অশনি-সংকেত উপন্যাসের পটভূমি ১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষপীড়িত বৃহত্তর বাংলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করলে বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দেয়। ফলে ৫০ লাখ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হন। খুব ছোট একটা গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উপন্যাসে লেখক দেখান, এই দুর্ভিক্ষ কিভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছিল।
উপন্যাসের শুরুতে দেখা যায়, গঙ্গাচরণ নামে এক শিক্ষিত ব্রাহ্মণ সস্ত্রীক নতুন গাঁয়ে এসে বসতি স্থাপন করে। নতুন গাঁ ব্রাহ্মণবিহীন, সেই সুযোগে ধূর্ত গঙ্গাচরণ সেখানকার প্রধান পুরোহিত হয়ে টোল খোলার পরিকল্পনা করতে থাকেন। সরল গ্রামবাসীরাও নিজেদের মধ্যে একজন ব্রাহ্মণকে পেয়ে খুশি হয়ে ওঠে। তার স্ত্রী অনঙ্গ নিজের মধুর ও স্নেহশীলা স্বভাবের জন্য অচিরেই গ্রাম্যবধূদের ভালবাসা অর্জন করে। এই সময় দুর্ভিক্ষ লাগলে গ্রামে খাদ্যের আকাল দেখা যায়। চতুর গঙ্গাচরণ নিজের জন্য কিছু চাল সংগ্রহ করে নেয়। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয় না। ক্রমশ দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ আঁচ লাগতে থাকে গ্রামের মানুষের গায়ে।
Bibhutibhushan Bandyopadhyay (Bangla: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়) was an Indian Bangali author and one of the leading writers of modern Bangla literature. His best known work is the autobiographical novel, Pather Panchali: Song of the Road which was later adapted (along with Aparajito, the sequel) into the Apu Trilogy films, directed by Satyajit Ray.
The 1951 Rabindra Puraskar, the most prestigious literary award in the West Bengal state of India, was posthumously awarded to Bibhutibhushan for his novel ইছামতী.
১৯৪৩-৪৪ সালের গ্রামীণ ভারতবর্ষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বারুদের গন্ধ এখানে এসে না পৌছালেও আরেক দাবানল ছারখার করে দেয় সমগ্র ভারতের গ্রামীণ সত্ত্বাকে। সেই দাবানলের নাম ক্ষুধা। অখন্ড ভারতবর্ষের মানুষের স্বপ্ন তখন অর্থ, অট্টালিকা আর প্রতিষ্ঠা নয়, শুধু একমুঠো চাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিকদের জন্য খাদ্যের অগ্রীম মজুত বাড়াতে ভারতবর্ষের গ্রামে গ্রামে শেষ খাদ্যদানাটুকুও ব্রিটিশ সরকার কেড়ে নিতে শুরু করে। শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। সারা ভারত জুড়ে মৃত্যুবরণ করে ৫০ লক্ষ অসহায় মানুষ। লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অশনি সংকেত উপন্যাসটিতে সেই দুর্ভিক্ষের দাবানলে এক সহায় সম্বলহীন দরিদ্র ব্রাক্ষ্মণ পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই উপস্থাপনের মাধ্যমে পাঠকদের নিয়ে গেছেন সেই ৭০ বছর পূর্বের গ্রামীণ ভারতবর্ষে।
নামকরণের স্বার্থকতাঃ স্বাধীনতাপূর্বে ভারতবর্ষের অবিভক্ত বাংলায় ধনী দরিদ্র সব মানুষের মাঝে অদ্ভুত এক অহংকার দানা বেঁধেছিল। সেই অহংকার ছিল প্রাচুর্যের। গোলা ভর্তি ধান। জলাশয়ে অসংখ্যা মাছের বিচরণ। সৃষ্টিকর্তার আদেশে যেন প্রকৃতি সবকিছু দান করেছে বাংলার মানুষকে। মানুষ দুটো ভাতের জন্য অনাহারে প্রাণ দিতে পারে এমন কথা তাদের কল্পনা জগতেও কখনো ঠাই পেত না। কিন্তু ছিয়াত্তরের মন্বত্তরের প্রায় দুইশত বছর পর মানুষ আবার জানলো দু মুঠো আহার হতে পারে কতটা দামী। উপন্যাসে নতুন গাঁয়ে দুর্ভিক্ষের দাবানলে যেদিন মতি নামের মেয়েটির প্রথম চিতা জ্বলে উঠলো সেদিন মানুষ বুঝতে পারলো ধধংসের সংকেত। অনাহারের আগুনে ছাই হয়ে উড়ে যাওয়ার লক্ষ মানুষের জন্য বিনাশের অশনি সংকেত।
চারিত্রিক বিশ্লেষণঃ সমগ্র উপন্যাসটিতে দরিদ্র ব্রাক্ষণ গঙ্গাচরণ যেন ছিল মস্তিষ্ক আর তার স্ত্রী অনঙ্গ বৌ ছিল হৃদপিন্ড। একটু ভাল থাকার, দুটা ভাল খাওয়ার আশায় গঙ্গাচরণ পরিবারকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম। কখনো বাসুদেবপুর, কখনো ভাতছোলা আবার কখনো নতুন গাঁ। গঙ্গাচরণ দরিদ্র হলেও কিছু শিক্ষিত ছিল। নতুন গাঁয়ে এসে টোল খুলে ছাত্র জুটিয়ে শুরুটা বেশ ভাল হয়েছিল গঙ্গাচরণের। চতুর গঙ্গাচরণ গ্রামের মানুষের মিথ্যে চিকিৎসা করেও সুনাম এবং সামগ্রী দুটো উপার্জন করছিলো। কিন্তু হঠাৎ একদিন সেই স্রোত থেমে গেল। শুরু হলো যুদ্ধ। হু হু করে বেড়ে যেতে লাগল চালের দাম। শুণ্য হয়ে গেল গুদাম ভরা পাহাড় সমান চালের সারি সারি বস্তা। যারা একদিন স্বপ্রনোদিত হয়ে মাছ, সবজি এনে ব্রাক্ষণকে সেবা দিত তাঁরাই দু মুঠো চালের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতো লাগল গ্রামের পর গ্রাম। এরই মাঝে একদিন অনঙ্গ বউ এর কোলজুড়ে আসে নবজাতক। যার মুখে আহার দিতে গঙ্গাচরণ আর অনঙ্গ বউ প্রতিদিন মুখোমুখি হয় নতুন যুদ্ধের। এতকিছু পরেও অনঙ্গ বউ যেন দেবী অন্নপূর্ণা। তীব্র দুর্ভিক্ষের