি যে যথেষ্ঠ পরিশ্রম করেছেন, সময় দিয়ে বইটা সাজিয়েছেন সেটা প্রতিটা পৃষ্ঠাতেই লক্ষণীয়। বইটির সবথেকে আলাদা দিক হলো উক্তির প্রয়োগ। নবীজীরﷺ জীবনীতে লেখক উপন্যাস, কবিতা থেকেও উক্তি তুলেছেন, এনেছেন উদাহরণ। কাজী নজরুল ইসলামের লেখার ব্যবহার বেশি ছিল, ছিল সীরাত গ্রন্থের উক্তি, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার উক্তির সাথেও নবীজীরﷺ জীবনের দিকগুলো উদাহরণ দিয়েছেন। উপন্যাস হিসেবে এক পুরো উপন্যাস অবশ্যই বলা যাবে না। কারণ উপন্যাসে কল্পনার আশ্রয় বেশি থাকে, মনগড়া অনেক কথা থাকে। তবে তিনি যাঁর জীবনী উপজীব্য করে লেখা হাত দিয়েছিলেন তাঁর জীবনে কল্পনা করে নেয়ার মতো কিছু আছে কি? এত ঘটনাবহুল, এত নাটকীয় জীবনে নতুন করে কল্পনার আশ্রয় কতটুকু বা করা যায়?
সংলাপের ব্যবহারগুলো আমার বেশ লেগেছে। লেখকের নবী প্রেম, সে সময়ের মানুষের নবীর ﷺ প্রতি আস্থা, সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে আল্লাহর একত্ব প্রকাশের ঘটনাগুলো লেখক বেশ মাধুরী দিয়েই লিখেছেন। তবে বেশি মাধুরী দিতে গিয়ে কিছু জায়গায় আমার মনে হয়েছে একটু বেশি করে ফেলেছেন। মানে নাটকীয়তা কিংবা ড্রামাটিক ভাব একটু বেশি এসে গেছিলো। যেটা আরো পরিপক্বভাবে ব্যাখ্যা করা যেত সেখানে আবেগকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছেন। ৩০৪ পৃষ্ঠার এই লেখায় আমার কাছে বিরক্তির উদ্রেক করেছিল সে সময়ের সংলাপে ইংরেজির প্রয়োগ। ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন কিছু কথা তিনি প্রচলিত বাক্যরীতিতে লিখেছেন বা শব্দের প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু তাই বলে ওয়ান টু ওয়ান, প্লীজ, সহ অনেক ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ যেন আরোপিত লাগছিল। বেমানান আরকি। এছাড়াও লেখক সংক্ষেপ করতে গিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে এড়িয়ে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে গেছেন। যেগুলো আরো ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এতে পাঠক বরং আরো তৃপ্তিই পেতো। উহুদের ময়দানে নবীজীরﷺ দাঁত হারানোর ঘটনা সহ অনেক কিছুই উল্লেখ করেননি তিনি। এছাড়াও তাঁর ওফাতের পরে ইসলামের প্রচার এবং প্রসারের ঘটনা একেবারে সংক্ষেপে এনেছেন ঠিক আছে কিন্তু কারবালার কথা এড়িয়ে গেছেন। সেটাও আনা উচিত ছিল মনে করি। শেষে এক নিমেষে নবীজীর ﷺ জীবনের ৬৩ বছর হাইলাইট আকারে পয়েন্ট করে উল্লেখ করেছেন এটা বেশ ভালো হয়েছে। সর্বোপরি আমার কাছে লেখকের লেখা নবীজীর ﷺ জীবনী উপজীব্য বইটি দারুণ লেগেছে। ভিন্নভাবে, ভিন্ন আঙ্গিকে তাঁকে জানতে সাহায্য করেছে লেখাটি। শেষের দিকে নবীজীর ﷺ উপর প্রেরিত ধর্মের উপর দ্বীন আনার পরেও সুযোগ পেলেই বিরোধিতা করা, উস্কে দেয়া উবাইয়ের জানাজা পড়ানোর ঘটনাটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। হেদায়েত নসিব না হওয়া একটা লোকও তাঁর মাধ্যমে জানাজা পেলো।
প্রায় দেড় হাজার বছর পরে এসে আমরা যখন ঘটনাগুলো পড়ি তখন নিজেকে কখনো ভাগ্যবান মনে হয়। যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানকবের উম্মত আমি। আবার দুঃখ হয় কাফেররা তাঁকে দেখতে পেলো, আমরা পেলাম না। কিন্তু ইসলামের ছায়াতলে নবীর ﷺ দেখানো দ্বীনের বান্দা আমি এটাই তো সবথেকে বড় প্রাপ্তি!
