পশ্চিমা বিশ্বের সাথে আমাদের প্রাচ্যের যে আদর্শগত পার্থক্যগুলো রয়েছে, সে তালিকায় প্রথমেই থাকবে রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ। ইয়োরোপের বেশীর ভাগ দেশে মোটামুটি মধ্যযুগেই এই নীতি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। আমাদের উপমহাদেশীয় অঞ্চলগুলোতে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পৃথকীকরণের ব্যাপারটি মোটেই জনপ্রিয় নয় বলে এবং এর সাথে বহু রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের যোগসূত্র থাকায় এ অঞ্চলের দেশগুলোতে আইন প্রণয়ন হয় দেশগুলোতে প্রচলিত ধর্মের ভিত্তিতে, ফলে, এসব দেশে জনজীবন তুচ্ছাতিতুচ্ছ সব মানসিক বাধায় অকারণে হোঁচট খায়; হাস্যকর ও বায়বীয় সব বিষয়ের গোলকধাঁধায় দিক হারিয়ে এ অঞ্চলগুলোর মানুষ বারবার নানান ধর্মীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা, আইনের প্রয়োগ, ও ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস-এগুলো যে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং স্বাধীন ৩টি বিষয় সেটি এ অঞ্চলের মানুষেরা খুব একটা বোঝার চেষ্টা করেন না; এঁরা এই অজ্ঞানতাপূর্ণ জীবনদর্শনটিকে প্রাণপনে আঁকড়ে ধরে রাখেন বলেই ভারতে শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্যই বাসযোগ্য একটি দেশ বানাবার নোংরা এজেন্ডা নিয়ে একটি দল রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতার দায়িত্বে আসে, পাকিস্তানে ধর্ষণের শিকার কোন নারী বিচার চাইতে গেলে তাঁকে চারজন সাক্ষীর সাক্ষ্য যোগাড় করবার আজীবন-চেষ্টায় মাথা কুটে মরতে হয়, শ্রীলংকাতে দশকের পর দশক ধরে হিন্দু তামিলদের দমন পীড়ন করে ও চাকরী থেকে বঞ্চিত করে বৌদ্ধ সিংহলিরা ক্ষমতায় আসে, আর বাঙলাদেশে সন্তান দত্তক নিতে চাইলে সামাজিকভাবে হেয় হতে হয় (কারণ, ইসলামে সন্তান দত্তক নেবার বিধান নেই। ধর্মকে কেন্দ্র করে আইনগুলো রচিত হয় বলে দত্তক সন্তানের সম্পত্তির প্রতিরক্ষায় কোন আইনগত কাঠামোও এখানে নেই; দত্তক পিতা-মাতার মৃত্যুর পর খুব সহজেই দত্তক সন্তানদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায়)। বাঙলাদেশে সব মিলিয়ে ৪০ লাখের ওপরে অনাথ শিশু রয়েছে। পরিবারের আদর সাহচর্য ছাড়া বেড়ে ওঠা এদের মানবিকতার জ্ঞান বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। বাঙলাদেশের কিশোর কিশোরীদের মাঝে কেন হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতির হার ক্রমশঃ ঊর্ধমুখী, এবং কেন তাদের ভেতরে অনুশোচনার অভাব লক্ষ্যণীয়-এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেকটাই লুকিয়ে আছে এখানে।
