রহস্য, থ্রিলার ও ডিস্টোপিয়ান ঘরানার উপন্যাসটি ৩টা পর্বের । প্রথম পর্বে চেয়ারম্যান বাড়িতে হাজির হয় এক বোবা লোক, যে পুরোনো বইয়ের পাতা ছিঁড়ে গল্প পড়িয়ে চেয়ারম্যান বাড়ির মানুষের আঁতের খবর বের করে আনে। সেখানে থাকে খুন, প্রেম ও যৌনতা। দ্বিতীয় পর্বে চেয়ারম্যানের পুত্র মেয়র হয়ে যায়, আর তার পরিবার বনে আটকা পড়লে এক অন্ধ জাদুকরের আস্তানায় ঠাঁই হয়। তারপর অন্ধ জাদুকর নানা গল্প বলে লোভ দেখিয়ে মেয়র পরিবারের লোকের অন্যায়, প্রেম, যৌনতা বের করে আনে। ধর্ষণের মতো ঘটনার জট খুলতে থাকে, নতুন করে রহস্য দাবা বাঁধতে থাকে। তৃতীয় পর্ব ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দ বা তার আগে পরের কাহিনি, সেখানে মেয়রের পুত্র দেশদরদি মন্ত্রী মহোদয় হয়। তার জলসায় নেমে আসে এক পঙ্খিরাজ। সেখানে আলোর ভেলকি বসে থাকে, যে আলো মানুষের মতো কথা বলে উপস্থিত মানুষকে লোভ দেখিয়ে শর্তের বেড়াজালে গ্রাস করে ফেলে, আর সবার মগজ স্ক্যান করে গোপনীয় কথা বের করে আনে। কৌশলে ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। বিউপনিবেশায়নের চিন্তা থেকে রচিত উপন্যাসে আটকে যাওয়া তৃতীয় বিশ্বের মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ প্রকাশিত হয়। দুর্দান্ত গতি, রহস্যভেদ ও থ্রিলার ধাঁচের এই উপন্যাস পড়া শুরু করলে শেষ করতেই হবে।
চার প্রজন্মের চারজন পুরুষের কাহিনী উঠে এসেছে এখানে। এসব কাহিনীর সাথে জড়িত তাদের প্রেমিকা, বউ, ছেলে, মেয়ে আরো অন্য মানুষের ঘটনাগুলো একের পর এক চলে এসেছে একই ধাঁচে প্রত্যেকের মৌখিক বর্ণনায়। কাহিনীটা মূলত একজন জাদুকর টাইপের লোকের আগমনের মাধ্যমে শুরু হয়। একটা পরিবারের সবার সাথে তার কথোপকথনের মাধ্যমে কাহিনীর বাকি অংশ এগিয়েছে। প্রত্যেকবারই লোকটা নতুন কাউকে ডেকে তাদের অতীত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলে। সেই মানুষটা নিজ থেকেই যত পাপ অন্যায় অবিচার অতীতে করেছে সব গড়গড় করে বলে দেয়। কিছুটা ফ্যান্টাসির মত মনে হলেও এটাকে আমি পরাবাস্তব ও রহস্যময় ঘটনার সাথে তুলনা করব।
উপন্যাসটি মূলত বিউপনিবেশায়ন নিয়ে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ধরন নিয়ে, তৃতীয় বিশ্বের মানুষ নিয়ে। বিউপনিবেশায়ন হলো উপনিবেশায়ন থেকে সামগ্রিক মুক্তির প্রক্রিয়া। এখানে তিন প্রজন্মের জীবনের বিস্তৃত কাহিনি অংকিত হয়েছে যারা সবাই ছিল চরিত্রহীন, ধান্দাবাজ ও পরনারীতে আসক্ত। কিন্তু এদের দোষ ছাপিয়ে যে বিষয়টা সূক্ষভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সেটি হলো বাইরের অপশক্তি কিভাবে আমাদের মানসিকতাকে কলুষিত করে নিজ স্বার্থসিদ্ধি করে। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ করা ও হতে পারে, কখনো বা ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে তাদের পুতুলের মত নাচাতেও পারে।
ম্যাজিক রিয়েলিজম নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটা ভাল লাগলো। কাহিনিতে প্রচুর ১৮+ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যেগুলা অনেকের কাছে অসহনীয় লাগতে পারে। আর একই সাথে একটি পরিবারে ২/৩ জন গর্ভবতী হয়ে যায়, আবার একই দিনে তাদের সন্তান হয়। যদিও এইরকম কাকতালীয়, অদ্ভুত সব ঘটনা জাদুবাস্তবতায় খুব কমন। এসব বাদ দিয়ে যদি পড়েন তাহলে নিঃসন্দেহে মেহেদী ধ্রুব দারুন একজন গল্পকথক। আর এই গল্প বলার ধরনটাই ছিল এই উপন্যাসের আসল প্রাণ, পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ।
পশ্চিমের হাওয়ায় পিঁপড়ারা ইঁদুর হয়ে যায়, তারপর একদিন ইঁদুরেরা পঙ্খিরাজ হয়ে নেমে আসে প্রাণের শহরে।