সময় যে এসেছে দুটো ভাতের দাবী নিয়ে কাউকে ফেরাতে পারেনি সেই দেবী। এমনি একজন ধূর্ত ব্রাক্ষণ দুর্গা ভটচায গঙ্গাচরণের কাছে নিলজ্জের মত দিনের পর দিন পাত পেরে খেয়ে গেছে। আর সেই দেবী নিজে না খেয়ে বৃদ্ধকে তুলে দিয়েছে সবটুকু। সেখানেই বিবেক বিবর্জিত ব্রাক্ষণ থেমে যায়নি, নিজের সমগ্র পরিবার নিয়ে উঠে এসেছে গঙ্গাচরণের বাড়িতে। তবুও অনঙ্গ বউ অবিচল। ক্ষুধা মানুষকে দিয়ে কি করাতে পারে? কোথায় নামাতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে পেটে আহার ভরা কোন দার্শনিককে করে কখনো সত্যিটা জানা যাবে না, দেখা যাবে না। জানতে হলে প্রশ্নটা কতে হবে কোন ক্ষুধার্তকে কিংবা অশনি সংকেত উপন্যাসটি পড়লে আমরা সেই নিষ্ঠুর সত্যটা মানসপটে চাক্ষুস দেখতে পাবো। শুধু দুটো গরম ভাতের জন্য কাপালীদের ছোট বউ যখন নিজের শরীর অন্য পুরুষের কাছে বিলিয়ে আসে তখন জানা যায় ক্ষুধার প্রকৃত সংজ্ঞা।
ব্যক্তিগত অভিমতঃ আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় দুই বাংলা শ্রেষ্ঠ উপন্যাসিক। যাকে আজ পর্যন্ত কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। কারণ সম্ভবত বিভূতিভূষণ একমাত্র সাহিত্যিক যিনি একই সাথে দুইধারার উপন্যাস লিখেছেন। আরণ্যক, দৃষ্টিপ্রদীপ, অপারিজত লিখে উনি সাহিত্যের সমৃদ্ধির সম্যক রূপ উনি পাঠকদের সামনে দাড় করিয়েছেন আর আদর্শ হিন্দু হোটেল, চাঁদের পাহাড়, অশনি সংকেত রচনা করে উনি বাংলা ভাষায় প্রাঞ্জল সাহিত্যের জন্ম দিয়েছেন। অশনি সংকেত উপন্যাস তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। আর সেটা বাংলা সাহিত্যের দুর্ভাগ্য। তবে এই অসম্পূর্ণ উপন্যাসটিতে পাঠক দুর্ভিক্ষের জীবন্ত রূপ দেখতে পাবেন আর দেখতে পাবে মনুষ্যত্বের গভীরতা। সুখী হবার জন্য রোজ আমরা মরীচীকার পিছনে ছুটে চলেছি। কিন্তু বিশ্বাস আর ভালোবাসা থাকলে এক মুঠো ভাত দুজনে ভাগ করে খাওয়ার মাঝেও সুখ আছে, তৃপ্তি আছে। যেখানে মমতা থাকে সেখানে নিজে না খেয়ে অন্যের প্রশান্তি মুখের অন্নের গ্রাস তুলতে দেখে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ
বিভূতি থেকে আমি সবসময়ই কিছু না কিছু শিখি। বিভূতির লেখা আমাকে শুধুমাত্র আনন্দ দেয় না,তার লেখা সবসময় আমাকে শেখায়। সেরকমই অশনি সংকেত পড়তে গিয়েও একটা উত্তম শিক্ষা পেলাম। প্রায়সময়ই আমি যখন জীবন নিয়ে আফসোস করি বিভূতির লেখা তখন আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমি কতটা সুখে আছি,আমার চেয়ে কতটা দুঃখে থাকতে পারে মানুষ।
ডিপ্রেশনে ছিলাম সেরকম একটা সময়ে নিছক আনন্দ পাবার লক্ষ্যেই বইটা পড়তে শুরু করেছিলাম। পড়তে গিয়ে এতবড় একটা চমক খাবো ভাবতে পারিনি। যেখানে আমি জীবনের ছোট-বড় মনোকষ্ট নিয়ে চিন্তিত,সেখানে বিভূতির এই উপন্যাসের চরিত্ররা চিন্তিত ভাতের জন্য,শুধুমাত্র ভাত।
ভাত! এই একটা শব্দ আমাদের বাঙালি জীবনে অনেক জরুরী। ভাত জিনিসটা এখন এই মূহুর্তে যার ঘরে আছে তারজন্য অনুমান করাও কঠিন এই জিনিসটা যার ঘরে নেই তার কি অবস্থা।
সময়টা যুদ্ধের। ভয়ংকর হারে বাড়ছে চালের দাম। আজ একটাকা কাল পাঁচটাকা তো পরশু পনেরো টাকা দর। তাও কেউ যে নিজের ঘরে চাল কিনে মজুদ রাখবে তাও পারছে না,গভর্নমেন্ট থেকে নির্দেশ চাল সব জমা দিতে হবে নতুবা পুলিশ এসে নিয়ে যাবে। টাকা দিয়েও কোথাও একদানা চাল পাওয়া যাচ্ছে না। আজ যারা খোশামোদ করতো কাল তারা নগদ অর্থে চাল কিনে নেবার প্রস্তাবেও মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
এরকম অবস্থায় আশেপাশের কয়েকটা ছোট্ট গ্রামের মানুষের ভাতের কষ্ট নিয়ে রচিত হয়েছে এই স্বল্প পৃষ্ঠার সুন্দর বইটা। ভাতের কষ্ট কত বড় কষ্ট,তিনবেলা ভাত যোগাড়ের চিন্তা,না খেতে পেয়ে মানুষ মারা যাওয়া,পেটের দায়ে হাঁসের খাবার পর্যন্ত কাড়াকাড়ি করে গ্রামের মানুষগুলোর গোগ্রাসে খেয়ে ফেলা! কি ভয়ংকর সে পরিস্থিতি!
এরমধ্যে উপন্যাসের প্রধান যে চরিত্র দুজন তাদের একজন অনঙ্গ বৌ। এই বৌটাকে লেখক ঠিকই নাম দিয়েছেন,"সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা" কেউ কখনো তার দুয়ার থেকে খালি হাতে ফিরতে পারে না। কেউ এসে খেতে চাইলে তাকে যত্ন করে খাওয়ায়, প্রয়োজনে নিজে অভুক্ত থেকে। নিজের ঘরে চাল নেই কেউ এসে কেঁদে পড়েছে,"আজ তিনদিন ভাত খাইনি,বড্ড খেতে সাধ হয়।" গ্রামের যেখান থেকে হোক চাল ধার এনে তাকে ভাত খাওয়াবে। আসলে এরকম মনের মানুষ এখন অবশ্য খুবই বিরল। তবে নেই যে এমন বলবো না। আমি নিজের চোখেও ভালোমানুষ দেখেছি নাহলে বিভূতির এটাকে অতিকল্পনা বলে উড়িয়ে দিতাম। তবে দেখিনি যেটা সেটা হচ্ছে এমন অভাব। মানুষের এমন কষ্ট তো আর মিথ্যা না! লেখক নাহয় রুপকার্থে লিখেছেন কিন্তু কষ্টগুলো তাই বলে শুধুই গল্প না। যুদ্ধের সময় সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের এটা বাস্তব চিত্রই ছিল এবং এখনো হতদরিদ্র না খেতে পাওয়া অভাবী মানুষের সংখ্যা নিতান্ত কম না। বইটা পড়তে পড়তে তাদের জন্য বুকটা হাহা করে ওঠে। লেখকের একি কম পারদর্শিতা?
