হরিপুর গাঁয়ে একটা সময়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মাঝে অনেক রেষারেষি ছিলো, কিন্তু কালক্রমে তারা সবাই পরস্পরের খুব ভালো সঙ্গী হয়ে ওঠে। গাঁয়ের একপ্রান্তে একটেরে জঙ্গুলে বাড়িতে সরলাবুড়ির আশ্রিত ছিলো শূলপাণি নামের এক খ্যাপাটে লোক। বুড়ি মারা যাবার পর সে একাই থাকতো সেই বাড়িতে, কারো সাথে বড় মিশতো না। প্রতিরাতে ঠিক আটটায় সে বিকট শব্দে হেসে উঠতো, আর গোটা গাঁ সেই শব্দ শুনতে পেতো। কিন্তু কে জানে কেন, এক রাতে শূলপাণি হাসলো না। কী হয়েছে শূলপাণির?
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
হরিপুর গ্রামটার বিশেষত্ব কি? এখানে প্রতিদিন রাত আটটার সময় শূলপানি বিকট শব্দে খ্যা খ্যা করে হেসে ওঠে। বন্দুকের গুলি মিস হতে পারে, কিন্তু তার হাসি মিস হবে না। আপনার ঘড়ি স্লো হয়ে গেছে? সমস্যা নেই, তার হাসির সাথে মিলিয়ে নিন, একদম ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু একদিন হলো কি, শূলপানির হাসি শোনা গেল না। গ্রামের সবাই আতঙ্কিত। এ কি অলুক্ষণে কাণ্ড। খোঁজ নিতে জড়ো হলো গাঁ-সুদ্ধ মানুষ। কিন্তু শূলপানিকেও পাওয়া গেল না। এরপরই ঘটতে শুরু করলো একের পর এক ঘটনা।
পুরো উপন্যাস জুড়ে হাসির খোরাকের কোন অভাব নেই। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে বিশাল ভুড়িখানা নিয়ে আমি শূলপানির মত খ্যা খ্যা করে হাসছি। আবার একই লাইনটা পড়ছি, আবার হাসছি। তবে এটাকে শুধু হাসির উপন্যাস ভাবলে ভুল হবে। আগাগোড়া ছোট ছোট রহস্যে ভর্তি, একদম শেষ অবধি। রীতিমত ট্রেজার হান্টিং। ভারি ভারি বইয়ের ফাঁকে এরকম দুই একটা উপন্যাস অনায়াসে পড়ে ফেলা যায়। মনে ভালো থাকবে।
এরপর মনোজদের অদ্ভুত বাড়ী পড়বো। রিজওয়ান ভাইয়ের মতে ওটাই অদ্ভুতুড়ে সিরিজের সেরা উপন্যাস। প্রান্ত ভাইকে ধন্যবাদ এই বইটা উপহার দেয়ার জন্যে।
কি আজব! দুইজন জলজ্যান্ত মানুষ উধাও? এ কি করে সম্ভব! শূলপাণির ঘর থেকে একটা কাঠের বাক্সও সেই রাতে গায়েব হয়ে যায়। তাও আবার নগেন দারোগা, গদাই নস্করের নাকের সামনে দিয়ে। সেই বাক্সে আছে সাতটি কড়ি আর সাতটি পুরানো পয়সা। কিন্তু কি এর রহস্য? কোন গুপ্তধন??
