এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। একটা স্কুল। একটা মফস্বল। তার ধার দিয়ে বয়ে যাওয়া কুন্তী নদী। বিঘ্ন সময়-সমাজ, যাপনের বিপন্নতা, মূল্যবোধের ভাঙচুর - সব পেরিয়ে এক স্বপ্নভুবনের কথা 'অনন্যবর্তী'।
"অনন্যবর্তী " খুব সাধারণভাবে বলা সাধারণ মানুষের গল্প হয়েও কেন অনন্য তা নির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল। এই জায়গা, এই নদী, এই সময় আর এই মানুষগুলো হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে আমাদের সহজ জীবন। শোভন, টুকু, তরণী, তনয়; অন্যদিকে সতীশচন্দ্র, শচীপ্রসাদ, ফণিভূষণের জীবনকে কি আদৌ সহজ বলা যায়? কেউ অসুস্থ, কারো মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা, কারো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, কারো টাকার অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হতে চায়, সমাজের জন্য কিছু করতে গেলে বাঁধা আসে অতর্কিতে - কতো কতো সমস্যা!কিন্তু তাদের জীবনে প্রেম আছে,সহমর্মিতা আছে, হাতের ওপর হাতের স্পর্শ আছে; আছে জীবনকে বুঝবার চেষ্টা ও প্রেরণা। অলক্ষ্যে, আচমকা রাজনীতিও ঢুকে পড়ে গল্পে। একদিকে কিশোর বয়স থেকে তারুণ্যে পৌঁছা একদল মানুষ, অন্যদিকে তাদের বাবা মা আর সমাজ নিয়ে আরেক সমান্তরাল উপাখ্যান। সমাধান নেই, তার সাথে মেনে চলা আছে;পরিণতি নেই, বয়ে চলা আছে। আর আছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। লেখক সবসময় তার সময়কে মানসিকতায় অতিক্রম করতে পারেননি (বিশেষত মেয়েদের নিয়ে) কিন্তু তার মধ্যে বিভূতিসুলভ স্থৈর্য ও জীবনের প্রতি তীব্র সংরাগ আছে। পড়তে পড়তে মনে হয়, এখানে যেতে পারলে মন্দ হতো না। এই সহজতা আর সামষ্টিক ভালোবাসা এখন যে বড়ো প্রয়োজন!
গল্প বলা বেশ সহজ কাজ, কিন্তু সহজ করে গল্প বলাটা খুব কঠিন। সহজ গল্প সহজভাবে বলা কতবড় সাহিত্যিক গুণ সেটা সমসাময়িক লেখকেরা যেন ভুলতে বসেছেন।অহেতুক জটিলতার ছড়াছড়ি সবখানে!
ছত্রে ছত্রে কাব্যিকতা, উপমার বাহার, অলঙ্কারের আধিক্য ব্যতীত গল্পকার সরল একটা সময়ের গল্প বলে গেলেন তার চেয়েও সরলভাবে। অনন্যবর্তী'র সরলতা মনে থাকবে অনেকদিন।
"আহাম্মকের খুদকুড়ো" এর প্রিভিউ কপির কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে দুর্লভ সূত্রধরের প্রতি একধরণের আস্থা জন্মেছিল, তিনি হতাশ করবেন না। তিনি হতাশ করেননি। প্রত্যাশার পারদ আরো খানিকটা উপরে উঠে গেলো।
এমন গল্প অতীতে বহুবার বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে বলা হবে আরও বহুবার। তবুও দুর্লভ সূত্রধরের লেখা পড়তে বিরক্তি লাগে না। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা সব মিলিয়ে দিলে যে জীবন জন্ম নেয় তা বড়ই সুন্দর হয়ে ফুটে ওঠলো।
একটা সুন্দর ছিমছাম মিনিমালিস্টিক বই। শৈশব, বেড়ে ওঠা, জীবন ও জগতকে দ্যাখার গল্প। সহজ সাধারণ কিছু মানুষের পার্সপেক্টিভ থেকে।
গল্পের ন্যারেশন খুবই লিনিয়ার, কিন্তু নান্দনিক। রূপক উপমার পরিমিত ব্যবহার। প্রকৃতির বর্ণনায় ন্যূনতম মনোটনি নেই।
শৈলী বিচারে অনন্যবর্তী'র সাথে মণীন্দ্র গুপ্তের 'অক্ষয় মালবেরি'র তুলনা করা যাইতে পারে। অবশ্য প্রথমটা ফিকশন, দ্বিতীয়টা নন। পড়তে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছি উভয় ক্ষেত্রে। মালবেরি আমার বেশিই প্রিয়।
অনন্যবর্তী এক ইউটোপিয়ান গল্প। এক স্বপ্নের রাজ্যের গল্প। একটা সুন্দর গল্প। এখানে মানুষ মানুষের পাশে দাড়ায়। বাস্তব দুনিয়ার পঙ্কিলতামুক্ত এই গল্প পড়ার সময় মনের মধ্যে প্রশান্তির এক মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে যায়। বাস্তব দুনিয়ার সেই পঙ্কিলতার কিছুটা আভাস দিয়েও লেখক তার পাঠকের কাছে জীবনের সুন্দর দৃশ্য আঁকেন। জীবনের জটিলতা বিবর্জিত এই গল্প দিয়ে হয়তো জীবনকে জটিলতামুক্ত করা যাবে না। কিন্তু এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনটা কতোটা সুন্দর হতে পারে। একটা আদর্শ স্থাপন করেন লেখক। এই গল্পগুলো মানুষের সংবেদনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করে।
আদর্শ জীবনেও দুঃখ থাকে। কিন্তু সেখানে দুঃখের সাথে একা লড়তে হয় না। কঠিন বাস্তবতার মধ্যে এই গল্প আমাদের মনে শান্তির ছায়া দেয়।
লকডাউন পিরিয়ডে মিহির সেনগুপ্তের 'সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম' বাদেও, আরেকটি অসামান্য স্মৃতিগদ্য পড়েছিলাম, 'আহাম্মকের খুদকুড়ো'। দুর্লভ সূত্রধরের লেখা। সমকালীন লেখক-লেখিকাদের ভীড়ে দুর্লভ সূত্রধরকে তখনই অবশ্যপাঠ্য হিসেবে আলাদা করে রেখেছিলাম। তাতে যে বিন্দুমাত্র কোনো ভুল ছিলো না তার প্রমাণ তাঁর পরবর্তী উপন্যাস 'অনন্যবর্তী'। সাম্প্রতিককালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের তালিকায় প্রথম সারির দিকে নির্দ্বিধায় যাকে রাখা যায়। কেন রাখা যায় অথবা দুর্লভ সূত্রধর বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কেন অবশ্যপাঠ্য—তারই খানিকটা আলোচনা-পর্যালোচনা পরবর্তী অংশে থাকবে। অনন্যবর্তী উপন্যাসের প্রেক্ষিতেই।
"ঘরেও নহে, পারেও নহে যে জন আছে মাঝখানে,...' সেই তাঁদের প্রতিদিনের বেদনাকে সেই তাঁদের জেগে-ওঠা ভোরগুলোকে"
—উপন্যাসটির উৎসর্গপত্রে লেখা। এই কয়েকটি লাইনের মর্মবস্তু উপলব্ধির প্রয়াস করতে করতেই পাতা উল্টানো বইটির। শোভন, তনয়, তরণী, তপেশ, মনোজ, টুকু, কাজু, শিবু—একদল ছেলে-মেয়ে। যাদের জীবনে কোনো ম্যাজিক নেই। কিন্তু তাদের যাপন, বেড়ে ওঠা, জীবনবোধ, হতাশা-আশা, জীবনের নানা ভাঙচুর পেরোতে পেরোতে মাথা তুলে মতাদর্শনিষ্ঠ চলমানতার ম্যাজিক-ই গোটা উপন্যাসটির মূল উপজীব্য। সে গল্পের পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে বয়ে গেছে আরেক গল্পও। শচীপ্রসাদ, সতীশচন্দ্র, ফণিভূষণ, নীরদ—জীবনের পড়ন্ত আলোর দিকে যেতে যেতেও, মধ্যবিত্ত যাপনের বিপন্নতা, সংসারের স্বার্থ-পরার্থের নানা বোঝাপড়া পেরিয়ে এসেও, যাঁদের জীবন থেকে স্বপ্ন দেখার অমল চোখটি হারিয়ে যায়নি। বিযুক্তির স্বেদ আর বেদনার অনুভব তাঁদের বেঁধে দিয়েছে একে অন্যের সাথে। শুধু কী তাঁদের? চাষী আখে, জাহান চাচা, আনোয়ার চাচি, ঊষা-মা, স্বর্ণঠাকুর—কত যে মানুষ! বিচিত্র এক মায়াবী আলোয় বাঁধা হয়ে আছে সবাই। উপন্যাসটির শেষের দিকে আসতে আসতে আমরা দেখতে পাবো শচীপ্রসাদদের সেই স্বপ্নের-ই উড়ান। এক যৌথ কমিউন। শটিডাঙা। কিন্তু সেসব তো আরোও পরে। তারও আগে বয়ে চলা কুন্তী নদী ধরে রেখেছে আরো কত দৃশ্য..! আরোও কত যে আখ্যান!
