মুসলিম দাম্পত্য, যৌন-সংস্কার, তার প্রেম-অপ্রেমের দ্বন্দ্ব ও গতিশীলতার সমস্যা নিয়ে দীর্ঘকাল যাবৎ ভাবিত শক্তিমান লেখক আবুল বাশার। বৈচিত্র্যময় এই সমস্যাকে নানা দিক থেকে আলো ফেলে দেখবার চেষ্টা করে চলেছেন তিনি তাঁর একাধিক ছোট-বড় গল্পে। এই প্রয়াসেরই পূর্ণায়ত রূপ 'ফুলবউ'। এজিন-তালাক-বহুবিবাহ'- ভরা মুসলমান জীবনকে আধুনিক ও আধুনিকতার মূল্যবোধের প্রেক্ষিতে বিচারের সাহসী, স্মরনীয় ও তাৎপর্যময় এক কীর্তি। স্মরণ করা যেতে পারে যে, শারদীয় 'দেশ' পত্রিকায় প্রকাশমাত্রই এই উপন্যাস ঘটিয়েছিল বিস্ফোরণ।
আবুল বাশারের জন্ম ১৯৫১ খ্রীস্টাব্দে। ছয় বছর বয়সে সপরিবার গ্রাম তাগ। মুর্শিদাবাদের লালবাগ মহকুমার টেকা গ্রামে বসবাস শুরু। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যের স্নাতক। হিন্দিভাষা-সাহিত্যেরও ডিপ্লোমা। গ্রামের স্কুলে ১০-১২ বছর চাকুরি। কাজ করেছেন সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায়। দারিদ্র্যের চাপ আর সামাজিক বিষমতা ও পীড়ন কৈশোরেই লেখালেখিতে প্ররোচিত। উত্তীর্ণকৈশোরে, ১৯৭১ সালে, প্রথমে কবিতাগ্রন্থের প্রকাশ। নাম : ‘জড় উপড়ানো ডালাপা ভাঙা আর এক ঋতু’। পরবর্তী এক দশক লেখালেখি বন্ধ। জড়িয়ে পড়েন সক্রিয় রাজনীতিতে। বহরমপুরের ‘রৌরব’ পত্রিকাগোষ্ঠীর প্রেরণায় লেখালেখিতে প্রত্যাবর্তন। কবিতা ছেড়ে এবার গল্পে। প্রথম মুদ্রিত গল্প ‘মাটি ছেড়ে যায়’। ‘ফুলবউ’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন ১৩৯৪ সালের আনন্দ-পুরস্কার।
এই সময়টা, যখন মুসলিম পুরুষরা একের অধিক বিয়ে করতো, আমরা প্রায় পার করে এসেছি। "প্রায়" ব্যবহার করলাম, কারণ পরিচিত এক ছেলে দুই বিয়ে করেছে। এমনিতে প্রচুর আজেবাজে অনৈসলামিক কাজ করে, শুধু বিয়ের বেলায়, "ধর্মে আছে।" যেন ধর্ম রক্ষার জন্যেই সে কাজটি করেছে। ফুলবউ'তেও এমন চরিত্র পাওয়া যায়। বই নিয়ে আমার প্রাথমিক অভিযোগ হচ্ছে - এতো জলদি মানুষ প্রেমে পড়ে কীভাবে? প্রেম এতো সহজ? এটুকু বাদ দিলে বলা যায়, "ফুলবউ" অত্যন্ত দুঃসাহসী সাহিত্যকর্ম। এই লেখা বর্তমান উগ্র ধর্মান্ধ সময়ে লিখতে আবুল বাশারকে দুবার ভাবতে হতো। দুই নারী রাজিয়া ও নবীনা সংসার জীবনে অতৃপ্ত। মেয়েদের যৌন চাহিদা আছে এবং তা পূরণের প্রয়োজন আছে, তা রাখঢাক না রেখে স্পষ্টভাবে কাহিনিতে এসেছে ( "দেহ ছাড়া ভালোবাসা কোথায়ই বা থাকে? যৌনতা ছাড়া ভালোবাসা দাঁড়াবে কোথায়?") মানুষের চাওয়া এবং তার সাথে প্রচলিত ধর্মীয় সংস্কার/কুসংস্কারের দ্বন্দ্ব নিয়েই মূলত ফুলবউ এর আখ্যানভাগ গড়ে উঠেছে। সময়ের তুলনায় প্রাগ্রসর বা দুঃসাহসী লেখার একটা সাধারণ সমস্যা আছে। সেটা হচ্ছে, পরিণতি বিয়োগান্তক হয় যাতে মানুষ অতিরিক্ত খেপে না যায় (যেমন - এমিল জোলা'র "তেরেসা", শরৎচন্দ্রের "বিলাসী")। ফুলবউ'তেও একই ঘটনা ঘটেছে। তারপরও বইটি নিজ মহিমায় উজ্জ্বল। অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপনের সাহস সবার থাকে না।