গ্রামের নাম হরিপুর। শান্ত আরর নির্ঝঞ্ঝাট একটা গ্রাম এই হরিপুর। একটা সময় যার সাথে যার অমিল ছিলো, সম্পর্ক খারাপ ছিলো এখন তাদের মাঝেই গলায় গলায় মিল। কি অদ্ভূত গ্রামের এই মানুষগুলা। এই যেমন গ্রামের দারোগা নগেন একটা সময় নাওয়া খাওয়া ভুলে ডাকসাইটে ডাকাত সর্দার গদাই নস্করকে ধরার জন্য পাগল হয়ে ছিলো। আর এখন দুজন প্রতি সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে দাবা খেলেন। এক সনয় হরিপুর গ্রামের জমিদার ছিলেন মহেন্দ্র রায় (এখন অবশ্য সেই জমিদারি নেই) আর তখন তার রাজদ্রোহী ছিলেন পবনকুমার। পবনকে তখন ধরার জন্য উঠে পড়ে ছিলেন মহেন্দ্র। আর এখন দুজন একসাথে আড্ডা দেন। গ্রামের এলোপ্যাথি ডাক্তার শহিদলাল, হোমিওপ্যাথি বিশু দত্ত আর কবিরাজ রামহরি। একটা সময় তিনজন কেউই কাউকে দেখতে পারতেন না। আর এই বৃদ্ধ বয়সে এসে যেকোন অসুখে তিনজনই তিনজনের কাছে ছুটে যান। এরা ছাড়াও গ্রামে আছে শূলপাণি নামের একজন পাগল। কারো কাছে সে পাগল, কেউ বলে বিজ্ঞানী। একেকজন একেক কথা বলে। সেই শূলপাণি গত ত্রিশ বছর ধরে ঠিক আটটা বাজে এক অট্টহাসি দেয়। কেউ জানে না কি কারণ তার। কখনো এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় নি।
কিন্তু আজ হলো! শূলপাণি ঠিক আটটায় হাসি দেয় নি। গ্রামের সব লোক গিয়ে জড়ো হলো তার ঘরে। অদ্ভূত! শূলপাণি ঘরে নেই। ঠিক তার পরদিন সকালে গ্রামের লোক জানতে পারলো গ্রামের পরঞ্জয় বাবুও ঘরে নেই।
নিঃসন্দেহে আমার পড়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ শীর্ষেন্দুর লেখনিতে অদ্ভুতুড়ে সিরিজের উপন্যাস। সম্ভবত আনন্দের গড়পড়তার নির্দিষ্ট ১০০-১২০ পেজের পকেটবুক সাইজের টেমপ্লেটে আটকে না থেকে দে'জের পূর্ণদৈর্ঘ্যের বইয়ের আকারে ছোট ছোট অক্ষরে অপেক্ষাকৃত বৃহদাকায় কাহিনিতে ডেভেলপ করতে পারাতেই অতীব সুস্বাদু রহস্যময় রোমাঞ্চকর সরেস একটি অদ্ভুতুড়ে রহস্যোপন্যাস হিসেবে যথাযথ আঙ্গিকে ঠিক যেমনটা দরকার ছিল তেমন ভাবে এগিয়ে গিয়ে ঠিক যেখানে দরকার ছিল সেখানেই থেমেছে। জাস্ট পার্ফেক্ট। মনোজদের অদ্ভুত বাড়ী চিরকালই আমার পড়া শীর্ষেন্দুর শ্রেষ্ঠ অদ্ভুতুড়ে কিশোর-উপন্যাস হয়ে থাকবে, তবে 'হরিপুরের হরেক কাণ্ড' খুব বেশি দূরেও থাকবে না।
হরিপুরের হরেক বাসিন্দাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বাসিন্দা হলো শূলপাণি।গত ত্রিশ বছর ধরে ঠিক রাত ৮ টা বাজলে সে অট্টহাসি হেসে উঠে।তার এই হাসির উপর নির্ভর করে অনেক গুরুত্বপূর্ন বিষয়াদি যেমন- প্রিয়নাথ বাবু এই হাসি শুনেই ফটিককে পড়ানো ক্ষ্যান্ত দেন,মহেন্দ্র বাবু তার মুদি দোকানের ঝাঁপি ফেলেন,অন্নদাপিসী তার পূজা-আহ্নিক সেরে ফেলেন,কেউবা আবার নিজের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নেন- ইত্যাদি ইত্যাদি। তা একদিন শূলপাণি হাসলোনা।হরিপুরের মানুষের দৈনিক রুটিনে ঐদিন বেশ গোলমাল হয়ে গেলো। খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো,শূলপাণি হাপিস হয়ে গেছে।সাথে খোয়া গেছে তার ঘরের সাত কড়ি সাত পয়সার বাক্সটাও। বাক্স খোঁজার জন্যে পিছে লাগলো চোর। সেই চোরের পিছে আরেকদল চোর। তাদের পিছে আরেকদল চোর। এত চোরের কাহিনী কি?আর ওই বাক্সই বা কই আছে?শূলপাণি ই বা কই লাপাত্তা হলো? সবকিছু মিলিয়ে ভজঘট পাকিয়ে মজার বই হরিপুরের হরেক কাণ্ড!
