বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে, কলকাতায় বসবাসরত চার তরুণ-তরুণী - জয়িতা, আনন্দ, সুদীপ আর কল্যাণ দেশের জন্য কিছু করতে চাই, তবে সেটা ব্যতিক্রমীভাবে। সেই সময়টাতে ঘুণে ধরা সমাজ যখন রাজনৈতিক শোষণ, অর্থনৈতিক শোষণে মত্ত, সাধারণ মানুষেরা কিছু করছে না, শুধুমাত্র নিজের জন্য নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা ছাড়া। আর দিনশেষে পাবলিক প্লেসের আড্ডায়, এর ওর উপর দোষ চাপিয়ে খালাস। তারা চারজন এই সিস্টেমটাকেই ভাঙতে চাইছিল।
সুদীপ, অসৎ উপায়ে সম্পদশালী হওয়া অবনী তালুকদারের একমাত্র সন্তান। পুঁজিবাদী সমাজের এই শোষণ নিজ থেকে দেখা। কিছুটা রগচটা, সাহসী। জয়িতা, সদ্য মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত হওয়া পরিবারের মেয়ে। তবে তার শ্রেণীর সেই কৃত্রিমতা, সমাজের মেকি সংস্কারকে অপছন্দ করে, নিজেকে মেয়ের চেয়ে মানুষ মনে করাই মেয়েলি ব্যাপার স্যাপার এড়িয়ে চলে। আনন্দ, মধ্যবিত্ত তবে সচ্ছল পরিবারের সন্তান। ধীরস্থির, শান্ত, বুদ্ধিমান আনন্দই এই দলের নেতৃত্ব দেয় বলা চলে। কল্যাণ, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, গতানুগতিক সংস্কার থাকলেও দেশকে বদলানোর স্বপ্ন দেখে।
এই চারজনই প্রেসিডেন্সি কলেজের মেধাবী শিক্ষার্ধী, এই ঘুণে ধরা সমাজকে বদলাতে চাই। ততোদিনে এমন মতবাদের কার্যক্রম নকশালবাদ বিফল হয়েছে। তবে তাদের উদ্দেশ্য অন্য। তারা সমাজের কিছু অন্ধকার-খারাপ দিককে উপড়ে ফেলে বাঙালির বোধে আঘাত করে জাগাতে চাই। তাই তারা বেছে নিল উগ্রপন্থা। প্যারাডাইস নামে এক এসকর্ট রিসোর্টে আগুন ধরিয়ে, এক জাল ঔষধের গোডাউনে আগুন দিয়ে, এক দূর্নীতিবাজ মন্ত্রী আর তার গুন্ডা সহচরকে খুন করে তারা। লোকদের মাঝে তাদের কাজ নিয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়।
তবে প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে তারা চারজন আশ্রয় নেই হিমালয়ের কোলে, ভারত নেপাল সীমান্তে এক পাহাড়ি গ্রাম তাপল্যাঙে। সেই গ্রামে আদিবাসীদের আবাস, সভ্যতার আঁচড় লাগে নি তাতে। সেখানে শোষণ নেই, তবে অজ্ঞতার জন্য সেখানকার মানুষ কিছু করতে পারছেন না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে পালটে যায়। ক্রমেই তারা শুরু করে সেই পাহাড়ি গ্রামকে সামর্থ্যবান করার সাধনা। পরিবর্তন যদি করতে হয় সেই ছোট জায়গা থেকে শুরু হোক। তাদের স্বপ্ন পূরণ করার আত্মত্যাগ, সংগ্রাম আর সাধনা নিয়েই এই 'গর্ভধারিণী' বই।
'গর্ভধারিণী', জনপ্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদারের লেখা একটি উপন্যাস। এর আগে লেখকের 'আট কুঠুরি নয় দরজা' বইটা পড়া ছিল। ওই সময় শুধু থ্রিলার পড়তাম, তাই থ্রিলার হিসেবে বিপ্লব, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয় দিয়ে ভর্তি একঘেয়ে বোরিং সেই বইটা পড়ে বেশ হতাশ হয়েছিলাম। তবে 'গর্ভধারিণী' থেকে থ্রিলার আশা করি নি, একটা সামাজিক উপন্যাস হিসেবে পড়তে শুরু করেছিলাম। আর শেষ করে বইটা ভালোই লাগলো।
সমরেশ মজুমদারের লেখা প্রাঞ্জল, তাই পড়তে আরাম। তবে তিনি ঘটনাপ্রবাহ এমন বিশদভাবে বর্ণনা করেন যে তা অনেক বড় হয়ে যায়। এইজন্য বইটার ব্যাপ্তি অনেক। বইটা শুরুই হয় মূল চারজন চরিত্রের গঠনের মাধ্যমে। প্রথম চার অধ্যায়ে এই চারটি চরিত্রকে লেখক বেশ ভালোভাবেই পাঠকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর গল্পের জন্য ঐ সময়কার সামাজিক পরিস্থিতি, মূল চরিত্রদের দর্শন বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
