অশীতিপর নিত্যময়ী একদিন তাঁর বাগানে দেখা পেলেন ঊর্ধ্বতন ষষ্ঠ পুরুষ সামন্তমশাইয়ের। তিনি একটি শেয়ালের রূপ নিয়ে বারে বারে ফিরে আসেন। নিত্যময়ী অনুভব করেন, তাঁকে পাহারা দেন ছায়ার মধ্যে ছায়া হয়ে বাস করা পিতৃপক্ষ। তবু হনুমানের উপদ্রব তাঁর বাগানে, তবু জাগতিক মৌচাকে সিক্ত তাঁর হৃদয়, নিত্যময়ী জানেন-- মায়া থেকে যায়। কাল আবর্তিত হয়, যা ঘটেছে ও যা ঘটবে, অন্তরীক্ষের সম্ভাবনা নিয়ে আবির্ভূত হয় তাঁর সামনে। এই উপন্যাস একটি আঞ্চলিকতার আখ্যান রচনা করে। সেই ভৌতিক লোকালয়ের অযুত রহস্যকে পেটের ভেতর লুকিয়ে স্তব্ধ অপেক্ষা করে অলৌকিক বাগান, আগমনীর প্রত্যাশায়।
আরেকবার শাক্যজিতের গদ্যশৈলীতে বিমোহিত হলাম। প্রায় নিস্তেজনাপূর্ণ, মোচড়বিহীন গল্পে শুধুমাত্র ভাষার জোরে তীব্র, সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন এক উপসংহার পাওয়া গেলো শেষ হওয়ার পরও যার অদ্ভুত অস্বস্তিকর আবেশ রয়ে যায় পাঠকের মনে।
লেখকের নতুন বই "নৈশ অপেরা" বর্তমানে আলোচনায় আছে, থাকাটাই স্বাভাবিক। নতুনের ভীড়ে একটু পুরনো জিনিস পড়লাম এবং শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের চমৎকার গদ্যে আরো একবার চমৎকৃত হলাম।
উপন্যাসটি একটি বাগানকে ঘিরে আবর্তিত। এই বাগান দক্ষিণ কলকাতার মধ্যে হলেও, তার অলৌকিকতা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। নিত্যময়ী এই গল্পের প্রধান চরিত্র তার চোখ দিয়েই অনেকখানি গল্প বলা আছে। তিনি অবিবাহিত কারণ তাঁর হার্টে ছিদ্র থাকার দরুন তার বাবা কোনো সুযোগ্য পাত্র খুঁজে দিয়ে যেতে পারেননি। নিত্যময়ীর বাগানটি পিতৃপ্রদত্ত, এই বাগানকে ঘিরেই তার জগৎ সংসার। তার অতীত, বর্তমান সবকিছুই এই বাগানকে ঘিরে। বাগানের মধ্যে শুধু গাছপালা বা শাক- সবজি আছে এরম নয়, সেখানে গোঁয়ারগেল, ব্যাঙ, শিয়াল, সাপ, হনুমানের ও বসবাস আছে। এমনকী নিত্যময়ী দেবী তার উর্দ্ধতন পূর্বপুরুষদের দেখা পান, মনে করেন তার পূর্বপুরুষেরা সবসময় তাকে পাহারা দিয়ে চলেছেন, তিনি রান্না করে বাগানে রেখেও আসেন তাদের জন্য।
তারপরে আছে শ্মশানে কালীমন্দিরের এক পুরোহিত, গনেশ; যার নিত্যময়ীর সম্পত্তির উপর লোভ আছে, কিন্তু কোথাও গিয়ে সে বারবার আটকে যায়। নিত্যময়ীর জীবন কখনই পুর্নতা পায়না, সে তার ভাড়াটে দম্পতি 'শিখা-ইন্দ্র' এর দাম্পত্য জীবন দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন, লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের মিলন দেখে নিজের অভাবকে চাপা দিয়ে রাখেন। তারপর একদিন নিত্যময়ী গনেশের সাথে যান বাবুঘাট গিয়ে পিতৃপুরুষের তর্পন করার জন্য। গনেশ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তার সম্পত্তি লোভের মতলব ভাঁজে কিন্ত এবারও সফল হয়না। উল্টে নিত্যময়ী তাকে এবং সূর্যকে সাক্ষী রেখে, মরার আগেই নিজের তর্পন নিজে দেবার আর্জী করে বসেন। গনেশ বোঝে মায়া, ভালোবাসা কষ্ট দেয় ঠিকই কিন্তু মনকে সবসময় শুদ্ধও রাখে। এরপর নিত্যময়ী তার সেই মায়ার বাগানের মায়া কাটিয়ে অন্য জগতে পাড়ি দেন।
উপন্যাসটি অন্যধরনের, সবার পছন্দ হবে না। তারা একটু ফাস্ট পেসে পড়তে ভালোবাসেন, এটি তাদের জন্য নয় বা যারা ইনটেন্স লেখা পছন্দ করেন তাদেরও ভালো লাগবে না। অনেক ধৈর্য নিয়ে এই গল্প পড়তে হবে, প্রথমের দিকে একঘেয়েমি লাগবে। যারা অনেকটা সময় নিয়ে বর্ণনামূলক লেখা পড়তে ভালোবাসেন, তাদের ভালো লাগবে। হ্যাঁ, একটা বাগানকে ঘিরে অনুভূতিগুলো সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, সেই জায়গাগুলো ও খুব সুন্দর। খুব আলাদা কিছু আমার লাগেনি, অন্যধরনের লেখা নয়। লেখকের দুটি বই পড়েছি, সত্তরের দশক এবং নকশাল আন্দোলনের কথা দুটি বইতেই ঘুরে ফিরে এসেছে, এই সত্তরের দশকের ঘটনার প্রভাব ভালোমতই লেখকের মনে লক্ষ্য করা যায়।
গল্প নয়, শুধুমাত্র ভাষার সৌন্দর্য্যের জন্যেই উপন্যাসটা পড়া উচিৎ। শাক্যজিতের লেখনী যে কত শক্তিশালী, সেটা তিনি এই উপন্যাসের পরতে-পরতে বুঝিয়ে দিয়েছেন।