হরিপুরে গাঁয়ের শূলপাণি প্রত্যহ রাত আটটায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। বছরের পর বছর এই ঘটনার ব্যত্যয় হয়নি। কিন্তু হঠাৎ এক রাতে কেউ শূলপাণির হাসি শুনতে পেল না। চারদিকে হইচইয়ে নরক গুলজার। কী হয়েছে শূলপাণির? সেই উত্তর পেতে পড়তে হবে 'হরিপুরের হরেক কাণ্ড'।
পাগলাটে লোক, বোকা চোর, কতিপয় মন্দ আদমি প্রভৃতি হলো অদ্ভুতুড়ে সিরিজের সিগনেচার বৈশিষ্ট্য। যা পুরোমাত্রায় বইটিতে পেয়েছি। যদিও 'মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি', 'পটাশগড়ের জঙ্গল'-এর মতো বইয়ের সঙ্গে তুলনা চলে না।
অদ্ভুতুড়ের ভাল ভাল বইগুলিরই রেটিং কম নাকি রে, জগুয়া?
- কা জানতে রামপ্রসাদ ভায়া, লোকে বোধহয় হাইপ দেখে পড়ে।
কিন্তু এই বইটার মত পিওর এডভেঞ্চার বই কি অদ্ভুতুড়েতে আছে? এখানে কোন ভূত নেই, তবে পাত্র পাত্রীর প্রায় সবার বয়সই ৭০+। ৭০+ বয়সের লোকরা এত কুল, আর ফিট, এটাই অদ্ভুত।আর অদ্ভুতুড়ের অন্যান্য গল্পগুলির চেয়ে এই উপন্যাসটা বেশ গোছানো। আর আছে ভরপুর চোর।
একটা লিমেরিক লিখেছি এই বইটা নিয়ে:
"ধাঁধা আছে, গুপ্তধন ভি আছে, আউর আছে হাসি, রাত ৮টায় পড়িতে বসবেন, শূলপাণি বলে হাসি।"
চোর রামপ্রসাদের হিন্দি বুলি মারাত্মক হাইস্যকর।
আর বেশি বললে রামু চোর হামার কোঠিমে চোরি করেগা,এইখানেই থামি উইথ স্ট্রং রিকমেন্ডেশন।
বেশ জমে উঠেছিল। কেমন একটা টান টান ভাব। অদ্ভুতুরের সব গুন বরাবরের মতই বিদ্যমান। তবে শেষ টা কেমন তাড়াতাড়ি ই হয়ে গেল। শেষ টা যদি আরেকটু জমতো,তাহলে দারুণ একটা পাঠ্য হতো। এখন ও যে খারাপ তা না,তবে অন্য অদ্ভুতুরের তুলনায় একটু কম মনে হয়েছে।
অদ্ভুতুড়ে সিরিজ পড়তে পড়তে আপনি শুরুতেই খুঁজে পাবেন অদ্ভুত মানুষ আর অদ্ভুত সব জগতের মধ্যে ঢুকে পড়া। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই সিরিজে গল্পে বাস্তব আর অবাস্তবের সীমারেখাটা কখন যে মিলেমিশে যায়, তা বোঝাই যায় না। অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বইগুলোতে সেই বৈশিষ্ট্য যেন আরও বেশি করে ধরা দেয়। ‘হরিপুরের হরেক কাণ্ড’ তার চমৎকার একটি উদাহরণ।
হরিপুর নামটা শুনলে খুব সাধারণ একটি গ্রামের কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এই গ্রাম মোটেই সাধারণ নয়। এখানকার মানুষজন যেমন বিচিত্র, তেমনই বিচিত্র তাদের অতীত, স্বভাব আর কর্মকাণ্ড। গ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে নানা গল্প, গুজব, রহস্য এবং অদ্ভুত সব ঘটনা। ফলে বইয়ের শুরু থেকেই যেন মনে একটা কৌতূহল তৈরি হয় যে হরিপুরে আসলে কী হচ্ছে?
এই উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র শূলপাণি। হরিপুর গ্ৰামে সরলা বুড়ির আশ্রয়ে থাকে লোকটা।লোকটি এমনিতেই অদ্ভুত। তার আরও অদ্ভুত একটি অভ্যাস আছে। প্রতিদিন রাত ঠিক আটটায় তার বাড়ি থেকে ভেসে আসে প্রচণ্ড হাসির শব্দ। এতটাই নিয়মিত সেই হাসি যে গ্রামের মানুষ পর্যন্ত সেই শব্দের সঙ্গে নিজেদের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নেয়। কিন্তু হঠাৎ একদিন রাত আটটা বাজল, অথচ শূলপাণির সেই হাসি শোনা গেল না। শুধু তাই নয়, শূলপাণিও নিখোঁজ।
ব্যস! এখান থেকেই শুরু রহস্যের আসল খেলা।শূলপাণি কোথায় গেল? তার হাসির রহস্যই বা কী? তাকে কি কেউ অ*পহরণ করেছে, নাকি সে নিজেই কোথাও চলে গেছে? আর এই ঘটনার সঙ্গে গ্রামের অন্যান্য অদ্ভুত ঘটনাগুলোরই বা কী সম্পর্ক? ওদিকে আবার শূলপাণির ঘর থেকে একটা কাঠের বাক্সো উধাও। যেখানে ছিল সাতটি তামার ও কড়ির পয়সা। এগুলোর রহস্যই বা আসলে কী?