অশনি সংকেত নামটা দেখে আমার ধারণা ছিল বইটা হবে ভৌতিক বা অলৌকিক কিছু একটা। তবে লেখক এখানে অশনিসংকেত বলতে এই দুর্দশায় পড়া মানুষগুলোর জীবনকেই বুঝিয়েছেন। সাক্ষাৎ ভুত বা প্রেত না হোক এটাও আসলে ভয়ংকর অশনি সংকেত তাদের জীবনে।
Ashani Sanket is an underrated gem by Bibhutibhushan Bandyopadhyay. It tells the story of a Brahmin couple in a Bengal village just before and during the Bengal Famine of 1943. We see Gangacharan, a clever Brahmin trying to make a decent living in a village that he recently moved into by priesthood and teaching, as well as exploiting his respected upper-caste status to gain small favors from the villagers. His wife, Ananga, on the other hand, is kind and charitable, often feeding poorer people at the cost of her own meals. Despite the difference in characters, they make a happy and devoted couple, with two small sons and a dream of having a good life. But instead of seeing good days, their life is struck by one of the worst famines in the history of the world. According to most historians, the 1943 famine was man-made, caused by the British colonial policies of food distribution during WWII. The villagers in this story don't understand most of what is happening beyond the unbelievable food scarcity. In a small section, where the comparatively more educated villagers including Gangacharan discuss the war, we see how naive they are. These are people who hear Singapore being taken over by the Japs and decide that it must be close to Orissa (the neighboring state to Bengal). For the large part, they can't believe that they might run out of rice and that it is possible to die of hunger. When both things happen in front of their eyes, it comes as a bitter shock.
I found this novella to be brilliant, more so because of its subtlety. The small moments are beautiful in capturing the helplessness of the characters. There were moments of villagers helping each other out with whatever little food they have stored, or feeling terrible about not being able to share in order to save their own families, and I wondered if in a similar situation I would have had a heart big enough to behave similarly. 1943 famine killed around 3 million people, but this story is not about the worst of it. It ends before the worst strikes, leaving the reader to wonder about the fate of the characters. It's a story of struggle and camaraderie, and a horror looming over the horizon.
দুঅক্ষরের নেহাতই সাদামাটা এক শব্দ,যার শক্তি নিয়ে সন্দিহান হবার মতো সজ্জন সময়ের সাথে হারিয়ে গিয়েছে গহীনে;যুদ্ধ যখন নিজের সাথে তখন সন্ধির চেয়ে সফল চেষ্টা আর কিচ্ছু হতে পারে না বৈকি।অতএব ভরপেট বা আধাপেট যাই হয়ে থাক না কেন আদম সন্তান এই আদিম প্রবৃত্তির জন্য আহাজারি থেকে অস্ত্র হাতে সশস্ত্র হতে পিছপা হয়নি সুদূর অতীতে ,অদূর ভবিষ্যতে ও সে আশা শুধু আকাশ কুসুমেই সীমাবদ্ধ।
মন্বন্তরে মতান্তর হতেই পারে দানের থেকে জানের পরোয়া বেশি করার জন্য, কিন্তু নিয়তির নির্মম নিষ্ঠুর রসিকতায় অপমানে আহত বা ভিক্ষাবৃত্তিতে বিমুখ বাসিন্দাদের কাছে ক্ষুধার জ্বালার চেয়ে তীব্র সত্য আর কিচ্ছু হতে পারে না।
সেই গল্পেরই জলরং তুলিতে জলবরৎ তরলং করার দুঃসাহসী তথাপি দৃঢ় শানিত কলমে বাংলার চালচিত্র তুলে ধরার কাজটি সুনিপুণ হাতে করেছেন বিভূতিভূষণ।
আগুন গরম দামের সাথে নিত্য নাভিশ্বাস উঠা কাঠপাথরের এই শহরে নগরে গ্ৰামে বাজারে তেলের দাম লিটার প্রতি দুশো, বিবিধ সবজি শতকের কাছাকাছি ,উৎসব পার্বনে কদাচিৎ কায়ক্লেশে যোগাড় করা গো মাংসের সাড়ে সাতশো খাসির নয়শো দামের সাথে দর কষাকষির কেচ্ছা এখন কান পাতলেই শোনা যায়।
এক মুঠো চালের জন্য চৌর্যবৃত্তি থেকে ছলচাতুরি শেষমেশ চক্ষুলজ্জা খুইয়ে হাত পাতার এই গল্পে খুব চেনা পরিসরে অল্প করে মনে করিয়ে দেয় টিসিবি ট্রাকে ঝুলন্ত মায়ের বাড়ন্ত সংসারের বাজার ফর্দে সাধ্যের মাঝে সবটুকু নিংড়ে পাবার পরিকল্পনা কিংবা সেই নয় হাজার আয়ের সংসারে ম্রিয়মাণ পিতার পলাতক হবার বিবর্ণ জলছবি।
বিলাসী মনের আয়েশীভাবের ফুডপান্ডা থেকে ফুটপাতে থাকা মানুষ গুলোর মনস্তত্ত্ব বুঝতে আরেকটি বার বিভূতিভূষণের বিস্তারে লেখার খুব প্রয়োজন এই দেশে।
বিভূতি বাবুর কোন লেখা পড়ে শেষ করলে,মাথায় খালি একটা কথা-ই বাজে,"এই বই একবার পড়ার জন্য লেখা হয়নি।" অশনি সংকেত শেষ করেও ঐ কথাই ঘুরছে মাথায়,একবার পড়ে তাকে সাজিয়ে রাখার বই,এ নয়। কি করে মানুষ কলমের ডগায় এত মায়া জমিয়ে রাখতে পারেন,ভাবতে গিয়ে বার বার অতলান্তে ডুবে যাই। বিভূতি মানেই ভুবন ভোলানো স্নেহ, মায়া,মমতার ডালি দিয়ে সাজানো একখানা স্বপ্নের রাজ্য। বিভূতি মানে, এক অদ্ভুত সুন্দর ঘোরের জ্বালে আটকে যাওয়া।
অনঙ্গ বউ। আহ্। এই চরিত্র কি ভোলা যাবে? অসম্ভব! এই চরিত্রে আমি আমার মা কে খুঁজে পেয়েছি। হুবহু। আমার মা কে দেখেছি,কোন দিন কাউকে না খেয়ে যেতে দেন নি। যত অনটন ই চলুক ঘরে,আমার মা আমাদের খাবার দাবার ঠিক রেখেছে। অথচ নিজের কোন খেয়াল নেই। কি আশ্চর্য মিল! পড়তে গিয়ে, আমি শুধু ভাবছিলাম,কি করে সম্ভব? আসলে আমাদের মায়েরা এমনি হয়ে থাকেন। চিরকাল শুধু সংসার, ছেলে মেয়ে,নিজের কোন খোঁজ নেই। তারা চিরটা কাল বট বৃক্ষের মতো দু-হাতে শুধু দিয়ে গেছেন,বিলিয়ে গেছেন। বটের ছায়ায় বেড়ে ওঠে,অসংখ্য ছোট গাছ আর আমরা বেড়ে উঠি মায়ের ছায়ায়,মায়ের আবেশে ডুবে। বিভূতি বাবু লিখেছেন,মেয়েরা লক্ষ্মী। মেয়েরাই অন্নপূর্ণা। বুভুক্ষু জীবের অন্ন ওরাই দু'হাতে বিলোয়।
গঙ্গাচরণ। সবাই তার ধূর্ততা,খারাপ অংশটা নিয়ে ব্যস্ত। অথচ, এই গঙ্গাচরণ আমাদের বাবাদের শ্বাশ্বত রূপ। গঙ্গাচরণ কেন ধূর্ততার আশ্রয় নেয়? খেতে না পেয়ে। একটু ভালো থাকার আশায়। নিজে জন্য যতটা,ঠিক ততটুকুই স্ত্রী, সন্তানের জন্য। গঙ্গাচরণ আসলে আমাদের ঈশ্বরী পাঠুনি, যে সব পেয়ে ও দেবী কাছে বর নিয়েছিলো,"সন্তান যেন দুধে ভাতে থাকে"।
রাজায় রাজায় লড়াই, উলুখাগড়ার প্রাণান্তর। অন্নের কষ্ট যে নিদারুণ, আহা। প্রায় ৫০ লাখ লোক মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছিলো,শুধু খেতে না পেয়ে। ভাবা যায়? একে তো করুণ ঘটনা,বিভূতি বাবুর কলমে সেটা আরো স্পষ্ট আর হৃদয়গ্রাহী হয়ে ধরা দিলো।
চট্টগ্রামে থাকতে সেখানের বাতিঘরে প্রায় যাওয়া হলেও, ঢাকা চলে আসার পর "ঢাকা বাতিঘরে" তেমন একটা যাওয়া হয়নি। আজকে অনেকদিন পর খালাতো বোনকে নিয়ে চলে গেলাম। কতক্ষণ এদিক সেদিক বই দেখে এরপর একটা চেয়ার টেনে "অশনি-সংকেত" নিয়ে বসে পড়লাম। কোনদিকে না তাকিয়ে এক বসায় পড়ে ফেললাম বইটা। শেষ করে কতক্ষণ বাতিঘরের কারুকার্যখচিত দেয়ালের দিকে একমনে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বইয়ের শেষটার কথা ভাবছিলাম।
প্রতিবার একেকটা বিভূতিভূষণের বই পড়ি আর অবাক হয়ে ভাবি, 'এত সুন্দর করেও লেখা যায়??!!'
