শিরোনাম ও ফ্ল্যাপের লেখা ধারণা দিয়েছিল স্মৃতিকথাটির বেশিরভাগ জুড়ে থাকবে দেশভাগ। দেশভাগের কথা আছে বটে। তবে সবচেয়ে বেশি আছে মিহির সেনগুপ্তের পরিবার, পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধব, তাদের সঙ্গে লেখকের সম্পর্ক এবং একসঙ্গে কাটানো সুখ-দুঃখের কথা। উদ্বাস্তু হয়ে এপার থেকে ওপারে গিয়ে কয়েক বছর যাযাবরের মতো কাটিয়ে কষ্টেসৃষ্টে মাথার ওপর একটি ছাদ নির্মাণ, ফেলে আসা বরিশালের কেওড়া গ্রামের সেই বড় বাড়ির মতো করে নতুন বাড়িটাকে রূপ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘদিন পরে পুনরায় যৌথ পরিবারের আনন্দঘন বাতাবরণে ফেরা (মিহিরের বড় তিন ভাই পঞ্চাশের দাঙ্গার সময় কলকাতায় পাড়ি জমান, মিহির তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ১৯৬৩ সালে, মা-বাবা ও বাদবাকি পাঁচ ভাইবোন দেশ ছাড়েন আরও পরে) এবং একদিন স্বাভাবিক নিয়মে সেই যৌথতায় ভাঙন ধরার স্মৃতিচারণ হলো ‘এপার বড়ো মাঘমাস ওপার বড়ো কুয়া’। ফাঁকফোকরে উত্থাপিত হয়েছে নানান বিষয়। কিছুটা খাপছাড়া ভাব আছে। আমার মনে হয়, এ ধরনের লেখাগুলো কিঞ্চিৎ এলোমেলো হলেই মানায় বেশি।
মিহির সেনগুপ্তের সবচেয়ে নামকরা বই ‘বিষাদবৃক্ষ’ এখনো পড়িনি। বইটার কিছু বিষয় নিয়ে সমালোচনা হতে দেখেছি। যেমন, দেশভাগ তথা বাংলা বিভক্তি ও সাম্প্রদায়িকতার দায় নাকি শুধু এক পক্ষের বলে আভাস দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এ বইয়ে দেশভাগের প্রসঙ্গ বারবার ঘুরেফিরে এলেও কোথাও এমন কিছুর ইশারা-ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বইটার আরও দুটি ইতিবাচক দিক হলো, এতে আছে ব্যাপকভাবে আত্মসমালোচনা। এবং নেই কোনো হামবড়া ভাবসাব।
আমার অতি প্রিয় লেখক অভিজিৎ সেন যে মিহির সেনগুপ্তের অগ্রজ সহোদর, তা জেনেছি ৫৫ পৃষ্ঠায় এসে। শুরু থেকে মিহির নাম প্রকাশ না করে সেজদা সম্বোধনে অভিজিৎ সেনের কথা লিখে আসছিলেন। এক জায়গায় উল্লেখও করেছিলেন তাঁর সেজদা লেখালেখি করেন। ব্যক্তি অভিজিৎ সেন সম্পর্কে জানতাম না কিছুই। খানিকটা জানা গেল এই বইটা থেকে।
বইয়ের সর্বত্রই বিরাজমান ছিল বিদায়বেলার মিহি এক করুণ সুর। কারণ স্পষ্ট। মিহির সেনগুপ্তের নিজ হাতে লেখা শেষ পাণ্ডুলিপি এটা। পাণ্ডুলিপির পয়লা পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, ‘‘এই বইটা কি লেখা শেষ করতে পারব। সময় যে জানান দিচ্ছে।’’
স্মৃতিকথা বা আত্মজৈবনিক ধারার লেখাজোখা যারা পছন্দ করেন, তাদের ‘এপার বড়ো মাঘমাস ওপার বড়ো কুয়া’ ভালো লাগবে বলে মনে করছি।