অবনদার নাইট স্কুল, কৃষ্ণাদি, পিপু, কুসুমিতা, তরুবালা—এরাও তো রয়েছেন। রয়েছে আনন্দ দাদা আর আনন্দীদিদি—মফস্বলের কুৎসাপ্রিয় মানুষদের কৌতুহল ভেসে বেড়ায় যাদের ঘিরে, তারাই এই ছেলে-মেয়ের দলটির তাপিত জীবনে একটুকরো স্নেহ এঁকে দেন। আনন্দদাদা বলতে পারেন—'যখন তখন, যেখানে সেখানে মাথা নীচু করবে না বাবারা। আমি সামান্যি মানুষ। আমি কে, কেমন মানুষ, তোমাদের পেন্নামের যুগ্যি কী-না, তা না জেনে মাথা নীচু করবে কেনে?' আর 'মেগে-খাওয়া অন্নই তাঁর কাছে ঈশ্বর' বলা আনন্দীদিদির সাথে কখন যেন রবীন্দ্রনাথের বোষ্টমী আনন্দীকে মিলিয়ে ফেলে ছেলে-মেয়ের দলটি। সে মোকামের ছায়াঘন প্রাঙ্গনে ফল, নাড়ু, বাদাম-তক্তির সাথে জমে উঠে তাদের কোনো কোনো বিকে���ের সান্ধ্যআড্ডা। তরণীর ভেন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারে মাকে নিয়ে আলাদা করে দেওয়া তরণীর সংসারের 'বিকল্প ব্যবস্থা'র পরিকল্পনাস্থলও।
অবন��ার নাইট স্কুলে মতাদর্শের জন্য ছেলে-মেয়ের দলটির শ্রমদান করার মাঝে এসে দাঁড়ায় অনুচ্চকিত রাজনীতি। শুধু নাইট স্কুলের প্রেক্ষিতেই নয়, গোটা উপন্যাসটি জুড়েই। এবং এখানেই সমকালীন সাহিত্যিকদের ভীড়ের বিপরীতে দাঁড়ানো দুর্লভ আক্ষরিক অর্থেই 'দুর্লভ' হয়ে উঠেন। একটা নুয়ে পড়া মূল্যবোধহীন সমাজে মতাদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিনির্মাণের সুরটি ভনিতাবিহীন স্পষ্টতায় ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
বাবা-ছেলের কথোপকথনের মাঝে উপন্যাসটিতে উঠে আসে মতাদর্শের প্রতি হুজুগেপনার বিপরীতে দায়বদ্ধতা এবং লক্ষ্যে স্থির থেকে চলমানতার পথ-নির্দেশ---
'মনে রেখো যে-কোনো আদর্শই শুনতে ভালো, কিন্তু তার প্রয়োগ-পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল এবং কষ্টসাধ্য এক প্রক্রিয়া।'
ক্ষয়ে যাওয়া, পচে যাওয়া, হাতকচলানো মানসিকতার পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশে দাঁড়িয়ে দুর্লভ স্পষ্ট ভাষায় বলে যেতে পারেন—
'আমাদের মতাদর্শ আসলে কর্মের পথ-নির্দেশিকা।'
অবনদার মতাদর্শহীন কর্মকান্ডে, কৃষ্ণাদির প্রতি তার ব্যবহারে, বিক্ষুব্ধ ছেলে-মেয়ের দলটির বেশীরভাগ সদস্য যখন নাইট স্কুলে যাওয়া বন্ধ করতে চায়, তখন শোভনের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়—
'কারোর মুখ চেয়ে তো আর নাইট স্কুলে যাই না, যাই ঐ যে কী বলে—মতাদর্শের জন্য। কারোর জন্য তাই ছাড়বোও না।'
টুকু বাধা দিতে চাইলে শোভন আরোও বলে—
'আমি তনয়কে বোঝাবো, সে তুমি ভেবো না। দেখছো না, সবটা তো আর সলিল সমুদ্র নয়। চারদিকে এত যে জরুরী আইন, নানা ধরণের কানুন, রাষ্ট্রশক্তির দাপাদাপি, বিরোধীদের পাইকারি ধরপাকড়—তাতে কি মানুষের আন্দোলন থেমে গেছে। প্রতিদিনই তো কোথাও-না-কোথাও মিছিল-মিটিং-আন্দোলন-প্রতিবাদ হচ্ছে। সুতরাং কাছাকাছির ছোটোমাপের ঘটনা দেখে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না। কোনোকিছু নিয়ে ভেবেই নিজেকে কষ্ট দিও না।'
এসময়ের সবচেয়ে জরুরী রাজনৈতিক লাইনটিও এখানে নির্মাণ করে দিয়ে যান দুর্লভ।
গোটা উপন্যাসটিতে অন্যান্য মানবিক অনুভূতির সাথে এসেছে প্রেমও। সে প্রেম মানুষ-মানুষীর জৈবিক চাহিদা আর স্বার্থ-পরার্থের বোঝাপড়ার মাঝে আটকানো প্রেম নয়। বরং তার সুরটির মাঝে কখন যেন ডুমাটোলার দাদুর সেই উক্তিটিই পরম সত্য হয়ে ধরা দেয়—
'হমারা জীবন সির্ফ হমারা অকেলা নহি হ্যায়, সবারটা মিলিয়ে তবে আমাদের এক একটা জীবন। তোমার জমানো খুদকুড়োর মধ্যে দেখবে আছে কত লোকের জীবনের দিনরাত, কিতনে লোগো কা জীবিত রহনা। কতজনের কত কথার কত শব্দ, দিল কী বাত, কতজনের কত গান, বুদ্ধি কী কিতনা সুগন্ধ, বিচারো কা হীরা-জহরৎ। সোচো দাদুভাই, ইয়ে কেবল আপকি চিজেঁ নহি হ্যায়---বলতে গেলে তোমারই নয়।…'
তাই কুন্তীর পারে শোভন-টুকুর সবচেয়ে নিবিড় প্রেমের সংলাপটি হয়ে উঠে—
'কোনো কিছু নিয়েই কষ্ট পেও না, খুব পরিকল্পনা করে কিছু করার সুযোগ তো আমাদের মতো পরিবারের ছেলেমেয়েদের নেই টুকু। কিন্তু যা করব, তোমাকে সঙ্গে নিয়েই করবো।'
শোভনের দেওয়া প্রেমপত্রের ছত্রে ছত্রেও তাই উঠে আসে দিনবদলের স্বপ্ন। সবাই মিলে। সবটা মিলে। শোভন লিখে—
'.......তুমি তো জানো টুকু, আমি কী স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্নে বাড়ি-গাড়ি নেই, আছে সকলের হাসি-আনন্দ গানে ভরা পৃথিবীর স্বপ্ন। বদলানোর কাজটা কিন্তু সহজ নয়। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে সেটা হবে না? নিশ্চয়ই হবে।'
চিঠির উত্তরে টুকুর গলায়ও সেই একই স্বপ্নভূবনের সুর—
