আমি হিমাদ্রি দে। আলিপুর থানার ওসি। থানায় আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করে এস আই মহিউদ্দিন। আমাদের থানায় মূলত চুরি, ডাকাতি, নারী ও শিশু নির্যাতন ইত্যাদি এরকম কেস নিয়ে কাজ করা হয়। ওতো বড় কোনো কেস আমাদের সামনে আসে না। আমাদের শহরের নেতারাও বেশ ভালো। শহরের উন্নয়ন করেছে। তরুণ প্রজন্মের আইডল তারা। হঠাৎ একদিন শহরের সেসব স্বনামধন্য নেতারা সবাই একজন একজন করে গুম হতে থাকে। গুম হওয়ার ২ দিন পর পর কিছু নির্দিষ্ট পাবলিক প্লেস থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। আমরা মনে করি আমরা পুলিশ সদস্যরাই লাশের কাছে পৌছেছি। কিন্তু আসলে খুনি নিজেই লাশ আমাদের কাছে পৌছায়। আমরা মনে করি কেসে তদন্ত করে আমরাই ক্লু পেয়েছি। কিন্তু আসলে খুনি নিজেই আমাদের জন্য ক্লু ছেড়ে যায়। আমরা মনে করি আমরা ২ ধাপ এগিয়েছি। কিন্তু খুনি আমাদের চেয়ে আরো ৪ ধাপ এগিয়ে থাকে। খুনি নিজেকে 'কাস্তিগো' নামে পরিচয় দেয়। কে এই কাস্তিগো? কি তার উদ্দেশ্য? কেমন তার অতীত? কেন সে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে নির্দিষ্ট প্যাটার্নের মানুষদের খুন করছে?
একদম ডালভাত ধরনের রিভেঞ্জ থ্রিলার। এতো লেইম এক্সকিউজের জন্য ভিলেন মশাইরা পুরো ফ্যামিলিকে যেভাবে হত্যা করলো আর পুলিশের গাড়িটাকে উড়িয়ে দিল তা বোধ করি এক যুগ আগের বাংলা সিনেমাতেও পাওয়া যাবে না। তাছাড়া লেখক ভূমিকাতে যেভাবে টুইস্টের কথা বলেছিলেন সেভাবে কিছুই চোখে পড়ে নি। সবকিছুই গতানুগতিক, সাদামাটা। মূল চরিত্র কিয়াসের চরিত্র নির্মানে একদমই ফোকাস করা হয় নি। সম্ভবত ২য় বইটিতে লেখক কাজ করবেন এ নিয়ে । তবে লেখকের প্রতিভা আছে। প্রথম থ্রিলার হিসেবে উনার ভাষার ব্যবহারটা বেশ প্রাঞ্জল ছিল। খুব ছোট হওয়ায় এক সিটিংয়েই পড়ে ফেলা যায়।
অনেকের বর্তমান রূপ খুব আলোকিত মনে হয়। কিন্তু তাদের অতীত রূপ হয়তো অন্ধকারাচ্ছন্ন। তরুন প্রজন্মের আদর্শ নেতারা একের পর এক গুম হচ্ছেন। এরপর হচ্ছেন নৃশংসভাবে খুন। প্রতিটি হত্যাকান্ডের ধরণ একই। কোন সিরিয়াল কিলার শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আব্দুল্লাহ, ঐশী এবং নূর। তিন বন্ধু একই অফিসে চাকরি করেন। সুন্দর হাসিখুশি জীবন তাদের। তবে একই সাথে আছে প্রিয় বন্ধু কিয়াসকে এক যুগ আগে হারানোর বেদনা। কি ঘটেছিলো ১২ বছর পিছনে।
একের পর এক জনপ্রিয় নেতাদের অন্তর্ধান এবং হত্যা হিমাদ্রির পুলিশি ক্যারিয়ারের বারোটা বাজাচ্ছে। ওসি হিমাদ্রি দে এবং এস আই মহিউদ্দিনের সামনে একাধিক হত্যারহস্য। এসবই কি কোন সিরিয়াল কিলারের কাজ? নাকি অপজিশন পার্টির ষড়যন্ত্র? প্রচন্ড চাপ এবং সীমিত সময়ের মধ্যে তাদের ভেদ করতে হবে 'Kastigo' রহস্য। এমন এক মিস্ট্রি যেখানে ক্লু তারা খুজে পাচ্ছেন না, বরঞ্চ ক্লু তাদের কাছে এসে ধরা দিচ্ছে। এরকম একজন খুনীকে কিভাবে ধরবেন পুলিশ সদস্যরা, যে পুরো ঘটনাটা নিয়ন্ত্রণ করছে?
