🌿📔সদ্য পড়ে শেষ করলাম সাহিত্যিক দীনেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা “সেকালের চিত্র চরিত্র”! লেখকের লেখা এর আগে পড়া হয়নি। ‘সেকালের চিত্র চরিত্র’ বইটির মাধ্যমে আমার প্রথম পরিচয় হলো লেখকের লেখার সাথে। এটি একটি গল্পের সংকলন, বইতে মোট বাইশটি গল্প রয়েছে..... সব গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে রিভিউ অনেক বড় হয়ে যাবে, তাই আমার ভালোলাগা বেশ কয়েকটি গল্প নিয়ে আজকের আলোচনা....
🌿📔পুনর্মিলন ~ রাধাকান্ত তাঁত বুনিয়া কষ্টে সংসার প্রতিপালন করিত। দুই পুত্র ও পত্নী ভিন্ন সংসারে তাহার আর কেহ ছিল না। তাহার তাঁতের শক্তি ছিল না যে চারি জনের পেট ভরাইতে পারে। রাধাকান্তর কোন এক সময়ে মনে হয়েছিল তাঁত ফেলিয়া ভিখার ঝুলি লইয়া গৃহস্থের দ্বারে দাঁড়াতে হবেই... কিন্তু সে ভেক লইতে পারিল না। অনাহরে,থাকিয়া অতি কষ্টে সংসার প্রতিপালন করিতে লাগিল। ইতিমধ্যেই রাধাকান্তর পুত্র নলিনী ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় পাশ হইয়া গ্ৰাম্য এক উচ্চপ্রাথমিক পাঠশালায় পন্ডিতি লাভ করিল। রাধাকান্ত ভাবিল,মা অন্নপূর্ণা এইবার যদি দুবেলা দুমুঠো মাপান। সত্যই কি মা অন্নপূর্ণা এই পরিবারের সহায় হয়েছিলেন? রাধাকান্তের ইচ্ছে ছিল সমান ঘরে পুত্রের বিবাহ দেবেন। কিন্তু নলিনী এক উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে শিবরাণীকে বিবাহ করে। কিছুদিন পর শিবরাণী শাশুড়িকে বলিল_'মা তুমি ছোটো ছেলেকে নিয়ে ভিন্ন হয়ে রেঁধে খাও কর্তা আমাদের দিকে থাকুক...... শেষ পর্যন্ত কি শিবরাণী নিজের মতো করে থাকতে পেরেছিল এই পরিবারে?
🌿📔স্বায়ত্তশাসনের সুখ ~ এই গল্পে দেখানো হয়েছে এক গরীব ব্রাহ্মণ-এর পুত্র কিভাবে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলছে..... বিশ্বরূপের মৃত্যুর পর পুত্র ধিনিকৃষ্ণ সংসারে অন্ধকার দেখিতে লাগিলো। ধিনিকৃষ্ণ-এর মনে হয়েছিল পিতা গলায় একখানি দুর্বহ পাষাণ বাঁধিয়া তাঁহাকে ভবের মাঠে চরিতে ছাড়িয়া দিয়া গিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণ-এর পুত্র হয়েও পূজাপাঠে মন বসতো না তার। সে কন্ট্রাক্টরের কাজ শুরু করার জন্য রাজীবলোচনপুরের মিউনিসিপাল চেয়ারম্যান নন্দলাল বাবুর কাছে গিয়েছিলেন সাহায্যের জন্য...... নন্দলাল বাবু কি সাহায্য করেছিলেন ধিনিকৃষ্ণকে? অন্যদিকে মিউনিসিপাল-এর ভাইস চেয়ারম্যান প্রাণবল্লভ বাবুর মাথায় যে দুষ্টু ফন্দি এসেছিল,কি সেই দুষ্টু ফন্দি?প্রাণবল্লভ বাবু কি সফল করতে পেরেছিলেন নিজের দুষ্টু ফন্দিতে?
🌿📔গৃহহীন ~ ফতাইপুর গ্ৰামের বাসিন্দা মহেশ দাস। পিতা গোবিন্দ দাস একজন সম্পন্ন চাষি গৃহস্থ ছিলেন। গোবিন্দ দাস তীর্থ স্থান বৃন্দাবনধামে গিয়ে মারা যান। পিতার মৃত্যুর পর মহেশ দাস চতুর্দিক অন্ধকার দেখে। পিতার শ্রাদ্ধের কাজ সম্পন্ন করার জন্য বন্ধু জগবন্ধুর পরামর্শে সুদের কারবারী গোপীনাথ এর থেকে চড়া সুদে টাকা ধার নেয়। পিতার শ্রাদ্ধের কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে মহেশ দাস সর্বস্বান্ত হয়ে ছিলো। শেষ পর্যন্ত কোন খাতে বইতে চলেছে মহেশ দাসের জীবন?
🌿📔ডাক্তারের নির্বুদ্ধিতা ~ সনৎকুমার নন্দী পেশায় একজন ডাক্তার। সনৎকুমারকে তার মা বলেছিলেন 'গরীবের দুঃখ কষ্ট দূর করিস বাছা..... পিতৃ -আজ্ঞায় সনৎকুমার চাকরি গ্ৰহণ করিলেন কলিকাতার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। দুই বৎসর পরে মানিকনগর মহকুমার দাতব্য চিকিৎসালয় জয়েন করেন। এখানে দেখলাম কিছু কটু ডাক্তার সনৎকুমারকে নিজেদের দলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। সনৎকুমার কি পারবেন নিজের চিন্তা ভাবনা নিয়ে অটুট থাকতে? তাঁর মায়ের কথা কি রাখতে পারবে? নাকি ওই কটু ডাক্তারদের সাথে হাত মেলাবে? এই গল্প আমার ভীষণ ভালো লেগেছে আমিও চাই বাস্তবে সনৎকুমার এর মতো চিন্তা ভাবনা যেন প্রতিটি ডাক্তারের থাকে। আমি বা আপনার সবাই দেখি সরকারি দপ্তর গুলোই ঠিক মতো চিকিৎসা হয় না। এতে বেশি সমস্যা হয় গরীব মানুষের কিন্ত এই গল্পের ডাক্তার সনৎকুমার ভালোভাবে শিখিয়ে দিলেন কীভাবে গরীব মানুষের চিকিৎসা করা যায় এবং পাশে থাকা যায়!
🌿📔ল্যাংড়ার কলমে আমড়া ~ এই গল্পে নীল বিদ্রোহ সময়টা তুলে ধরা হয়েছে। নীলের চাষ, নীলের ব্যাবসা, গরীব চাষীদের ওপর ইংরেজদের অত্যাচর ইত্যাদি। লালগোলাপ নামে একজন ভাগ্যবান পুরুষ ছিলেন। যিনি রেশমের ব্যবসায় তিনি বহু অর্থ উপার্জন করতেন। একবার রেশমের ব্যাবসায় তিনি এক লক্ষ টাকা লাভ করিলেন। সেই বার চতুর্দিকে জনরব প্রচারিত হইল, দস্যুরাজ বিশ্বনাথবাবু পদ্মা পার হইয়া আসেন লালগোলাপের ধনভাণ্ডার লুণ্ঠন করিতে..... লালগোলাপ কি পেরেছিল দস্যুরাজ বিশ্বনাথবাবুর হাত থেকে তাঁর ধনভাণ্ডার রক্ষা করতে ?
🌿📔শ্যাম বাউল ~ এই গল্পে শ্যাম বাউল নবদ্বীপের কীর্তনীয়া সম্প্রদায়ের দলপতি ছিল। একালে কীর্তনের প্রাদুর্ভাব অনেক পরিমাণে হ্রাস প্রাপ্ত হইয়াছে। কিন্তু চৈতন্যদেবের পরবর্তী যুগে রাধাকৃষ্ণ সম্বন্ধীয় মধুর ভাবপূর্ণ কীর্তনে রাঢ় ও বঙ্গ প্লাবিত হইয়া গিয়াছিল এবং তৎকালে মহাজন বিরচিত পদাবলীর অত্যন্ত আদর ছিল। এই সকল কীর্তনীয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্যাম বাউলের স্থান অতি উচ্চে ছিল। শ্যাম বাউল প্রতিদিন মহারাজের দরবারে গিয়া দাড়িইয়া থাকিতো। একদিন রাজা তাঁহার অমাত্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন এই লোকটি কে, কেনই বা সে প্রত্যহ দরবারে আসিয়া দাঁড়াইয়া থাকে। রাজার কথা শুনিয়া দেওয়ানজি শ্যামকে জিজ্ঞাসা করিলেন _'তুমি কে বাপু? শ্যাম তখন নিজের পরিচয় দেন এবং বলেন আমি রাজবাড়ীতে একপালা কীতন গাহিব, এটা আমার অনেক দিনের আশা। রাজা অনুমতি দিলেন কিন্তু এক শর্ত..... কি সেই শত? শেষ পর্যন্ত কি শ্যাম রাজবাড়িতে কীতন গাহিতে পেরেছিলেন?
