‘দেশ ছাড়ার দীর্ঘদিন বাদে ১৯৮৬-এর শরতের এক কাকভোরে যখন সীমান্ত পেরিয়ে বেনাপোলে ঢুকব, তখন নো ম্যানস্ ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল...., সেটা যেন বিরাট হাঁমুখ ফাটল, যেখানে আমার দেশ নামক বোধটা চিরকালের মতো তলিয়ে গেছে তার দুপাশের দুটো অথবা পরবর্তীকালে তিনটে নির্বোধ, হৃদয়হীন, চৈতন্যহীন রাষ্ট্রকে দেখে। তার কোনোটিতেই দেশজাত আমার কোনো অস্তিত্ব বা অস্মিতার চিহ্নমাত্র নেই।... কেউ যেন আর কোনোদিন জানতে চাইবে না, তোমার দেশ কোথায়? ভদ্রাসন কোথায় ছিল তোমার? আমাকেও কষ্ট করে উত্তর হাতড়াতে হবে না, কারণ এতদিনে জেনেছি, দেশ বলে সত্যিই তো কিছু আর নেই।’
Mihir Sengupta is an Indian writer of Bengali origin, best known for his 2005 autobiography Bishaad Brikkho (Tree of Sorrow). It describes the 1947 partition as seen by the author, who was uprooted from his native Barisal in present-day Bangladesh and ended up in Calcutta as a refugee. Bishaad Brikkho is regarded as an important literary document of the 1947 partition and won the Ananda Puroshkar literary prize. His current residence is in the West Bengal state of India.
শিরোনাম ও ফ্ল্যাপের লেখা ধারণা দিয়েছিল স্মৃতিকথাটির বেশিরভাগ জুড়ে থাকবে দেশভাগ। দেশভাগের কথা আছে বটে। তবে সবচেয়ে বেশি আছে মিহির সেনগুপ্তের পরিবার, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধব, তাদের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক এবং একসঙ্গে কাটানো সুখ-দুঃখের কথা। উদ্বাস্তু হয়ে এপার থেকে ওপারে গিয়ে কয়েক বছর যাযাবরের মতো কাটিয়ে কষ্টেসৃষ্টে মাথার ওপর একটি ছাদ নির্মাণ, ফেলে আসা বরিশালের কেওড়া গ্রামের সেই বড় বাড়ির মতো করে নতুন বাড়িটাকে রূপ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘদিন পরে পুনরায় যৌথ পরিবারের আনন্দঘন বাতাবরণে ফেরা (মিহিরের বড় তিন ভাই পঞ্চাশের দাঙ্গার সময় কলকাতায় পাড়ি জমান, মিহির তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ১৯৬৩ সালে, মা-বাবা ও বাদবাকি পাঁচ ভাইবোন দেশ ছাড়েন আরও পরে) এবং একদিন স্বাভাবিক নিয়মে সেই যৌথতায় ভাঙন ধরার স্মৃতিচারণ হলো ‘এপার বড়ো মাঘমাস ওপার বড়ো কুয়া’। ফাঁকফোকরে উত্থাপিত হয়েছে নানান বিষয়। কিছুটা খাপছাড়া ভাব আছে। আমার মনে হয়, এ ধরনের লেখাগুলো কিঞ্চিৎ এলোমেলো হলেই মানায় বেশি।
মিহির সেনগুপ্তের সবচেয়ে নামকরা বই ‘বিষাদবৃক্ষ’ এখনো পড়িনি। বইটার কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনা হতে দেখেছি। যেমন, দেশভাগ তথা বাংলা বিভক্তি ও সাম্প্রদায়িকতার দায় নাকি শুধু এক পক্ষের বলে আভাস দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এ বইয়ে দেশভাগের প্রসঙ্গ বারবার ঘুরেফিরে এলেও কোথাও এমন কিছুর ইশারা-ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বইটার আরও দুটি ইতিবাচক দিক হলো, এতে আছে ব্যাপকভাবে আত্মসমালোচনা। এবং নেই কোনো হামবড়া ভাবসাব।