প্রিয় লেখক অনেকেই আছেন। যদিও তাদের প্রতিটা কাজ যে ভালো লেগেছে তা কিন্তু নয়। তবে বিভূতিভূষণের লেখা কখনো আমাকে নিরাশ করে নাই। এতটাই সুন্দর ও নিঁখুত শব্দচয়নের মাধ্যমে প্রতিটা গল্প লিখেছেন তিনি!
বইয়ের সারসংক্ষেপ আর আলাদা করে লিখলাম না। অনেকদিন পর একটা বাংলা বই পড়ে, বাংলা রিভিউ লিখছি। অনভ্যাসের কারণে সারসংক্ষেপ লেখার দক্ষতা অনেকটা কমে গিয়েছে।
গাঁ'য়ে এতো মানুষ। পাশের গায়েও। এর মধ্যে না খেতে পেয়ে কেউ মারা যেতে পারে - কারো বিশ্বাসই হচ্ছিল না। অথচ সেটাই ঘটলো....
২য় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের দিকে, সৈন্যদের খাবার সরবরাহ + খাবার ডিস্ট্রিবিউশনে অসামঞ্জস্যতায় আমাদের এদিকে যে দূর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, ওই সময়ে গ্রামীন জীবনে খাবার সংকট নিয়ে লেখা উপন্যাস টি।
বইয়ের প্রতিটা চরিত্র যেমন অন্যের সন্ধানে ব্যস্ত, মনে হইলো আমিও ওদের ই একজন, আমারও তীব্র ক্ষুধা, মনে হইলো আরেকটু পড়ি, আর এক পৃষ্ঠা, মনে হইলো আরেক পৃষ্ঠা গেলেই মনে হয় এই মন্বন্তর শেষ হইয়া যাবে। এই করতে করতে বইটাই শেষ হয়ে গেলো। কিন্তু আমার মনের ক্ষুদা মিটলো না। ভাবলাম, কানলাম, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাইলা। বিভূতিভূষণ এর বই এমন ই হয়, এমন হইতেই হবে, শেষ হয়েও যার রেশ রয়ে যাবে চিন্তায়।
অনন্য ছিল বইটা! না খেতে পেয়ে মানুষ মারা যায় এটা চিন্তার অতীত এই মূহুর্তে। দুর্ভিক্ষের ভয়ানক রূপটা প্রত্যক্ষ করে আসলাম মনে হচ্ছে। আহা কতো খাবার নষ্ট করি!!!
পদ্মবিলের পাড়ে একখানা খড়ের ঘর ছাওয়ার বড় শখ বামুনের বৌ অনঙ্গের। ভোরবেলা নাইতে নাইতে সেই পদ্মবিলের স্মৃতি ঝিলিক দিয়ে উঠে তার চোখে। কত গাঁ ঘুরল তার স্বামী গঙ্গাচরণের সাথে! কে আর ঘুরেছে তার মতো করে? স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘুরে ঘুরে থিতু হতে পারল সে। ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণের বেশ সম্মান এই গাঁয়ে। পাঠশালার পাশাপাশি এ বাড়ি সে বাড়ি থেকে ভেট মন্দ আসেনা। আর চাইলেও বেশ পাওয়া যায়। কদ্দিন পর বিকেলের একটু জলখাবার ও করে দিল অনঙ্গ-বৌ। অদূর ভবিষ্যৎ এর সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধির ছবি দেখতে পায় দুজনেই, সেই সুখের স্বপ্নে মুখে ফুটে উঠে এক উজ্জ্বল আভা। কিন্তু যুদ্ধ এসে তাদের সব মাটি করে দিল। চালের দাম বাড়তে থাকল হু হু করে। রোজই চড়তে থাকছে দাম। না খেয়ে কেউ মরে? এই প্রশ্ন মনে উঠতে উঠতে চোখের সামনে কঙ্কালসার মানুষ আর মৃত্যু দেখে ফেলে গাঁয়ের সবাই। নিজেরাও কবে এর শিকার হবে কেউ জানে না। শাক-পাতা সেদ্ধ করে আর কদ্দিন? অনঙ্গ-বৌ স্বভাবতই স্নেহপ্রবণ, যতক্ষণ পর্যন্ত তার ক্ষমতা অন্যকে সাহায্যই করে সে। নিজেকে বিপদে ফেলেও। কিন্তু দুর্ভিক্ষের এই মর্মান্তিক আঘাতে সে কি তার স্বাভাবিক মাধুর্য ধরে রাখতে পারে? নাকি সেও হয়ে উঠে বিশ্বাস কিংবা কুণ্ডদের মতো স্বার্থপর?
বিভূতিভূষণের আরেক অমর সৃষ্টি। ছোট্ট এই উপন্যাসে দুর্ভিক্ষ, মানুষের হাহাকার,বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং মনোবৃত্তি লেখক যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, সত্যিই মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। অনঙ্গ-বৌ বাংলা সাহিত্যে অতি অসাধারণ এবং উজ্জ্বল এক চরিত্র। না, তার চরিত্রে তেমন বিদ্রোহ বা প্রকটতা নেই। সে তার মাধুর্য দিয়েই ভাস্বর।
এমন সময় বইটি পড়লাম, যখন নিজের দেশে সর্বোপরি সারা বিশ্বেই এক অস্থির সময়, এক অনিশ্চিত বাঁচা-মরার লড়াই। বইটি এবং তার ভাষ্য আরও মর্মে গিয়ে প্রবেশ করল তাই হয়তো।
After relishing its presence on my bookshelf for a long time (I do that a lot; just luxuriate in the anticipation of reading a book before I get around to reading them) I finally picked up Distant Thunder by Bibhutibhushan Bandhopadhyay. Some of you know how much of a fan I am when it comes to him.
Distant Thunder (Ashani Sanket in Bengali) narrates the travails of the people of a tiny village in West Bengal during the Bengal Famine of 1943. Gangacharan, a priest, and his wife Ananga, have just shifted from Bhatchhala.
“They were the only Brahmin family in the village. Others were milkmen and Kapalis. This village near the river was a new one…(and) it is still called New Village.”