কথা হলো, পশ্চিমে রাষ্ট্র ও ধর্মের এই পৃথকীকরণ কি করে সম্ভব হলো? আজকের আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল বলা হয় ম্যাগ��া কার্টা চুক্তিপত্রটিকে। সরকার প্রধান, রাজা/বাদশারা যে আইনের ঊর্ধে নন, অপরাধ করলে তাঁদেরও যে শাস্তি পেতে হবে, এই ব্যাপারটি ৮০৭ বছর আগে লেখা এ দলিলে নিশ্চিত করা হয়। এই ম্যাগনা কার্টার হাত ধরেই স্থাপিত হয় আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান যা আজ পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের আইনী কাঠামোর প্রধান ভিত্তি: এর গালভরা নাম হেইবিয়াস করপাস (Habeas Corpus)। ল্যাটিন এই শব্দদ্বয়ের আক্ষরিক অর্থ "(অভিযুক্ত ব্যক্তি) সশরীরে আপনার হেফাজতে আছে"। প্রাচীন বা মধ্যযুগের মতো নৃপতি/ রাষ্ট্রপ্রধানরা আজ চাইলেই আপনাকে জেলে আটকে রাখতে পারেন না (বাঙলাদেশীরা, অট্টহাস্য করবেন না, প্লিজ!), আপনাকে আগে আদালতে সশরীরে হাজির করতে তিনি বাধ্য। আদালত নির্ধারণ করবেন আপনি দোষী না কি নির্দোষ, নৃপতি নয়। অপরাধ প্রমাণিত না হবার আগে আপনি যে নির্দোষ তা নিশ্চিত করে এই হেইবিয়াস করপাস। হেইবিয়াস করপাস আছে বলেই নৃপতিকে ঘুরপথে মাথা খাটিয়ে অতিরিক্ত কষ্ট করে ৩২ কি ৫২ ধারার আইন প্রণয়ন করতে হয়, তাঁর মূল স্বপ্ন যেটি-সেই সরাসরি আপনার দরজায় টোকা মেরে বিনা প্রশ্নে আপনাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া-সেটি কিছুটা জটিল ও বিলম্বিত হয় এই হেইবিয়াস করপাসের বরাতেই।
৮০০ বছরেরও বেশী আগে বানিয়ে যাওয়া এই নীতিগুলোতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে আলাদা করে রাখবার প্রাথমিক একটি প্রয়াস আমরা দেখতে পাই সহজেই। তবে, রোম যেমন এক রাতে তৈরি হয় নি, জনগণের অধিকার আদায়ের নিমিত্তে প্রস্তাবিত এই সব আইন কানুনের বিধিও তেমনি কলমে লেখামাত্রই বাস্তবায়িত হয়ে যায় নি। এর সাথে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের রক্ত, ঘাম, ও সংগ্রামের অদ্ভুত সব ইতিহাস। ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের আধুনিক যে রূপটি আমরা দেখি আজ, সেটির ভিত্তি গড়া হয়ে গিয়েছিলো ষোল শতকের ইংল্যান্ডে, রাজা অষ্টম হেনরির শাসনামলে। রবার্ট বোল্ট তাঁর বিখ্যাত নাটক 'আ ম্যান ফর অল সিজনস' লিখেছেন এই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটেই। ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ওপর এ নাটক নির্মিত, তাই এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি আগে জেনে নেওয়া জরুরী।
টিউডর বংশের রাজা অষ্টম হেনরি এক অর্থে সভ্যতার ইতিহাসের গতিপথ অনেকখানি পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন, অথচ তাঁর রাজা হবারই কথা ছিলোনা। হেনরি ছিলেন তাঁর পিতা রাজা সপ্তম হেনরির দ্বিতীয় পুত্রসন্তান; প্রথম পুত্র আর্থারকে টপকে সিংহাসনে বসার কোন উপায় তাঁর ছিলোনা। আর্থারের যখন ৩ বছর বয়েস, পিতা সপ্তম হেনরি তখন স্পেনের ক্যাথলিক সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ ও সম্রাজ্ঞী প্রথম ইসাবেল-এর সাথে বাঙলা সিনেমার তরিকায় চুক্তি করেন, আর্থার বালেগ হলেই ফার্দিনান্দ-ইসাবেলের কন্যা ক্যাথেরিনের সাথে তার বিয়ে দেবেন। মূলত ইংলিশ-স্প্যানিশ ক্যাথলিক সাম্রাজ্যের হাত আরও শক্তিশালী করে তোলাই এঁদের লক্ষ্য ছিল। ১৫০১ সালে ১৫ বছর বয়েসে আর্থার ক্যাথেরিনকে বিয়ে করে ইংলিশ-স্প্যানিশ ক্যাথলিক সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ সম্রাট হবার পথে পুরোপুরি এগিয়ে যান, কিন্তু বিধিবাম! বিয়ের মাত্র ২০ সপ্তাহ পরেই রোগে ভুগে আর্থার ধরাধাম ত্যাগ করেন। স্বাভাবিকভাবেই সিংহাসনের দায়িত্ব এবার এসে পড়ে আর্থারের ছোট ভাই অষ্টম হেনরির ওপর, কিন্তু স্প্যানিশরা দাবী করে বসে হেনরিকে তখতে বসতে হলে ক্যাথেরিনকে বিয়ে করেই বসতে হবে। স্প্যানিশদের এ শর্ত না মানার অর্থ দাঁড়াবে নিজেদের সবচেয়ে বড় মিত্রকে অপমান করা, যা কার্যত রাজনৈতিক আত্নহত্যা। জোট সাম্রাজ্যের স্বপ্নে বিভোর সপ্তম হেনরি তাঁর বিধবা জেষ্ঠ্যা-পুত্রবধূকে দ্বিতীয় পুত্রের সাথে বিয়ে দেবার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেন, কিন্তু এবার বাধ সেধে বসেন ক্যাথলিকদের পালের গোদা স্বয়ং পোপ। ক্যাথলিক মতে ভাই কখনও ভাবীকে বিয়ে করতে পারেনা, কারণ, বাইবেলে এসেছে, “Thous shalt not uncover the nakedness of thy brother’s wife: it is thy brother’s nakedness” (লেভিটিকাস ১৮ঃ ১৬)।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদিও বানানো হয় গণমানুষের উপাসনা এবং ধর্মীয় রীতিনীতি জারি করবার নিমিত্তে, কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় কাজ আসলে নৃপতিকে তুষ্ট করা, নৃপতির হাতের তরবারী হয়ে ওঠা। জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার বেলায় শাসকের সবচেয়ে ক্ষমতাধর হাতিয়ারটি মূলত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, অস্ত্রাগারে সযত্নে সঞ্চিত গোলাবারুদ বা পুলিশ-সেনাবাহিনী নয়। ভাবীকে বিয়ে করার ক্যাথলিক নিষেধাজ্ঞা সর্বসাধারণের জন্য জারী থাকলেও শেষ পর্যন্ত সামান্য কিছু রাজনৈতিক হাদিয়ার বিনিময়ে রাজার জন্য নিয়মটি শিথিল করেন মর্ত্যের বুকে ঈশ্বরের লোকাল অফিসের বড়বাবু পোপ; বিনামূল্যে তো আর কেউই কাউকে লাঞ্চ করায় না। বিয়ের পর হেনরি-ক্যাথেরিনের বেশ কয়েক বছর ভালোই চলছিলো, কিন্তু এ কয় বছরে কোন পুত্র সন্তানের দেখা না পাওয়ায় হেনরি বেশ বিচলিত হয়ে পড়েন, এছাড়াও ক্যাথেরিন ক্রমশ ধর্মকর্মে মনোযোগী হয়ে পড়ায় হেনরির কাছে তাঁকে আর আগের মতো অতো একটা আকর্ষণীয় ঠেকছিলোনা। তিনি অ্যান বোলিন নাম্নী আরেক নারীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন, যিনি হেনরিকে পুত্রসন্তান উপহার দিতে পারবেন বলে নিশ্চিত করেন।
