খ্রিষ্টের জন্মের আড়াই হাজার বছর আগের কথা। মেম্ফিসের এক মন্দিরে হাই প্রিস্ট ইমহোটেপ এক গোপন নির্দেশ দিয়ে গেলেন প্রধান পুরোহিত ফেটকে। আরো দু’হাজার বছর পর ফারাও সামটিকের পরীক্ষা বানচাল করে দিলেন পুরোহিত সেনুহিত। বহু বছর পর একবিংশ শতকের প্রথমভাগে তুরস্কের কেমেরডামলারি প্রজেক্টে মারা গেলেন প্রফেসর রোনাল্ড। আজকের দিনে তার হাতের চিঠি পেয়ে চমকে উঠলেন এককালের সহকর্মী প্রফেসর লিলি চৌধুরী। রোনাল্ডের মৃত্যু কী স্বাভাবিক, না হত্যাকান্ড? সুপ্রাচীন এক ভাষার পাঠোদ্ধারের খোঁজে লিলি মাঠে নামালের তরুণ দুই গবেষক, স্যাম আর রেহানকে। দ্রুতই বোঝা গেলো টক্কর লেগে গেছে মহাশক্তিশালী সুপ্রাচীন এক সংগঠনের সাথে। সাহায্যের হাত বাড়িয়েরেখেছে তাদের চিরশত্রু। কিন্তু স্বার্থ আছে নিশ্চয়, কী সেটা? সবকিছুর মধ্যে জুপিটার কর্পোরেশনসের যোগটাই বা কোথায়? হন্যে হয়ে কেন সবাই চাইছে আদি সে ভাষার অর্থ বের করতে। খুঁজে বের করতে হবে হাই প্রিস্ট ইমহোটেপের সমাধি। সেখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে কিছু উত্তর! কিন্তু সেজন্য হাত মেলাতে হবে কোনো এক প্রতিপক্ষের সাথে। কিন্তু কাউকে কি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায়?
🟥পূর্বকথাঃ আনুমানিক ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, পূর্বদিক থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে নীলের তীরে হাজির হয়েছিল একদল লোক। তারা ছিল দেবতাদের প্রতিনিধি। বার্ধক্য আর অসুখ তাদের স্পর্শ করত না। নিজেদের ভিতরে তারা কথা বলতেন দেবতাদের ভাষায়। তাদের মেয়ে সন্তানদের জন্মের পরেই মুখে ফোটে সেই ভাষা। আর সেই প্রাচীন ভাষার নাম হচ্ছে দার্গোস। বহু পুরনো জ্ঞান লুকিয়ে রাখা আছে এই ভাষার ভিতর। অ্যামিথিসের প্রথম সেহমেট ইমহোটেপ মনে করতেন উপযুক্ত সময় অ্যামিথিসের উচিত সব প্রকাশ করা, মানুষের কল্যাণে এই জ্ঞান যাতে লাগে সেটা নিশ্চিত করা। কিন্তু সকলে একমত হয়নি, তখন হতাশ হয়ে নিজেই ড্রাজোসের সবকিছু লিপিবদ্ধ করা শুরু করেন তিনি আর মৃ*ত্যুর আগে হাই প্রিস্টকে নির্দেশ দেন তার সমাধিতে যেন রেখে দেওয়া হয় সেই অজানা জ্ঞান সমৃদ্ধ স্ক্রলটি এবং অ্যামিথিস থেকে গোপন রাখা হয় তার সমাধির অস্তিত্ব। ইমহোটেপের শেষ কথা ছিলো,🔸বেশ বুঝতে পারছি ঘনিয়ে এসেছ আমার সময়। শিগগিরি ওসিরিসের সামনে উপস্থিত হতে হবে আমাকে। ভয় নেই আমার, দেবতারা জানেন যা করেছি প্রাচীন সেই জ্ঞান গোপন রাখার জন্যই।🔸 🟥কাহিনি সংক্ষেপঃ অ্যামিথিস নামক সংগঠন হাজার বছরে ধরে লুকিয়ে রেখেছে ড্রাজোস নামের এক সভ্যতার কথা যাদের ভাষা দার্গোস প্রায় হারিয়ে গেছে বহুকাল আগেই। একটা সময়ে তাদের উপলব্ধি হয় ড্রাজোসের কথা লুকিয়ে রাখা অনন্তকাল সম্ভব না। ৪২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, অ্যামিথিস হেরোডোটাসকে দায়িত্ব দেন প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া দার্গোস লিপিগুলো পুনর্লিখিত করার। লিপিগুলো পুনর্লিখিতই শুধু নয়, হেরোডোটাস দার্গোস ভাষায় প্রথম লিখিত নিয়ম চালু করেন কারণ শেষ সময় সবাই ভয় পাচ্ছিল লিখিত কোন নমুনা না থাকলে ভবিষ্যতে যে কোন সময় আসতে পারে যখন এই ভাষা সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে। ঘটনাচক্রে ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, সিজার যখন মিশরে ক্লিওপেট্রা আর ত্রয়োদশ টলেমির বিবাদ মীমাংসা করছিলেন তখন অ্যামিথিস নিজেদের সমর্থন জুড়ে দিয়েছিল টলেমির সাথে। কিন্তু টলেমির পরাজয় অবশ্যম্ভাবি বুঝে অ্যামিথিসের এক সদস্য নিজের প্রাণ রক্ষার বিনিময়ে সিজারের সেনাপতিকে ড্রাজোস এবং তাদের ভাষার দার্গোস সম্পর্কে সবকিছু বলে দেয়। এরপর দুটি সংগঠন দার্গোসের বিষয়ে জেনে যায়। সেই সময় মাইসেনিয়াস গ্রিসে পাঁচ বণিক পরিবার মিলে তৈরি করেছিল এক সংঘ, দ্য কোর্ট অভ মার্চেন্ট। পরবর্তীতে পাঁচ পরিবারের কোর্ট অভ মার্চেন্ট ধীরে ধীরে পরিণত হয় ইউনিকর্ন নামের প্রতিষ্ঠানে। তাদের বিরোধিতা করতে সংঘটিত হয় মেডুসা নামের আরেকটি সংগঠন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় শেষবারের মতো বড় লড়াই করেছিল দুই সংগঠন। কোর্টের পক্ষে পরিবারের একজন নিহত হয়েছিল আর মেডুসার কাউন্সিলের বড় একটা অংশ মা*রা গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত মতৈক্য হয় যুদ্ধ বন্ধের। ২০০৭ সালে আর্কিওলজিস্ট রোনাল্ড প্রাচীন লিপি নিয়ে চিঠি লিখেন প্রফেসর লিলিকে। ওই চিঠি পাঠাবার পরদিন কেমেরডামলারি প্রজেক্টে মারা গেলেন প্রফেসর রোনাল্ড। আজকের দিনে সেই চিঠি পেয়ে চমকে উঠলেন প্রাক্তন সহকর্মী ভাষাবিদ লিলি চৌধুরী। দার্গোসের সন্ধানে লিলি মাঠে নামলেন তার পরিচিত দুই তরুণ গবেষক স্যাম এবং রেহানকে নিয়ে। মাঠে নামার সাথে সাথেই তারা বুঝে গেল টক্কর লেগে গেছে মহাশক্তিশালী সুপ্রাচীন সেই সংগঠন ইউনিকর্নের সাথে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ইউনিকর্নের চিরশত্রু মেডুসা। কিন্তু এটা কি আসলেই সাহায্য নাকি স্বার্থ? সবকিছুর মধ্যে জুপিটার কর্পোরেশনের যোগসূত্রটা কোথায়? সবারই লক্ষ্য একটাই খুঁজে বের করতে হবে মেম্ফিসের গ্রেট টেম্পলের পুরোহিত ইমহোটেপের সমাধি। 