জীবনে শত চাইলেও মানুষ কখনো নিজে পাপকে গোপন করতে পারে না। কোন একসময় সেটা স্মৃতি হয়ে ধরা দেয়, এই বইটা তেমনই এক উপন্যাস। যেখানে কয়েকটি পরিবার বা কয়েকজন মানুষের গোপনীয় অপরাধ তুলে ধরার আখ্যান।
শত চাইলেও মানুষ কখনো নিজে পাপকে গোপন করতে পারে না। যাপিত জীবনে কোন একসময় সেটা আতংকিত মূর্তি রূপে সামনে আসে। পশ্চিমের হাওয়ার প্রাণ বইটা তেমনই এক উপন্যাস। যেখানে একটা রাজনৈতিক পরিবারের গোপনীয় অপরাধ তুলে ধরার আখ্যান। একটা পরিবারের সদস্যদের কুটিলতা, লোভ উঠে এসেছে। নিজের আপজনরা ক্ষমতা আর কামনীয়তার পিছনে পড়ে সংঘটিত দোষগুলোর চাক্ষুষ প্রমাণ এই বই।
বেশীরভাগ মানুষই বাইরে একরকম আর ভেতরে সম্পূর্ণ বিপরীত। কে জানে কেউ হয়তো দানশীল আচরণ নিয়ে মনে মনে তার চেয়ে বেশী হাসিল করার হাসিল করার মতলব করছে। ক্ষমতার লোভ কার নেই, আদিমকাল এটা আছে, থাকবে। কেউ সংসারে প্রতিপত্তি দেখানোর লোভ, আর কেউ সমাজের উচ্চ আসনে গদি হাসিল করার লোভ। কিন্তু এই নিজের কর্ম সম্পন্ন করতে গিয়ে কখন যে বড় ধরনের পাপে জড়িয়ে তা মানুষ নিজেও জানে না। তখন সেই সামনে আসে তখন নিজের অবচেতন মনে ভয় পায়।
কাহিনী সংক্ষেপ : হঠাৎ করে চেয়ারম্যান আওলাদ খানের বাড়িতে উদয় হলো অদ্ভুত এক লোক। সে আবার কথা বলতে আর চোখে দেখতে পারে না। সে বলে "পুবের আসমানে মেঘ থাকবে,পশ্চিম আসমান থেকে হাওয়া আসবে।মানুষের হাতে থাকবে অ স্ত্র। বাঁচতে চাইলে অ স্ত্র নিতে হবে হাতে "। একথা শুনে চেয়ারম্যান বাড়ির সবাই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যায়। আগন্তুকের হাতের লেখায় সবার নিজের নিজের পাপের কথা মস্তিষ্কে এসে ধাক্কা দেয়। সবাই বুঝে সামনে বিপদ আসন্ন….
নিজের অভিব্যাক্তি: লেখক গল্পটিকে তিনটি পর্বে ভাগ করেছেন, পিঁপড়া পর্ব, ইঁদুর পর্ব,পঙ্খিরাজ পর্ব। একটা পরিবারের অতীত এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে এই পর্বগুলোর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথম দুইটা পর্বে একটা কমন জিনিস ছিলো। একজন আগন্তুক যে পরিবারের প্রতিটা সদস্যের তাদের অপরাধের কথা ইশারায় মনে করিয়ে দেয়। এই আগন্তুকে আচরণও বিভিন্ন জায়গায় দেখা উদয় হওয়া ব্যক্তির মতো। সে নিজেকে পরিচয় দেয় অন্তরজামি হিসেবে। আকাশ থেকে পাতালে তার কোনকিছুই অজানা নেই। তার এই অদ্ভুত ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার গল্পটা ভালো লেগেছে। লেখকের গল্প বলার ধরন ভালো। একটা পরিবারের সদস্যদের ষড়যন্ত্র আর অপরাধ গুলো খুব সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। দোষগুলো অনেকটা cross connection এর মতো একজনের করা অপরাধের সুযোগে অন্যজন পাপ করেছে।
বাড়ির ছোট ছেলে আরাফ উচ্চশিক্ষত হলেও সে অতীতের পাপী। লোকচক্ষুর আড়ালে নিজের চেয়ে নয় বছরের বড় খালাতো বোনের সাথে সম্পর্কে জড়ায় আর সহযোগিতা করে একটা মৃত্যুর গোপনীয়তা। অদ্ভুত লোকটার সতর্কীত ইশারায় আরাফ ভয়ে কেঁপে উঠে যদি সত্যটা প্রকাশ হয়ে যায়। তাছাড়া তার বাবা চেয়ারম্যান আওলাদ খানেরও রয়েছে অন্ধকার দিক। সে গ্রামের চেয়ারম্যান সবাই সাহায্য, দান করে। কিন্তু ভেতরে চলতে থাকে কুটিল পরিকল্পনা। শালির সাথে পরকীয়া, স্ত্রী হ ত্যা র মতো অপরাধ করে সে। এভাবে বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্যের অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে প্রথম পর্বে সবার একান্ত সাক্ষাৎকারের আগে কিছু ছোট ছোট গল্প ছিল, যেমন রাজা উজির আর সরদারের ছেলে, গেঁয়ো বাবা আর শিক্ষিত ছেলের গল্প।