"বড় মানুষ যাঁরা, তাঁদের দয়া বেশি। ভালোবাসা কম।কারণ করুণা দয়া এইসব প্রায় সর্বত্রগামী সহজ। ভালোবাসা নয়।"
আবুল বাশারের অত্যন্ত ভিন্নধর্মী উপন্যাস "ফুলবউ "। আসলে, আমার পড়া উপন্যাসগুলোর মধ্যে মনে পড়ছে না সর্বশেষ কবে এতো সাহসী ধাঁচের উপন্যাস পড়েছি।
উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু মিল্লাতের ফুলবউ রাজিয়া। মিল্লাতের বাবা নিসার আলির চতুর্থ বিবি অষ্টাদশী রাজিয়া। রাজিয়ার সাথে বৃদ্ধ নিসার আলির বিয়ে তো হবার কথা ছিল না,কথা হচ্ছিল মিল্লাতের সাথে বিয়ে হবার! ঘটনা যাই হোক, বিয়ের অল্প দিনের মাথায় নিসার আলি মারা যান আর তার শহরের বাড়িটি পুত্র মিল্লাতের বদলে দিয়ে যান রাজিয়াকে(আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হয়)। এদিকে,রাজিয়াকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনা মিল্লাত। কিন্তু যে বাড়িতে মিল্লাত থাকে, শহরের সে বাড়িতেই থাকতে হয় রাজিয়াকে। ্ সময় সবই সহিয়া যায়। মিল্লাত চায় তার ডাক্তার বন্ধু মবিন বিয়ে করুক বিধবা রাজিয়া ওর্ফ ফুলবউকে, তাই চায় মিল্লাতের বোন নবীনাও। এদিকে,সাদিকের স্ত্রী নবীনা এখনো ভালোবাসে মবিনকে। অন্যদিকে,মবিন আর মিল্লাতের যুক্তিশীল বন্ধু রিয়াজ চাইছে একেবারেই ভিন্ন কিছু। আপাতদৃষ্টে,অসম্ভব বলে মনে হলেও দুটি হৃদয়ের আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপ দিতে চায় রিয়াজ। তাই সে আইনের গলিতে গলিতে ফাঁক খুঁজে বেড়ায়।
আসলে, মিল্লাত আর রিজিয়া কী চাইছে তা বেশ জটিল করে তোলে পরিস্থিতিকে। এদিকে,মবিনও নাছোড়বান্দা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে।
ইসলামি আইন নিয়ে জানি অতিঅল্প। তার গলিতে গলিতে কী রয়েছে তার জ্ঞান তো নেই বললেই চলে। এই উপন্যাসে ইসলামি বিধান একটি বিশেষ অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছে যা আপাতদৃষ্টে কল্পনাতীত।
উপন্যাসটি পড়তে বেশ সাহস সঞ্চার করতে হয়েছে। বারবার থমকে গিয়েছি ঔপন্যাসিক আবুল বাশারের লেখনীতে প্রচন্ড প্রথাবিরোধীতা দেখে,আবার বেশ ভালোও লেগেছে।
কিন্তু, কথা হচ্ছে এতই যখন ভালো লাগল তবে কেন ৪ তারকা দিলাম? উত্তর-
কাহিনী বেশ ভালো গতিতেই এগিয়েছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত ঔপন্যাসিক সেই ফ্লো ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন বা সমাপ্তি কেন যেন মনে হয়েছে ঠিক কাহিনীর সাথে মেলে না তাই ১ তারকা কম দিলাম।
মুসলিম ইতিহাস আমার বরাবরই ভালো লাগে পড়তে অনেকটা গল্পের মতোই লাগে কিন্তু মুসলিম আইন সম্পর্কে জ্ঞান আমার সেই শূন্য অথবা তার থেকেও কম,বইটা শুরু করেছিলাম গুনে গুনে দেড় বছর আগে,এক পাতা পড়তাম বিরক্ত হতাম রেখে দিতাম আবার কালেভদ্রে মনের অজান্তেই খুলে বসতাম আবার উৎসাহে ভাটা পড়ত😐