🟥পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ ★লেখক মিথ ও ইতিহাসের মিশেলে এত সুবিশাল ফিকশন লিখেছেন যার ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি আমার কল্পনার বাইরে ছিল। প্রায় ২৫০০ খ্রিষ্টাব্দপূর্ব থেকে কাহিনী শুরু হয়ে বর্তমানে এসে শেষ হয়েছে। অনেক হিস্টোরিক্যাল ফিকশনে কয়েক পাতা অতীতের ঘটনা বর্ণনা থাকার পর বাকি ঘটনা বর্তমানে এসে থ্রিলারের মত কাপঝাপ দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। এই উপন্যাসের অদ্ভুত সুন্দর বিষয়ে ছিল পুরো কাহিনী জুড়ে মিথ আর ইতিহাসের ঘটনার সাথে চরিত্রের বর্ণনাগুলো চলে এসেছে গল্পের প্রয়োজনে। কাহিনির পাতায় পাতায় ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তিদের বাণীগুলোকে উপন্যাসের চিত্ররূপে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন_🔸আমি,নেখুবিস,গ্রেট টেম্পল অভ পিটাহের পুরোহিত। দেবতাদের আশীর্বাদপুষ্ট পিটাহের শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ইমহোটেপকে স্মরণ করছি আমি। তার নির্দেশে যুগের পর যুগ ধরে সেই সমাধির নিরাপত্তা বিধান করে আসছি আমরা। ফিকে হয়ে এসেছে সেই সমাধির স্মৃতি, হয়তো আমি শেষ ব্যক্তি যার পর হারিয়ে যাবে তা।🔸 ★লেখকের লেখনশৈলী সাবলীল আর তথ্য ডাম্পিং এর দক্ষতা অসম্ভব সুন্দর ছিল। ড্যান ব্রাউন ভক্তদের একটুও বিরক্ত লাগবে না। ফারাও প্রথম সামটিকের দুই শিশুকে নিয়ে ভাষার পরীক্ষায় লেখকের নিজস্ব হাইপোথিসিসটা চমকে দেয়ার মত_🔸যখন শিশু কোন ভাষার মাঝে বেড়ে উঠবে না আশপাশ থেকে কোন ভাষা শেখার সুযোগ থাকবে না তখন সে নিশ্চয় সেই ভাষাতেই কথা বলে উঠবে যে ভাষা সব থেকে প্রাচীন ভাষা।🔸 ★লেখক বিভিন্ন প্রাচীন ভাষাসহ সভ্যতা, সংস্কৃতি, পুরাকীর্তি, ইরাক-ইরান, সিরিয়া, মিশর, গ্রীস, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে প্রচুর ঘাটাঘাটি করেছেন। এসব দেশের ভাষা, ঐতিহাসিক ঘটনা ও জায়গার অনেক বর্ণনা উঠে এসেছে কাহিনির সাথে ধারাবাহিকভাবে_🔸১৯৫৮ সালের এই দিনেই হাসেমাইট রাজবংশকে ক্যুয়ের মাধ্যমে উৎখাত করে জন্ম নেয় ইরাকি রিপাবলিক। এটা স্মরণ রাখতেই টাইগ্রিস নদীর উপর ব্রিজটার নাম রাখা সাসপেনশন ব্রিজ।🔸 ★উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আছে ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতার খেলা। প্রাচীন একটি ভাষা টিকিয়ে রাখা এবং সেই ভাষার গুপ্ত রহস্য নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করার প্রচেষ্টা কালের আবর্তে সবার ভিতর দেখা গেছে। ঘটনার বিস্তৃতির সাথে সাথে আপনার কাছে শত্রু ও মিত্রপক্ষের বিষয়টা প্রেডিক্টেবল মনে হবে। তবে এখানেই চমক দেখিয়েছেন লেখক। দিন শেষে কে যে কার ভাত মারবে সেটা উপন্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত বুঝতে পারবেন না। আপন পর হয়ে আসবে, শত্রু হবে মিত্র_এ যেনো বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। ★এত বিশাল উপন্যাসের চরিত্রায়ণ করা বেশ কঠিন। পুরো উপন্যাসে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক, একজন মার্সেনারি, দুজন তরুণ গবেষক আর কর্পোরেট পরিবারের নিয়ে বিস্তৃত আকারে উপন্যাসের চরিত্রায়ণ করা হয়েছে। উপন্যাসের সব চরিত্রগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড আলাদাভাবে বিল্ডআপ করা হয়নি, ঘটনার সাথে সেগুলা চলে এসেছে। আমার মনে হয়ে এটাই পার্ফেক্ট ছিল সবদিকে থেকে না হলে আরো বড় হয়ে যেত কাহিনি। চরিত্রায়ণে সবচেয়ে সুন্দর বিষয় ছিল এরা মাকড়সার জালের মত একে অন্যের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। বিশাল বড় একটা উপন্যাসে এতগুলো চরিত্র একটার সাথে আরেকটা রিলেট করা বেশ দুঃসাধ্য একটা কাজ। ❌ উপন্যাসের কয়েক জায়গায় রব আর রবার্টের নাম উলোটপালোট হয়েছে, এক জায়গায় হয়েছে রেহান ও স্যামের নাম। পুরো উপন্যাসে তাদের উপস্থিতি থাকায় একটা সময়ে রেহান ও স্যাম চরিত্র দুটি ক্লিশে লাগতে পারে তবে সেটা উপন্যাসের সমাপ্তিতে আপনার ধারনা বদলে দিবে। স্যামের কমব্যাট দক্ষতা আরেকটু কম দেখালে ভাল হতো, তাতে তার মূল উদ্দেশ্য নিয়ে আরো রহস্য থাকতো। রবের চরিত্রায়ন সবচেয়ে ভাল লেগেছে আর কার্লের চরিত্রের বিল্ডআপ সবচেয়ে কম ব��যাপ্তি পেয়েছে। কাহিনির সমাপ্তিতে মেডুসার আর রবের চমক উপহার হিসেবে থাকলো । 🟥 আপনি যদি ড্রাজোসের এই রহস্য উদ্ধারে নামতে চান তাহলে আপনাকে যেতে হবে গ্রেট স্যান্ড সিতে। এর ধার ঘেঁষে সিয়াতে আছে বিখ্যাত টেম্পল অভ আমুন,যার ওরাকলের সাথে দেখা করতে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছিলে অ্যালেক্সান্ডার দ্য গ্রেট। প্রায় ৭২০০০ বর্গ কিলোমিটারের এই মরুদ্যানের কোথাও চির নিদ্রায় শায়িত আছেন ইমহোটেপ। ইমহোটেপ তার সমাধি রক্ষার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন মেম্ফিসের মন্দিরের হাই প্রিস্ট ফেটকে। তিনি বলে গেছেন, 🔸যখন সময় হবে এই অজানা জ্ঞান প্রকাশের; লাল চুলের এক নারী আসবে দেবতাদের খোঁজে, সঙ্গে থাকবে বিশুদ্ধ বংশধারার কেউ।🔸
মানবজাতির সূচনা লগ্ন থেকেই বিকাশ ঘটেছে নানান সভ্যতার। কত সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছে নতুন করে। আবার কালের বিবর্তনে হারিয়ে গিয়েছে জানা অজানা অনেক সভ্যতা। সব সভ্যতার কথা কি আমরা জানি? আমরা জানি, পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সভ্যতাগুলোকে? আজও গবেষণা চলে। মানবজাতির এই পরিবর্তন, পরিবর্ধন নিয়ে রহস্যের খোঁজে গবেষকরা নিজের রাতের ঘুম হারাম করে। তবুও সবটা জানা যায় না। সবটা জানতে হয় না। প্রকৃতি তার আপন নিয়মে নিজের রহস্য আড়াল করে। সেই আড়াল ভেঙে যখন সত্য সবার সামনে উপস্থিত হয়, তখন নেমে আসে ঘোর অমনিশা। এরপর?