লেখক পুরো গল্পটায় একে অপরের প্রতি যে ক্ষোভ সেটা বুনেছেন। এখানে নারীর প্রতি আকর্ষণ, প্রেম, ক্ষমতা অর্জনের গল্প ছিল।
নেগেটিভ দিকের আলোচনা করলে বলা যায়…কিছু জায়গায় বার বার একই ঘটনার পুনরাবৃত্ত ঘটেছে। আর গল্পের ২য় ভাগে গিয়ে অতিরিক্ত বর্ণনায় বিরক্তি এসে গেছিল। বেশির ভাগ অপরাধের মূল ভীত ছিল নারী জনিত ব্যাপার, এটা ভালো লাগে নি।অদ্ভুত ব্যক্তি যে কামরূপ কামাখ্যা থেকে এসে বলে পরিচয় দেয় তার কর্মকাণ্ড বেশি অতিরঞ্জিত মনে হয়েছে। আর কিছু জায়গায় গল্প বর্ণনাটা আরও সুন্দর হলে ভালো লাগতো। যেমন মেয়র তার পরিবারকে নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার সময় হঠাৎ পথ হারিয়ে এতো জঙ্গলের ভিতর বাড়ি খুঁজে পাওয়া আর অদ্ভুত ব্যক্তির সাথে দেখা হওয়াটা আরেকটু বাস্তব রূপ দিতে পারত।
সব মিলিয়ে গল্পের মূল থিম টা ভালো। যদি বর্ণনা কমিয়ে লেখা আরেকটু ভালো করলে সুন্দর হতো।
❛ঠিক মতো বাইতে পারলে, ভাঙ্গা নৌকাও চলে জীবন চলার পথে, নাই নাই ভি দিক আছে সঠিক দিক যাইতে পারলে, সুন্দর একটা দ্বীপ আসে দুনিয়া ঘুরতাসে, কে ঘুরায় খুঁজতে হইবো বিষয়টা বুঝতে হইবো, জীবনের তরী বাইয়া, জায়গামতো যাইতে হবে তরিকা সবারই এক, ভাঙ্গা নৌকা বাইতে হইবো দুনিয়ায় আইসি কিছুই ছিল না অঙ্গে ভালো কাজ ছাড়া কিছু যাইবো না সঙ্গে ।❜
মানবজীবন কর্মের জীবন। কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগও জীবনকালেই অনেকে পেয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে যাকে দেখে ভালো মনে হয়, পর্দার আড়ালে তার চরিত্রের এমন অনেক দিক বের হয়ে আসে যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। দুনিয়ায় লাভ, যশ, খ্যাতির ফাঁদে পড়ে কত অন্যায় হয়ে যায় তার হদিস থাকে না। জীবন তরীর শেষ ঘাটে এসে হয়তো কেউ অনুধাবন করে, কেউবা করেই না। কিন্তু মৃ ত্যুর পরে লাভ, নাম, খ্যাতি, যশ কিছুই যায় না। ভালো কাজ ছাড়া কিছুই যায় না সাথে। এই সাধারণ কথার মর্মটাই এক জীবনে মানবজাতি বুঝতে পারে না। খান পরিবারের লোকেরা জনদরদী হিসেবেই পরিচিত। ঘটনা হয়তো একবিংশ শতাব্দীর একদম শুরুতে। খান পরিবারের আঙিনায় হাজির হয় এক ফকির। মাথায় জটওয়ালা সেই ফকিরের অদ্ভুত ক্ষমতা। পিঁপড়া নিয়ে কী সব কারবার করে। তার আগমনে খান বাড়ির সবাই একত্র হয়। লোকটা পুরোনো বইয়ের পাতা ছিঁড়ে গল্প পড়ে শোনায়, এরপর একেকবার পরিবারের একেক সদস্যকে ডেকে আলাদা করে কথা বলে। কথা শেষে তারা অদ্ভুত এক অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়। লোকটা নাকি তাদের বাঁচাবে। কিন্তু কথার সত্যতা কী? বাড়ির সকল সদস্যদের এমন সকল গোপন কথা কী করে জানলো সে?
জটওয়ালা ফকিরের আগমন এবং প্রস্থানের পর কেটে গেছে বহু বছর। সময়টা হয়তো কোভিড অতিমা রি র দিকে হবে। আবারো খান বাড়ি, তবে পরবর্তী প্রজন্ম। চেয়ারম্যানের ছেলে মেয়র হয়েছেন। লকডাউনে অসহ্য হয়ে খান ফ্যামিলির লোকেরা গাড়ি নিয়ে ছুটেছিলেন কক্সবাজারে উদ্দেশ্যে। কিন্তু মধ্যপথে গাড়ি বিকল হয়ে গেলে তারা দেখা পায় চোখ সেলাই করা অদ্ভুত এক বুড়োর। যার কাছে ইঁদুর আছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে। কামরূপ কামাখ্যায় টিকে থাকা লোকের কাছে আছে সুরমা, লাঠি, বাক্স, পান সহ অদ্ভুত সব জিনিস। যা দিয়ে তিনি খান পরিবারের লোকেদের সাহায্য করবেন। কিন্তু এর আগে তিনি নানা গল্প বলেন। সাথে পরিবারের সদস্যদের নিজেদের জীবনের সে সকল ঘটনা তাদের মুখ দিয়ে বের করে আনেন যে সকল কথা কেউ কোনোদিন জানতে পারার কথা না। গল্প শোনার এই নেশা আর নিজের স্বীকারোক্তির এই খেলা থেকে বাঁচতে হলে খান পরিবারের কাউকে আবার বির্সজন দিতে হবে না তো?