At first, life is fairly comfortable. Gangacharan gets remuneration in kind for performing pujas and for teaching the children of the village. He and his wife form good relationships with some of the people, regardless of caste, which keeps them in good stead for a long time. However, it’s not long before this peaceful coexistence is disturbed by the first rumblings of a crisis. The famine spreads quickly and everyone, including, Gangacharan are caught in its throes.
We’re given a sharp, on-the-ground look at this event that sent rural Bengal into the depths of hunger. It was an event that was unfortunately overshadowed by WWII, which was raging at the time, and which accelerated the problems in these villages.
As important a subject as it is, I have to say this is the first Bibhutibhushan book that disappointed me with its writing (or perhaps the translation?) on the whole. Yes, I did feel the pathos and the desperation of the situation. I did see the caste divisions, the poverty, and other social aspects.
But I didn’t feel the magic that I usually do in Bibhutibhushan’s works except in the parts where there were descriptions of nature. The story seemed disjointed and the use of too many vernacular words got in the way. There is a glossary but it’s distracting to constantly look up the meaning and get back to the story.
Satyajit Ray’s movie version is widely acclaimed and seems to have brought the book to life. Perhaps I should watch that. In the meantime, yes read the book for a lifelike picture of an occurrence that’s a forgotten landmark in Indian history. Don’t read the book if you’re looking for Bibhutibhushan’s engrossing charm that was there in his iconic works like Pather Panchali or Aranyak.
That said, I’m pretty sure the Bengali version is far better. Anyone read it? Let me know what you thought.
কোনপ্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের লেশমাত্র না থাকা সত্ত্বেও স্বচ্ছল একটি গ্রাম আস্তে আস্তে সবার অগোচরে চলে গিয়েছে দুর্ভিক্ষের দোরগোড়ায়। হঠাৎ করেই বাজার থেকে চাল উধাও। হাজার হাজার বস্তা চাল সমুদ্রে ফেলে যুদ্ধের বাজারে বহু যত্ন করে চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রেখেছে একদল অসাধু মুনাফাখোর।
সুপুরির বদলে তখন খেজুরের বীচি দিয়ে পান সাজা হয়, এক মগ ফ্যানের জন্য বাড়ি থেকে বাড়িতে ঘুরে চলে ভিখিরিরা, এক কাঠা চালের জন্য পোড়া যদুর কাছে দেহ বিক্রি করতেও বাঁধে না কাপালীদের ছোট বউয়ের, না খেতে পেয়েও যে মানুষ মরতে পারে শেষকালে সেই অভিজ্ঞতার সাথেও পরিচয় ঘটে সকলের।
সত্যজিৎ রায়ের অশনি-সংকেত দেখুন, কিংবা বিভূতিভূষনের অশনি-সংকেতই পড়ুন, এরপর যতদিন বেঁচে থাকবেন আপনার দ্বারা খাবার নষ্ট করা এই ব্যাপারটি হওয়া খুবই কঠিন হবে বলে মনে করি।
কথাটা গঙ্গাচরণের বিশ্বাস হলো না। না খেয়ে আবার লোক মরে? যে দেশে এত খাবার জিনিস, সে দেশে লোকে না খেয়ে মরবে?
এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র - ক্ষুধা। সে অদৃশ্য, কিন্তু তার ভয়ংকর প্রভাব গ্রামবাংলার মানুষের ঘরে ঘরে বিরাজমান। একমুঠো চালের জন্য, একবেলা পেট ভরে খাওয়ার জন্য চারিদিকে এত হাহাকার। বিভূতি বাবুর হৃদয়গ্রাহী লেখনীতে ক্ষুধার্ত মানুষের এই নিদারুণ কষ্ট আমাদের ভাবতে বাধ্য করায়- অবহেলায় আমরা কতই না খাবার অপচয় করি!
অশানি-সংকেত উপন্যাসের খুব একটা নাম ডাক শোনা যায় না, যেমনটা শোনা যায়, পথের পাঁচালী, আদর্শ হিন্দু হোটেল কিংবা অরণ্যকের নাম। অথচ এই ছোটখাটো উপন্যাস কি নির্মম বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছে। বিভূতিভূষণ বাবুর মত এত চমৎকারভাবে নিম্নবিত্তের হাহাকার আর কে ফুটিয়ে তুলেছে আমার জানা নেই।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণত গল্পের উন্মুক্ত সমাপ্তি টানতে অভ্যস্ত। তবে 'আদর্শ হিন্দু হোটেল', চাঁদের পাহাড়', 'আরণ্যক'-এর মতো উপন্যাসগুলোর ক্ষেত্রে কথাটি যেভাবে প্রযোজ্য, 'অশনি সংকেত'-এর ক্ষেত্রে বোধকরি সেভাবে নয়। বিশেষত দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি না খেতে পেয়ে একটা মাত্র মানুষের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই শেষ হয়ে যাবার কথা নয়।
যদুপোড়াকে ছোট-বৌ ফিরিয়ে দিচ্ছে।
"কাপালী-বৌ একবার দূর থেকে চেয়ে দেখলে পিছন ফিরে। একটু ইতস্তত করলে। তারপর একেবারেই চলে গেল।"
শেষ করার ধরণেই বোঝা যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে অসমাপ্ত লেখাটি। বিভূতিভূষণ প্রশ্ন রাখেন লেখাশেষে। তবে এতগুলো উত্তরবিহীন প্রশ্ন রেখে যান না। 'আদর্শ হিন্দু হোটেল' শেষে প্রশ্ন জাগে - মুম্বাইয়ের জীবনে কী ঘটেছিল হাজারীর সাথে? 'চাঁদের পাহাড়' জানতে চায় - আবার কবে শঙ্কর আফ্রিকার টানে ছুটেছিল? আবার 'আরণ্যক' শেষে সত্যচরণকে প্রশ্ন করি - আপনি কি সত্যিই আর কুশি নদীর তীরে অথবা দক্ষিণ ভাগলপুর-গয়ার বনপাহাড়ে যাননি?
কিন্তু, 'অশনি সংকেত' যেখানে শেষ হলো, সেখানে কয়টা প্রশ্ন করব?
- ছোট-বৌয়ের কী হলো? - গঙ্গাচরণের পরিবার কি নতুন গাঁয়েই থেকে গেছিল? - মতির পরে আর কেউ কি মরেনি?