দেবতাদের নিয়ে বহু গালগপ্পো প্রচলিত আছে। এখানেও বা বাদ থাকবে কেন? নীল নদের তীর নিয়েও যে অসংখ্য মিথ কিংবা সত্যের বাণী ছড়িয়ে গিয়েছে। হাজার হাজার বছর আগে সেই নদের তীরে একদল মানুষের আগমন ঘটে। এক ভিন্ন ভাষায় কথা বলা সেই মানুষরা যেন অমর। বার্ধক্য, অসুখ কোনো কিছুই তাদের ছুঁতে পারে না। অনেক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী সেসব মানুষেরা আসলেই মানুষ, না দেবতা? তার মুখের ভাষাকে বলা হয় দার্গোস। আর তাদের এই গড়ে ওঠা সভ্যতা? ড্রাজোস...
সেই ড্রাজোস সভ্যতার খোঁজে একদল মানুষ। কেউ সৎ, কেউবা অসৎ! তাদের লক্ষ্য ভিন্ন, উদ্দেশ্য ওকে অপরের বিপরীত। যায় সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় পনেরো বছর আগে। কেমেরডামলারি প্রোজেক্টে কাজ করতে গিয়ে পাওয়া যায় বেশ কিছু শিলালিপি। ভিন্ন এই শিলালিপির রহস্য উদ্ধার করতে প্রফেসর রোনাল্ড সেগুলো পাঠান বেশ কিছু ভাষাবিদের কাছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই প্রোজেক্টেই মা রা যান তিনি। ফলে ধামাচাপা পড়ে যায় রহস্য। সত্যিই কি ধামাচাপা পড়ে? এর গভীরে অনুসন্ধান চালিয়ে যান একদল লোভী মানুষজন। তাদের উদ্দেশ্য কী?
রোনাল্ডের পাঠানো শিলালিপির এক কপি হাতে এসে পৌঁছায় প্রফেসর লিলির। ঠিক পনেরো বছর পর সেই চিঠি দেখে চোখে বিস্ময়। মৃ ত প্রাক্তন প্রেমিকের এই রহস্য উদ্ধার করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সে। তার সাথে যোগ দিয়েছেন সেই কেমেরডামলারি প্রোজেক্টে কাজ করা প্রফেসর জনসন। এবং তাদের দুই ছাত্রছাত্রী রেহান ও স্যাম। রহস্য সমাধানে ঘুরে বেড়াতে হবে দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আরিজোনা থেকে তুরস্ক, সিরিয়া, গ্রিস পেরিয়ে মিশরে এসে থেমেছে ওরা। ওরা জানে না পেছনে ছুটে আসছে শত্রুরা। এক ভয়াবহ সংঘাতের সামনে দাঁড়িয়ে সমাধান হবে রহস্যের?
প্রাচীনকাল থেকে মেডুসা নামের এক গুপ্তসংঘের কথা শোনা যায়। একই সাথে শোনা যায় ইউনিকর্নের নাম। পুরনো দুই গুপ্তসংঘের মাঝে সাপে নেউলে সম্পর্ক। যুদ্ধ চলে। যাতে গোটা পৃথিবী পড়ে যায় হুমকির মুখে। দুই পক্ষই চায় ড্রাজোস খুঁজে বের করতে। কিন্তু কেন? কী আছে এই সভ্যতায়? ক্ষমতাধর এই দুই সংগঠন অনেক গভীরে নিজেদের বীজ পুঁতে রেখেছে। কে যে কোন পক্ষ, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এই লড়াইয়ে আরেক গুপ্তসংঘ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অ্যামেথিস! ওরা আবার ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। যাদের কাজ ড্রাজোস পাহারা দেওয়া। লুকিয়ে রাখা এর সকল রহস্য। ত্রিমুখী এই সংঘর্ষে সফল হবে কে? শিক্ষার খোঁজে যাওয়া একদল অ্যাকাডেমিক-ই বা কী করে ফিরবে প্রাণ বাঁচিয়ে?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
দারুণ একটা বই শেষ করলাম। লেখকের মুন্সিয়ানার তারিফ করতে হয়। পড়তে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল দেশীয় কোনো লেখকের বই নয়, বিদেশি লেখকের কোনো একটি বইয়ের অনুবাদ পড়ছি। শুরু থেকেই লেখক বইয়ের আকর্ষণ ধরে রাখতে পেরেছিলেন। যার রেশ ছিল পুরো বই জুড়ে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। একটি বারের জন্যও গল্পের আকর্ষণ পড়তে দেননি।
মিথ ও ইতিহাসের সুবিশাল সমাবেশ "দ্য লস্ট সিম্বল অব ড্রাজোস"। যেখানে সুমেরিয়ান, মেসোপটেমিয়ান, আসিরিয়ান, আক্কাদিয়ান, আর্মাইক ভাষা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। সেই আলোচনায় উঠে এসেছে পুরনো কিছু সভ্যতা, সংস্কৃতি, পুরাকীর্তি, ইতিহাস। এ জাতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে খুব পড়াশোনার দরকার। লেখক যে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন, তার ছাপ ছিল বইয়ে। তবে কিছু জায়গায় লেখকের পাঠককে তথ্য জানানো ন্যাচারাল মনে হয়নি। মনে হয়েছে জোর করে তথ্য গেলানো হচ্ছে। ঠিক এ কারণে গল্পের গতিতে বারবার হোচট খাচ্ছিলাম। আরেকটু রয়ে সয়ে তথ্যগুলো আলোচনা করলে মনে হয় আরেকটু ভালো হতো।