হেনরি এবার তাঁর স্ত্রী ক্যাথেরিনকে তালাক দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু এবারও পোপ সপ্তম ক্লেমেন্ট বেঁকে বসেন; পোপের অনুমোদন ছাড়া ক্যাথলিক-বিবাহবিচ্ছেদ বৈধ নয়। ক্যাথেরিনের বোনপো পঞ্চম চার্লস তখন রোমান সাম্রাজ্যের (হলি রোমান এম্পায়ার) নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন, পোপের আবাসস্থল ভ্যাটিকান চার্লসের ঠিক নাকের ডগায়। চার্লসের খালার বিবাহ বাতিল করে দিলে ক্লেমেন্ট মশাইয়ের পোপের আরামের চাকরীটি আর থাকেনা। অস্তিত্বের এমন সংকটে পড়ে হেনরিকে 'না' বলে দেয়া ছাড়া পোপের আর কোন উপায় ছিলোনা। মুখে অবশ্য তিনি বলেন, বারবার রাজার ইচ্ছেমতো নিয়ম পাল্টানো পোপের কাজ নয়, আগে যা হয়েছে হয়েছে, এখন থেকে ঈশ্বরের বিধান মতোই সব চলবে। বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন, ঈশ্বর অনেক ছক কেটে অপু দশ বিশ তিরিশ হিসেব নিকেশ করে তবেই কার সাথে কার বিয়ে হবে তা ঠিক করে দেন। হেনরির বিবাহবিচ্ছেদ তাই ঈশ্বরের চোখে অবৈধ।
বিবাহবিচ্ছেদের ব্যাপারে মতপার্থক্য নিয়ে হেনরির সাথে পোপের দূরত্ব বাড়তেই থাকে। ক্লেমেন্টকে ল্যাং মেরে ফেলে দেবার জন্য হেনরি এবার দারুণ এক ফন্দি আঁটেন। তিনি এবার বাইবেল দেখিয়ে জনগণের সামনে হাঁক দিয়ে বলেন, ঈশ্বর স্পষ্ট করেই তাঁর বইতে লিখে দিয়েছেন ভাইয়ের স্ত্রীকে বিয়ে করা চলে না, তবুও সম্পত্তির লোভে তাঁর পিতা এবং পোপ যোগসাজশ করে তাঁকে ভাবীর সাথে বিয়ে দিয়ে ভয়ানক এক পাপাচারে লিপ্ত করেছেন। হেনরির ওপর ঈশ্বর যে ক্ষুব্ধ সে তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, কারণ তাঁর কোন পুত্রসন্তান হচ্ছেনা। তিনি এখন এই পাপ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন, অথচ পোপ তাঁর বিবাহবিচ্ছেদে মত দিচ্ছেন না। ভাবীর সাথে বিবাহিত থাকা অবস্থায় প্রতি মূহুর্তে হেনরির পাপ দ্বিগুণ-চতুর্গুণ হারে বেড়ে যাচ্ছে। এমন ভয়ানক পাপাচারে মদদ দিয়ে চলেছেন যে পোপ, তাঁকে কি আর পোপ বলে মানা চলে? হেনরি এবার নিজেকেই ইংল্যান্ডের ক্যাথলিক সমাজের মাথা বলে ঘোষণা করলেন, তাঁর প্রস্তাবিত নতুন সমাজ কাঠামোতে পোপের বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কোন ভূমিকা আর রইলোনা। চার্চ এবং স্টেট-এর পৃথকীকরণের রাস্তা খোঁড়ার কাজ শুরু হয়ে গেলো…
পোপকে পাশ কাটিয়ে হেনরির নিজেকেই ক্যাথলিক চার্চের সর্বেসর্বা ঘোষণা করার এ রাজনৈতিক চালটি হেনরির দরবারের একজন মোটেই পছন্দ করেন নি, তাঁর নাম স্যার থমাস মোর, নাট্যকার রবার্ট বোল্ট যাঁকে ম্যান অফ অল সিজনস বলেছেন। থমাস মোর ছিলেন হেনরির লর্ড হাই চ্যান্সেলর; এ পদটি যুক্তরাজ্যে এখনো আছে, এবং এর অবস্থান যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীরও ওপরে। মোরের কাছে হেনরির দাবী ছিল তিনি যেন হেনরির প্রস্তাবিত 'ওথ অফ সুপ্রিমেসি'-তে স্বাক্ষর করেন। এই শপথ নেবার অর্থ মোর মেনে নিয়েছেন রাজা অষ্টম