এরকম আরো প্রশ্ন চাইলে করা যেত বা যায়। নামকরণেই সব প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয়ে গেছে এমনও বলার উপায় নেই। বরং নামকরণই আরো বেশি করে আক্ষেপ জাগায় - আরো কিছু কথা নাহয় কহিতে মোরে! সেসব কথা বলবার জন্য উপন্যাস আর যতটুকু বড়ো হলে যথেষ্ট ছিল, ততটুকু করার আগেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান।
তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ নিয়ে উল্লেখযোগ্য অনেক কাজই হয়েছে বাঙলা কথাসাহিত্যে। চল্লিশ দশকের পর থেকে অনেক লেখায়ই দুর্ভিক্ষ প্রধান বা আংশিক উপজীব্য হয়ে এসেছে। নজরুল লিখেছেন 'মৃত্যুক্ষুধা'। যদিও সেখানে আনসার চরিত্রের যক্ষ্মারোগে মৃত্যু ঘটে, তবুও আনসার এবং ক্যামিও চরিত্র রুবির আখ্যান শুরু হতেই দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি বিষয় হিসেবে কিছু আড়ালে পড়ে যায়।
সাম্প্রতিককালে 'আগুনপাখি' উপন্যাসে হাসান আজিজুল হক দুর্ভিক্ষকালীন জনজীবন চিত্রিত করেছেন। এ চিত্র 'অশনি সংকেত' উপন্যাসের নির্মাণে অঙ্কিত দুর্ভিক্ষের জনজীবনের সাথে মেলে।
দুর্ভিক্ষের ইঙ্গিত শুরু হয় কেরোসিনের অভাব দেখিয়ে। 'আগুনপাখি' উপন্যাসে কেরোসিনের অভাব রেড়ীর তেলে পূরণ করার কথা পড়েছি, পড়েছি সুতি বস্ত্রের সীমাহীন অভাব মোটা কাপড়ে মেটানোর বিবরণ।
'অশনি সংকেত' অবশ্য মোটাদাগে অন্নকষ্ট দেখিয়েছে। অন্নকষ্ট একটা অখণ্ড দেশের, একটা সমাজের, একটা পরিবারের - গঙ্গাচরণ যে পরিবারের কর্তা।
কর্তা হিসেবে পারিবারিক স্বার্থের কথা ভাবতে গিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তিত্বের বিসর্জন দিয়ে হলেও পৈতের প্রভাব খাটিয়েছে গঙ্গাচরণ (এ বিষয়টা 'বিপিনের সংসার' উপন্যাসের জমিদার-গিন্নীর চরিত্রে পাই)। অন্নাভাব শুরুর আগে চালটা-কলাটা - কিছুর জন্যই ভাবনায় পড়তে হয়নি। অনঙ্গ বউ স্বামীর এমন ধূর্ততাকে কিছু প্রশ্রয়ই দিয়েছে বলা চলে। তবে, নতুন গাঁয়ে আসার আগেপরে কখনোই সংসার রাজার হালে তাদের চলেছে - এমনটা বলা যায় না। সে কারণে আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো তাদের সন্তানরা আদর-শাসনের মিশেলে বেড়ে উঠেছে - বখে যায়নি।
বিশেষ করে অনঙ্গর মাতৃস্নেহ লক্ষ্যণীয়। এ বিষয়টি যদিও উপন্যাসে উপজীব্য হয়ে ওঠেনি, তবুও যতটুকু দেখা গেছে, 'সূর্য-দীঘল বাড়ী' উপন্যাসের জয়গুন চরিত্রের মাতৃস্নেহ মনে পড়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জননী' এবং শওকত ওসমানের 'জননী'র সারাংশের সারাংশ বোধকরি অনঙ্গর সন্তানবাৎসল্য। অনটনের দুঃসহ সময়ে ত হাতের রুলি পর্যন্ত ছেড়ে দেয় অনঙ্গ।
দুর্ভিক্ষের বাজারে চাহিদা-যোগান-দ্রব্যমূল্যের ত্রিমুখী সংঘর্ষের অস্থির সময়ে নিজে না খেয়ে, পরের বাড়ির ধান ভেনে, দুঃসময়ের জন্য সঞ্চয় করে করে রেখে অনঙ্গ শুধু নিজের পরিবারই টানেনি, দুর্গা পণ্ডিতের উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা পরিবারের অন্নেরও যোগান দিতে চেষ্টা করেছে। এরকম একটা বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে সন্তান জন্ম দিয়েছে পর্যন্ত! অভাবের দেশে নবজাতক এলে যে বিব্রতকর বাস্তবতার গ্রাস খুলে যায়, তা বোধকরি গঙ্গাচরণের চোখ বেয়ে নামা ঝরঝর জলধারাই বলতে চায় প্রাণপণে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কুবেরের আখ্যানে লিখেছিলেন
"শেষে বিরক্ত হইয়া কুবের বলিল, 'চুপ যা গণেশ। পোলা দিয়া করুম কী? নিজেগোর খাওন জোটে না, পোলা!'
কুবেরদের নিত্যসংগ্রামে অবশ্য ভাত না জুটুক, একেবারে না খেয়ে মরতেও হয় না।
আবার অনঙ্গে ফিরি। ধান ভানার ব্যাপারটা স্বামীর কাছে গোপন করে অনঙ্গ। গঙ্গাচরণ জানতে পারলে মমতার সাথে যে আশঙ্কা তার হয়, তাকে তুলনা করা সম্ভব জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসের মকবুল এবং মন্তুর চরিত্রের বিবেচনাগত বৈপরীত্যের সাথে।
গঙ্গাচরণ নিজের স্ত্রীকে 'অন্নপূর্ণা' আখ্যা দিতে কার্পণ্য করেনি। উপন্যাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ক্ষ্যান্তমণির ব্যাপারেও একই মত গঙ্গাচরণের - হাজারী যেমন কুসুম এবং ঘোষ পরিবারের এক বৌয়ের চরিত্রে 'অন্নপূর্ণা'র সন্ধান পেয়েছিলেন।
গঙ্গাচরণের পিতৃসুলভ শাসনের মধ্যে দুটো দিক স্পষ্ট - শ্রেণিপার্থক্য এবং পাঠশালার পণ্ডিতের ব্যক্তিত্ব। কাপালী, গোয়ালা সম্প্রদায়ের লোকে যা করে, তা ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ছেলে হয়ে হাবু করবে - এইটে মেনে নিতে কষ্ট হয় গঙ্গাচরণের। অন্যকে ফরমায়েশ করে কাজ আদায়ের অভ্যাস হয়ে গেলে এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তার ওপর যদি আবার নিখরচায় সব মেলে মুহূর্তেই। অবশ্য প্রবল অন্নাভাবের সময়ে এসে যখন পঁয়ষট্টি টাকা হয়ে গেল চালের দর, তখন গঙ্গাচরণের স্বভাবগত পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
শ্রেণিপার্থক্যের প্রসঙ্গ যেখানে আসে, শ্রেণিসংগ্রাম সেখানে অবশ্যম্ভাবী। তবে শ্রেণিসংগ্রাম সাধারণত অত্যাচারীর শাসনতন্ত্রে দেখা যায়। বিশ্বাস মশায় গ্রামের মোড়ল হিসেবে অত্যাচারী কিনা সেটা এক কথায় বলে ফেলা যায় না। মজুদকৃত চাল সরিয়ে রাখার খেসারত দিতে হয়েছে মোড়লকে। শ্রেণিসংগ্রামের হুমকির মুখে পিঠটানই দিল মোড়ল। তার ইতিকথায় জানা যায়, তার জ্ঞাতি খুড়ো তার সব সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেয়। বিষয়টার সাথে শরৎচন্দ্রের 'বিলাসী' গল্পের মৃত্যুঞ্জয়ের ঘটনার প্রাসঙ্গিক মিল পাওয়া যেতে পারে।
