ডিক স্যাণ্ড যেন ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই শৈশব কৈশোরের সোনালী অতীতে, যখন রোমাঞ্চকর সব অভিযানের বই পড়তে বসলে নাওয়া খাওয়া ঘুম বাদ দিয়ে বইয়ের পাতায় নাক গুজে থাকতাম!
পিলগ্রিম, ছোট্ট একটা তিমি শিকারি স্কুনার। ডিক স্যাণ্ড নামের বছর পনেরোর এক কিশোর এই জাহাজে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করে। জাহাজের ক্যাপ্টেন বেশ ভালো লোক। তিমি শিকার করতে যেয়ে জাহাজের সমস্ত ক্রু সহ ক্যাপ্টেন মারা গেল। এদিকে জাহাজে রয়েছে শিশু সন্তান সহ এক নারী, আধ পাগল পতঙ্গবিদ, পাঁচ কাফ্রি, বদমেজাজি এক কুকুর, এবং নেগোরো নামে এক পর্তুগিজ। জাহাজ সম্পর্কে ডিক বাদে কারোরই কোনো ধারণা নেই বললেই চলে।
সুতরাং জাহাজের দায়িত্ব এসে পড়লো ডিকের ঘাড়ে। কিশোর ডিকের নতুন পরিচয় দাঁড়ালো ক্যাপ্টেন ডিক স্যাণ্ড হিসেবে। ডিক ক্যাপ্টেন তো হলো বটে কিন্তু রুদ্র সাগর, বিশ্বাসঘাতকতা, অনভিজ্ঞতা সেই সাথে এতগুলো মানুষের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সূদুর আমেরিকায় পৌঁছুনোর আশা তার অচিরেই হতাশায় পরিণত হতেও দেরী হয়নি। কি হলো এত গুলো মানুষের? রুদ্র সাগর, ভয়াবহ আতঙ্ক জাগানিয়া বন, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বিশ্বাসঘাতকতার ফাঁদ এড়িয়ে এতগুলো নিরীহ মানুষ কি নিরাপদে লোকালয়ে ফিরতে পারবে? নাকি রুদ্র সাগর, বিপদজনক বন জঙ্গল বা মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে অকালে পিতৃপ্রদত্ত প্রাণ বিসর্জন দিয়ে বসবে?
দীর্ঘদিন পর সেবা যেন তার পুরনো রূপে ধরা দিলো। একটা সময় সলোমনের গুপ্তধন, শী, রিটার্ন অফ শী, হারানো পৃথিবী, ট্রেজার আইল্যান্ড, নেশা, রহস্যের দ্বীপ, আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ, মৃত্যুঞ্জয়, প্রবাল দ্বীপ, রবিনসন ক্রুসো, বাউন্টিতে বিদ্রোহ ইত্যাদি বই পড়তে যেয়ে নাওয়া খাওয়া ঘুম হারাম করে কত যে বকা খেয়েছি। সেবার ক্লাসিক যেসব এডভেঞ্চার থ্রিলার ছিল, সেই সব বই এক বসায় শেষ না করে ওঠারই উপায় ছিল না। সেসব বই একবার নয়, বার বার পড়া যেত। পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হয়ে বইয়ের চরিত্রগুলোর সঙ্গেই যেন পাঠকরা অভিযানে বেড়িয়ে পড়তো। ডিক স্যাণ্ড যেন সেই অনুভূতি পুনরায় ফিরিয়ে আনলো। অথচ মজার ব্যাপার হলো জুল ভার্ণের অধিকাংশ বই পড়া হলেও ডিক স্যাণ্ডের নাম পূর্বে কখনোও শোনা হয়নি।
একটা এডভেঞ্চার থ্রিলারে সাধারণত পাঠকের কি কি চাহিদা থাকে?
দারুণ একটা গল্প থাকবে, গল্পের বুনট হবে জমাট, প্রিয় কিছু চরিত্র থাকবে যাদের ভালো মন্দের জন্য নিজের অজান্তেই বই পড়তে পড়তে টেনশন হওয়া শুরু করবে, তাদের আনন্দে আপনি আনন্দিত হবেন, তাদের দুঃখে দুঃখিত হবেন, তাদের বিপদে আপনারই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা অনুভব হবে, থাকবে ফিল গুড টাইপের কিছু চরিত্র, যাদের উপস্থিতি হবে কিছুটা কম কিন্তু যতক্ষণ বইয়ের পাতায় উপস্থিতি থাকব্দ ঠোঁটের কোণে মুচকি একটা হাসি লেগে চলেই আসবে, সেই সঙ্গে থাকতে হবে রোমাঞ্চিত হওয়ার মত প্রকৃতি, পরিবেশ, যেখানে পদে পদে বিপদের হাতছানি, জীবন নিয়ে টানাটানিই করেই কুল পাই না অন্যদিকে তাকাবো কখন এমন পরিস্থিতি দেখা দেবে প্রায়শই, ধুরন্ধর, নিষ্ঠুর, হাসতে হাসতে কল্লা কেটে নিতে পারে, যেসব চরিত্রের প্রতি মনের অজান্তেই ঘৃণা অনুভব করতে শুরু করবেন তেমন এক আধটা ভিলেন এসব বইয়ে না থাকলে চলবে না অবশ্যই, বইয়ের পাতায় পাতায় থাকবে শব্দের খেলা, কখনো রসাত্মক তো কখনো শিহরণ বইয়ে দেবে। তাই না? বোনাস হিসেবে আরো কিছু উপাদান থাকলে একেবারে সোনায় সোহাগা, কী বলেন?