'এইচ. এস.-এ বাজে রেজাল্ট যদি করো তাহলে এসব কাজে বাধা দেবো। সবাই মিলে চেষ্টা করব। কিন্তু সেটা করতে হবে বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে। বাড়িতে, ঘরের মধ্যে, পাড়ায় সব অসমতার চটজলদি প্রতিকার হয়? আমরা নিশ্চয়ই সুখী সুন্দর পৃথিবীর জন্য কাজ করবো, একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, নিজেকে গড়ে তুলে, চারপাশটাকেও গড়ে তুলব আমরা।'
—আর শচীপ্রসাদ নিজের আত্মজাকে লেখা এক সদ্য-তরুণের চিঠিপত্র হাতে ধরে রাগ করবেন কী, স্বপ্নিল এক ঘোরের মধ্যে পড়ে যান। তিনি জানেন শোভনের স্বপ্ন এই সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনৈতিক স্বপ্নের জগত আর তার বহুধাবিস্তৃত প্রয়োগগত কর্মকান্ডের মাঝে অবিকৃতভাবে সফল হবে না। তবু দুটি সদ্য তরুণ-তরুণীর এই উচ্চাশাময় প্রেম বহুকাল পর তাকেও স্বপ্নাদিষ্ট করে দিয়ে যায়। প্রেমপত্র উদ্ধারের পর কুসুমিতার রাগেরও কোনো সঙ্গত কারণ তিনি খুঁজে পান না। কুন্তীর পারে বৈকালিক ভ্রমণে তাই তিনি কুসুমিতাকে বোঝান—
'জীবনে চলতে চলতেই নিজের ভালো-মন্দ বুঝবে টুকু। পরের ভালো বুঝতে বুঝতেই নিজের ভালো বোঝাটা সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। আর যদি ভুলই করে, দুঃখ পাবে; দুঃখের মধ্য দিয়েই পথ করে নেবে জীবনের। কুসুমিতা, তোমার মেয়ে ভয়ানক বুদ্ধিমতি, স্বপ্ন-দেখা আলাভোলা ছেলে শোভনকে ও-ই চালিয়ে নিয়ে যাবে।'
দুই প্রজন্মের সমান্তরালভাবে বয়ে চলা গল্পের মাঝে কত যে চরিত্র, নিজের নিজের বোধ আর ভাষ্যে উপস্থিত হয়েছে। কৃষ্ণাদির বাড়িতে এক বিকেলে শোভন যাওয়ার পর, কৃষ্ণাদির বাবা নীরদ মেসোমশাই বাগানে কাজ করতে করতে শোভনের কথার উত্তরে যখন বলেন—
'সব ভালো কাজ-ই খাটনির কাজ, কিংবা এমনও বলতে পারো যে-কোনো কাজই ভালো করে করতে গেলে খাটনি আছে। ভালো করে, বড়ো আর সুন্দর গোলাপ ফোটাতে গেলে প্রতিদিন যত্ন করতে হবে, গোড়া পরিষ্কার করে দিতে হবে, জল দিতে হবে, ঠিক ঠিক সময়ে সার দিতে হবে, শুকনো ডালগুলো কাটিং করে দিতে হবে—আরও কত কী। ফুল ফোটাতে হলে যত্ন করতে হবে। কিন্তু দেখো, আগাছা অমনিই হয়, যত্ন লাগে না।'
প্রতিউত্তরে শোভন বলে উঠে—
"আমাদের বীরেনবাবু স্যারও বলেন, মানুষের যত্ন না করলে মানুষও আগাছারই মতো ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়।"
—আর এখানেই অলক্ষ্যে মোকছেদ যেন মিহিরের 'সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম' থেকে মূর্ত হয়ে উঠে আসে—'খালি একই চিজ আছে সংসারে, যা লইয়া হ্যার কারবার, তা অইলে মানুষ,—মানুষরতন, এ্যার বেশি রতন, ধন, দৌলত আর তো কিছু হ্যার পেরোজন নাই। এই সাত রাজার ধন এক মাণিক্য,—এ্যারে লইয়াই মোর লালন—লালন শাহ, পাঞ্জ—পাঞ্জশাহ, রাজা।"
মফস্বলীয় পটভূমিতে উঠে আসা এই উপন্যাসটির মূল নির্যাসটিও তাই। বাউল-ফকিরের ভাষায় বলতে গেলে—
'মানুষরতন, কর তারে যতন—যাহা তোমার প্রাণে যায়।'
উপন্যাসের শুরু শোভনের উড়োজাহাজের গায়ে সেঁটে আসা স্বপ্নে। সেই স্বপ্ন উড়োজাহাজে উড়তে উড়তে এসে শেষ হয় এক যৌথ কমিউনের স্বপ্নভূবনে।
গোটা উপন্যাসে আর যা মন কাড়ে, দুর্লভের ভাষার টান। নির্মেদ, টান টান, স্পষ্ট। ভনিতাহীন সৎ উচ্চারণ। ছোটো-বড়ো প্রতিটা চরিত্র সমান গুরুত্বে, যত্নে, দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলা। মতাদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিনির্মাণ—নষ্ট রাজনৈতিক পরিমন্ডলে। আবহে। দুই প্রজন্মের আলাদা টানাপোড়েন—অথচ পাঠকের একবারও হোঁচট খাওয়ার পরিসর নেই। আরো যে বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়, সেটা হলো গোটা উপন্যাসটিতে অথবা তাঁর আগেরও যে স্মৃতিগদ্য, আহাম্মকের খুদকুড়ো, সেখানেও লক্ষ্য করা যায়, গোটা লেখায় চমক-ঠমক দেওয়া লাইন অথবা ক্যাচি লাইন যাকে বলে-সেরকম প্রতিটা ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা করে উল্লেখ করার মতোন তেমন কিছু থাকে না। বরং শুরু থেকে শেষ গোটা আখ্যানটিই এক বহমান বাক্যধারায়, ঘটনা-পরিঘটনায় জড়িয়ে বয়ে চলে। একে অন্যের সাথে সংপৃক্ত হয়ে। বলতে হলে তাই গোটা আখ্যানটিই তুলে ধরতে হয়। দুর্লভ সূত্রধরের গদ্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অসামান্য দিক হলো, গোটা আখ্যানটি আপন গতিপ্রক্রিয়ায় বয়ে চলতে চলতে পাঠককেও যেন এক আত্মবীক্ষার পথে ঠেলে দেয়।
সমাজ-প্রতিবেশের নানা বিষমতা মেলাতে মেলাতে একসাথে বেঁচে থাকে একদল মানুষ। যাদের জীবনে কোনো ম্যাজিক নেই। অথচ তাদের যাপন-ই আসলে আস্ত এক ম্যাজিক। নষ্ট এক সময়ে। আর ঠিক এ জায়গায় এসেই অনন্যবর্তী পাঠকের কাছে অনন্যসাধারণ হয়ে উঠে।