সময় এগোয়, প্রযুক্তির উন্নতি হয় কিন্তু উন্নতি হয়না পরিবেশের, পরিস্থিতির। বিশ্বায়নের নামে ধ্বং সের এক মাতাল হোলি খেলায় বিশ্ববাসী মেতে ওঠে। যেখানে টাকা, সম্পদ, কাম-ই মূল। সময়টা একবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক। খান পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম। মেয়রের ছেলে হয়েছেন মন্ত্রী। তার আশেপাশের বিভিন্ন চরিত্র, তাদের জীবন গন্ডি চলছে একেকভাবে। সেই প্রাচীনকাল থেকে খান পরিবারের ক্ষমতার খেলা, রাজনীতি, জনগণের জন্য কাজ করা, সেবায় নিয়োজিত থাকা সব কিছু অব্যাহত আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জনগণের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করলেও তাদের ভেতরের সূক্ষ্ম সত্যগুলো সবসময়েই কলুষিত। ক্ষমতার জন্য কৌশল অবলম্বন, পরকীয়া, উদ্যম যৌ নতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়েছে। যা অব্যাহত আছে। তথ্য প্রযুক্তিতে ভরপুর নতুন যুগে মন্ত্রী এত ভালো কাজ করেও সুখে নেই। তার মনে শান্তি নেই। শান্তি পেতে তাই সে আয়োজন করে জলসার। কিন্তু জলসায় পক্ষীরাজে করে আগমন হয় এক হলোগ্রামের। যার পশ্চিমা ঘ্রাণে সকলে মোহগ্রস্ত হয়ে যায়। আটকা পরে টাইমফ্রেমে। পক্ষীরাজ হলোগ্রাম এসে জলসার সবাইকে নানা প্রলোভন দেখায়। ক্ষুধা না লাগার ক্যাপসুল, রঙিন পানি, আকাশে উড়তে দেয়ার ক্ষমতা দিয়ে নিয়ে যেতে চায় তাদের পাতাল, মাথার আকাশ, তাদের গল্প। উচ্ছ্বসিত জনগণ হেসে খেলে সব দিয়ে দেয়। কেউ জানেও না বুঝতেও পারে না কী দিয়ে দিলো। সবাই এক হুজুগে মেতে আছে। হুজুগের মাঝেই একে একে মৌখিক স্বীকারোক্তি আসে ভালো মানুষের লেবাস মেয়া কিছু মানুষের। কিন্তু এত মুখোশের মাঝে কি একজনও সঠিক মানুষ নেই? পিঁপড়া হয়ে ঢুকে পক্ষীরাজ হয়ে বের হওয়া এই প্রলোভনে সাড়া না দিয়ে কেউ থাকতে পারবে? সবার মাঝে আরণ্যক কি পারবে লোভ, কাম, অন্যায় থেকে দূরে থেকে নিজেকে সজীব রাখতে?
পশ্চিমের হাওয়ায় ঘ্রাণ প্রাণের ঘাতক হয়ে যাওয়ার আগে হুশ ফিরতে হবে!
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ❞ মেহেদী ধ্রুবের প্রথম উপন্যাস। জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, রহস্য আর থ্রিলারের মিশেলে লেখা অদ্ভুত উপন্যাস। অদ্ভুত কেন বলছি? ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তির আড়ালে গল্প বলে সেই গল্পের মালিকানা নিয়ে গেছেন। স্বাধীনভাবে চলতে পারলেও নিজ থেকে কোনো গল্প থাকবে না এমন একটা সময়ের কথা বলেছেন লেখক। এমন আরও অনেক অদ্ভুত ব্যাপার আছে বইতে। যেমন খান পরিবারে ননদ, বউ, শাশুড়ি একই দিনে বাচ্চা প্রসব করে, আবার একই সময় গর্ভবতী হয়। প্রায় প্রতি লাইনে লাইনে অদ্ভুত যৌ নতার বর্ণনাআ, বিকৃত রুচির পরিচয় মিলেছে সমাজের রোল মডেলদের। উপন্যাস তিনটা ভাগে বিভক্ত। প্রথম পিঁপড়া পর্ব এগিয়েছে খান পরিবারের একটা প্রজন্মকে নিয়ে। যেখানে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুন্দর মিল থাকলেও মনের গহীনে আছে খেদ, আছে হিংসা, আছে পরনারী, পরপুরুষে আসক্তি। ক্ষমতায় আসার নানা তরিকা। নিজেকে টিকিয়ে রাখতে ভালো কাজ করা। পরিবারের প্রতিটা সদস্যের মনের কথা তাদের মুখ থেকেই জানা যায়।
দ্বিতীয় ইঁদুর পর্বে আছে এই পরিবারের পরের প্রজন্মের কথা। মহামারীর সময়ের কথা। একইভাবে ক্ষমতায় আসতে, নিজের কামনা মেটাতে কীভাবে কৌশল অবলম্বন হয় তার কথা।
তৃতীয় পর্ব পক্ষীরাজ। সুবিধা দিয়ে কিভাবে আসমান জমিন হাতিয়ে নিয়ে যায় হেসে খেলে তার একটা চিত্র এসেছে এখানে। এসেছে তৃতীয় প্রজন্মের খান পরিবারের কথা। যারা সেই শুরু থেকেই চরিত্রহীন, লোভী, স্বার্থান্বেষী, মুখোশধারী। এদের মধ্যে একজন হয়তো স্রোতের বিপরীতে এক কন্ঠ। যে মন্ত্রী পিতা কিংবা ক্ষমতাশালী পরিবারের নাম ভাঙিয়ে চলে না। সত্যিই ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠে। কিন্তু এত নেগেটিভিটির মাঝে একটা পজিটিভ শক্তির শক্তি কতটা?