লেখক পাঠকদের ইরাক, ইরান, সিরিয়া, মিশর, গ্রীস, তুরস্ক, লিবিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ঘুরিয়ে এনেছেন। দারুণ সব বর্ণনার মাধ্যমে সেসব দেশকে প্রানবন্ত করে তুলেছেন। যেন চোখের সামনে সব চিত্র ভেসে উঠছিল। বিভিন্ন পুরাকীর্তি খুঁজতে প্রায় সময় গুহা না সুড়ঙ্গে যেতে হয়েছে উপন্যাসের চরিত্রদের। সেই সুড়ঙ্গ না এর আনুষঙ্গিক চিত্র লেখক ভালোই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।
যেহেতু উপন্যাসটিতে শত্রু, প্রতিপক্ষ, আক্রমন-প্রতি আক্রমন, দৌড়ঝাঁপ, ছুটে চলার উপর লেখক প্রাধান্য দিয়েছেন; সেহেতু গো লাগু লি, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার কলাকৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে বেশ কিছু দৃশ্য কেমন যেন ফুটে ওঠেনি। আরেকটু স্পষ্ট হতে পারত। যদিও শেষাংশের দৃশ্যায়ন আমার যথাযথ মনে হয়েছে। আরেকটি বিষয় দৃষ্টিকটু লেগেছে। লেখক হয়তো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছেন। সেই জ্ঞান তিনি বিতরণ করেছেন পুরো বই জুড়ে। কিছু সিরিয়াস মুহূর্তে অস্ত্রের মডেলের নাম পড়তে মাঝেমাঝে বিরক্ত লাগছিল। সব জায়গায় প্রয়োজন ছিল না বোধহয়।
লেখকের বর্ণনাশৈলী দারুণ লেগেছে। খুবই সাবলীল। কিছুটা বাহুল্য অবশ্য গল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছিল। যদিও দারুণ এক গতিশীল উপন্যাস লেখক উপহার দিয়েছেন। তবে শুরুতে লেখক মিথলজি নিয়ে বর্ণনা করেছেন। এরপর মূল গল্পে প্রবেশ করেছেন। আমার মনে হয়েছে গল্পের মাঝেমাঝে অতীতের কাহিনি দিতে পারলে আরেকটু আকর্ষণীয় হয়ে উঠত। এতে অধ্যায়গুলো এত বিশাল লাগত না।
এছাড়া এর দৌড়ঝাঁপ করেও কেন ড্রাজোস খোঁজা গুরুত্বপূর্ণ, সেই ব্যাখ্যা পেলাম না। লেখক হয়তো পরের বইয়ে সে ব্যাখ্যা দিবেন। কিন্তু আংশিক এই বইয়ে দেওয়া গেলে ভালো লাগত।
▪️চরিত্রায়ন :
বিশাল কলেবরের বই, অসংখ্য চরিত্রের আনাগোনা। লেখকের পরীক্ষা ছিল, কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তুলতে পারেন। এবং তিনি পেরেছেন। মূল চরিত্রগুলো ও তার অতীত দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একই সাথে খল চরিত্র, বিভিন্ন গুপ্তসংঘ তাদের অতীত ভালোই ফুটে উঠেছে। ছাত্রছাত্রীদের সাথে শিক্ষকের সম্পর্ক এখানে মূল আকর্ষণ। একসাথে চলতে চলতে কখনো কখনো দূরের মানুষও কাছের হয়ে ওঠে। এখানে তা-ই দেখানো হয়েছে।
সত্যিই কি কাছের হয়ে ওঠে? যেখানে ষড়যন্ত্র দানা বাঁধছে, যে আপন আর কে শত্রু তা-ই বোঝা দুষ্কর। সব ছাপিয়ে প্রতিটি চরিত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়ে লেখক যেভাবে গল্পের রাশ টেনেছেন, এখানে তারিফ লেখিকার প্রাপ্য।
▪️বানান, সম্পাদনা, অন্যান্য :
বানান ভুল কিছু ছিল। ছাপার ভুলের সংখ্যাও একটু বেশি লেগেছে। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা করেছে নামের অদল বদল। কিছু নাম কাছাকাছি ছিল। যেমন রব-রবার্ট, স্যাম-সামি। এসব ক্ষেত্রে নাম উল্টেপাল্টে গিয়েছিল। আবার কোথাও রেহানের পরিবর্তে শ্যামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিষয়গুলোতে একটু নজির দেওয়া জরুরি।
তাছাড়া ইংরেজি অতি মাত্রায় ইংরেজি শব্দের ব্যবহার ভালোই প্যারা দিয়েছে। বাংলা অক্ষরে ইংরেজি শব্দ পড়তে আমার কখনোই ভালো লাগে না। এখানেও লাগেনি। পারিভাষিক শব্দ আছে, এমন শব্দের ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করলেই বোধহয় ভালো লাগবে।
▪️পরিশেষে, এই গল্পে ইতিহাস আছে। আছে মিথলজির মিশেল। সব ছাপিয়ে ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার লোভ, নিজেকে সবার শীর্ষে দেখতে চাওয়ার বাসনা। যেখানে দু-একটা মানুষের জীবন সংকটে পড়লে ক্ষতি কী?