হঠাৎ করেই কিছুদিন আগে বইটা খুললাম এবং মনকে ভয়াবহ রকমের শাসন করে আবার পড়লাম,এবার রাজিয়া মিল্লাত,রিয়াজ ,মবিন নবীনা ঠিকই এতদিন তাদের অবহেলিত করে রাখার শোধ কড়ায় গন্ডায় মিটিয়ে নিল😏 কথায় বলে রুপের আগুন বড় প্রলয়ংকারী আর সেই রুপ নিয়েই গরীবের ঘরে জন্মেছে রাজিয়া, নিজের প্রবল মনোবল আর প্রতিকূলতা কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পড়াশোনা চালাতে পারলেও নিসার হোসেন আর বৈদ্যবাটি সমাজের কাছে হার মানতে হয়,অশীতপর নিসার জোর করে নিজের হবু পুত্রবধূর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিকা করে,চির বিদ্রোহী রাজিয়া তা মানতে পারিনি,পরিনতিও তার ভালো হয়নি,নিসার মৃত্যুর আগে তাকে খালাস ও দেয়নি তালাক ও না,ফলে নিজের অবস্থা অনেকটা শাখের করাত হয়ে যায় তার, অপরদিকে মিল্লাত তার স্বপ্নের রক্সিনীকুমার যে কিনা নিসারেরই ছেলে শুরুতে রাজিয়া জন্য বিরুপভাব রাখলেও আস্তে আস্তে তার ব্যক্তিত্ব সাহসিকতা তাকে মুগ্ধ করে ফেলে ,সৎ মাতা পুত্রের সম্পর্ক থেকে রাজিয়া হয়ে যায় ফুলবউ!যাকে আপন করে পেতে চাওয়ার ফলশ্রুতিতে সমাজের নানা জায়গায় থেকে আসতে থাকে বাধা , শুরু হয় ইসলামিক আইনের জটিলতা,বোন নবীনা বন্ধু মবীন মৌলভী গোটা সমাজ উঠে পড়ে লাগে তাদের সর্বশক্তি দিয়ে.এগিয়ে আসে অন্ধের যষ্ঠির মতো বন্ধু রিয়াজ সাহায্যের্থে.
কিন্তু সব গল্পই কি পরিনতি পায়?সব চাওয়াই কি পূরন হয়?সব চরিত্র কি happily ever after ভাবে থাকতে পারে?জবাবগুলো খুঁজতে হলে ফুলবউকে যে একবার হলেও পড়তে হবে, বুঝতে হবে তারপর নিজেকে ঐ জায়গায় রেখে ভাবতে হবে আমি হলে কি পারতাম?
খুব সাহসী, দৃঢ় গল্প। মুসলমান সামাজিক জীবনের প্রেক্ষাপটে খুবই বোল্ড লেখা। কিছু কিছু সংলাপ খুবই নাটুকে লেগেছে, অহেতুক কিছু সংলাপও ছিল। শেষটা ট্রাজিক হবে সেটা অনুমেয় ছিল।
একটি মন খারাপের, ভালোবাসার, প্রতিরোধের, অশ্লীলতার(সমাজের চোখে) কাহিনী। কোনো সম্পর্ক কি শুধু শেষ বললেই শেষ হয়? যে সম্পর্ক শুরুই হয়নি, সেই সম্পর্ক কি করে ভালোবাসা আটকায়? এই গল্প মিল্লাত আর রাজিয়ার, রাজিয়া যে মিল্লাত এর ফুলবউ, তাহলে কি রাজিয়া পারে না মিল্লাত কে ভালোবাসতে? এই গল্প রিয়াজের, তার প্রতিরোধের আর সব শেষে এই কাহিনী মবিন এর মতো কিছু স্বার্থপর, মূর্খ, নীচ মানুষের।
আমার শরীর বলে নাই কিছু, আমার মন বলেও কিছু হয়না। শরীর, মন আর আমি সমস্ত একটা বিন্দুতেই মেলে শেষে। মানুষের এইসব 'সমস্তের' বিবরণ লেখকের দুঃসাহসিক কলমে ছবি হইয়া গেছে। যা কিছু তীক্ষ্ম-গভীর (ছবি কিংবা গান) তাই নিষিদ্ধ হয় মোল্লার জবানে, আর দূর হতে আরো বহুদূরে অপর এক অস্পষ্ট পৃথিবীর শক্তিতে মবিনেরা বিজয়ের উৎসব করে। যেকোন সত্য শুভ্র স্বপ্ন, যখনই এস্টাবলিশমেন্টের বিপরীতে গেছে তখনই তারে কালিমায় ঢাইকা দেওনের এক উপাখ্যান এই বই। করুণা সহজ সর্বত্রগামী বলে, বড় বড় মানুষেরা দয়া-মায়া করে, ভালোবাসা পদতলে দলে। হেরে জেতে হবে জেনে, তবু, ঝড়ের রাত্রির বুক চিড়ে রিয়াজের সাইকেলের ঘন্টা মহাপ্রলয়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে নাকি?