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় খুব ধীরে ধীরে রহস্যের জট খুলেছেন। পাঠককে একেবারে শুরুতেই সবকিছু জানিয়ে দেননি। বরং একের পর এক চরিত্র, ঘটনা আর সূত্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। ফলে পড়তে পড়তে বারবার মনে হয় আসল রহস্যটা বোধহয় এবার বুঝে ফেলেছি! কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পরেই দেখা যায়, হিসাবটা ঠিক মেলেনি। এবং গল্প ডালপালা মেলে আরো ছড়িয়ে পড়েছে।
বইটির চরিত্রগুলোও আমার পড়তে পড়তে বেশ মজার লেগেছে। প্রাক্তন ডা*কাত গদাই নস্কর, অবসরপ্রাপ্ত দা*রোগা নগেন, বিজ্ঞানী সুজন বোস, শূলপাণি এবং আরও কত বিচিত্র মানুষ। প্রত্যেকেই যেন নিজের মতো করে একটি গল্প। তাদের কথাবার্তা, আচরণ এবং পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই তৈরি হয়েছে উপন্যাসের হাস্যরস। শীর্ষেন্দুর লেখায় এই বিষয়টি বরাবরই খুব উপভোগ্য যে তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন অদ্ভুত মানুষকে গল্পের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করাতে পারেন, অথচ চরিত্রটিকে কখনোই কৃত্রিম মনে হয় না।
এখানে রহস্যের পাশাপাশি রয়েছে গুপ্তধনের গুজব, সন্দেহ, পুরোনো শত্রুতা, বিজ্ঞান, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং নানা অস্বাভাবিক ঘটনা। ফলে গল্পটি একদিকে যেমন কিশোরদের জন্য রোমাঞ্চকর, অন্যদিকে বড়দের জন্যও যথেষ্ট উপভোগ্য। বিশেষ করে শীর্ষেন্দুর স্বভাবসিদ্ধ রসবোধ গল্পের রহস্যময় পরিবেশকে কখনোই অতিরিক্ত ভারী হতে দেয়নি।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে হরিপুরের পরিবেশটা। শহরের কৃত্রিমতা থেকে দূরে, গ্রামের মানুষজনের নিজস্ব জীবনযাপন, তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, কৌতূহল, গুজব সবকিছু মিলিয়ে হরিপুর যেন বইয়ের পাতায় তৈরি হয়ে ওঠা এক জীবন্ত জায়গা। মনে হয়, বইটা পড়ছি না, বরং হরিপুরের কোনো এক চায়ের দোকানে বসে গ্রামের মানুষদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া রহস্যের গল্প শুনছি।
আর শীর্ষেন্দুর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই।তিনি খুব সাধারণ ঘটনাকেও এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন যে সেটি অসাধারণ হয়ে ওঠে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে শোনা হাসি, একজন মানুষের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কিংবা গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া একটি গুজব সবকিছুই তার কলমে রহস্যের অংশ হয়ে ওঠে।