▪️বই : দ্য লস্ট সিম্বল অব ড্রাজোস ▪️লেখক : ইমতিয়াজ আহমেদ ▪️প্রকাশনী : নয়াউদ্যোগ ▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৫১২ ▪️মুদ্রিত মূল্য : ৭০০ টাকা ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২/৫
❛যুগে যুগে নানা সভ্যতার আবির্ভাব হয়েছে। কেউ রাজত্ব করেছে, কেউ শোষিত হয়েছে। একসময় সব ধুলোয় মিশে গিয়েছে। হারিয়ে গেছে শানশৌকত। ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে সেসব সভ্যতার গৌরবগাঁথা। হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার খোঁজে মানুষ ছুটছে। বিলীন হয়ে যাওয়া হাজার বছরের সেসব ইতিহাসের কথা জানতে প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষাবিদ থেকে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সবাই লেগে আছে। কারো উদ্দেশ্য সৎ, কারো অসৎ। তবে প্রকৃতি কি চায় তার সব রহস্য মানব জাতি বের করে ফেলুক?❜
ইমহোটেপ বুঝতে পেরেছেন তার সময় ফুরিয়ে আসছে। তাই অ্যামিথিসের অমতেই প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস আর ভাষা সম্পর্কে লিখে রেখেছেন তিনি। উপযুক্ত সময় আসলে যেন সেই ইতিহাস মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহার হয়। সে লেখা তুলে দিলেন মন্দিরের হাই প্রিস্ট ফেটের কাছে। প্রাচীন এক সভ্যতা ❛ড্রাজোস❜। যার ভাষা ❛দার্গোস❜। কেবল বিশুদ্ধ রক্তধারার কেউ হলেই এই ভাষা মুখে ফুটে। তবে বেশি মানুষ এই ভাষায় কথা বলুক বা প্রচার হোক, এক দল লোক সেটা চায় না। এজন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত তারা। সময় পেরিয়ে খ্রিস্টের জন্মের কয়েক দশক আগে সিজার আর ক্লিওপেট্রা যখন টলেমির বিরুদ্ধে যু দ্ধে র প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন ❛অ্যামিথিস❜ তার সমর্থন টলেমির দিকেই রাখলেন। কিন্তু তার অবস্থান সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ায় দলেরই একজন নিজের পরিবার এবং জীবনের নিরাপত্তার জন্য রহস্য ফাঁ স করে দিলো সিজারের দলের লোকের কাছে। যে কিনা আবার আরেক সংঘের সদস্য। নানা ঘটনায় সময় পেরিয়ে যায়। এরপর কেমেরডামলারির এক প্রজেক্টে কাজ করছিলেন প্রফেসর রোনাল্ড। তার সহকারী খুঁজে পেলো এমন এক ফলক যা প্রাচীন কোনো সভ্যতার নিদর্শন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যার আবিষ্কার অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। প্রোফেসর রোনাল্ড এই ব্যাপারে সাহায্য চাইলেন তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহকর্মীর। এরপর? হার্ট অ্যা টাকে প্রাণ চলে যায় প্রফেসরের। থেমে যায় নতুন সভ্যতা আবিষ্কারের পথ।
এই ঘটনার পর পনেরো বছর পেরিয়ে গিয়েছে। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর লিলি চৌধুরী হাতে নিয়ে বসে আছেন এক চিঠি। চিঠিটার বয়স পনেরো বছর! মৃ ত্যু র ঠিক আগেরদিন রোনাল্ড তাকে পাঠিয়েছিলেন চিঠিটা। এত বছর পর তার হাতে আসলো তাও কেমনভাবে সেটা কিছুটা খতিয়ে দেখলেন তিনি। তবে বেশি মাথা ঘামালেন না। চিঠির বিষয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সাথে পাঠানো ছবি, ডকুমেন্ট সত্যি হলে সামনে খুলে যাবে এক বিশাল সভ্যতার দুয়ার। সেই কাজেই তিনি সহকর্মী হিসেবে নিলেন প্রফেসর জ্যানসেনকে। জ্যানসেন যোগ করলেন তার প্রিয় ছাত্র রেহানকে। লিলি নিয়োগ দিলেন তার প্রিয় ছাত্রী সামান্থা তথা স্যামকে। শুরু হলো তথ্য দিয়ে নতুন সভ্যতার আবিষ্কারের এক রোমাঞ্চকর যাত্রা।
তবে যাত্রা যে স্মুথ হবে না সেটা বলাই বাহুল্য। কারণ পথে আছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল ❛ইউনিকর্ন❜ আর ❛মেডুসা❜। দুই পক্ষই রহস্যময় সেই সভ্যতার অবস্থান খুঁজে পেতে আগ্রহী। কার আগে কে সফল হবে, সেই নিয়ে হাজার বছর ধরে মা র মা র কাট কাট অবস্থা বজায় রেখে চলেছে। যদিও গত এক শতাব্দী ধরে সাম্যাবস্থা বিরাজ করছে চুক্তির ভিত্তিতে। কিন্তু সুপ্রাচীন সেই সভ্যতার আবিষ্কারের কথা আসলে সাম্যাবস্থা থাকবে না বলাই বাহুল্য। দুই দলই সক্রিয় হয়েছে। চাল, পাল্টা চালের মধ্যে লুকিয়ে চলছে নানা কাজ।
স্যাম, রেহান আর তাদের নিরাপত্তাকারী রব (রব যদিও জুটেছে তুরস্ক থেকে) ইরাক, তুরস্ক, লিবিয়া, গ্রীস, মিশর নানা জায়গা ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করছে। সাথে উপহার হিসেবে প্রতিপক্ষের হা ম লা র সম্মুখীনও হচ্ছে। তবুও জেদ চেপে গেছে। কী এমন আছে এই প্রাচীন সভ্যতায় যার জন্য পক্ষগুলো এমন হন্যে হয়ে লেগেছে? উদ্ধার করতেই হবে এই ইতিহাস। কোথায় আছে প্রাচীন সেই সভ্যতা ড্রাজোসের অবস্থান? দার্গোস ভাষা বলতে পারে এমন কেউ নেই। কী করে উদ্ধার হবে অতীত সেই সভ্যতা? ইমহোটেপের সমাধি সেই আদিকাল থেকেই গোপন আছে। ২০২২ এর ভাষাবিদেরা কি পারবে গোপন সেই সমাধির অবস্থান বের করতে?
স্যাম আর রেহানকে পাঠিয়ে স্বস্তিতে নেই লিলি। নতুন যুগের ছেলেমেয়েদের মাথায় এমনিতেই গরম র ক্ত বহমান। তিনি নিজেও এই বয়সে এমন ছিলেন। তাই রহস্য উদঘাটন আর ছাত্র ছাত্রীর নিরাপত্তায় তিনি উড়াল দিলেন গ্রিসে। দেখা যাক তিনি নিজে কতটা কাজ এগিয়ে নিতে পারেন। তার সন্দেহ রোলান্ডের প্রয়াণ কি আসলেই স্বাভাবিক ছিল? কাকতাল হতে পারে কিন্তু গাট ফিলিংস অনেক কিছু মেলাচ্ছে।