দুর্লভ সূত্রধর এখন বেশ নামকরা লেখক। তাঁর সব গল্প পড়া না হলেও আহম্মদের খুদকুড়ো - র নাম প্রায় অনেকের শোনা। অনন্যবর্তী 2025 এ এসে সেই নব্বই এর দশক বা তারও আগের গল্প শোনায়। কুন্তী নদীর ধারে বড়ো হয়ে ওঠা শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের কাহিনী এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। সেইসঙ্গে দেখতে শেখা চারপাশের পরিবেশ, মানুষজন কেমন পরিবর্তিত হয়ে চলেছে সময়ের সঙ্গে।
তনয়, শোভন, টুকু, কাজু, তরণী, তপেশ কয়েকজন কৈশোর পেরোনো ছেলে মেয়ের সরল, সাধাসিধে গ্রাম্য বা আধা মফস্বলী জীবন।লেখক এই কৈশোর ও যৌবনের সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে থাকা চরিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে বন্ধুত্ব, প্রেম, পড়াশোনা, মানসিক অস্থিরতা যেমন বুঝিয়েছেন, সেই রকমই সমান্তরালে শচিপ্রসাদ, সতীশচন্দ্র, ফনিভূষণ, ঊষাদেবী, কুসুমিতা এঁদের মাধ্যমে যৌবন থেকে বার্ধক্যে উন্নীত হওয়ার কাহিনীও ব্যক্ত করেছেন। রাজনীতি, সংকীর্ণতা, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বিভ্রান্ত করেছে চরিত্র গুলিকে। কিন্তু তারা পথ খুঁজে পেয়েছে ফিরে আসার। ব্যাক টু বেসিক শুধু একটা শব্দ বন্ধই নয়, লেখক সেটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার ও করেছেন। শচিপ্রসাদ, ফনীভূষনেরা কুন্তী নদীর ধারে শটিগ্রামে তৈরি করতে চেয়েছেন বার্ধক্য যাপনের অবলম্বন একটি আশ্রম বা Santuary। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করেছেন তাঁরা। কিন্তু সেই পথ সহজ নয়। বাধা বিপত্তি প্রচুর। শেষ অবধি তাঁরা কি সমর্থ হন সেই কাজ সম্পূর্ণ করতে ?
আমাদের জগৎ ইউটোপিক নয়। তবু, ভাবতে ভালো লাগে যে সমস্যা থাকলে সমাধানের পথ ও থাকবে। এই দশকের গল্পে আমরা সহজে সমাধান খুঁজে পাইনা। মানুষ জটিল, সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা ভীষণ। এর মাঝখানে অনন্যবর্তী একটা খোলা হাওয়ার মতো। গত দশকের খোলামেলা জটিলতাহীন জীবন মিঠে লাগে তাই।
📑🍁সদ্য পড়ে শেষ করলাম সাহিত্যিক দুর্লভ সূত্রধরের লেখা ‘অনন্যবর্তী’ উপন্যাস টি। লেখকের লেখার সাথে প্রথম পরিচয় Experience বেশ ভালো, লেখক সহজ সরল ভাষায় খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন এই উপন্যাসকে। এই উপন্যাস সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প বলে। বলে জীবনের ভাঙচুর পেরিয়ে এক স্বপ্নভুবনের কথা।
💫📃এবার আসি উপন্যাসের কথায় -
📑🍁প্রথমেই বলি এটি একটি সামাজিক উপন্যাস। এই উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় কুন্তী নদীর ধারে অবস্থিত একটি গ্ৰাম। এবং গ্ৰামের বেশ কিছু ছেলেমেয়েদের স্কুল জীবন থেকে শুরু করে তাদের কিশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ...... তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর বন্ধুত্ব, ও প্রেম। তবে এ কাহিনী কেবল কিশোর প্রেমকাহিনী নয়। কয়েকটি পরিবার ও সেই মানুষদের ভিতর বাইরে চিরাচরিত ভাঙন, বিকার ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলে এই উপন্যাস......
অন্য দিক শচীপ্রসাদ, সতীশচন্দ্র তাদের গভীর বন্ধুত্ব ও তাদের মধ্যবিত্ত জীবন যাপনের বিপন্নতা, সংসারের স্বার্থ-পরার্থের নানান বোঝাপড়া পেরিয়ে এসেও, তাঁদের জীবন থেকে স্বপ্ন হারিয়ে যায়নি।
এই উপন্যাসে দুটি প্রজন্মকে খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। যেমন সংসারের জন্য নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ ও ছেলেমেয়ে দের অভাব অনটন এর মধ্যে দিয়েও বড়ো করে তোলা.....
এই উপন্যাসের পার্শ্ববর্তী চরিত্র গুলো সমান ভাবে এগিয়ে চলে। তাদের ভূমিকা ও নেহাত কম নয়। লেখকের লেখনী ভীষণ ভালো লেগেছে আমার। যারা গ্ৰাম্য জীবনী পড়তে পছন্দ করেন তারা অবশ্যই এই বইটি পড়তে পারেন। আমার বইটি পড়ে ভীষন ভালো লেগেছে। আরো একটা কথা না বললেই নয় এই বই এর Page Quality বইয়ের বাঁধাই just অসাধারণ।
📍আমরা জানি রেজাল্টের দিন নির্লজ্জের মতো অত ভাত খেতে নেই, সেদিন নিজেকে চিন্তিত দেখাতে হয়, ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে হয়। চুলগুলো একটু এলোমেলা, একটু উদাসীন, আরও একটু সব কী কী থাকতে হয়।
📍জীবন মানুষকে যা দেয় মানুষ জীবনকে তাই-ই ফিরিয়ে দিতে পারে।
পরীক্ষার রেজাল্ট। বন্ধুদের বেতালা ছড়ার মাঝে একবগ্গা কিছু সাইকেলের হিপ-হিপ-হুররে। বরাবর উন্নাসিক ফার্স্ট বেঞ্চের উদ্বেগ থেকে তফাতে থাকা সেই বড় হয়ে ওঠার বেলা। আর বিকালের কাদা মাঠে বাঁক নেওয়া ফ্রিকিক গোলে ঢোকার ঠিক আগেই বন্ধুর বোনের কথা মনে পড়তেই, বুকের কোন দিকটা ব্যথা করে ওঠে যেন?