আমার কাছে বইটা ভালোই লেগেছে। মূলত বইতে লেখার ধরন, গল্প থেকেও বেশি যেটা আমার মনে হয়েছে সেটা হলো একজন ব্যক্তির মনের ভেতরে চলা নানা কথা, বলা ভালো স্বীকারোক্তি। একটা পরিবারের মাধ্যমে লেখক সেইসব ক্ষমতাসীনদের কথা বলেছেন যারা উপরে উপরে ফেরেশতা হলেও তাদের খুঁড়ে দেখলে ময়লা ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। উপন্যাসের চরিত্রগুলো প্রচুর পরিমাণে কা মাসক্ত, উদ্যম যৌ নতা যাদের জীবনের চাবিকাঠি। এজন্য বইতে ১৮+ বর্ণনা ভরপুর ছিল। তবে চরিত্রদের বৈশিষ্ট্য, তাদের কাজ বোঝাতে এই বর্ণনা আমার কাছে প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। লেখক বইতে মানব মনের সেই কালো বা ধূসর দিককে তুলে এনেছেন যা আমরা সচরাচর দেখি না। উপন্যাসের আরজু, আরমান, শুভ, অনিল, আরশা এরা হয়তো আপনার আমার মাঝেই বিরাজমান। একজন মানুষ নিজে খুব কম ক্ষেত্রেই বিশুদ্ধ হয়। কোনো না কোনো দিকে তার একটা ডার্ক সাইড থাকে। উপন্যাসে খান পরিবার এবং প্রজন্ম ধরে তাদের বুদ্ধি দেয়ার মতো বাইরের কিছু লোককে বন্ধু বানিয়ে রেখেছেন। যারা আদতে উপকার করে না, অপকার করে ধরা যায় না।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন, সোজা করে পাওয়ার লোভ, অভাব থেকে বাঁচতে নিজেকে চিন্তা না করেই বিকিয়ে দেয়া এই উপন্যাসের অন্যতম একটা মেসেজ। শত অন্য���য়, পাপ করে একসময় এসে উপলব্ধি করে দীনের পথে এসে পড়াও যে একধরনের সূক্ষ্ম চাল সেটা এই উপন্যাসের প্রায় প্রতিটা চরিত্রের মাঝে প্রকাশ পেয়েছে। কোনো বিষয়ে পক্ষ বিপক্ষ তৈরির সাথে সাথে আমরা সেটার ধর্মীয় দিক বের করে যে র ক্তার ক্তি পর্যায়ে চলে যাই, সেটাও এই হলগ্রামের পক্ষীরাজের আগমনের মাধ্যমে বোঝা যায়।
এত অন্যায়ের মাঝে কি কেউ ভালো কাজ করেনি এরা? করলেও পরাবাস্তব সেই দুনিয়ায় জাদুর কোনো আগমনে তারা তাদের করা খারাপ কাজগুলোকেই মনে করতে পারে বা হলোগ্রাম তাদের স্ক্যান করে নেয়। স্ক্যান করে সেই খারাপ দিকগুলোকে, দুর্বলতাগুলোকে।
আহাম রি না হলেও ম্যাজিক রিয়েলিজমের মাধ্যমে মানুষের মনের কালো দিকগুলো নিয়ে লেখা উপন্যাস আমার ভালো লেগেছে। উদ্যাম যৌ নতার বর্ণনা বাদ রেখে এর কারণকে উপলব্ধি করে পড়তে পারলে বইটা আপনাকে অনেক কিছু ভাবাবে। ডিস্টোপিয়ান ধাঁচের বই হিসেবে ভালো ।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
প্রচ্ছদটা এইটা নতুন। আমার ভালোই লেগেছে। শব্দগঠনের ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বল লেগেছে। সম্পাদনার ঘাটতি ছিল।
❛রাতে একান্তে শোবার সময় নিজেকে কখনো প্রশ্ন করেন- যা করি, করছি তার কতটা ভালো আর কতটা অন্যের ক্ষতিতে অবদান রাখছে? মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার আগে ভালো কর্ম কতটা সাথে যাবে কখনো আমরা ভাবি?❜
আমার কাছে সবচেয়ে মারাত্মক ব্যক্তি হলো যে ব্যক্তি বাইরে একরকম দেখায় কিন্তু ভিতরে আরেক রকমের হয়। অর্থাৎ সে মুখে বলে এক কথা কিন্তু বিশ্বাস করে তার বিপরীতটা অথবা বিপরীত কার্যকলাপে জড়িত। আমাদের ইসলাম ধর্মেও কিন্তু এরকম একটা টার্ম আছে— মুনাফিক। যে প্রকাশ্যে ইসলাম চর্চা করে কিন্তু গোপনে ইসলামের বিরোধিতা করে। এবং ধর্মের দৃষ্টিতে এরা হলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক। একইভাবে আমাদের সমাজের মানুষদের মধ্যে যারা মুখে বলে এক কথা কিন্তু কাজ করে তার বিপরীতটা, তারাই সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