শুরুতেই আনন্দের খবর দিতে চাই। উপরোক্ত চাহিদার প্রত্যেকটি উপাদান রয়েছে ডিক স্যাণ্ডে। বরঞ্চ বলা যায় উপরি হিসেবে আরো কিছু যুক্ত হতে পারে। ভালো জিনিস এক আধটু বেশি খাইলে ক্ষতি নাই। শুরুতেই বলতে হবে গল্পের কথা। অত্যন্ত চমৎকার একটা গল্প।
যারা এডভেঞ্চার থ্রিলার পছন্দ করেন, স্পেশালি সেবার ক্লাসিক বইগুলোর অন্ধভক্ত তাদের জন্য এই বইয়ের গল্প যেন কুমিল্লার আসল মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই অথবা পদ্মার খাঁটি ইলিশ মাছ ভাজার মক্তই সুস্বাদু।
গল্পের শুরু থেকেই যে টানটান একটা ভাব থাকে তা কখনোই ঝুলে যায়নি। নানারকম ঘটনার আগমনের মধ্যে দিয়ে গল্প এগিয়ে গিয়েছে দুর্দান্ত গতিতে। বিরক্ত হয়ে দুই চার পেজ বাদ দিয়ে যাবেন, এ এমন সুযোগ নেই। গল্পের বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে রয়েছে নানা রকম বিপদ,, সুখ দুঃখ, বিশ্বাসঘাতকতার নানা ঘটনা, রয়েছে আধুনিক সময়ে সব গল্পে যেই উপাদান না থাকলে অনেকেরই মনে হয় কিছু একটা কমতি থেকে গেল, যাকে আমরা টুইস্ট বলে আখ্যায়িত করি সেই বান্দা থুড়ি উপাদান। বড়সড় টুইস্ট না থাকলেও গল্পের প্রয়োজনে মাঝেমধ্যেই ছোট ছোট টুইস্টের দেখা মিলবে। সেসব টুইস্ট আপনাকে হতবাক হয়ত করবে না কিন্তু উপভোগ্য ঠিকই মনে হবে।
একটা গল্পে যদি অনুভব করার মত চরিত্র না থাকে সেই গল্পে প্রবেশ করা বা ঠিক আপন আপন বোধ করা যায় না। লেখক জুল ভার্ন বা রূপান্তরকারী ইসমাইল আরমান ভাই এই ব্যাপারগুলো সম্বন্ধে আমাদের চেয়ে ভালো জ্ঞান রাখেন। জুল ভার্নের বই গুলোর কিছু চরিত্রই থাকে যেগুলো আপনাকে মোহিত করে রাখবে। গল্পের পরতে পরতে মনে করাবে আরে শালা এ তো আমাদের আপন লোক। কিছু চরিত্রের প্রতি সৃষ্টি হবে অসম্ভব রকমের ঘৃণা। ভিলেনের প্রতি যদি ঘৃণাই সৃষ্টি না হয় সেক্ষেত্রে গল্পের ভিলেনের ভিলেনির আর মূল্য রইলো কী, তাই না? বইয়ের নামেই বুঝতে পারছেন গল্পের প্রধান চরিত্র ডিক স্যাণ্ড। বইয়ের শুরু থেকেই তার প্রতি ফোকাস রাখা হয়েছে। জীবনের ঘাত প্রতিঘাত, নানা অভিজ্ঞতার টইটুম্বুর ডিককে পনেরো বছরের কিশোরের চেয়ে পোড় খাওয়া যুবক বলেই মনে হবে। নায়কের চরিত্রে তিনি ঠিকঠাক। অতি মানবীয় পারফরম্যান্স দেখানোর তেমন কুবুদ্ধি বা ইচ্ছে তার তেমন একটা দেখা যায়নি। কিছু জায়গায় অবশ্য মনে হয়েছে ব্যাডা এত বেশি বুঝে কেন, ধরে দিব নাকি এক আধটা কানের উপরে, তার পরেই মনে হবে যত যাই হোক বেচারার বয়স তো সবে মাত্র পনেরো। সুতরাং ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখাই যায়। গল্পের অন্যান্য প্রধান চরিত্রের মধ্য ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে যাবে মিসেস ওয়েলডন, তার ছেলে জ্যাক, পাঁচ কাফ্রির অন্যতম সদস্য হারকিউলিস, ডিঙ্গো নামের বদমেজাজি কুকুর, আধপাগলা পতঙ্গবিদ কাজিন বেনেডিক্ট। মিসেস ওয়েলডন নারী হয়েও যে অসমসাহসীকতার সঙ্গে বিপদ আপদ আগলেছেন তা চমৎকার লেগেছে। আপনার বাসায় টগবগে প্রাণবন্ত পিচ্চি আছে? ওরা আশেপাশে থাকলেই দেখবেন মন ভালো হয়ে যায়। জ্যাক ঠিক সেরকমই একটা চরিত্র। তবে এদের ছাড়িয়ে বইয়ের সবচেয়ে প্রিয় তিনটি চরিত্র হয়েছে আধপাগল পতঙ্গবিদ বেনেডিক্ট, কাফ্রি হারকিউলিস এবং ডিঙ্গো। পশুপাখির প্রতি আমার সবসময়ই আলাদা ভালো লাগা কাজ করে। তাই ডিঙ্গো যে আমার পছন্দের তালিকায় থাকবে তা সহজেই অনুমেয়। এ তো গেল ভদ্রমহোদয়, ভদ্র মহোদয়া এবং ভদ্র পশুর কথা। এবার আসতে হবে নেগেটিভ চরিত্রে। নেগেটিভ চরিত্র নিয়ে বেশি বলে পড়ার আনন্দ মাটি করবো না। তবে নেগেরোর প্রতি যে “তোকে না মে রে আজ ভাতই খাবো না” অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা এখনো যায়নি। নেগেটিভ চরিত্র আরো আছে, স্পয়েল করলাম না। সংক্ষেপে বলা যায় ভালো এবং মন্দ মিলিয়ে দারুণ সব চরিত্রের দেখা মিলেছে ডিক স্যাণ্ড বইয়ে।
সেবা প্রকাশনী সম্পর্কে একটা অভিযোগ প্রায়শই শুনি সেবা বইয়ে বেশ কাটছাঁট করে। হ্যাঁ সেটা অনেকাংশেই সত্য ঘটনা। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে সেবা প্রকাশনীর মত অন্য কোনো প্রকাশনীতেই এত দুর্দান্ত ভাবে রূপান্তর করা হয় না। সেবা প্রকাশনীর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। তবে ২০১৪/১৫ পরবর্তী সময়ে সেবার রূপান্তর পড়ে অনেক বইয়েই পূর্বের সেই আরাম পাইনি। দুই চারটা বই বেশ বিরক্তও লেগেছে সত্যি বলতে। কিন্তু ডিক স্যাণ্ডে সেবার অন্যতম পরিচিত মুখ ইসমাইল আরমান ভাই পূর্বের সেই আমেজ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। ৩৬০ পেজের বই ২৪ ঘন্টারও কম সময়ে শেষ করেছি, এর মধ্যে কাল রাতের ঘুমেরও বেশ কিছুটা বারোটা বাজিয়েছি। এত দারুণ স্মুথ বই, এক পেজ পড়ার পর অন্য পেজ না চাইলেও পড়ে ফেলতে মন চাইবে। সেবার বইয়ের ভাষা, বাক্যগঠন বা এইসব ব্যাপার নিয়ে আঙ��ল তোলার সাহস কারো আছে বলেও মনে হয় না। সেবা এসব দিকে সবসময়ই সেরা। এই বইতেও রূপান্তরকারী ইসমাইল আরমান এবং সেবা প্রকাশনী তাদের চূড়ান্ত দক্ষতাই প্রদর্শন করেছে। টপ নচ।
সেবার বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি বা পেজ নিয়ে বলার কিছু নেই৷ কমের ভেতরে এত দারুণ দারুণ বই পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য প্রয়াত কাজীদার প্রতি আজীবন শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে যাব। সেবার বইয়ে বানান ভুল আমি খুব একটা দেখিনি। আর বইয়ের দুই চারটা টাইপো বা বানান ভুল আমার পড়ায় খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধি কখনোই করেনি। সম্পাদনা নিয়ে বলার ধৃষ্টতা নেই। উনারা এসব দিকে সেরা।
পরিশেষে বলতে হয়, আমি নস্টালজিক মানুষ আমার কাছে ডিক স্যাণ্ড হলো সেই বই যা আপনাকে নিয়ে যাবে আপনার শৈশব কৈশোরের রোমাঞ্চকর সময়ে, যখন আপনি বইয়ের পাতায় ডুবে যেতে পারলে আর কিছুই চাইতেন না। ডিক স্যাণ্ড হলো সেই বই যা সোনালী সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যে সময় আর কখনোই কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরবে না। দেরী না করে চড়ে বসুন ডিক স্যাণ্ডের সঙ্গে পিলগ্রিম স্কুনারে, দেখা যাক তিমি শিকারের জাহাজ আর ক্যাপ্টেন ডিক স্যাণ্ড আপনাকে নিয়ে কোন বন্দরে যেয়ে ভিড়ে।
রেটিংঃ ৫/৫
বইঃ ডিক স্যাণ্ড
লেখকঃ জুল ভার্ন
রূপান্তরঃ ইসমাইল আরমান
প্রকাশনীঃ সেবা
প্রকাশকালঃ ২০২৩