আবার রেজাল্ট! এক জীবনে কতই যে পরীক্ষা! তাতে উতরে গেলেই, বন্ধুর মতোই খুশি যেন বন্ধুর বোনও! অথচ এই কাহিনী কোনও নিছক বাল্য প্রেমের কাহিনী নয়। সেই লেখা লিখতে চেষ্টাই করেননি লেখক। বরং নিরন্তর এক দোটানার মধ্যে নিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি পাঠককে। সেই দোটানা কখনও আচমকা বড় হয়ে যাওয়া ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েও কথা খুঁজে না পাওয়া বাবার, কখনও সংসারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্ত্রীর সম্মান রাখতে চাওয়া স্বামীর, কিংবা কখনও যৌথ পরিবার ভাঙতে ভাঙতে দুটো ব্যবধান বেড়ে যাওয়া প্রজন্মের, এবং অবশ্যই রাজনীতির।
তবু এরকম তো খুব বেশি হয় না, যেখানে একটা কাহিনী পড়তে পড়তে মনে হয় যে, আমাদের বড় হওয়াটাও যদি এরকম ভাবে হতো? বিভূতিভূষণের অপু বা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সোনাবাবুর ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার যে যাত্রাপথ, সেই যাত্রাপথে তো সামিল হতে চেয়েছি আমাদের মতো আরও অনেকেই। আর তার বহুদিন পরে দুর্লভ সূত্রধরের লেখা ‘অনন্যবর্তী’ উপন্যাসের এই ছোট থেকে কৈশোরে এগোতে যাওয়া চরিত্রগুলো কোথাও যেন আমাদেরকেও টেনে নিয়ে গেল তাদের সেই রাস্তায় হাঁটার পথে সামিল হতে।
একটা নদী। একটা ছোট রেলস্টেশন। ঘুপচি বাস স্ট্যান্ড। চায়ের দোকান। এবং এইসব ঘিরে গড়ে ওঠা একটা জনবসতি। এই সবই তো ভীষণ পরিচিত দৃশ্য নদীকেন্দ্রিক যে কোনও মফস্বলেই। কিন্তু সেই মফস্বলের গল্পই যেন আলাদা হয়ে যায় দুটো ভিন্ন দেখার চোখ, আর একটা সহজ-সরল লেখনশৈলীতে। মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিছু পরিবারের ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে একসঙ্গে; বড় হচ্ছে তাদের শারীরিক মানসিক নানাবিধ জটিলতা নিয়েই। এবং পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গেই তারা যে শুধু প্রেমেই পড়ছে তা নয়, বরং যাবতীয় অনভিজ্ঞতা নিয়েও জড়িয়ে পড়ছে রাজনীতিতেও। এবং তাদের এই আপাদমস্তক বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোথাও যেন বদলে যাচ্ছে তাদের পূর্বপুরুষদের পথচলাও। ‘অনন্যবর্তী’ শুধুই একদল কিশোর-কিশোরীদের গল্প নয়, এই গল্পে প্রবলভাবে উপস্থিত তাদের বাবা-মায়েরাও। সেই বাবা-মা, যাঁরা কখন যেন হয়ে উঠেছেন আমাদের চারপাশের চেনাজানা অভিভাবকদের মতোই। এখনও অনেকটা বয়স বেড়ে যাওয়ার পরেও যে মানুষগুলোকে দেখলে সিগারেট লুকিয়ে নিতে হয় হাতের মুঠোর তলায়, ঠিক সেরকমই যেন।
এবং একটা সময় ধাক্কা খেতে খেতে এই সমস্ত চরিত্রেরা একটা সময় খুঁজে নিচ্ছে ঠিক নিজেদের বিকল্প একটা মাথা তোলার জায়গা। বামপন্থী রাজনীতির গড়ে ওঠা এবং ক্ষয় কোথাও যেন প্রবল ভাবে বাসা বেঁধে বসেছে এই আখ্যানের আনাচে-কানাচে। ফলে প্রবল ভালবাসায় তৈরি হওয়া একটা সান্ধ্য স্কুলের ভিতরে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা রাজনীতি যেন চারপাশটাকে আরো খুঁটিয়ে, আরো সন্দেহের চোখে দেখতে শিখিয়ে যাচ্ছে পাঠকদের। সেখানেই হাতে হাত রাখার গল্প যেমন তৈরি হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে অনেক দিনের বলতে চাওয়া কিছু কথা কিছুতেই বলতে না পারার মতো অব্যক্ত ব্যথা, ঠিক তার পাশে-পাশেই একটা বিশ্বাস ভাঙার গল্পও যেন চুপচাপ বলে চলেছে শুধু প্রেম নয়, বরং রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কথাও। আর ঠিক তার পরেই যখন এই গল্পের বড়রা তৈরি করছে একটা আলাদা জমি, সেই জমি তো শুধুই মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়ে থাকছে না আর। সেই জমি হয়ে উঠছে প্রতিবাদের একটা বিকল্প ��ূমি। আইনি সহায়তা কিংবা বিনামূল্যে চিকিৎসা দান যেন দেখিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মাঝে সাধারণের আরো মানবিক হয়ে ওঠার গল্প। আর আমরা ভীষণ চাইছি সেই জমিতে পা রাখতে একবার। ভীষণ চাইছি সেই অভিভাবকদের ছাতার নিচে গিয়ে দাঁড়াতে। চাইছি সেই সব ছেলে-মেয়েগুলোর বন্ধুত্ব যেন অটুট অমলিন থাকে এভাবেই আজীবন। এবং চাইছি শোভন আর টুকুর কচি কলাপাতার মতো সবুজ মনদুটোও যেন এক হয়ে যায় একদিন। আর, কাজুর সঙ্গে টুকুর দাদা তনয়ের প্রেমটাও হয় যেন, শালিক ঠাকুর! পিপুটা যেন সংসার করে সুখে! এরা কারা? তার হদিশ পাওয়া যাবে এই অসময়ে দাঁড়িয়ে একটা অন্যরকম মন ভাল করা আখ্যান ‘অনন্যবর্তী’তে। আর এই অপরূপ আখ্যানের রূপকার যিনি, সেই সূত্রধর কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই দুর্লভ!
এই দুঃসময়ে মাথা তুলে দাঁড়াবার মত একটি আখ্যান ‘অনন্যবর্তী’, বইমেলার ধুলো মেখে যা পাঠকের সঙ্গ নিলে আশাহত করবে না, আশা করা যায়। . . অনন্যবর্তী | দুর্লভ সূত্রধর প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : সৌজন্য চক্রবর্তী প্রকাশক : সুপ্রকাশ