নবির সুন্নত- চারটে বিয়ে পুরো করতে গিয়ে আমার বিয়ের জন্য ঠিক করা পাত্রীকেই বিয়ে করে ফেললেন আমার বাবা হাজী নিসার হোসেন! আর এই তথ্যটুকু আমি জানতে পারি বাবার সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী রাজিয়ার মুখে থেকেই! বাবার এমন কর্মকাণ্ড মেনে নিতে পারিনি বলে গ্রামের বাড়ি সীতাহাটি থেকে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বাবার শহরের বাড়িতে এসে উঠি। আমার বিশ্বাস ছিল এই বাড়িটি বাবা আমাকে লিখে দেবেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর যখন বিধবা রাজিয়া বাড়ির দখল নিতে এলো, তখন রাজিয়ার প্রতি আমার এক ধরণের ঘৃণা জন্মালো।
আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইছিলাম কিন্তু সহসাই যেতে পারিনি। বাড়িতেই থেকে যেতে লাগলাম। রাতে থাকি, দিনেরবেলা ছাত্র পড়াই। পাশাপাশি ঘরে থাকতে থাকতে ক্রমশ রাজিয়ার ওপর থেকে ঘৃণাবোধটা দূর হয়ে গেল; এর বদলে জন্ম নিলো ভালোবাসা! কিন্তু এটা ঠিক না- আমি নিজেকে বিরত রাখলাম। ঠিক করলাম রাজিয়াকে বিয়ে দেব! তাই রাজিয়ার পাত্র হিসেবে বন্ধু মবিনকে বেছে নিয়ে ছিলাম। কিন্তু মবিন রাজি হয়নি। মবিন ফ্রেশ একটা মেয়ে চায়। এমন মেয়ে- যে আগে কখনো কোন পুরুষ দ্বারা ব্যবহৃত হয়নি!
ছোট বোন নবীনার সংসারটাও ভেঙে গেছে। অথচ নবীনার শিক্ষক স্বামী সাদেক নবীনাকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিল। আর আজ সে-ই কি না বাহারপুরে তার লজিং বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করে বসে আছে! নবীনাও খুব করে চায় যে মবিন রাজিয়াকে বিয়ে করুক। কারণ আমাদের একই বাড়িতে বসবাস করাটা সমাজ ভাল চোখে দেখছে না, ধর্মের চোখে তো নয়ই। আমার সাথে যে রাজিয়ার বিয়ের কথা হয়েছিল তা কারো অজানা নয়। সুতরাং মবিন যদি রাজিয়াকে বিয়ে করে তাহলে সমাজ এবং ধর্ম— দুটোই রক্ষা হয়।
একদিকে প্রেম অন্যদিকে সামাজিক সম্পর্ক, তারওপর আবার রাজিয়ার জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা অবস্থায় রাজিয়াকে নিয়ে গেলাম রিয়াজের কাছে। রিয়াজ আমার আরেকজন সুহৃদ বন্ধু। পাবলিক লাইব্রেরিতে চাকরি করে। পত্রিকায় কলাম লেখে। যথেষ্ঠ ধর্মীয় জ্ঞান রাখে। আমাদের প্রেমের সম্পর্কে রিয়াজ অজ্ঞাত নয়। তবুও যখন আমি সামাজিক ভয়ে রাজিয়াকে অন্যত্র বিয়ে দিতে চাইছি তখন রিয়াজ ক্ষেপে যায়। বলে, আমি কেন রাজিয়াকে বিয়ে করছি না? বরং আমারই উচিত রাজিয়াকে বিয়ে করা। রিয়াজ সব ব্যবস্থা করবে। তখন রিয়াজ বলে যে, সামাজিক বিধানে