❛আবু জাহেল কাফের হয়ে দেখলো আমার নবীকে উম্মত হয়ে দেখলাম না তাই দুঃখ রইলো মনেতে।❜
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
প্রচ্ছদটা বেশ লেগেছে। লেখক বলেছেন বাংলা একাডেমির বানানরীতি অনুযায়ী লিখেছেন। তবুও কিছু মুদ্রণ প্রমাদ রয়ে গেছিল।
❛নবী ছিলেন গরিবানা, বাদশাই পাইয়া করিলেন না দোজাহানের বাদশা নবী উম্মতের লাইগা দিওয়ানা।❜
বইটার শুরুটা এত সুন্দর, আমি ১ম পড়ে রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। অবশ্যই কালেশনে রাখার মত বই। তবে লেখক মাত্রাতিরিক্ত ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন যে বিষয়টা বিরক্তিকর লেগেছে। এখানে এই শব্দগুলা একদমই বেমানান ছিল। এই বিষয়টা মনে হয় বইটার সবচেয়ে দূর্বল পয়েন্ট।
'প্রশংসিত' নামটা শুনলে বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা দিয়ে ওঠে। অবশ্য যারা জানে না এই নামের পেছনে কি মহিমা রয়েছে তাদের জন্য প্রশংসিত শব্দটা অন্য দশটা শব্দের মতোই। কিন্তু যারা জানে তারা অপার দরদের সাথে পড়ে নেয় সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এজন্যই মহান রব্বুল আলামীন তার কালামে পাকে আমাদেরকে প্রশ্ন করেছেন, "যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?"
প্রিয় রসূল (সঃ)- কে জানা প্রত্যেক মানুষের জন্যই আবশ্যক। আপনি যে ধর্মেরই হোন না কেনও প্রিয় রসূলের (সঃ) -এর জীবনীতে পাবেন নিজেকে সাঁজানোর সব ধরনের সরঞ্জাম। রসূল (সঃ) -এর জীবনটাই আমাদে জন্য অনুকরণীয়। তাঁর জীবন থেকে আপনি আপনার ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে বিশ্বজীবনকেও পুরোপুরি সাঁজাতে পারবেন। তাঁকে আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের জন্য রহমতস্বরূপ ও অনুকরণীয়, অনুসরণীয় করে পাঠিয়েছেন। আচ্ছা, একটা মানুষ তাঁর পুরো জীবনটা আপনার জন্য কেঁদেছে। আপনি যাতে সুখী হতে পারেন স�� জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত দরদমাখা কন্ঠে দোয়া করেছে। তাঁর পরিচয় কী জানার ইচ্ছে করে না আপনার? তিনি কেমন দেখতে ছিলেন, কিভাবে সবার সাথে আচরণ করতেন, তিনি ব্যক্তিজীবনে কেমন ছিলেন, সমাজ জীবনে কেমন ছিলেন, রাষ্ট্রীয় থেকে আন্তর্জাতিক সবক্ষেত্রে তার বিচরণ কেমন ছিল তা জানতে কী ইচ্ছে করে আপনার? তবে এই জানাটা যদি সাহিত্যের ভাষায় হয়ে থাকে তবে ব্যপারটা আরো দারুণ হয়, তাইনা?