দুলর্ভ সূত্রধরের এ উপন্যাস পড়ার প্রথম সৌভাগ্য হয় গতবছর শারদ নির্মুখোশে। সেবছর শারদ নির্মুখোশের মূল থিম ছিল বাঙালির নব্বই দশক। কিন্তু এ উপন্যাসকে নির্দিষ্ট কোনো কালের সীমাগন্ডিতে বাঁধা চলে না। হতে পারে, এ উপন্যাস যে সময়কালের কথা বলে, সেটা সাতের দশক। কিন্তু যে গুটিকয়েক মানুষ জনের সাথে পরিচয় করায়, তেমন মতাদর্শ নিষ্ঠ মানুষজন সবকালেই বড় দুলর্ভ। এ উপন্যাস এ কিশোরের অভিমানী কৈশোরের যৌবনে পদার্পনের আখ্যান। তাঁর দৃষ্টিতে সমাজকে দেখা, মতাদর্শের আগুনের প্রথম পাঠ এবং চারিপাশের মানুষজনের মধ্যে নিজেকে খুঁজতে চাওয়ার প্রচেষ্টাও বটে। নিজের 'আইডেন্টি' খুঁজতে গিয়েই কিশোর শোভন আবিষ্কার করেছিল, তার পরিবারে তার অবস্থান কতকটা জ্যামিতি বাক্সের দু-কাঁটার কম্পাসটার মতো। তাকে নিয়ে কারও বিশেষ হেল-দোল নেই। এর জন্য সে অভিমানী কিন্তু এতে সে অভ্যস্তও। বরং, তার গুরুত্ব তার বন্ধু-বান্ধবদের দলের মধ্যে এবং অবশ্যই টুকুর কাছে। শোভনের কথনেই এবং শোভনকে ঘিরেই এ উপন্যাসে ক্রমে হাজির হয় সতীশচন্দ্র, শচীন্দ্রপ্রসাদ, ফণীভূষণ, কুসুমিতা, তরুবালা, কৃষ্ণাদি, অবনদার মতো পার্শ্বচরিত্ররা। 'পার্শ্ব' কথাটা উল্লেখ করলাম বটে, কিন্তু এই চরিত্রগুলো না থাকলে, শোভন তনয়দের বেড়ে ওঠার মতাদর্শ নিষ্ঠ আখ্যানটিও পরিস্ফুট হত না। দুর্লভবাবুর 'আহম্মকের খুদকুঁড়ো' যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা উপন্যাসের এই চরিত্রগুলো সম্পর্কে কিছুটা পূর্ব পরিচিত। এবং এ উপন্যাসের চরিত্রায়নের ছাঁচই বুঝিয়ে দেয় এ উপন্যাস আত্মজৈবনিক। অথচ, তাতে আমিত্বের আত্মরতি নেই বরং আত্মকেন্দ্রিকতার ঊর্ধে এক দল কিশোরের সমাজের জন্য ভাবনা। ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের 'অপবিত্রতা'কে মহত্ত্বর মতাদর্শে উদবর্তন। মতাদর্শই তো সমগ্র জীবনের পথ নির্দেশিকা। এ উপন্যাস আসলে দুই প্রজন্মের মানুষের কথা বলে। নবীন প্রজন্মের শোভন তনয় এবং তাদের বন্ধু-বান্ধবীরা। এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মের সতীশচন্দ্র শচীন্দ্রনাথ ফণীভূষণ। সময়কালের নিরিখে দুই প্রজন্মের বয়সজনিত পার্থক্য থাকলেও, মতাদর্শের ভিত্তিতে এক প্রজন্ম অপরটির ছায়া মাত্র। সতীশচন্দ্র, শচীন্দ্রনাথ এরা যেন যৌবন কালের শোভন তনয়। দুই প্রজন্মের বেড়ে ওঠা, জীবন যাপন, আশা-নিরাশার এবং মতাদর্শের মধ্যে কী সাংঘাতিক মিল। আবার পার্থক্যও আছে। শোভন-তনয়দের নব অঙ্কুরিত মতাদর্শ সরলরৈখিক। নিজের সমস্তটা মতাদর্শকে বাস্তবায়িত করার স্বপ্ন দেখে শোভন তনয় টুকুর যৌবন। কিন্তু সতীশচন্দ্রের মতো মধ্যবিত্ত সংসারের জোয়াল, পরিবারের অতি প্রিয়জনদের স্বার্থকেন্দ্রীক আচরণে নিরন্তর রক্তাক্ত মানুষরা জানেন-"যে কোনো আদর্শই শুনতে ভালো, কিন্তু তার প্রয়োগ-পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল এবং কষ্টসাধ্য এক প্রক্রিয়া'। এক সময় তাঁরাও তো তাঁদের যৌবন ঘিরেও শোভন তনয়দের মতো কত স্বপ্ন দেখেছিলেন! কিন্তু মতাদর্শের এই জটিল কষ্ট-সাধ্য বাস্তবিক প্রয়োগটাই সতীশচন্দ্র, শচীন্দ্র, ফণীভূষন আর নীরদবাবুরা প্রৌঢ় বয়সে করে দেখান শটি ডাঙায়। এই চার প্রৌঢ়ের(?) কর্মকাণ্ডই আবার নতুন করে ভরসা যোগায় শোভন তনয়, টুকু কাজুদের মনে। আর এই দুই প্রজন্মের মানুষজনের আশা-হতাশা, জীবনের উত্থান পতন, মান-অভিমান, ভালোবাসার রঙ প্রতিফলিত হয় চিরবহমান কুন্তীর অপরাহ্ন আলোয়। এই উপন্যাসের মানুষজনেরা কেউ কেউকেটা নন। অতি সাধারণ পরিচিত মানুষজন- ঘরেও নহে, পারেও নহে / যে জন আছে মাঝখানে'.... সেই তাঁদের প্রতিদিনের বেদনাকে/সেই তাঁদের/জেগে-ওঠা ভোরগুলোকে। এ উপন্যাস গতিবিধি অনুযায়ী হতেই পারত, পরিবারে আপাত অপাংক্তেয় এক কিশোর কিংবা জীবন সংগ্রামে নিরন্তর ক্লিষ্ট মতাদর্শ আঁকড়ে বেঁচে থাকা তিন প্রৌঢ়ের কিংবা উপন্যাস জুড়ে ছড়িয়ে থাকা টুকরো টুকরো নানা চরিত্রের বিষণ্নতা উদযাপনের আখ্যান। কিন্তু লেখক মহাশয়, কলমের মায়াবী মোচড় অনায়াসে সে আশঙ্কা উড়িয়ে সন্ধান দিয়েছেন, উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় আলোকবর্তিকার। শোভন আর এখন স্বপ্নে উড়োহাজের গায়ে সেঁটে থাকে না। স্বপ্নে সে এখন উড়োজাহাজের পেটের ভিতর। শুধু সে কেন, উড়োজাহাজ বয়ে নিয়ে চলেছে দুই প্রজন্মকে-শোভন-তনয়-সতীশচন্দ্র-শচীন্দ্র-ফণীভূষণ, তাঁদের ভরসার মানুষ গুলোকে। আর শোভনের ঠিক পাশেই থাকে টুকু-তার খরতপ্ত জীবনের 'ওয়াশিস'। জীবন তো আসলে এমনই-'আলোর উৎসার', 'ভালো মন্দের সারাৎসার'। জীবন অনন্য-অনন্যবর্তী। 'আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে/ তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে'।
ইউটোপিয়ান ঘরনার গল্প দুর্লভ সূত্রধর এর "অনন্যবর্তী"। আমাদের জীবন অবশ্যই সেই ঘরনার নয়। আমাদের স্বপ্নে অবশ্য আমরা ইউটোপিয়ান কিছুর চারপাশে কুয়াশা মাখা কিছুর কংকাল দেখি। বেগুনি পেরেকে বিদ্ধ এই জীবনের জটিলতার উত্তাপে স্বপ্নে ঘণত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বিশেষ কিছু কথা উৎসাহ নিয়েই ঘুম আসে। আবার ঘুম শেষে হারিয়ে যায় স্বপ্নটা নিজের ছায়ার মতো। আদতে আমরা কি খুব সাধারন একটা গল্পের কাছে সমর্পিত হই? আমাদের পড়া গল্পের প্লটটাও যেন জটিল হতে হয়। খুব সাধারন একটা হাওয়াই মিঠাই টাইপ গল্প তারপরও আমাদের সমর্পিত হতে বাধ্য করে।
দুর্লভ সূত্রধর এর "অনন্যবর্তী" সেই গোলাপি হাওয়াই মিঠাই। নান্দনিক। উপন্যাসটি গভীর নয়, আবার গভীর জীবনবোধের অভাবে দুষ্ট নয়। হালকা, তবে ওজনহীন নয়।