শাসনপ্রবণ গঙ্গাচরণের বিদ্যার দৌড় বেশি না থাকায় তাকে কূপমণ্ডুক আখ্যা দেওয়া যায়। গ্রামে ওলার আক্রমণ ঠেকানো প্রসঙ্গে তার চারিত্রিক বিশেষত্বকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্কৃত 'লালসালু'র মজিদের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এ ব্যাপারগুলো দুর্ভিক্ষপরিস্থিতির প্রাক কথা। এর বিবরণের ধরণ কিছু হাস্যরসাত্মক ঠেকে। ধীরে ধীরে আখ্যান করুণরসে পর্যবসিত হতে হতে গঙ্গাচরণের চরিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেতে পারে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কৃষ্ণেন্দুর মধ্যে তাঁর পরিচিত এক দীর্ঘদেহী কালোপানা চেহারার কনভার্টেড খ্রিস্টানকে এনে লিখেছেন 'সপ্তপদী'। রিনা ব্রাউন নামটা কল্পিত হলেও এরকম উদ্ভ্রান্ত এক বিদেশি মেমের সাথে পুরীর সৈকত কিংবা কলকাতার চৌরঙ্গী তথা হালের এসপ্ল্যানেড - দুজায়গায়ই দেখা হয়েছে তারার। সেই মেমকে রিনা ব্রাউন বানিয়ে কৃষ্ণেন্দুর জীবনে নিয়ে এসে আবার কেড়েও নিয়ে গেলেন। বাস্তবের সেই কনভার্টও নাকি তাঁর ভিনদেশি রাধিকার সাথে আজীবন থাকতে পারেননি।
এসবই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপজীব্যে লেখা 'সপ্তপদী'র পরিশিষ্ট অংশে লিখে দিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। এ উপন্যাসেও অন্নাভাব স্বল্প পরিসরে দেখানো হয়েছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রথম চিনতে পারি 'আদর্শ হিন্দু হোটেল' পড়ে। মুগ্ধতাছড়ানো ব্রাহ্মণ হাজারী দেবশর্মা চক্রবর্তী কাজের খোঁজে যখন গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ব্রাহ্মণের সেবায় তখন যারা নিজেদের সব উজাড় করে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় জীর্ণ এক গৃহস্বামী ছিলেন, ছিলেন সদগোপ জাতের এক ঘোষসন্তান।
হাজারীকে কাজের খোঁজে ঘোরালেন যিনি, সেই বিভূতিভূষণ দুর্ভিক্ষের সময়ে চালের সংস্থানে পদব্রজে ক্রোশকে ক্রোশ পাড়ি দেওয়ালেন 'অশনি সংকেত'-এর গঙ্গাচরণকে। তার সেবায় উৎসর্গীকৃতপ্রাণ দুটো চরিত্র ফিরে এল যথাক্রমে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত এবং সদগোপ ঘোষসন্তান হয়ে।
এসময়ে আত্মপ্রকাশ করা ক্ষ্যান্তমণি চরিত্রে 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'-এর কুসুম চরিত্রের ছায়া পাই। গঙ্গাচরণ ক্ষুধার সাথে লড়াই করতে যেয়ে এদের থেকে খাবার নিচ্ছে।
তবে হাজারী দেবশর্মা চরিত্রের অসাম্প্রদায়িক চেতনা গঙ্গাচরণ চরিত্রে নেই। যতটুকু আছে, তা অনঙ্গ বউয়ের চরিত্রে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরিস্থিতি নিয়ে গ্রামের মানুষের অজ্ঞতার চিত্র কিছুটা দেখানো হয়েছে উপন্যাসে। 'আগুনপাখি' উপন্যাসে কেবল মেতরবউ একা এই বিশেষত্ব টেনেছেন নিজের চরিত্রে। যুদ্ধ কেন হচ্ছে - এটাই কোনো যুক্তিতে মেলাতে পারেন না তিনি। অনঙ্গ অবশ্য যুক্তির ধার ধারেনি। কেবল প্রশ্নই করেছে। 'সূর্য-দীঘল বাড়ী' উপন্যাসের নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যেও এমন রাজনৈতিক অসচেতনতা দেখেছি।
গ্রামীণ নিম্নবর্গের আখ্যানে সাধারণত লিবিডো ধারণার প্রয়োগ থাকে। 'অশনি সংকেত' উপন্যাসে কাপালীদের ছোট-বৌয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট এবং অনঙ্গর ক্ষেত্রে অস্পষ্ট কিছু ইঙ্গিত দেখেছি। তবে বিভূতিভূষণের লেখায় স্পষ্ট লিবিডো সাধারণত বিরল। 'বিপিনের সংসার' উপন্যাসে এসেছে কিছু ইঙ্গিত। 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'-এর পদ্মঝি'র ইতিকথার বিবরণে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ক্ষুধা মানুষকে ব্যক্তিত্বহীন স্বার্থপর করে, ভিক্ষুক বানায়, প্রতারক বানায়, চারিত্রিক স্খলন ঘটায় এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটায়।
নতুনগাঁয়ের মানুষ সব মেনে নিলেও, মানতে পারেনি - ভাত না পেয়ে কেউ মরতে পারে। মতির মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে সেটা সম্ভব। এ ক্ষুধাতুর মৃত্যুই 'অশনি সংকেত'।
অথচ মতি চরিত্রের এতটা গুরুত্বপূর্ণ বনে যাওয়াটা একরকম অকল্পনীয়। ধারণা করা যায়, ঔপন্যাসিকের কৌশলগত দক্ষতা ছাড়াই এরকম ঘটনা ঘটে গেছে। নির্মাণে রসতত্ত্বগত এমন রদবদল করে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ভাবের অসম্পূর্ণ পরিণতি দিয়ে যেতে পেরেছেন। এও এক ধরণের পরিণতি বটে।
🅒 রেজওয়ান আহমেদ, শিক্ষার্থী-গবেষক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য (৬ষ্ঠ আবর্তন), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
പുസ്തകം - അശനിസങ്കേത് എഴുത്തുകാരൻ - ബിഭൂതിഭൂഷൺ ബന്ദോപാധ്യായ
പരിഭാഷ - ലീല സർക്കാർ
വായന അനുഭവം - അശ്വതി ഇതളുകൾ
സത്യജിത്ത് റായിയുടെ സിനിമയ്ക്ക് ആധാരമായ നോവൽ ആണ് അശനി സങ്കേത്.രണ്ടാം ലോക മഹായുദ്ധകാലത്തെ ഭക്ഷ്യ ക്ഷാമം ആണ് ഈ നോവലിന്റെ പ്രതിപാദ്യ വിഷയം. കോറോണയെന്ന മഹാമാരി മൂലം ബുദ്ധിമുട്ട് അനുഭവിക്കുന്ന ഈ വേളയിൽ ചിന്തിക്കാനും ചിന്തിപ്പിക്കാനും തരത്തിൽ കുറച്ചു വസ്തുതകൾ ഈ നോവൽ നമ്മുക്കായി കരുതിയിട്ടുണ്ട്..ഇപ്പോഴുള്ള സാമൂഹിക പച്ഛാത്തലവുമായി കൂട്ടി വായിക്കേണ്ടതുണ്ട്..
ദാരിദ്ര്യം കൊടുമ്പിരി കൊണ്ട ബംഗാളിലെ ഗ്രാമത്തിന്റെ കഥയാണ്... ഗുരുചരണും ഭാര്യ അനംഗയുമാണ് പ്രാധാന കഥാപാത്രങ്ങൾ.. ഒരു സുപ്രഭാതത്തിൽ ഭക്ഷണം അവർക്ക് അന്യമാകുന്ന കാഴ്ചയെ അവരുടെ നിസസഹായ അവസ്ഥയെ നോവുന്ന അക്ഷരങ്ങളിലൂടെ വായനക്കാരിലേക്ക് പകരുകയാണ് എഴുത്തുകാരൻ..