তবে সবকিছু যে স্বাভাবিক হবে না এটা তো জানা কথা। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে স্যাম, রেহান, রব আর লিলি পৌঁছুলেন গ্রিসে। একত্র হতে না হতেই ইউনিকর্ন তুলে নিলো দুই নারীকে। তাদের উদ্ধার করতে আবারো কাঠখড় পোড়াতে হবে। এদিকে যেমন ইউনিকর্ন থেমে নেই ওদিকে তেমন বসে নেই মেডুসাও। নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে। আবার তৃতীয় পক্ষ হিসেবে জুপিটারও তাদের খেল দেখাচ্ছে। এতগুলো পক্ষ, প্রতিপক্ষ আর তৃতীয় পক্ষের ভিড়ে ইতিহাসের রহস্যের অবস্থা কঠিন। সবাই লেগেছে রহস্য উদঘাটন করতে। কে আগে পারবে ইমহোটেপের হারানো সমাধির হদিস বের করতে? তাও তো কাজ শেষ নয়। কী এমন আছে ড্রাজোসে? এক পক্ষ চায় নিজের সুবিধার জন্য সে জ্ঞানকে ব্যবহার করতে, আরেক পক্ষের চাওয়া মানব জাতির ভালোর জন্যেই সে ইতিহাসকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। আবার আরেক তৃতীয় পক্ষ চাইছে সবাইকে বাদ দিয়ে নিজেই পুরোটা খেতে। ইমহোটেপ কি জানতেন ভবিষ্যতের পৃথিবীর মানুষ এমন অদ্ভুত হবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
প্রথম বলেই ছক্কা! হ্যাঁ প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়েছেন লেখক ইমতিয়াজ আহমেদ তার প্রকাশিত বই ❝দ্য লস্ট সিম্বল অব ড্রাজোস❞ এ। মিথলজিকে উপজীব্য করে লেখা বইটিতে লেখক প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ছড়িয়েছেন মুগ্ধতা। খ্রিস্টের জন্মেরও ৩০০০ বছর আগের কথা। সুপ্রাচীন এক সভ্যতা ছিল। তারা নাকি অ ম র ছিল। সমৃদ্ধ এই সভ্যতার ভিত আর ইতিহাস কী ছিল সেটা ইতিহাসের বালুতে চাপা পড়ে গেছে। কিছু একটা রহস্য তো ছিলই। যার জন্য বাঘা বাঘা বনেদি পরিবারেরা তৈরি করলেন সব সংঘ। তার থেকে তৈরি হয়েছিল ❛দ্য কোর্ট❜। সবমিলে এলাহী ব্যাপার। এই সভ্যতার খাল খননেই কোন���ভাবে এসে পড়েন রোনাল্ড। বছর পেরিয়ে লিলি, স্যাম, রেহান, জ্যানসেন ঢুকে পড়েন এই ইতিহাসের গলিতে। তবে এখানে চলে লুকোচুরি খেলা। শিকার শিকারী হচ্ছে তো পরক্ষণেই আবার নতুন লোকের আগমন ঘটছে মঞ্চে। পক্ষ, প্রতিপক্ষ আর নতুনের আগমনে অ্যারিজোনা থেকে ইরাক, তুরস্ক, লিবিয়া, গ্রিস, মিশর সহ নানা দেশ ভ্রমণ হয়ে যাচ্ছে। একসাথে কাজ করেও একে অপরের প্রতি সন্দেহ দূর হচ্ছে না। কার দুর্ভিসন্ধি যে কী! লেখক পূর্বকথা এবং প্রায় চল্লিশটি অধ্যায় মিলিয়ে ৫১০ পৃষ্ঠার সুবিশাল উপন্যাস সাজিয়েছেন। তবে আমার মনে হয়েছে অতীত বর্তমান যদি সমান্তরালে চলতো তবে গল্পের গতি আরো দ্রুত হতো। একবারে শুরুতেই অতীতের কথকতা শেষ করে বর্তমানের দুই অংশ ধাপে ধাপে এনেছেন। এখানে অতীত বর্তমানের মিশেল হলেও মন্দ লাগতো না। লেখক প্রচুর জ্ঞান নিয়ে পড়ে লেখাগুলোকে মলাটবদ্ধ এক উপন্যাসে জায়গা দিয়েছেন। বর্ণনা, ইতিহাসের কথা, বিভিন্ন তথ্য আর বিভিন্ন জায়গার ইতিহাসের কথা পড়ে বোঝা যাচ্ছিলো যথেষ্ঠ শ্রমের ফসল বইটি। বিভিন্ন সভ্যতার সাথে অনেকগুলো প্রাচীন ভাষা এবং এদের ইতিহাস এনেছেন গল্পের সাথে দারুণ নৈপূণ্যতায়। অতিরিক্ত ইতিহাস লেখার গুনে অনেকসময় পড়তে ভালো মন্দ লাগে। এখানেও এত কিছু ছিল যে হজম করতে বেগ পেতে হলেও একঘেঁয়ে লাগেনি। মিথ, ইতিহাস, সভ্যতা সবসময়ই আগ্রহোদ্দীপক বিষয়। সেজন্য এ ধরনের বই পড়ার সময়ের অভিজ্ঞতা আর রোমাঞ্চ অনেক বেশি। বইয়ের শুরুতে সবথেকে প্রাচীন ভাষা আর সভ্যতা নিয়ে লেখক যে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন সেটা আমার অসাধারণ লেগেছে। ❛কোনো শিশুকে একেবারেই ভাষার সংস্পর্শে না রাখলে সে কথা বলবে না নাকি সে তার প্রাচীন বা আদি ভাষায় কথা বলে উঠবে?❜ কেমন ভাবলেই দারুণ লাগে না! উপন্যাসের শুরুর এই অংশটুকু আমার আগ্রহ তৈরি করতে প্রভাবকের মতো কাজ করেছে। এরপর ধীরে ধীরে প্রাচীন ভাষা আর দার্গোস নিয়ে রহস্যের বেড়াজাল এর সমাধান জানতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
শুরুর থেকে শেষ পর্যন্ত লেখক রহস্য ধরে রাখতে পেয়েছিলেন। শেষের দিকে মেডুসা, স্যাম আর রবের টুইস্টটুকু আলাদা ট্রিট হিসেবে মনে হয়েছে। রবকে অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহ হচ্ছিল তবে শেষের দান আসলেই দারুণ। আশা করা যায় আসবে এর নতুন কোনো খন্ড। সেখানে হয়তো লেখক সমাধান করবেন আসলেই কেন ড্রাজোস নিয়ে এত মাতামাতি। সেখানে রব, সামান্থা আর রেহানের ত্রয়ী হবে না টেক্কা হবে দেখার অপেক্ষায়।
চরিত্র:
কাহিনির প্রয়োজনে উপন্যাসে এক বালতি চরিত্রের আগমন ঘটেছে। তাদের প্রত্যেককে লেখক নির্দিষ্ট সময়, জায়গা দিয়েছেন। যার থেকে প্রতিটা চরিত্রই তাদের মেলে ধরেছে। উপন্যাসের চরিত্রের উপস্থিতি বেশি থাকলে দেখা যায় অনেকক্ষেত্রেই তাদের সবার প্রতি সুবিচার হয় না। এখানে লেখক সুবিচার করে তার মুন্সিয়ানা দেখিয়ে দিয়েছেন। নায়ক, ভি লে ন, সাইড চরিত্র সব মিলে সবাইকে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে মানুষ হিসেবে পক্ষের ঊর্ধ্বে নই। আমার নিজস্ব পছন্দের চরিত্র আছে এখানে। লিলিকে আমার দারুণ লেগেছে। লিলির জন্য অনুভূতি বলতে গেলে স্পয়লার হবে। তাই লুকিয়ে রাখলাম। সবথেকে বিরক্তিকর অবশ্যই রবার্ট!