অনন্যবর্তী অনেকটা আমাদের সেই ফেলে আসা দুপুড় আর বিকেলের মাঝামাঝি সময়ের শ্যাওলা জমা বিশেষত্বহীন ছাঁদে মৃদু হাওয়ায় দোলা মায়ের শুকনো শাড়ি। স্মৃতির দিকে গেলে শুধুই শাড়ি জুড়ে ভাতের মাড়ের ঘ্রাণ। স্বপ্নের দিকে গেলেও ভাতের মাড়ের ঘ্রাণ। অনন্যবর্তী সেই ভাতের মাড়ের ঘ্রাণ। সহজ, সরল ও সুন্দর।
দুর্লভ সূত্রধর এর "অনন্যবর্তী" একদল ছেলেমেয়েরে গল্প। পাশাপাশি জীবনের শেষ অধ্যায়ে পা রাখা একদল বড়দের গল্পও। জীবনের জটিলতায় যেখানে সাধারনত এমন সেট-আপ-এ জেনারেশন গ্যাপ আর তার সংঘাতটুকু প্রকট হয়ে ওঠে - অনন্যবর্তী সে চেনা ছকে হাঁটেনি। বর��� প্রশান্তিময় এক বোঝাপোড়ায় এগিয়েছে গল্প ও এর সকল চরিত্ররা। তাই এই সকল চরিত্রগুলোর সাথেই পাঠকের বোঝাপড়া। পাঠকের ভাবনার উপজীব্য।
অনন্যবর্তী এর চরিত্রগুলো আহামরি কোন জৌলুসের পোষাকে আবৃত নয়। একদম সাদামাটাও নয়। মায়োপিক চোখে (বা মনে) দেখলে ফার্নেসে জমা জলের মতো। মিনিয়েচার মৌচাকের ঝাঁক। অথচ কোথাও যেন তাদের ছায়া অনবরত মিশে যাচ্ছে আমার সাথেই। পরিপ্রেক্ষিত জমিনে ঠায় দাঁড়িয়ে তাই শোভন, তনয়, টুকু, তরণী, কাজু, সতীশচন্দ্র, শচীপ্রসাদ, ফণিভূষণ হয়ে ওঠে চেতনার নিয়ন্ত্রক। আয়নায় মুখ দেখা।
একদম সহজ,সরল, জটিলটা বিবর্জিত ন্যারেশনটা কেন তাহেলে হয়ে ওঠে মনোগ্রাহী ও হৃদয়গ্রাহী? "যাদের জীবনে কোন ম্যজিক নেই" এই গল্প হয়ত তাদের। এই গল্প তাই আমাদেরও, যাদের ম্যজিক নেই, হয়ত প্রত্যাশা আছে। যেই প্রত্যাশা এর বিপরীতে মানিয়ে নিতে হয় - "বেশি কিছু চাইবি নে। একটা মাত্র লোকই উত্তমকুমার হয়।" ঠিক সেখানে এসেই "অনন্যবর্তী" হয়ে ওঠে পাঠকের স্যানাটোরিয়াম।
কাহিনির শুরুতে শোভনের উড়োজাহাজ আর শেষটায় শটিগ্রামের স্বপ্নের খামার - নিচে বয়ে যাওয়া কুন্তীনদী - এমন মিঠে একটি আবহে গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে বসে আমি যা দেখি তার নাম - জারমিনেশন। স্বপ্নের, আকাঙ্খার, প্রত্যাশার এবং আবেগের। মনে হয়, জটিল এই জীবনটা সুত্রধর এর "অনন্যবর্তী" এর মত দুর্লভ না হোক; ফিরে আসুক মাড় দেয়া শাড়ীর অলস ছাঁদ। আমাদের অভিযোগগুলোও যেন আমাদের চেনাজানা হোক।
দুর্লভ সূত্রধর এর "অনন্যবর্তী" আমাদের আয়নার সামনে দাড়িয়ে চেনা প্রতিচ্ছবি হোক। দুর্লভ না হয়ে থাকুক। অনন্যবর্তী পাঠকের কাছেও দুর্লভ না থেকে হয়ে উঠুক তাদের স্যানাটোরিয়াম। দুর্লভ সূত্রধর এবং সুপ্রকাশ এ আস্থা ছিল, এবং হতাশও করেনি।
ম্যজিকহীন জীবনে "অনন্যবর্তী" যেন ম্যজিক হয়েই মিশে থাকে।
একটা গ্রাম গ্রাম শহর। চারজন প্রৌঢ়। একদল কিশোর কিশোরী। একটা স্কুল। আর কুন্তী নদী। আর একরাশ মুগ্ধতা, ভালোবাসা। এক সুতোয় বাঁধা কয়েকটা মানুষের জীবনে কিছু অপ্রাপ্তি, আক্ষেপ আর ভরসা হয়ে ওঠা অদ্ভুত আত্মিক টান নিয়ে নির্মেদ, খুব সাধারণভাবে বলে যাওয়া জীবনের গল্প অনন্যবর্তী।
পরিবারের প্রতি অভিমান করে জমিদারি ছেড়ে অনেক দূরের শহরে এসে জীবন শুরু করা, চাকরির পাশাপাশি রাত জেগে পড়াশোনা করা, সংসারের হাল ধরা এক মোক্তার সতীশচন্দ্রের গল্প এটা। শহরে দ্বিতীয় স্ত্রী, আর দুই ছেলে মেয়ে রেখে দূর দেশে আধুনিক চিন্তাধারার এক চাকুরে শচীপ্রসাদেরও গল্প এটা। আরও একজনের গল্প- সবার বিপদে আপদে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়া দরিদ্র প্রৌঢ় ফণীভূষণ আর তাদের বন্ধু প্রকৃতিপ্রেমী নীরদ। কেউ দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, কেউ ছেলে বউমার দূরে চলে যাওয়ার কষ্ট ভুলতে রক্তের সম্পর্কহীন মানুষের সঙ্গে আত্মার আত্মীয়দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। কেউ জীবনের ভার বইতে ক্লান্ত হয়ে ভাবছেন দায়িত্ব এখনো শেষ হয় নি। সবার কষ্টগুলো কোথায় গিয়ে যেন মিলে যায়। হরিহর আত্মা হয়ে দিন কাটে চার প্রৌঢ়ের।
কয়েকজন কিশোর থেকে তরুণ হয়ে ওঠে। তরুণী থেকে পুরোদস্তুর গৃহিণী হয়ে সংসারের হাল ধরে পিপু। শোভন, তনয়, তরণী, মনোজ, শিবু, তপেশ মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে অনার্সে পা রাখে। তাদের আগলে রাখে কাজু আর টুকু। কেউ সমাজ বদলে দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর, কেউ অন্নসংস্থানের চিন্তায় কাতর, আবার কেউ পরিবারে অপাংক্তেয় হয়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে চেয়ে হয়রান। তবুও তারা এক হয়ে থাকে। বিপদে আপদে একজন আরেকজনের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। বিপ্লবী, ধ্যানী রোল মডেল অবন দত্ত আর কৃষ্ণার অসমাপ্ত অভিমান বয়ে যায় বই জুড়ে।
গল্পে মানুষের ভালো করতে চেয়ে একটা নতুন আবাস গড়ার স্বপ্ন যেমন এসেছে, পাল্লা দিয়ে তেমনই এসেছে গ্রামীণ রাজনীতি। জাত-পাত, ধর্ম, পেশা সকল ভেদাভেদ ভুলে বিভিন্ন মানুষ একটা জায়গায় গিয়ে এক হয়ে গেছে। মামলা মোকদ্দমার কাগজ, আকাশমণি গাছের চারা, ইঞ্জেকশনের সূঁচ, আর সবার ছোট ছোট সব দুঃখ কুন্তীর বুকে একাকার হয়ে যায়।
অনন্যবর্তী এক ইউটোপিয়ান পৃথিবীর গল্প- যে পৃথিবী ভালোবাসার গল্প বলে। হোক না কল্পনায়— আমরা ওই পৃথিবীতে বাঁচতে চাই। আটপৌরে জীবন থেকে মুক্তি পেতে একদিনের জন্য শটিডাঙার খামারবাড়িটায় বেড়াতে এলে মনে হবে, সারাজীবনের জন্য থেকে যেতে পারলে বড় মন্দ হতো না।