তবে বইটির নামের মতোই এর ভেতরেও আছে হরেক কাণ্ড। একটিমাত্র রহস্যকে ঘিরে গল্প এগোলেও তার সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকে আরও নানা ঘটনা। কোথাও হাসি, কোথাও উত্তেজনা, কোথাও বিস্ময় সব মিলিয়ে পড়ার সময় একঘেয়েমি আসার সুযোগ খুব কম।হরিপুরের হরেক কাণ্ড মূলত এমন একটি বই, যা পড়তে বসলে মনে হয় একটু মজা করে রহস্যের জগতে ঢুকে পড়ি। কিন্তু পড়া শেষ করার পর বুঝতে পারি, গল্পটা শুধু রহস্য বা রোমাঞ্চের ছিল না।হরিপুরের মানুষগুলোকেও বেশ আপন করে ফেলেছি।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভুতুড়ে জগতের সৌন্দর্যই বোধহয় এখানেই। তার গল্পে ভূ*ত থাকুক কিংবা রহস্য, গুপ্তধন থাকুক কিংবা নিখোঁজ মানুষ সবকিছুর মধ্যেই একটা শিশুসুলভ বিস্ময় লুকিয়ে থাকে। ‘হরিপুরের হরেক কাণ্ড’ সেই বিস্ময়কে ধরে রাখা এক মজার, রহস্যময় এবং দারুণ উপভোগ্য উপন্যাস। তবে শেষটা আরেকটু যদি সাসপেন্স হতো আরেকটু ভালো লাগতো বেশি।
🎉 বইয়ের নাম: "হরিপুরের হরেক কান্ড" 🎉 লেখক: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
হরিপুর একটা অদ্ভুত গ্রাম। যেখানে প্রতিদিন রাত ৮ টার সময় শূলপানি নামে একজন হেসে উঠে। ঝড় বৃষ্টি যাই হোক না কেন। সে ঠিক রাত ৮ টার সময় ই হেসে উঠবেই। প্রথম সবাই ভয় পেলেও পরে সবার গাসহা হয়ে যায়। এবং অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে মানুষ তাদের ঘড়ির টাইম মিলাতে শূলপানির হাসির জন্য অপেক্ষা করে। কারণ শূলপানি যে ঠিক ৮ টায় হাসি দেয়। হঠাৎ একদিন শূলপানির হাসি শুনতে না পেয়ে আশ্চর্য হয়ে যায়। এবং গ্রামের সকল মানুষ শুলপানির বাড়ি গিয়ে দেখে শূলপানি নেই। আর এখান থেকেই রহস্যের শুরু।
প্রচুর হাসি আর রহস্য দিয়ে সম্পূর্ণ বইটি ভরপুর। আর শীর্ষেন্দু অদ্ভূতুরে সিরিজ মানেই অসাধারণ কিছু। অদ্ভূত সব ক্যারেক্টর আর তাদের অদ্ভুত সব কাজকারবার আপনাকে একটু হলেও অদ্ভুত অনুভূতি দিতে বাধ্য করবে।
বইটা গেলবার পুজোর সময়ে অর্ডার দিয়ে ষষ্ঠী নাগাদ হাতে পেয়েছিলাম। সবাই বলছিল পরে অর্ডার দিস, কিন্তু মনে ভয় ছিল যদি আউট অফ স্টক হয়ে যায়? পুজোর দিনগুলোতে বাড়ির কিছুদূর থেকে আসা ঢাকের মৃদু আওয়াজের কোরাসে এই বইটা পড়ার সুখস্মৃতি অনেকদিন মনে থাকবে। পড়ার অনুভূতি এতই ভালো যে, প্লট নিয়ে সমালোচনা করার নেই এবারে।
It's engaging but not that entertaining. আমি আমার আগের একটি রিভিউতে বলেছিলাম যে আমার মতে অদ্ভুতুড়ে সিরিজের কোনো গল্পকেই "খারাপ" বলা যায় না। কোনোটা হয়তো অনেক ভালো, আর কোনোটা হয়তো একটু কম ভালো। অর্থাৎ, ভালো বিশেষণটি সর্বদা বিদ্যমান। এমনই গুণধর লেখক শ্রদ্ধেয় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। "হরিপুরের হরেক কান্ড" গল্পটি ওই একটু কম ভালো-এর কাতারে পড়লেও সামগ্রিকভাবে আকর্ষণপূর্ণ ছিল।
এই ছোট্ট বইটা শেষ করতে অনেক সময় লেগে গেল। যা হোক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যয়ের অদ্ভুতুড়ে সিরিজ বরাবরই আমার খুব প্রিয়। এই বইটাও তার ব্যতিক্রম ছিল না তবে শেষ দিকে মনে হল অহেতুক কাহিনীকে টেনে লম্বা করা হয়েছে।
শুরু এবং শেষ টা সাধারন ছিল। কিন্তু মাঝের অংশ টুকু দুর্দান্ত ছিল। টেনে লম্বা না করে ৬০ পেইজের মধ্যে রাখলে খুব ভাল একটা থ্রিলার হতে পারত। ৪০+ চরিত্রের সমাগম গল্পটিকে একটু ঝুলিয়েই দিয়েছে। অপ্রয়োনীয় কাহিনি বলতে গিয়ে শূলপাণির হাসির রহস্যই খোলাসা হয় নি।