এই গল্পটা তিনটি প্রজন্মের। তিনটি পর্ব মিলে। পিঁপড়া পর্ব, ইঁদুর পর্ব, পঙ্খিরাজ পর্ব। প্রথম পর্বে— চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে হঠাৎ করে এক জাদুকরের আগমন ঘটে। উসকো-খুশকো, হাড্ডিসার শরীর, কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। এই লোক কথা বলতে পারে না। যা বলতে চায় তা একটি খাতায় লিখে সবার সামনে তুলে ধরে। লোকটার হঠাৎ আগমনে আর তাজ্জব সব কর্মকান্ডে চেয়ারম্যান বাড়ির লোকেরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। সেই লোককে ঘিরে একটি ঘরে সবাই জমায়েত হয়। তারপর সেই লোক বহু পুরনো একটি বই বের করে সেখান থেকে কয়েকটি পাঁতা ছিঁড়ে একজনকে পড়তে দেয়। রূপকথার গল্পের মত কেউ একজন সেটি পড়তে থাকে।
গল্প শেষ হওয়ার পর পরিবারের সবাইকে বাইরে যেতে বলে যেকোনো একজনকে ঘরের মধ্যে থাকতে বলে। এরপরই শুরু হয় সবচেয়ে আজব কান্ড। লোকটা একে একে তার সম্পর্কে সবকিছু বলে দেয়। মনে হয় যেন মানুষের স্মৃতি সে পড়তে পারে। এভাবে চলতে থাকে একের পর এক গল্প। আমার পরিবারের সবাই তাকে ঘিরে জমায়েত হয়। লোকটা বইয়ের পাতা ছিড়ে গল্প করতে দেয়। গল্প শেষ হয়, সবাই বের হয়ে যায়। মাত্র একজন থাকে ঘরের মধ্যে। তারপর সেই মানুষটির সম্পর্কে কথা একে একে বলতে থাকে। এভাবে সকলের স্মৃতি তার স্মৃতির মালিকের সামনে বলতে থাকে। আর উঠে আসে চেয়ারম্যান পরিবারের সকল ব্যক্তির গোপন ও নিষিদ্ধ সব স্মৃতি।
ইদুর পর্ব আর পঙ্খিরাজ পর্বের গল্প একটু ভিন্ন। কিন্তু মূল বিষয়বস্ত একই রকম। জাদু বাস্তবতার মধ্য দিয়ে সকল চরিত্রের গোপন ও নিষিদ্ধ স্মৃতি গুলো টেনে বের করে আনা হয়েছে। প্রত্যেকটা চরিত্রে আমরা দুজন মানুষকে পেয়েছি। একটা হচ্ছে তার ভিতরের মানুষ আরেকটা তার বাইরের মানুষ। ঐ যে বললাম মুনাফিকদের মত। পৃথিবী তাদের সবাইকে অনেক ভালো ব্যক্তিত্বের অধিকারী মনে করে। কিন্তু তারা নিজেরা জানে যে তাদের জীবনে কত গোপন কর্মকান্ড, অপরাধ রয়েছে। যা মানুষরা জানতে পারলে হয়তো তাদের উপর থুতু ছিটাবে।
এই গল্পের মূল বিষয়টি হয়তো এটাই। লেখক হয়তো এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, সমাজের ক্ষমতাশালী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গরা কিভাবে দুটো লাইফ লিড করেন। জনগণের সামনে ভালো থাকার কিংবা ভালো সাজার চেষ্টা করে কিন্তু আসলে ভিতরে ভিতরে জনগণেরই পিঠে ছুরি মারে। আসলে এ ধরনের মানুষগুলো মারাত্মক ক্ষতিকর। আপনার লাইফে যদি এমন কেউ থাকে যে বাইরে একরকম কিন্তু ভিতরে আরেকরকম, তাহলে তার থেকে যথাসম্ভব সাবধানে থাকা উচিত। কারণ আপনি তার আসল চিন্তাভাবনা কখনোই ধরতে পারবেন না। হয়তো আপনার সামনে ভালো সাজার নাটক করে কিন্তু কে জানে হয়তো আপনার পিছনে সেই আপনার সমালোচনা করে। অবশ্য এর বিপরীতটাও হতে পারে। কিন্তু এর নজির খুব কম। আর এই ধরনের মানুষগুলো পরিষ্কার মনের হয়।
লেখকের স্টোরি টেলিং খুব ভালো। গল্পে একই কাহিনী বারবার রিপিট হলেও লেখকের গল্প বলার ধরন ভালো হওয়ায় বিরক্তির উদ্রেক হয় না। অবশ্য আমি যে খানিক বিরক্ত হয়েছি তা না বললেও নয়। কারণ তখনও আমি গল্পের মধ্যে লেখকের মূল উদ্দেশ্যটা ধরতে পারিনি। বারবার একই ঘটনা রিপিট হওয়ার কারণে মূলত বিরক্তিটার উদ্রেক। যেমন ধরা যাক পিঁপড়া পর্ব। এই পর্বের জাদুকর চরিত্রটা বারবার একই ঘটনা ঘটাচ্ছিল। পরিবারের সবাইকে ডেকে একটা গল্প শোনায়, তারপর সবাইকে যেতে বলে একজনকে থাকতে বলে, আর ঘরে থাকা অবশিষ্ট একজনকে তার গোপন স্মৃতিগুলো মনে করিয়ে দেয়। তারপর সে ব্যক্তি বের হয়ে যায়, আবার সবাই আসে একটা গল্প শোনে, সবাই বের হয়ে গিয়ে আরেকজন ব্যক্তি থাকে......