তাই চলুন, তাঁকে ভিন্নভাবে জানার জন্য আজ একটা বই নিয়ে কথা বলা যাক।
বইয়ের নাম: প্রশংসিত লেখক: মুহাম্মদ সৈয়দুল হক পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩০৪ প্রকাশনি: দাড়িকমা গতানুগতিক সীরাত হয়ত আপনি পড়েছেন কিন্তু সাহিত্যিক ছন্দে লেখা সীরাত হয়ত পড়া হয়নি আপনার। বলা চলে বাংলা সাহিত্যের এক নতুন সংযোজন এই 'প্রশংসিত' বইখানা। আপনি বইয়ের পরতে পরতে পাবেন নবীজীবনের এক বর্ণিল আলোকসজ্জা। দেখবেন নানান উপমায় রসূল (সঃ) -কে লেখক সাঁজিয়েছেন। বলে নেয়া ভালো প্রিয় রসূলেকে আপনি কোনো উপমা দিয়েই বেঁধে ফেলতে পারবেন না। আপনিও জাবের ইবনে সামুরা (রঃ) -র মতো কনফিউশানে পরে যাবেন আমার রসূল (সঃ) বেশি সুন্দর নাকি পূ্র্ণিমার চাঁদ বেশি সুন্দর! লেখক খুব দরদ, ভালোবাসার শব্দ দিয়ে প্রিয় রসূল (সঃ) -কে সাঁজাতে চেয়েছেন এই বইটিতে। ভিন্ন আঙ্গিকে আপনি জানতে পারবেন প্রিয় রসূলের জীবনী।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: আগেই বলে নিই বইটা অবশ্যই সুপাঠ্য! একবার পড়তে বসলে শেষ না করে আপনি বই থেকে উঠতে চাইবেন না। উপন্যাস ধারায় বইটি লেখা হয়েছে। তবে তাতে আপনি কাব্যিক চরণও পাবেন অনেক যা লেখক মূলত কাজী নজরুল ইসলাম থেকে নিয়েছেন। পাশাপাশি নাটকের সংলাপের ঢংয়েও অনেকগুলো ঘটনাকে লেখক একসাথে জুড়ে দিয়েছেন। যা বলা যায় লেখক এসব অনুচ্ছেদে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। পড়তে গিয়ে কখনো বোরিং ফিল করিনি। আর এই বই পড়ার আগে দশেক মতো সীরাত পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে (আলহামদুলিল্লাহ) তাই এই গ্রন্থের কোথাও কোনো তথ্যের অসংগতি আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। লেখক যেহেতু প্রাচীন ও সমসাময়িক অনেকগুলো সীরাত থেকে তথ্যগুলো নিয়েছেন যা বইটার গুণগত মানকে বাড়িয়েছে। তবে লেখার সুবিধার্থে লেখক মনে হয় কিছু কিছু জায়গায় অতিমাত্রায় শব্দবিন্যাস ঘটিয়েছেন। বইটি পড়ার সময় এটা হয়ত সবার দৃষ্টিগোচর হবে না। পড়ার সময় যেন মনে হবে আপনি সব দেখতে পাচ্ছেন। মনে হবে আপনি আজ থেকে ১৪০০ বছর আগের সেই মরূ প্রান্তে রসূলের পিছন পিছন হাটছেন। বিশেষ করে যুদ্ধের অংশগুলোতে আপনি প্রায় হারিয়ে যাবেন। আর বইয়ে বানান ভুলের সংখ্যা নেই বললেই চলে। পড়তে বসে কখনো আমি বোর হয়ে যায়নি। দারুণ উপভোগ্য একখানা বই। তবে দেরি কেনও আপনিও পড়ুন। অন্যকে পড়ার জন্য উৎসাহ দিন।
এককথায় অসাধারণ। রাসূল (সা.) এর জীবনীকে একটি উপন্যাসে রূপ দিতে লেখককে অনেক কাঠখোট্টা পোড়াতে হয়েছে যার ছাপ পাওয়া যায় প্রতিটি অধ্যায়ে । উপন্যাসের গঠনশৈলী, যথোপযুক্ত উপমার ব্যবহার এককথায় দারুণ লেগেছে। রাসূল (সা.) পৃথিবীতে ছিলেন ৬৩ বছর, সে অনুযায়ী লেখক উপন্যাসটিকে ৬৩টি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন।
যারা রাসূল (সা.) এর জীবনী সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক কিন্তু কোনটা দিয়ে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না তারা এটা দিয়ে শুরু করতে পারেন।
উপন্যাস আকারে সীরাত, এই টাইপের এটাই আমার প্রথম বই, বইটিতে নবীজির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সীরাত খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন, তবে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় মাত্রাতিরিক্ত সংক্ষিপ্ত করে ফলেছেন, ওইসব বিষয়গুলো নিয়ে আরও লেখা যেতো। বইটা ৩০০ এর জায়গায় ৫০০ পৃষ্ঠা হলে বেশি ভালো হতো, কারণ অনেক ঘটনাই বাদ দেওয়া হয়েছে অথবা বেশি সংক্ষিপ্ত করে ফেলেছেন লেখক,