মুহাম্মদ জাহিদ হোসাইনের 'দন্ডভেদ' পড়ে শেষ করলাম। যদিও এটি একটি সিরিজের শুরুমাত্র। 'কাস্তিগো সিরিজ'। বইয়ে আখ্যান মাঝে মাঝে দুটি সময়রেখায় এগিয়েছে। ২০২২ এবং ২০১০ টাইমলাইন এই উপন্যাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের নাম দেখেই বুঝা যায় ভিজিল্যান্টি টাইপ স্টোরি বিল্ড করতে চাচ্ছেন লেখক। মার্ভেল কমিক্সের পানিশার টাইপ চরিত্র যে দন্ডদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শহরের আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাইছে স্বাভাবিক অবস্থায়। লেখকের রচনাশৈলিতে একটি সহজাত প্রতিভার ঝলক সময়ে সময়ে পেয়েছি।
উপন্যাসটির পিছিয়ে থাকা দিকটিও নামের সাথে প্রাসঙ্গিক। এরকম ভয়ংকর অপরাধীদের সাথে অনেক ভালো ফাইট সিক্যুয়েন্স রাখা যেত। পুরো বইয়ে এরকম অংশের অভাব দেখেছি। সাধারণত আমি থ্রিলার পাঠের সময় প্লটহোল, বানান এতসব খেয়াল রাখতে চাই না, পড়ে আনন্দ পাওয়ার স্বার্থে। 'দন্ডভেদ' এ অবশ্য গুরুতর কোন প্লটহোল নেই।
লেখকের লেখনীতে গতি আছে। তবে গল্পকথনের সময় "শো, ডোন্ট টেল" যে ভঙ্গিমাটি আছে তা লেখক প্রয়োগ করেন নি তেমন। যেমন অতীতের টাইমলাইনে কিছুটা আছে এই প্রয়োগ তবে বর্তমান সময়রেখায় তা খুবই কম। "শো" না করে শুধুমাত্র টেলিং করেও বেশ কিছুদুর যাওয়া যায়, সেই টেলিং এর গদ্য অনবদ্য হতে হয়। দুর্দান্ত লেখকরা সেই টেলিং জেনেবুঝেই করেন। লেখকের লেখনিতে চরিত্রগুলোর কথোপকথনে চমৎকার সাবলীলতা আছে। এই ধরণের সাবলীলতা আগামীতে 'কাস্তিগো সিরিজ' এর ডায়লগ ছাড়াও চরিত্রের চিত্রায়ন, প্লটের বিস্তৃত দৃশ্যায়ন এবং ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে দেখতে পাবো আশা করছি। প্রথম বই কলেবরে কম হওয়াটা স্মার্ট মুভ ছিলো। তবে একটি উপন্যাসে অন্তত দুটি চরিত্রের ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট দেখানো দরকার বলে মনে করি।
লেখকের প্রতি তাঁর প্রথম থ্রিলার উপন্যাসের জন্য শুভেচ্ছা। পুলিশের তদন্ত কর্মে একটা বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন লেখক। স্পয়লার হবে। তাই বলছি না। আশা করছি ক্রিটিকগুলো লেখক স্পোর্টিংলি নিবেন। আগামীতে আরো বড় পরিসরে, বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে লেখক রচনা করবেন 'কাস্তিগো সিরিজ - ২' এই আশায় রইলাম।
বই রিভিউ
নাম : দন্ডভেদ লেখক : মুহাম্মদ জাহিদ হোসাইন প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ২০২৩ প্রকাশনা : অনুজ প্রকাশন প্রচ্ছদ : সজিব ওয়ার্সি জনরা : থ্রিলার অনলাইন পরিবেশনা : রকমারি, বইফেরী, বইপরী, বইবাজার, দূরবীণ, হক বুকশপ রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
প্রথম লেখক হিসেবে মোটামুটি ভালই লিখেছেন। আহামরি বড় থ্রিলার না হলেও লেখকের লেখায় একটা চেষ্টা প্রতিফলন দেখেছি। উনার লেখা নতুন উপন্যাস "দ্য রেড সুলতান" অসাধারণ লেগেছে আমার।