হেনরিই ইংল্যান্ডের চার্চের সর্বাধিনায়ক, এবং তিনি বিনা প্রশ্নে হেনরির প্রতি অনুগত থাকবেন। ঈশ্বরের বিধানে অটুট বিশ্বাস রাখা মোর শত অত্যাচার এবং জেলবাসের পরও তাঁর অবস্থান থেকে নড়েন নি। মানসিকভাবে এবং নৈতিকভাবে হেরে গিয়ে ���্ষেপে বোম হয়ে হেনরি শেষতক মোরকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৫৩৫-এর ৬ জুলাই লন্ডনের টাওয়ার হিলে এ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। টাওয়ার হিল স্থাপনাটি বানানোই হয়েছিলো বিখ্যাত এবং উঁচু পদে আসীন ব্যক্তিদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করবার জন্য।
সব গল্পেরই তো একজন নায়ক আর একজন ভিলেন থাকে। বোল্টের এ নাটকের নায়ক অবশ্যই থমাস মোর। আদর্শবান মোর নীতির প্রশ্নে একবারও মাথা নত করেন নি। বারবার হুমকি দেয়া হয়েছে, পরিবার থেকে দীর্ঘদিন আলাদা করে রেখে ভীষণ ছোট এবং নোংরা একটি জেলে আটকে রাখা হয়েছে, খাবার দেয়া হয় নি, তবুও হেনরির সাথে আপোষে যান নি মোর। বোল্টের নাটকে দেখা যায় মোরের প্রটেস্ট্যান্ট শুভানুধ্যায়ীরা এসে তাঁকে বুদ্ধি দিচ্ছেন, ওপরে ওপরে হেনরির প্রতি আনুগত্য এনে মনে মনে তাঁকে অস্বীকার করলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়, তিনি সেটি কেন করছেন না। মোর জবাবে বলেন, যে ঈশ্বরের আনুগত্য পেতে অমন ছলাকলার প্রয়োজন হয়, তিনি সে ঈশ্বরের পূজারী নন, তাঁর ক্যাথলিক ঈশ্বরের রুচি অনেক বেশী সূক্ষ্ম। মোরের চরিত্রের এই দৃঢ়তার দিকে ইঙিত করেই বোল্ট তাঁর নাটকে মোরকে ম্যান ফর অল সিজনস বলেছেন; রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, হিম-প্রকৃতি যেমন রূপই নিক, গোটা বছরটা জুড়ে মোর এক কথারই মানুষ। নাটকের ভূমিকাতেই বোল্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন খ্রিষ্ট ধর্মে তাঁর মোটেই বিশ্বাস নেই, কিন্তু এ ধর্মটি রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারানো থমাস মোরের প্রতি তাঁর রয়েছে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধাবোধ, যে কারণে এ নাটকটি আদৌ লেখা। মোরের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পাঠকও যেন নিজের মতের প্রতি অবিচল থাকেন-প্রকারান্তরে সে আহবান-ই জানিয়েছেন বোল্ট।
থমাস মোর জীবদ্দশাতেই ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। এ বিষয়ে তিনি বেশ কয়েকটিই বই লিখেছিলেন, যেগুলোর মাঝে আজ সবচেয়ে বিখ্যাত 'ইউটোপিয়া' বইটি। এ বইতে তিনি একটি আদর্শ সমাজের কল্পিত ছবি এঁকেছিলেন, যেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোন বস্তু নেই। সমাজের সবাই সম্পদের ভাগাভাগি করে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজগুলো সারে। ব্যক্তির মালিকানায় যেহেতু কিছুই নেই এ সমাজে, তাই এখানে ক্ষমতার দখল নিয়ে খেয়োখেয়িও নেই। মোরের এ বইটির ৩ বছর আগে ১৫১৩ সালে মাকিয়াভেল্লি ইতালিতে বসে লিখেছিলেন মোরের ঠিক উল্টোরথী বই 'দ্যা প্রিন্স', যেখানে ক্ষমতাই মূল। 