নন্দলাল এসেছেন রাঘববাবুর বাড়িতে পূজোর কাজে। পূজো সেরে বাইরে এসে বাগানে অপরিচিত একজনকে দেখে নন্দলাল একটু দমে গেলেন। চেহারাখানা দেখে ষণ্ডাগুণ্ডা বলেই মনে হয়। ডা*কাত বা খু*ন খারাপির আ*সামি হওয়াও বিচিত্র নয়। কথা হল, রাঘব চৌধুরীর বাড়িতে এসে জুটলই বা কী করে! আর এক কথা, লোকটাকে তিনি কোথাও দেখেছেন, কিন্তু কোথায় তা মনে পড়ছে না।
রাঘব চৌধুরী বড়লোক হলে কী হবে, ভারী খামখেয়ালি মানুষ। পাট আর চটের পৈতৃক কারবারে লাখো-লাখো টাকা কামান বটে, কিন্তু লোকটার বাস্তববুদ্ধির একটু অভাব আছে। নইলে এ বাড়িতে যেসব লোক এসে জোটে, দূরদর্শী হলে কখনো তাদের আশ্রয় দিতেন না। বুঝতে পারলেন না তো আচ্ছা উদাহরণ দেই, পালোয়ান হাবু দাসের কথাই ধরা যাক। একসময়ে নাকি কুস্তি টুস্তি করত। রাঘববাবুর কাছে একদিন এসে ধরে পড়ল, “হুঁজুর, গতরখানা তো দেখেছেন। এই দেহের খোরাকটা একটু বেশিই। কিন্তু দিনকাল যা পড়েছে তাতে দু’বেলা ভরপেট জোটানোই মুশকিল, যদি একটু আশ্রয় দেন তা হলে যা করতে বলবেন, করব।”
কালোয়াত গুণেন সাঁতরা, মস্ত নাকি গাইয়ে, কিন্তু গাঁ-গঞ্জে সমঝদার না পেয়ে একদিন সভাগায়ক হবে বলে রাঘববাবুর কাছে এসে হাজির। রাঘববাবু সব শুনে তটস্থ হয়ে বললেন, “আজ্ঞে, আমি তো রাজা জমিদার নই, আমার সভা-টভাও নেই, কাজেই সভাগায়ক রাখার কথাই ওঠে না। আমি রসকষহীন নিকষ্যি ব্যবসাদার।” গুণেন ভারী মুষড়ে পড়ে বলল, “তবে যে সবাই বলছিল আপনার কাছে এলেই নাকি একটা হিল্লে হবে?” রাঘববাবু কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “আজ্ঞে, কালোয়াতি গানও আমি বুঝি না। বড়জোর কেত্তন বা শ্যামাসঙ্গীত অবধি আমার দৌড়, তবে গুণী মানুষের কদর আমি বুঝি। এসে যখন পড়েছেন তখন তো আর ফেলতে পারি না।”
লম্বা, সুড়ঙ্গের মতো সুটকো চেহারার ভূ*তনাথ হালদার, সে নাকি একজন ভূ*ত-বিশারদ। যত বুজরুক সব এসে এই রাঘবের ঘাড়ে ভর করে। ভূ*তনাথ নাকি ভূ*তবিদ্যা গুলে খেয়েছে। তার চারদিকে সর্বদাই ভূ*তের ভিড়! বছরটাক আগে এসে সেও জুটে গেল এ বাড়িতে। রাঘবকে বলল, “বাবুমশাই, ভূ*ত বড় ত্যাঁদড়। আপনার সুরক্ষার তো দরকার আছে।"
বৈজ্ঞানিক হলধর হালদার একসময়ে কালিকাপুর ইস্কুলে বিজ্ঞানের মাস্টার ছিলেন। মাথাপাগলা মানুষ। ইস্কুল কামাই করে বাড়িতে বসে নানারকম উদ্ভট বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতেন। শেষে ইস্কুলের কর্তৃপক্ষ বিরক্ত হয়ে তাঁকে চাকরি থেকে ছাড়িয়েই দিলো। বিপাকে পড়ে তিনিও এসে একদিন জুটে গেলেন রাঘবের বাড়িতে।
রাঘববাবুর এই যে অজ্ঞাতকুলশীল উটকো লোকদের আশ্রয় দেওয়া, এটা বাড়ির লোকেরা মোটেই ভাল চোখে দেখে না। কিন্তু তাকে বলে বিশেষ লাভ হয় না। বড়ই দয়ার শরীর। লোকে যা বলে তাই বিশ্বাস করে বসেন। কিছুদিন আগে পিছনের বাগানের আগাছার জঙ্গলে একজন লোককে পড়ে থাকতে দেখে বাগানের মালি চেঁচামেচি শুরু করে। লোকটাকে তুলে এনে মুখেচোখে জল থাবড়ানোর পর সে জ্ঞান ফিরে পেয়ে যা বলল তা আষাঢ়ে গল্প। সে নাকি এই পৃথিবীর লোক নয়। অনেক দূরে অন্য এক নীহারিকায় এক গ্রহে তার বাস। সেই গুলবাজ গোলাপ রায় ও থেকে গেল!
এই যে এত সব উদ্ভট লোক এসে জড় হচ্ছে বাড়িতে শেষমেশ রাঘববাবু কোনো বিপদে পড়বেন না তো? আর বিপদে পড়লে এই মুফতে খাওয়া লোকগুলোর ভূমিকাই বা কী হবে বলা মুশকিল। রাঘববাবুর বাড়িতে আসলেই উদ্ভট কর্মকাণ্ড চলছে!
🫒পাঠ প্রতিক্রিয়া🫒
অদ্ভুতুড়ে সিরিজের "রাঘববাবুর বাড়ি" পড়ে মোটামুটি মজা পেলাম। খুব ভালো নয় আবার খুব খারাপ নয়। এটাকে মধ্যম মানের বই বলা যায়। রাঘববাবুর বাড়িতে যেসব লোক থাকতে আসছে মূলত তারাই এই গল্পের প্রধান আকর্ষণ। তবে সবচেয়ে মজা লেগেছে ভূ*তেদের আগমন। তবে তারা কোথা থেকে আগমন করেছে সেটা বলবো না। তবে এই অংশটুকু বেশি ভালো লেগেছে।
অদ্ভুতুড়ে সিরিজের লেখাগুলো গতানুগতিক ধারার নয়। কিশোরদের জন্য লেখাগুলো সহজ সাবলীল এবং রঙিন। এখানে এডাল্ট মাইন্ড নিয়ে পড়লে ভালো লাগবে না। শীর্ষেন্দুর বড়দের বইগুলোর থেকে আমার কেন জানি না এই বইগুলো বেশি ভালো লাগে। একটি বাড়িকে ঘিরে সুন্দর লেখনীতে বইটি তৈরি। তবে এর চেয়েও সুন্দর এবং মজার বই অবশ্য এই সিরিজে আছে।
চরিত্রদের মধ্যে আমার নন্দলাল কে ভালো লেগেছে। এছাড়া ওই বিজ্ঞানী শুরুতে বেশি অবদান না রাখলেও শেষটায় কিন্তু সে চমক দেখাবে। সব মিলিয়ে ভালো লাগার সিরিজ এই অদ্ভুতুড়ে।
🫒বইয়ের নাম: "রাঘববাবুর বাড়ি"
🫒লেখক: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
🫒 প্রকাশনা: আনন্দ পাবলিশার্স