আমার অতি প্রিয় লেখক অভিজিৎ সেন যে মিহির সেনগুপ্তের অগ্রজ সহোদর, তা জেনেছি ৫৫ পৃষ্ঠায় এসে। শুরু থেকে মিহির নাম প্রকাশ না করে সেজদা সম্বোধনে অভিজিৎ সেনের কথা লিখে আসছিলেন। এক জায়গায় উল্লেখও করেছিলেন তাঁর সেজদা লেখালেখি করেন। ব্যক্তি অভিজিৎ সেন সম্পর্কে জানতাম না কিছুই। খানিকটা জানা গেল এই বইটা থেকে।
বইয়ের সর্বত্রই বিরাজমান ছিল বিদায়বেলার মিহি এক করুণ সুর। কারণ স্পষ্ট। মিহির সেনগুপ্তের নিজ হাতে লেখা শেষ পাণ্ডুলিপি এটা। পাণ্ডুলিপির পয়লা পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘‘এই বইটা কি লেখা শেষ করতে পারব। সময় যে জানান দিচ্ছে।’’
স্মৃতিকথা বা আত্মজৈবনিক ধারার লেখাজোখা যারা পছন্দ করেন, তাদের ‘এপার বড়ো মাঘমাস ওপার বড়ো কুয়া’ ভালো লাগবে বলে মনে করছি।
বেশি বয়সে আত্মজীবনী লেখার ঝামেলা হচ্ছে এতে ধারাবাহিকতা কম থাকে। দেশভাগের অনেক পর লেখকের পরিবারের সদস্যরা পালাক্রমে দেশত্যাগ করে। পশ্চিমবঙ্গে পুরো পরিবারের সংগ্রাম ও দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধের গল্প পড়তে ভালো লাগে। কিন্তু সেনগুপ্ত হুট করে বর্তমানে এসে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বিশাল একটা বিশ্লেষণধর্মী অধ্যায় লিখে ফেলেন যা বইয়ের মূলভাবের সঙ্গে খাপ খায় না। সবটা মিলিয়ে, পাঠ-অভিজ্ঞতা মিশ্র।
্মৃতিকথামূলক এই বইতে লেখক তুলে ধরেছেন দেশভাগের কথা , বাসস্থান সমস্যার কথা প্রকট। দেশভাগের পর লেখক যাযাবরের মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে অনেক কষ্টে বাড়ি বানান তাঁর ফেলে আসা বাংলাদেশের বাড়ির মতো । তিনি কলকাতায় আসার অনেক পরে তাঁর পরিবারের বাকি সদস্যরা দেশ ছেড়ে কলকাতায় আসেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো তুলে ধরেছেন, আবার সেই ভাইবোনের মধ্যে ঝামেলা -ভাঙনের গল্প তুলে ধরেছেন। একরাশ অভিযোগ - অভিমান জিইয়ে রেখেছেন তা লেখকের অনেক পরিচ্ছেদে ফুটে উঠেছে। তাঁর লেখা শেষ বই এটি "এই বইটা কি লেখা শেষ করতে পারব , সময় যে জানান দিচ্ছে।" পাঠ প্রতিক্রিয়া:- প্রচলিত কথা "ঘর থেকে ঘোর " মাথায় ঘুরছে। ঘর বানানোর সমস্যাই যেন প্রকট । মূলত দেশভাগের লেখা পড়বো বলে নিয়েছিলাম কিন্তু পরিবারের গল্প শুনলাম বেশি । সেই সময়ের গল্প শুনতে শুনতে এক পরিচ্ছেদে করোনা মহামারি নিয়ে লেখা অদ্ভুত এবং খাপছাড়া। এক পরিচ্ছেদের সাথে আর এক পরিচ্ছেদের সম্পর্কেও টালমাটাল। যদিও লেখকের সবথেকে চর্চিত বই 'বিষাদবৃক্ষ' পড়ে লেখকের লেখা আর একবার বুঝে দেখবো ।