'প্রিন্স'-এ মাকিয়াভেল্লি দেখিয়েছিলেন আদর্শ রাজপুত্রকে ক্ষমতার চূড়ান্তে উঠতে হলে হাতে যত রক্ত মাখার, মাখতে হবে, বন্ধুকে পায়ে পিষতে হলে পিষতে হবে, প্রতি মুহুর্তে বয়ান পাল্টে ফেলবার হলে পাল্টে ফেলতে হবে, কিন্তু ক্ষমতায় যাবার পর জনগণের উন্নতির জন্য কাজ করতে হবে (I have to be cruel only to be kind)। পশ্চিম তথা আমেরিকাকে আমরা মাকিয়াভেল্লিয়ান বলেই জানি, বিশেষত, হেনরি কিসিঞ্জার যখন বলেই দেন, "America has no permanent friends or enemies, only interests”, তবে মোরের স্বপ্নের ব্যক্তিমালিকানা-বিহীন সমাজ গঠন করবার চেষ্টা যাঁরা করেছেন, সেই লেনিন-স্টালিনরা হাতে যথেচ্ছ রক্ত মাখতে দ্বিধা করেন নি কখনোই, ব্যখ্যাও সবসময় তাঁদের প্রস্তুতই ছিলো, মাকিভেল্লির মতোই তাঁরাও বলেছেন, "I have to be cruel only t…”। মোরপন্থী কি মাকিয়াভেল্লিপন্থী-যে পথেই আপনি হাঁটুন, অজুহাত আপনার ওই একটি-ই।
বোল্ট ভিলেন বানিয়েছেন হেনরির দরবারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হেনরির 'চিফ মিনিস্টার' থমাস ক্রমওয়েলকে। বোল্ট দেখিয়েছেন কিভাবে ধূর্ত ক্রমওয়েল ক্রমশঃই মোরের প্রতি হেনরির মন বিষিয়ে গেছেন, কথার প্যাঁচে ফেলে কিভাবে সাজানো বিচারে মোরকে অপ্রস্তুত করেছেন বারবার। কিছুটা ধীরলয়ে শুরু হওয়া এ নাটক প্রহসনের বিচারের এ দৃশ্যে এসে হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়িয়ে দেয়। সাজানো বিচারের দেশের মানুষ বলেই ক্রমওয়েলের মাঝে বাস্তবের অনেক চরিত্রের প্রতিফলন স্পষ্ট দেখতে পাই, হয়তো সেটা দেখানোই বোল্টের উদ্দেশ্য ছিল। নাটকে বিভিন্ন দৃশ্যের মাঝে ছোট একটি চরিত্র ক্ষণিকের জন্য উঁকি দিয়ে যায়। এ চরিত্রটির নাম 'কমন ম্যান'। আমজনতার প্রতিনিধি এ কমন ম্যানের বয়ানেই নাটক শুরু হয়, এরপর গোটা নাটকে তার বিশেষ কোন ভূমিকা থাকেনা। নাটকের শেষে কমন ম্যান ধোপ পাল্টে জল্লাদ হয়ে থমাস মোরের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। এটিই আমাদের আমজনতার মূল চরিত্র। শাসনযন্ত্রের সিদ্ধান্তে আমাদের কোন ভূমিকা থাকেনা, কিন্তু আমরাই শাসকের বেতনভুক্ত জল্লাদ হয়ে শাসকের শত্রুর মাথা কেটে নেই।
ওহ, থমাস মোরকে সরিয়ে দিতে যে থমাস ক্রমওয়েল অতো ষড়যন্ত্র করলেন, তাঁর কি হয়েছিলো শেষতক? আর সেই অ্যান বোলিন? যাঁকে বিয়ে করবার জন্য হেনরি পোপকেও মধ্যমা দেখিয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা জারী করেন? খেয়ালী হেনরি কয়েক বছর পরই এঁদের দুজনেরই শিরোচ্ছেদ করেন। অ্যান বোলিন-এর পর হেনরি আরও ৪টি বিয়ে করেছিলেন, এঁদের ২ জনের প্রাণদণ্ড দেন। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, এই দু'বারও শিরোচ্ছেদ!