গল্পের মূল চরিত্রগুলোর এসব কর্মকাণ্ড ছাপিয়ে লেখক যে বিষয়টি ফুটে তুলতে চেয়েছেন তা হলো, বাইরের যেসব অপশক্তি রয়েছে এগুলো আমাদের মানসিকতা, চরিত্র, ব্যক্তিত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবার কখনো ধর্মের দোহাই, কখনো জনসাধারণের উন্নয়ন কিংবা যেকোনো কিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে।
গল্পে ১৮+ সিন প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। আমরা যতদূর জানি একজন মানুষের গোপন সব চাহিদার মধ্যে যৌ ন চাহিদা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরজন্য মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে আমরা জানি। যেহেতু গল্পে সমাজের উপরের পর্যায়ের মানুষদের মতো চরিত্রের গোপন কথাগুলো উঠে এসেছে তাই স্বাভাবিকভাবেই উপরোক্ত বিষয়টা আসবেই। তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই। যাদের সামান্য পরিমাণ হলেও এমন সিন পছন্দ না তাদের জন্য স্কিপ করাই ভালো। কারণ প্রায় পুরো বই জু্ড়েই এই ধরনের সিন রয়েছে। লেখক জাদুবাস্তবত, পরাবাস্তবতার মধ্য দিয়ে যে সমাজের এমন বিষয়কে এত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। তবে শুধু গল্প একইরকম ঘটনার ভেতরে থেকে এগিয়ে যাওয়ায় যে সামান্য বিরক্তি ছিল তা না থাকলে পুরোপুরি পারফেক্ট একটা বই।
বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি, বাঁধাই সব ঠিকঠাক। প্রচ্ছদটাও বেশ নজরকাঁড়া। কয়েক জায়গায় বানান ভুল ছিল। সেগুলো ঠিক থাকলেই মোটামুটি সব ঠিকঠাক।
🔸ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৫/৫
পরিশেষে, জাদুবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতাকে কেন্দ্র করে সমাজের উপরের পর্যায়ের মানুষদের গোপন স্বভাবকে লেখক “পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ”-এর মধ্যে তুলে ধরেছেন। এই বই আমাদের সমাজের উল্লেখযোগ্য কিছু সমস্যা তুলে ধরে। যেসব বোঝা এবং প্রতিকার করা আমাদের কর্তব্য।
"Everyone can act like they're happy, but no one knows what’s really going on inside."
▪️মানুষের সামাজিক জীবন ও ব্যাক্তি জীবনের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। ব্যাক্তিগত জীবনে ধরাবাঁধা কোন নিয়ম নেই কিন্তু সামাজিকভাবে আমাদের অনেক নিয়মনিষ্ঠা মেনে চলতে হয়। ব্যাক্তি জীবনে প্রায়শই এমন কিছু ঘটনা আবর্তিত হয় যেগুলো আমরা অন্য মানুষের সামনে প্রদর্শন করতে চাই না। মোটকথা, সামাজিক জীবনে আমরা এক ধরনের কৃত্রিমতা বজায় রাখি। যেনো মানুষ আমাদের ভালো দিকটি পর্যবেক্ষণ করে, মন্দ দিকটি নয়।
▪️কাহিনি সংক্ষেপ
'পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ' বইটি সমাজের এক নেতৃস্থানীয় পরিবারের গল্প। যেখানে বংশপরম্পরায় চেয়ারম্যান, মেয়র ও মন্ত্রী পর্যায়ের মানুষ রয়েছে। এই পরিবারের সদস্যদের জীবনের অনেক কালো, অন্ধকার, লুকায়িত ও নিকৃষ্ট অধ্যায়ের আলোকপাত ঘটেছে বইটিতে। লোভ, লালসা, যৌনতা ও চাহিদা যে কতোটা ভয়ংকর সেটাই ফুটে উঠেকে উক্ত বইটিতে। বইয়ে তিনটি পর্ব রয়েছে, যেগুলো প্রজন্মগত ভাবে আবর্বিত হয়, তখন সেখানে আবির্ভাব ঘটে এক রহস্যময় ব্যাক্তির, যিনি জাদুবাস্তবতা বা হ্যালুসিনেশনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি নিয়ে থাকেন। এভাবেই গল্পটি এগিয়ে যেতে থাকে..........
▪️আমরা সাধারণত সেলিব্রিটি বা সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিদের জীবন অনুসরণ করে থাকি। আমরা মনে করি তারা কতো সুখী! আমরা এমনটা ভেবে থাকি কারণ তারা ঠিক এই ভালো দিকটাই আমাদের শো করে। তাদের জীবনেও অনেক অন্ধকার বিষয় আছে যেগুলো তাদের হাস্যোজ্জ্বল চেহারার আড়ালে লুকায়িত থাকে।
▪️রমজানের শুরুতে বইটি শুরু করেছিলাম কিন্তু এডাল্ট জনরা হওয়াতে স্কিপ করি। এখন আবার রোজার পরে পড়লাম। আর সত্যি বলতে শেষ করার সামর্থ্য আমার নেই। এক বিষয়ের পুনরাবৃত্তি, অতিরিক্ত যৌনতা, সামঞ্জস্যহীন বর্ণনা পড়তে পড়তে একপ্রকার বিরক্তবোধ হয়েছে।
▪️বইয়ের সবচেয়ে বাজে দিক হলো অতিরিক্ত এডাল্ট বর্ণনা। মানে প্রতিটি ক্যারেক্টর যখন উত্তম পুরুষে তাদের অতীত স্বীকার করে সেখানে এক-দুটো বাজে ঘটনা থাকবেই। লেখক সেগুলো অনেক রসবোধের মাধ্যমে বিস্তারিত লিখেছেন। আপনি এখানে বিভিন্ন পজিশন ও ফ্যান্টাসির দেখা পাবেন। যেগুলো ভাবতেই কেমন লাগে। মানে প্রতিটি ক্যারেক্টর কোন না কোনভাবে যেনো শেষে এই যৌনতায় এসে মিশে গেছে। ক্ল্যাসি চ* আর কি!