লেখকের ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং বেশ ভালো। খুব চমৎকারভাবে গল্পের সময়কার পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখিয়েছেন। গল্পের দ্বিতীয়ার্ধে সেই হিমালয়ের কোলঘেষা গ্রামের এমন বর্ণনা দিয়েছেন যে এই গরমেও হালকা হালকা শীত লাগছিল। বইয়ের চরিত্রায়নও বেশ ভালো। মূল চারটি চরিত্রকে লেখক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়ে গড়েছেন। সেইসাথে তাদের নিজস্ব ধরণ, মানসিক টানাপোড়েন লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। চরিত্রগুলোকে তাদের দর্শনের ক্ষেত্রে লেখক সংশয়ে রেখেছেন। এইজন্য চরিত্রগুলোর চেতনা, মনোভাব গল্পের নানা জায়গায় বদলে যাচ্ছিল। এইক্ষেত্রে লেখক বেশ স্মার্টনেসের পরিচয় দিয়েছে।
বইয়ে লেখক সমাজের চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কিছু ভালো সোশ্যাল মেসেজ ছিল। তবে গতানুগতিক, জীবন বদলে দেওয়ার মতো কিছু না। আর কিছু ক্ষেত্রে চরিত্রগুলোর কিছু মনোভাবকে বাজে লেগেছিলো আমার। তবে যেহেতু চরিত্রগুলো ভুল করছিল, সেইসব বিষয়কেও চরিত্রগুলোর ভুল মনোভাব বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। এখানেই লেখকের চালাকি। গল্পের কিছু কিছু অংশে বেশ সাসপেন্স আছে। কিন্তু তাই বলে এটাকে থ্রিলার বলা যায় না।
বইয়ের প্রথমার্ধ আমার তুলনামূলক কম ভালো লেগেছে দ্বিতীয়ার্ধের তুলনায়। প্রোটাগনিস্টদের মনোভাব গতানুগতিক রোমান্টিক বিপ্লব থেকে একটু আলাদা হলেও, অনেক ভুল ভ্রান্তি ছিল তাতে। সেই কথাগুলোর বারবার রিপিটেশন, আর সেইসাথে প্লট ডেভেলপমেন্টের জন্য লেখকের অনেক অপ্রয়োজনীয় দৃশ্য আনা পড়ে বিরক্তি এসে যায়। প্রথম প্রায় ১৫০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এমনটা থাকে। এরপর থেকে গল্প আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। পাহাড়ের অংশটা ভালো ছিল বেশ। তাতে লেখকের বাম চেতনা ভালোমতোই প্রকাশ পাই। শেষ দিকে গল্পে হুট করে এক নাটকীয় মোড়ের মাধ্যমে এই বইটার সমাপ্তি হয়েছে, যা নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র।
এবার বইটার একটা বিশেষ অংশ নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছি। তা হলো জয়িতা চরিত্রটি। প্রোটাগনিস্ট চারজন হলেও লেখক ফেমিনিস্ট বিধায় স্পটলাইটে সবসময় জয়িতাকে রেখেছেন। সাধারণভাবে এই চরিত্রটিকে নারীবাদী দেখালেও খুবই টক্সিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে একটু আগে বললাম চরিত্রগুলোর রঙ ক্রমশ বদলে লেখক সেটা ঠিক না ভুল তা শুধু পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। এজন্য জয়িতা চরিত্রটির একেক রুপ নিয়ে পাঠকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে চরিত্রটাকে নিয়ে অতিরিক্ত আধিখ্যেতা আমার কাছে বিরক্তিকর লেগেছে।
জয়িতা নিজেকে মেয়েই মনে করে না, সে মেয়ে হলেও ছেলেদের মতো চলাফেরা করে, এই কথাগুলো বারবার পড়তে পড়তে তো একটা পর্যায়ে মাথাই ধরে গেছে আমার। আর শেষে তাকে ঘিরে যে নাটকীয় ব্যাপারটা সেটা অনেক অযৌক্তিক। গ্রামে তার অবদান যতোটা না ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাতে শেষে তাকে ঘিরে এতো বোলবোলা সত্যিই বিরক্তিকর লেগেছে। যাইহোক, সবশেষে লম্বা সময় নিয়ে একটু একটু করে বইটা পড়তে খারাপ লাগলো না। প্রথম দিকে গল্প একটু স্লো হলেও, ১৫০ পৃষ্ঠার পর থেকে বইটা উপভোগ্য। সমরেশের মজুমদারের প্রাঞ্জল লেখনীর জন্যও পড়তে ভালোই লেগেছে।
📚 বইয়ের নাম : গর্ভধারিণী
📚 লেখক : সমরেশ মজুমদার
📚 বইয়ের ধরণ : সামাজিক উপন্যাস, কন্টেমপোরারি ফিকশন
📚 ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৫/৫