അരി തീർത്തും അന്യമായപ്പോൾ വിശപ്പ് അടക്കാൻ വേണ്ടി എന്തും തിന്നു ശീലിക്കാൻ തയാറായാ ഒരു ജനതയുണ്ട് ഇതിൽ... ദാരിദ്ര്യം അക്രമങ്ങളിലേയ്ക്കും ഭിക്ഷാടനത്തിലേയ്ക്കും നയിക്കുമെന്നൊക്കെ പറയുന്നത് എത്ര ശെരിയാണ്.. വലിയ അർഥങ്ങൾ നമുക്ക് സമ്മാനിക്കുന്നുണ്ട് ഈ കൃതി.. കൃഷിയുടെ പ്രാധാന്യം.. വിശപ്പിന്റെ വില.. അങ്ങനെ ഒരുപാട് കാര്യങ്ങൾ നമ്മൾ മനുഷ്യർക്ക് പറഞ്ഞു തന്നു ചിന്തിക്കാൻ അവസരം കൂടി നൽകുന്നുണ്ട്...ഈ രചനയുടെ കാലിക പ്രസക്തി അന്നും ഇന്നും ഒരുപോലെയാണ്... വിശപ���പാണ് ഏറ്റവും വലുത് എന്നുള്ള സത്യം...
കയ്യിൽ പണമുണ്ടായിട്ടും ഭക്ഷ്യ വസ്തുക്കൾ ഒന്നും കിട്ടാതെ വരുന്ന അവസ്ഥയെ കുറിച്ച് വളരെ വിശദമായി ഇവിടെ പറയുന്നുണ്ട്..
ഗുരുചരണിന്റെ ഭാര്യയായ അനംഗ മറ്റുള്ളവർക്ക് ഭക്ഷണം വച്ചു വിളമ്പുന്നതിൽ ശ്രദ്ധ ചെലുത്തിയിരുന്നു..താൻ കഴിച്ചില്ലെങ്കിലും മറ്റുള്ളവരെ ഊട്ടാൻ അവൾ ശ്രമിച്ചു..ദാരിദ്ര്യം വർധിച്ചു വരുന്ന വേളയിലും വീട്ടിൽ വരുന്ന അതിഥികൾക്ക് ഭക്ഷണം കൊടുക്കാൻ അവൾ തയാറായി.. എന്നിരുന്നാലും വിശപ്പിന്റെ ആധിക്യത്തിൽ അവളുടെ ദാനവും മുറുമുറിപ്പിലേയ്ക്ക് മാറുന്ന സന്ദർഭവങ്ങളൊക്കെ ഹൃദയസ്പർശിയായി നോവലിൽ വരച്ചു ചേർത്തിട്ടുണ്ട്..
പരിഭാഷയിലും പ്രശ്നങ്ങളൊന്നും തോന്നിയില്ല.. ഒഴുക്കോടെ വായിച്ചിരിക്കാൻ പറ്റിയ ഒന്നായിരുന്നു ഈ പുസ്തകം...
ബംഗാളി പത്രത്തിൽ വന്ന നോവൽ പിന്നീട് പുസ്തകമാവുകയാണ് ഉണ്ടായത്..
অশনি সংকেত উপন্যাসের পটভূমি ১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষপীড়িত বৃহত্তর বাংলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করলে খাদ্যাভাব দেখা যায়। ফলে ৫০ লাখ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। খুব ছোট একটি গ্ৰামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উপন্যাসে লেখক দেখান, এই দুর্ভিক্ষ কীভাবে মানুষের জীবনে প্রভাবিত করেছিল। উপন্যাসের মূল চরিত্র হলো গঙ্গাচরন ও অনঙ্গ। শিক্ষিত ব্রাক্ষণ হওয়ায় গ্ৰামের সবাই গঙ্গাচরনকে শ্রদ্ধা করতো ও মেনে চলতো। গ্ৰামের মানুষের এই সরলতাকেই কাজে লাগিয়ে গঙ্গাচরন দিনের পর দিন তাদের থেকে সুবিধা আদায় করতে থাকে। অপরদিকে অনঙ্গ অত্যন্ত দানশীল, বন্ধুসুলভ ও সরল। সে যেন অন্নপূর্ণার রূপ। তাদের দিন ভালো যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই দেখা যায় দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষে সামর্থবানরা চাল মজুদ করতে থাকে নিজের জন্যে। আবার কিছু চাল বিক্রি হয় আকাশচুম্বী দামে যা কেনা দায়। অন্যান্য খাদ্যসামগ্রও বিক্রি হয় চড়া দামে। দুমুঠো ভাত এর জন্য মানুষ কী কী না করতে পারে তা ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসে। না খেতে পেয়ে মানুষ নদী-নালা, পুকুর ইত্যাদি যেখান থেকে পেরেছে সেখানে থেকেই সর্বপ্রকার শাক-সবজি উঠিয়ে খেয়েছে। কিন্তু তাতেও রক্ষা হয়নি মৃত্যু থেকে। এমনই দুর্ভিক্ষে সময় অনঙ্গের কোলজুড়ে আসে একটি খোকা। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, কেননা যেখানে ৪ জনের ক্ষুধা নিবারণই দায় সেখানে ৫ম সদস্য বিলাসীতার মতোই। বাস্তববাদী উপন্যাসের মধ্যে এটি অন্যতম।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সরকার সেনাদের জন্য খাদ্য মজুদের দরুণ হওয়া দুর্ভিক্ষ কারও অজানা নয়। আমার নিজের বয়সী এবং আমার থেকে কম বয়সী অনেককেই এখনও বলতে শুনি, সরকার এবং রাজনীতি নিয়ে কথা বলে কি হবে! আমি নিজে খেতে পড়তে পারছি, তাই কি যথেষ্ট নয়? এই বইটিতে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় উত্তর দিয়েছেন, না নয়। কেনো নয়? এই বিশাল খাদ্য মজুদের দরুণ খাবারের সংকট দেখা দিলো। সেই ভয়াবহ সংকট দূর অজপাড়াগাঁয়ে কিভাবে পরেছে তারই উপাখ্যান এই বইটি। যেখানে লোকজন সিঙ্গাপুর জার্মানির নাম শুনেনি, শিক্ষার আলো পৌঁছাতে পারেনি, জাতে পাতে বিশ্বাসী, সেখানের সকল লোকের ধনী গরীব ব্রাক্ষণ-কাপালী ভেদাভেদ ভুলে দেহ-ব্যবসা, ভিক্ষাবৃত্তি কত কিই না করতে হয়েছে, শুধু একবেলা খাবে বলে, একমুঠো ভাতের জন্য। তাছাড়া, নারী পুরুরষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, স্বামী স্ত্রীর মধ্যাকার সম্পর্ক, উঁচু জাতের সম্মান, দারিদ্র্যতা, স্বচ্ছলতা আরও বেশ কিছু বিষয় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে বইটিতে।
একটি সেরা বই!
যে লেখকের লেখা মনের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায় গিয়ে দাগ টানে, সে লেখক প্রিয় না হয়ে পারে? একটা মজার তথ্য দিয়ে রাখি। আদর্শ হিন্দু হোটেল এবং বিভূতিভূষণের লেখা অনেক বইয়ে জাত নিয়ে নানান আখ্যা পাওয়া যায়। মূলত সকল জাতের ব্রাক্ষণদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব নিয়ে। স্বয়ং বিভূতিভূষণ ছিলেন জাতে ব্রাক্ষণ।
পড়ছিলাম, অশনি সংকেত (অশনি শব্দের অর্থ বজ্র) লিখেছেন বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়।
কি ভয়াবহ বাস্তবতা চোখের সামনে ফুটে উঠলো! না খেয়েও মানুষ মরে? এ কথা কখনো কারোর বিশ্বাস হয় না। অথচ দুর্ভিক্ষ এক ভয়াবহ জিনিস। আমরা বোধহয় কল্পনাও করতে পারিনা এমন কিছু। বিভূতিবাবুর কলমে মায়ায় মায়ায় কেমন একটা লাগলো পুরো বইটা।