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইয়ের কাহিনি ভালো, সেইসাথে প্রচ্ছদটা আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে। তবে এইটুকুই। ৫১০ পৃষ্ঠার বইতে রূপক হিসেবে বললে ৫১০০ টা সমস্যা। পৃষ্ঠাগুলো পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া প্যাপিরাস স্করোলের মতোই মজবুত! সম্পাদনার ঘাটতি এত কম (!) ছিল যে প্রতি লাইনে লাইনে সে অভাব টের পেতে হয়েছে। বানান ভুল চোখে পড়লেও টাইপো ছিল মা রা ত্ম ক রকমের বেশি। এত দারুণ একটা বই পড়তে গিয়ে যা বিরক্তির উদ্রেক করেছে তার পুরোটাই এই টাইপো মিয়ার অবদান। সাথে বাড়তি উপহার ছিল নামের ভজঘট। রব, রবার্ট, স্যাম, সামি এদের নাম গুলিয়ে ফেলেছিলেন। এই সাথে কোথাও রেহানের মধ্যে স্যামের আত্মা প্রবেশ করে রেহানকে স্যাম বানিয়ে দিচ্ছিলো। এগুলোতে নজর দিলে পাঠকের ত্যক্ত হতে হতো কম।
❛প্রকৃতি নিজের রহস্যগুলো অপার মমতায় নিজের কাছে লুকিয়ে রাখে। মানুষ তার বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ করে অনেকসময় সেই রহস্যের সমাধান করে ফেলে। তবুও অজানা রয়ে যায় অনেক কিছু। ইমহোটেপের সমাধিও এমন কিছু। প্রকৃতি মাতা কি কখনো সে রহস্যের দুয়ার খুলে দিবে?❜
তবে খ ত ম করার আগে ডিয়ার পাঠকবাসী, বইয়ের একটা পিকুলিয়ার লাইন দিয়ে শেষ করি,
"যখন শিশু কোনো ভাষার মাঝে বেড়ে উঠবে না,আশপাশ থেকে কোনো ভাষার শেখার সুযোগ থাকবে না তখন সে নিশ্চয় সেই ভাষাতেই কথা বলে উঠবে যে ভাষা সব থেকে প্রাচীন ভাষা"
প্রায় তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বের আগের কথা, তখন মিশরকে প্রথম একত্রিত করেন ফাস্ট ডাইনেস্টির প্রথম রাজা মেনেস। ব্রিটিশ ইজিপ্টোলজিস্ট ফিন্ডারস ১৮৮০ সালে খুঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে সেই সময়ের কিছু জিনিস আবিষ্কার করেন। তার গবেষণায় দেখা যায় এগুলো মিশরীয় সভ্যতার মতো নয় বরং আরও পুরোনো। সভ্যতাটি প্রাগৈতিহাসিক ভিন্ন কোন সভ্যতার চিহ্ন বহন করছে, যারা অসভ্য মিশরীয়দের থেকে এগিয়ে ছিল সবকিছুতে। এরাই নীলের বুকে সভ্যতার রচিয়তা, তাদের শেখানো পথেই পরবর্তীকালে মিশরীয়রা উৎকর্ষতা পায় এবং পিরামিড বানায়। এই সভ্যতার মানুষগুলোর আগমন হয়েছিল মিশরের পূর্বদিক থেকে যে এলাকার নাম একসময় ছিল মেসোপটেমিয়া। বিভিন্ন গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী এই সত্যতা মিলে যায় আর তারা এটাকে বলতো ইনভেশন থিওরি। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালে জার্মান বোটানিস্ট উইম্কলার মিশরের পূর্বদিকের মরুভূমিতে নীলনদের অববাহিকা ও লোহিত সাগরের মাঝে পাথরের খোদাই করা অনেক চিত্রকর্ম খুঁজে পান।চিত্রকর্মে দেখা যায় প্রাচীন মেসোপোটেমিয়াবাসী জলপথে চলাচল করতো এবং এর সাথে ইনভেশন থিওরি মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।পূর্বদিক থেকে আসা এই রহস্যময় মানুষগুলোই ছিল সেই প্রাচীন সভ্যতার,যারা কথা বলতো দার্গোস ভাষায়।
লেখক ইমতিয়াজ আজাদ ড্রাজোস জাতির ইতিহাস নিয়ে দারুণ একটি হিস্টোরিক্যাল এডভেঞ্চার থ্রিলার রচনা করেছেন।
মিথলজিক্যাল, কন্সপিরেসি থ্রিলারে দেখা যায় উপন্যাসে ছোট অতীত টেনে বাকি লেখাটা বর্তমানে রহস্য খুঁজতে চলে এসেছে। লস্ট সিম্বল অফ ড্রাজোসের এখানেই ভিন্নতা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রাচীন নিদর্শন আর এডভেঞ্চারে ভরপূর্ণ ছিল। লেখক একটি গল্প বলার চেয়ে অনেকগুলা ঘটনা ও তার সাথে ড্রাজোসের রহস্যের শেকড় টেনে হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসকে পুরো উপন্যাস জুড়ে মাকড়শার জালের মতো বিছিয়েছেন।
কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে অনেক জাতি, তাদের সংস্কৃতি। আজকের এই পৃথিবীতে হয়তো ভবিষ্যত চিন্তা আর আধুনিকায়নে আমরা অতীত ভুলে গেছি, কিন্তু সবকিছুর তো শুরু আছে। আজকের এতো গতিময় পরিবেশ তখন ছিলো না। একটা সভ্যতায় বাস করা আর তার সৃষ্টি হতে দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। হয়তো কিছু রহস্যের ব্যাপ্তি ধারণার চেয়েও বিশাল। মিশর নিয়ে কম গল্প রচিত হয়নি। ফারাও, পিরামিড, দেবতা, মন্দির প্রত্যেকটা জিনিস তখন আলাদা মর্যাদা বয়ে বেড়াত যা আজকে সবই কিংবদন্তি। তেমনই এক কালের ড্রাজোস জাতি যারা নীল নদের পাড়ে এসে বসবাস শুরু করেছিল, তাদের ভাষা দার্গোসের রহস্য এখনো এত বছর পরেও এই আধুনিক সমাজে অপ্রকাশিত। দার্গোস এর উত্থান, পতনের ইতিহাস নিয়ে লেখক দুর্দান্ত একটা থ্রিলার লিখেছেন। যেখানে প্রাচীন সংগঠনের অস্তিত্ব, ক্ষমতা নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে।
⭕ পুরো বই জুড়েই মিথ, ইতিহাস, মিশরীয়দের অতীত, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গার অসম্ভব
সুন্দর বর্ণনা ছিল। সুমেরীয় ইতিহাস থেকে সিরিয়া, মেসোপোটেমিয়ার প্রাচীন ইতিহাসে ঠাসা এই বই পড়তে গিয়ে লেখকের জ্ঞানের প্রশংসা করতেই হয়। লেখক ইতিহাস আর ঐতিহাসিক স্থানের উপর প্রচুর রিসার্চ করেছেন এবং গল্পের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তথ্যগুলো খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন । রেহান আর স্যাম ড্রাজোসের রহস্য উদ্ধারে যত কাছে যায় লেখক এক একটা প্রাচীন ইতিহাস তাদের সামনে উন্মোচন করে। এ ব্যাপারগুলো যেমন উপভোগ করেছি সেই সাথে বিভিন্ন জায়গার ইতিহাসের কিছু অংশ জানার সুযোগ হয়েছে।