🌿📔গদাই পন্ডিত ~ এটা এক দারুন গল্প অনেক কিছুই শিখলাম এই গল্পের মাধ্যমে। গল্পের নাম গদাই পন্ডিত আর এই গল্পেও আছেন একজন পন্ডিত যিনি গদাই পন্ডিত নামেই পরিচিত। গদাই পন্ডিত একজন অলস মানুষ আমি চাই এমন পন্ডিত যেন কোন স্কুলে সার্ভিস না করে। স্কুলের শিক্ষক যদি না ঠিক থাকে ছাত্র ছাত্রীরা কি ভাবে শিক্ষা পাবে? সব সময় নিজের স্বার্থে চলেন এই গদাই পন্ডিত। বেশি আলোচনায় গেলাম না এই গদাই পন্ডিত কে নিয়ে।পুরো ঘটনাটা জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে এই গল্প । আমার ভীষণ ভালো লেগেছে এই গল্প আপনাদেরও ভালো লাগবে আশা রাখছি।
🌿📔কুন্ডুমশাই ~ শৈশবেই পিতৃহীন হইয়াছিলেন কুন্ডুমশাই। বিধবা মা স্বজাতি দে মহাশয়ের বাড়ি রাঁধুনিগিরি করিয়া পুত্রের পরিপালন করিয়াছিল। দে মহাশয়ের পরামর্শে মায়ের দুঃখ ঘোচানোর জন্য ফটিক কাজের জন্য কলকাতায় চলে যায় এবং ধীরে ধীরে সে অনেক বড়ো ব্যাবসাহী হয়ে ওঠে। একটা সময় ফটিক হয়ে ওঠে কুন্ডুমশাই। এবং টাকার নেশায় অন্ধ হয়ে যায়। ফটিক বাড়িতে মায়ের কাছে আসাও বন্ধ করে দেয়। ফটিকের মায়ের দুঃখ কি ঘুচেছিল শেষ পর্যন্ত.... কোন খাতে বইতে চলেছে ফটিকের মায়ের জীবন?
🌿📔গুরুঠাকুর ~ বন্দাবনচন্দ্রের পিতা জমিদার ছিলেন তাঁহার পিতামহ ও প্রপিতামহ প্রবলপ্রতাপে বিস্তীর্ণ জমিদারি শাসন করিতেন । বৃন্দাবনচন্দের পিতা তাঁহার সমগ্র জমিদারির পত্তনী বন্দোবস্ত করিয়া যে পরিমাণ বাষিক মুনাফা রাখিয়া গিয়াছিলেন এবং তাঁহার সিন্দুকে যে পরিমাণ নগত টাকা ছিল,তাহা তাদের পাঁচ ভাইয়ের সংসারযাত্রা নির্বাহের পখ্যে যথেষ্ট। কি এমন ঘটনা ঘটলো.... যার জন্য বৃন্দাবনের বাড়ি -��র নিলাম হইয়া গেল। বৃন্দাবনকে তার মেজদাদার বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল কেন? বৃন্দাবন কোন উদ্যেশ্য নিয়ে পাড়ার পাড়ায় সংকীর্তনের দলে যোগদান করিলেন? সংসারে স্ত্রী, ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে থাকার সত্ত্বেও সরসারে মতি নেই কেন বৃন্দাবনের? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে এই গল্পে!
🌿📔ঘোষাণী ~ এটা এক দারুন গল্প। এই গল্পে দেখলাম কালাচাঁদের স্ত্রী ঘোষাণী উনি একজন গোয়ালিনি। আধশের দুধে আধশের জল মেশাতো ঘোষাণী, কখনো কখনো হাতেনাতে ধরা পড়ছে। কিন্তু ঘোষাণী এতো চতুর যে সবাইকে ঠিক বুঝিয়ে শান্ত করতেন। বেশ ভালোই চলছিল ঘোষাণীর এই দুধ আর জলের বিসনেস। হঠাৎ করেই ঘোষাণীর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার...... কি ঘটতে চলেছে ঘোষাণীর জীবনে? জানতে হলে অবশ্যই গল্পটি পড়তে হবে!
“ব্যক্তিগত মতামত” বই পড়ার পর একটা আলাদাই অনুভূতি। এক কথায় বলতে গেলে অসাধারণ একটি বই। আর সুপ্রকাশ এর বই নিয়ে কোনো কথাই হবে না, বইয়ের বাঁধাই পেজ কোয়ালিটি দারুন। আমি এই বই আনেকটা সময় নিয়েই পড়েছি। কারণ এখন যে সমস্ত বই পড়ি তা চলিত ভাষায় আর এই বই সম্পূর্ণ সাধু ভাষায়। এই বই যদি আপনি শুরু করেন তাহলে অবশ্যই অনেকটা সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে পড়লে ভীষন ভালো লাগবে। আর প্রত্যেকটা গল্পে রয়েছে চমৎকার স্কেচ স্টাইলের অলঙ্করণ যা একটা আলাদা মাত্রা যোগ করে গল্পের মেজাজে। আর এই বইয়ের প্রচ্ছদটাও ভীষণ সুন্দর।
অসাধারণ বই। দুর্দান্ত সম্পাদনা। রবার্ট ব্লেকের মতো বালখিল্য পাল্প-ফিকশন ছাড়াও দীনেন রায়ের কলমে বাংলার পল্লী জীবন, তার মানুষজন, সমাজ নিয়ে এমন সব মণিমুক্ত ধরা রয়েছে, এ বই সেসবের মাল্যগাঁথা।