চারিদিক অশান্ত। যুদ্ধের দামামা, রোগের ঘনঘটা। কঠিন কিছু, কষ্টের কিছু পড়তে ইচ্ছে করছিল না। কোন ধরনের পূর্বধারণা ছাড়াই অনন্যবর্তী হাতে তুলে নিয়েছিলাম। লেখকের আহাম্মকের খুঁদকুড়ো পড়ার ভরসা ছিল। সে ভরসা বিফলে যায় নি। কিছু নবীন, কিছু প্রবীণ মানুষের গল্প এটি। সময়টা কয়েক দশক আগের হলেও সম্পূর্ণ উপন্যাস জুড়ে যে স্মিত আবহাওয়া বিরাজমান ছিল, তা সাধারণত এমন ধরনের উপন্যাসে থাকে না। উপন্যাসটি হালকা নয়, গভীর জীবনকথার অভাব আছে এমনও নয়, কিশোর কাহিনীও নয়, আপাদমস্তক বড়দেরই। কিন্তু সেইসব বড়দের জন্য যারা জীবনকে দেখেন সহজ চোখে। অকারণ জটিলতা পার হতে পারেন যারা। যারা সমস্ত যান্ত্রিকতা পার হয়েও রোবট হয়ে পড়েন না নিজে, বরং ভবিষ্যত তা যত অল্প দিনেরই হোক না কেন, তার স্বপ্ন দেখেন। এক দঙ্গল ছেলেপেলে। পড়াশোনাতে অসাধারণ না হলেও মন্দ নয়। তাদের স্কুল থেকে কলেজ অবধি সময়টা উপন্যাসে এসেছে। তার মধ্যে শোভন আর তনয় একটু বিশেষ। তাদের পরিবার আর প্রেমের কথা বিস্তারিতভাবে এসেছে। আবার শোভন আর তনয়ের বাবাও বন্ধুস্থানীয়। তাদের সাথে আরো রয়েছেন গ্রামীণ কম্পাউন্ডার ফণীভূষণ আর স্বাধীনচেতা নীরদ। চাকরিতে অবসরের পর এই চার বন্ধু মিলে শটিডাঙ্গায় একটা খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে জীবন চলতে থাকে সকলের। ট্র্যাজেডি থাকলেও খুব মোটা দাগে নয়৷ জীবনের সাধারণ দিকগুলোই ছুঁতে চেয়েছেন লেখক। গড়পড়তা একদল মানুষের জীবন। কিন্তু গড়পড়তার মধ্যেও বিশেষ। তাই শোভনের বাবা যখন শোভনকে উপদেশ দেন জীবনে খুব বড়লোক না হতে- আমরা অবাক হই না৷ মাঝি কাল্লুর সাথে ছেলেদের বন্ধুত্বে কিংবা গ্রামীণ নাইট স্কুল, হেলথ প্রোগ্রাম চালানোতে ওদের উৎসাহ আমাদের তারুণ্যের কাল মনে করিয়ে দেয়। আনোয়ারার চমৎকার রান্নার স্বাদ যখন সকলে নেন, তখন ভেদরেখাটুকু মুছে দেয়ারও একটা প্রয়াস চোখে পড়ে। সহজ সাধারণ ভাষায় সাধারণ কিছু মানুষের গল্পটা আমার দিনটা সুন্দর করে দিয়েছে। লেখককে ধন্যবাদ।
একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন এজ স্পেক্ট্রামের মানুষজনের কামিং অফ এজ স্টোরি পড়বার সুযোগ হলো। একপাল তরুণ-তরুণী যারা বড় হচ্ছে, নিজেদের ব্যক্তিগত স্ট্রাগল তাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে আবার একইসাথে সমাজের, পরিবারের নানাবিধ সমস্যাও তাদের তাড়িত করছে।
অপরদিকে তাদের অভিভাবকরা (মূলত বাবা, লেখকের দূর্বলতায় মা’রা এখানে মূলত গৃহিনীই আরকি) সারাজীবন পরিবারের ঘানি টেনে এখন একটু শান্তি খোঁজার চেষ্টায় আছেন। এই দুই প্রান্তের মানুষ কীভাবে তাদের নিজেদের ও একে অপরকে চেনার চেষ্টা করছে এবং এক বিন্দুতে এসে মিলিত হচ্ছে এই নিয়েই উপন্যাস আরকী।
সুন্দর, ছিমছাম উপন্যাস; এত গ্রাউন্ডব্রেকিং না যে মানসে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যাবে আবার এত দূর্বলও নয় যে কিছুদিন পরেই একদম বিস্মৃত হয়ে যবে।
এই বইকে কী বলবো! এই সময়ের রূপকথা, যেখানে যৌথখামারের স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন লেখক। কত হেরে যাওয়া, কত ব্যর্থতা পেরিয়ে মানুষ বেঁধে বেঁধে থাকেন দু-প্রজন্ম জুড়ে। যে সমৃদ্ধ, সচেতন নাগরিকের স্বপ্ন দেখেছেন এবং দেখিয়েছেন লেখক, তা বাংলা সাহিত্যে থেকে যাবে, এ আমার বিশ্বাস। একটাই আক্ষেপ, কেন অনুবাদ হয় না এসব বইয়ের?
বেশ কিছু মনে রাখার মতো লাইন দিয়েছে এই বই।
'আমাদের মতাদর্শ আসলে কর্মের পথনির্দেশিকা।'-- এরকম অসামান্য স্মরণীয় লাইনে ভরে রয়েছে এই বই। মাঝে মাঝেই ফিরে ফিরে পড়তে হবে এই বই আমাকে।
এলাকাটি একটি গ্রামীণ মফস্বল, যার ধার দিয়ে বয়ে গেছে কুন্তী নদী। মোক্তার আছে, ডাক্তার আছে, রয়েছে আরো বিচিত্র পেশার মানুষ। সেখানে উজ্জ্বল ছেলেমেয়ের পাশে আছে একদল ছেলেমেয়ে— 'যাদের জীবনে কোনো ম্যাজিক নেই'। লেখক এদের জীবনে কোনো ম্যাজিক নেই বললেন বটে, কিন্তু এদের জীবনের এবং এদের পরিবারের যাপনের ম্যাজিকই এই উপন্যাসের উপজীব্য। এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে। তনয়, টুকু, শোভন, কাজু, তপেশ, তরণী— তাদের স্কুল, তাদের খেলা, তাদের স্কুলের পর নদীর ওপারে ঘুরতে যাওয়া — এর মধ্যেই বড়ো হয়ে যাওয়া। তাদের একসঙ্গে নাইট স্কুল এ মতাদর্শের জন্য শ্রমদান, অনুচ্চকিত রাজনীতি— এ সবই তো আছেই, সঙ্গে এই উপন্যাসে রয়েছে প্রেম। সেই প্রেমের ধরন বড়ো নিজস্ব তাদের।
এই ছেলেমেয়ের দলের কাহিনীর পাশাপাশি চলেছে আরও একটি সমান্তরাল আখ্যান। সেই আখ্যান এদের আগের প্রজন্মের মানুষদের নিয়ে। মধ্যবিত্তের বিপন্নতা, শুশ্রূষাহীন প্রতিবেশের মধ্যেও কয়েকটি মানুষের পরস্পরের সঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকা। এই দুই প্রজন্মের কাহিনীর মধ্যস্থতাতেই প্রায় একটা গ্রামীণ মফস্বল, তাদের অর্থনীতি নিয়ে উঠে এসেছে লেখকের নিপুণ মেধাবী অনুকরণীয় গদ্যে। নদীর এপার ওপারের বিষমতা, সমাজের এপার ওপারের বিষমতা মেলাতে চায় একসঙ্গে বেঁধে থাকা একদল মানুষ। কিন্তু হয়ে ওঠে কী! সৌজন্য চক্রবর্তীর অলংকরণ ও প্রচ্ছদ মানানসই।