⭕ উপন্যাসের আরেকটা অংশ ছিল পৃথিবীর বুকে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন সংগঠনের দাপট আর তাদের ক্রাইম ওয়ার্ল্ডের লড়াই। ড্রাজোসের অবস্থান খুঁজে তাদের ভাষা দার্গোস এর পাঠোদ্ধারের নেশায় মেতে ইউনিকর্ন আর মেডুসার লড়াই অনেকটা এক মাছ নিয়ে দুই
বিড়ালের লড়াইয়ের মতো। আর্কিও��জিস্টরা পুরাকীর্তি উদ্ধারে কতোটা সংবেদনশীল, তারা তাদের কাজ সফল হতে যেকোনো কিছু করতে পারে, যেকোনো জায়গা যেতে পারে সেটা অনুভব করতে পারবেন। ক্ষমতার আসনে বসতে বিশ্বাসঘাতকতা, যুদ্ধ করতেও পিছপা হয় না। বিশেষ করে রবার্ট চরিত্রটা পুরো গল্প জুড়ে দাবা খেলার মতো খেলেছে। তুরুস্ক, জর্ডানের সিকিউরিটি কার্যকলাপের চিত্রও খানিকটা বিদ্যমান।
⭕ গল্পে কম এডভেঞ্চার ছিলো না। তুরস্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্যাম, রেহান, রবের সাথে ঘুড়ে বেড়িয়েছি। তাদের পদে পদে শক্তিশালী ক্ষমতার বাঁধা। প্রত্যেকটা বিখ্যাত স্থানে অভিযান চালানো অনেকটা ছোটবেলায় পড়া যকের ধন, ট্রেজার হান্টার গল্পের ফিল দেয় আর সাথে অ্যাকশন তো রয়েছেই। লেখক পুরো গল্পে মেজর টুইস্ট না দিলেও শেষে গিয়ে চমকপ্রদ কিছু টুইস্ট দিয়েছে। মেডুসা,স্যাম,রব এদের চিত্রটা শেষের দিকে গিয়ে পুরো পাল্টে গেছে। সিরিজের পরবর্তী বই যে বোমব্লাস্টিং হতে চলছে সেটার ইঙ্গিত।
লেখকের গল্প বুনন নিয়ে কোন অভিযোগ নেই। বলতে গেলে অবাক হয়েছি লেখকের প্লট, ঘটনার প্রক্রিয়া সাজানো দেখে। আমাদের দেশেও যে অন্য দেশের মতো এতো বড় কলেবরের দুর্দান্ত কন্সপিরেসি থ্রিলার লেখা যায় সেটা হয়তো এই বই না পড়লে জানতাম না। সাধারণত এরকম হিস্টোরিক্যাল বইয়ে অনেক বেশি তথ্য থাকে আর কোথাও গিয়ে যেন গল্প ঝুলে যায়। কিন্তু এই বিশাল বইয়ে তথ্যগুলো এতো ইন্টারেস্টিং আর লেখক যেভাবে উপস্থাপন করেছে সেখানে বোরড হওয়া চান্স কম।তবে কিছু জায়গায় তথ্য ডাম্পিং এর সাথে মূল প্লটের কোন মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু লেখক হয়তো গুছিয়ে সবকিছুর একটা ইতিহাস চিত্র ফুটিয়ে তুলার জন্য অনেক বেশি তথ্য দিয়েছে। এক্ষেত্রে ধৈর্য্য ধরে শেষ পর্যন্ত পড়তে পারলে একটা অজানা রহস্য উদ্ধারের দারপ্রান্তে পাঠক দাড়িয়ে থাকবে নিশ্চিত।
চরিত্রায়ন:
বইটা যেহেতু বড় আর প্লটও বিশাল তাই গল্পের প্রয়োজনে অনেকগুলো চরিত্র এসেছে। রেহান, স্যাম, রব এই তিনজন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপ এন্ড ডাউনে ছিলো। প্রফেসর লিলি চৌধুরী অভিজ্ঞ একজন আর্কিওলজিস্ট আর
রেহান, স্যাম তরুণ আর্কিওলজিস্ট যারা এই দার্গোস রহস্য উদ্ধারে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দৌড়ে বেড়ায়। বিশেষ করে স্যাম চরিত্রটা ভাইটাল রোল প্লে করেছে সেটা গল্পকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করেছ। রব চরিত্রটা সিকিউরিটি কনসালটেন্টের অভিনয় করলেও শেষে গিয়ে তার কার্যকলাপ পাঠককে চমকে দিবে। মেডুসা চরিত্রটা লেখক ক্ষমতাবান, রহস্যময় হিসেবে রেখেছে। রবার্টকে মেইন ভিলেন ভাবতে পারেন,তবে শেষে গিয়েও লেখক আরও বড়কিছুর অংশ রেখেছে। এছাড়া প্রায় সবগুলো চরিত্রই গল্পে জমজমাট ভূমিকা রেখেছে।
✔️বইয়ের অনেকগুলো চরিত্র হওয়াই কয়েকবার চরিত্রগুলো গুলিয়ে ফেলছিলাম আর অতীতের নামগুলো একটু কঠিনই লাগল 🥲,যদিও এটা স্বাভাবিক। তবে লেখক কয়েকটা চরিত্রের নাম বেশ কাছাকাছি রেখেছে। যেমন রব-রবার্ট, স্যাম-সামি। যার কারণে অনেক জায়গায় রব এর বদলে রবার্ট, সামির জায়গায় স্যাম, আবার রেহানের জায়গায় স্যাম হয়ে গেছে। এই জায়গাগুলোতে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। কয়েকটা নাম আরেকটু ভিন্ন করলে সমস্যাগুলো হতো না।… নাকি ইচ্ছে করে আমাদের মাথা নষ্ট করার কন্সপিরেসি করছেন লেখক? রহস্যই বটে!!
প্রাচীন এক সভ্যতা! প্রাচীন এক দূর্লভ ভাষা! নিজ শিকড়ের ভাষা! কিন্তু সবার আড়ালেই এই আদি ভাষার প্রচলন রয়ে গেলো! শুরু হলো প্রজন্মের পর প্রজন্মের নিজের শিকড়ের ভাষা রক্ষার এক আজন্ম লড়াই। সমাধিস্থ হলো এক মহা ইতিহাস। সহস্রবছর পর শুরু হলো সেই ভাষার উদঘাটন, জড়িয়ে গেলো বর্তমান সময়ের বেশ কিছু প্রত্নতত্ত্ববিদ। শুরু হলো ক্ষমতার মিশ্রণে এক রক্তারক্তি কান্ড। মিথ ও মিস্ট্রি থ্রিলারের সমন্বয়ে “দ্য লস্ট সিম্বল অব ড্রাজোস”এর ৫০০+ পেজের ফিকশন ধর্মী বইতে লেখক তুলে এনেছেন প্রায় ৩০০০ খ্রিষ্টাব্দপূর্ব হতে বর্তমান অবধি। পুরো উপন্যাস জুড়েই মিথ, ইতিহাস, মিশরীয়দের অতীত, ক্ষমতার লড়াই ও বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জায়গার বর্ণনা তুলে ধরেছেন। মৌলিক ধর্মী উপন্যাস এতো বড় কলেবরের হলে ও পড়ার সময় খেয়াল থাকবেনা কখন শেষ হলো। বেশকিছুজায়গায় টাইপিং মিস্টেক ছিলো। তবে সবকিছু মিলে উপভোগ্য এক উপন্যাস।
মিশর নিয়ে বাংলাদেশে ৫১০ পেজের কোন মৌলিক বই আমার পড়া হয় নাই আগে। বেশ ভালো ঝরঝরে লেখা। কিন্তু বিরক্ত লেগেছে প্রকাশকের উপরে। আমার মনে হয়ছে বইটা ০ ড্রাফট যেটা লেখক জমা দিয়েছেন সেটাই উনারা ছাপায় দিয়েছেন। ভুল চোখে পড়েছে অনেক পড়তে গিয়ে খুব বিরক্ত লেগেছে, এমন কি নামও উল্টা পাল্টা হয়েছে অনেক স্থানে।