▪️তিন টি পর্বের বইটিতে প্রথম পর্বটি পড়ে ভালো লাগছিলো। কেননা ওখানে প্রেক্ষাপট বর্ণনা দারুণ ছিলো। দ্বিতীয় পর্বেও মোটামুটি কিন্তু শেষটা পড়ে মনে হলো লেখক হলিউডের কোন সাই-ফাই মুভির কাহিনি নিজের ভাষায় ব্যাক্ত করছেন। কোন ধরনের ভাবাবেগ কাজ করে না। আর আমি এই পর্বটি পরে শেষও করতে পারি নি।
▪️বইয়ের একটা ভালো দিক হলো লেখকের মাঝে পটেনশিয়ালটি আছে। মানে পড়ার মাঝে ফ্লো পাওয়া যায় উনার লেখা পরে। এক ধরনের সরলতা আছে যা ইন্টারেস্টিং প্লট না হওয়ার পরেও কান্টিনিউ ভ্যালু রাখে।
▪️ বইয়ের বাইন্ডিং প্রচ্ছদ ও কোয়ালিটি অনেক ভালো। পেজ ও লেখা অনেক ভালো মানের ছিলো।
▪️ যারা বইয়ের গল্পের আঙ্গিকে টিভি সিরিজ দেখতে চান তাহলে বলিউডের The Fame Game (2022) দেখতে পারেন। প্রধান চরিত্রে ছিলেন মাধুরি দীক্ষিত।
২০২৫ রিভিউ বিষয়: বই রিভিউ: ৩৭ বই: পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ লেখক: মেহেদী ধ্রুব প্রকাশনী: উপকথা প্রচ্ছদ: আল নোমান জনরা: জাদুবাস্তব
বিক্রম বেতালের বেতাল কিংবা আলিফ লায়লার কিছু চরিত্র অনেক গল্প বলত। আলিফ লায়লার অনেক দাস নিজের সাথে ঘটা গল্প বলত।
ঠিক এখানেও কেউ কেউ এমন গল্প বলেছেন আবার নিজের করা কৃতকর্মের কথা কেউ স্মরণ করেছেন। খান নামের এক পরিবারের গল্প। যে পরিবারে অসংখ্য রহস্য, কেউ সন্তানকে ম/এরে/ ফেলে, কেউ স্ত্রীকে। যার যাকে ইচ্ছে। সেই পরিবার চেয়ারম্যান পর্যায় থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছে। এক এক জেনারেশন এক এক ভাবে। প্রতিটি সদস্যের অন্তরে আছে না বলা কিছু গল্প। কাকপক্ষীও যে গল্প জানে না, পিঁপড়, ইঁদুর আর পক্ষীরাজ সে গল্প বের করে আনে তাদের অন্তর থেকে। আরশা খান হোক বা শুভ কিংবা সুরভী অথবা শিউলি। এরকম অসংখ্য চরিত্র পাবেন। কে কার বাপ, কে কার চাচা আর কে কার মেয়ে এসব মাথায় রাখা বেশ শক্ত। নামগুলোও বেশ কাছাকাছি ছিল। নিজের স্বার্থের খাতিরে, কেউ এতটুকু ছাড় দিতে রাজি না। লোভ-লিপ্সা-হিংসা-জৈবিক চাহিদা সব অধিকাংশ মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
প্রত্যেকের জীবনে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে যৌন চাহিদায় যেন বেশি। এই ব্যাপার বারে বারে এসেছে, এটা একটু অস্বস্তির কারণ। অনেকের কাছে ভালো লাগবে না। কিন্তু চরিত্রের প্রয়োজনেই যে ব্যাপারগুলো এসেছে সেটা বলা বাহুল্য। তবে কিছু কিছু চরিত্রের বর্ণনা, উত্তম পুরুষেই তারা দিয়েছেন, একই রকম লেগেছে। বাবা-ছেলের একই দিনে সন্তান হয়, বংশে এরকম বার বার ঘটছে, ঘটেই চলেছে। অতি কা-ক-তা-লী-য় না?
উত্তম পুরুষে নারী-পুরুষ সবার চাহিদা বা ক্ষমতার লোভ কিংবা আকাঙ্ক্ষা বর্ণনা করেছেন। নিজের কাছে, নিজের পাপ লুকানো যায় না, এটা লেখক বার বার বলে দিয়েছেন।
আমি খুব সাধারণ ছোট খাটো মানুষ। এ গল্পের গভীরতা বুঝতে হয়তো আমার আরো ক’বার পড়তে হবে। যেটুক আমি বুঝছি সেটা এক কথায় বললে, মানুষ বোধহয় ধর্ম-ক্ষমতার জন্য রক্ত-গঙ্গা বইয়ে দিতে কোন কালেই পিছু পা হবে না। মানুষ বাঁচে সম্ভবত ক্ষমতার জন্যেই। আর নিজের পাপের সামনে, কৃতকর্মের সামনে নিজেকে আসতেই হবে, প্রায়শ্চিত্ত ও করতে হবে।
হয়তো আর গুঢ় অর্থ থাকতে পারে। খুব ভারী কথা বার্তা, আমার বোঝার বাইরে। তবে অনেকের কাছে হয়তো সহজেই বোধগম্য হবে।