পিতার স্ত্রী তার স্বীয় পরিচয়ে মায়ের স্থান অধিকার করে কিন্তু স্ত্রী হয়ে উঠার পক্ষে ধর্মের নিজস্ব বিধান আছে। ধর্মমতে বিবাহিত যে তরুনীর সাথে পিতার শারিরীক সম্পর্ক হয়নি, সে আসলে পিতার বৈধ স্ত্রী নয়। শুধুমাত্র কবুলিয়াত করে এক ছাদের নীচে বসবাস করলেই কেউ স্বামী-স্ত্রী হয়ে যায় না বরং উপযুক্ত দেনমোহরানার বিনিময়ে ধর্মমতে সঙ্গম না করলে বিবাহ পূর্ণতা পায় না। সামাজিক মাতা তার ধর্মীয় মাতা হয়ে উঠতে পারে না ।
এসব শুনে শুনে অবশেষে একদিন আমি রাজিয়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলাম...”
তারপর কী হলো? রিয়াজ কি পেরেছিল সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, ধর্মের ধৌঁয়ার দেয়াল ভেদ করে দুটি মানব-মানবী এক করে দিতে? মিল্লাত কি পেয়েছিল রাজিয়াকে কিংবা রাজিয়া মিল্লাতকে? কী ঘটে ছিল নবীনার জীবনে? মবিনই শপথ করেছিল কেন?
এ সবগুলো কেন'র জবাব আছে শক্তিমান লেখক আবুল বাশারের 'ফুলবউ' নামক উপন্যাসটিতে।
কিছু কিছু বই থাকে যা পড়ার পর থ মেরে পড়ে থাকতে হয়। শরীর-মন অসার হয়ে আসে। বুকের ভেতরটা ভারি হয়ে আসে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়- ফুলবউ ঠিক তেমন একটা বই। এমন একটা বইয়ের প্রশংসা লিখে শেষ করা যায় না। শুধু একশব্দে বললে বলতে হয়— অসাধারণ! সারা জীবন মনে রাখার মতো!
বইটি দুইবার পড়া শুরু করেছি কিন্তু মাঝখানে গিয়ে আটকে গেছি। ভেবেছি মিল্লাত হলো মূল চরিত্র, কিন্তু গল্পকে গতি দিয়েছে রিয়াজ আর নবীনার কাহিনী। ইসলামিক সমাজের প্রথা গুলোর সারশূন্যতা তুলে ধরেছেন লেখক অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে। এমন সাহসী লেখা খুব কমই পড়েছি। পাঠকের সামনে চরিত্র গুলি তুলে ধরেছে কিছু প্রশ্ন। যে প্রশ্ন গুলো সত্যিই অমীমাংসিত। কোনো ধর্মের বই তার উত্তর দিতে পারে না। একমাত্র মনের গভীর অন্তঃস্থল থেকে তার উত্তর আসে। কিন্তু শেষমেশ সামাজিক শাসনের কাছে কিভাবে মনের ভালোবাসার ট্র্যাজিক পরাজয় ঘটে তা অত্যন্ত অসহায় ভাবে আমাদের সামনে পরিস্ফুট হয়। ধর্ষক মবিন সব শাস্তি এড়িয়ে যায়, তারাই সমাজের শাসন কর্তা। রাজিয়া অসহায়। মিল্লাত অসহায়। রিয়াজ সব কিছুর সাথে লড়াই করা তাদের জেতাতে চায়। কিন্তু পারেনা। নবীনা চরিত্র টির আত্মোপলব্ধি আমাকে অন্য রকম ভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। তার প্রশ্ন গুলো অনেকদিন মনে থেকে যাবে। ভাবিয়ে তুলবে সময়ে সময়ে। মনে থেকে যাবে নবীনা অসহায়। তাকেও মরতে হয়। রাজিয়া, মিল্লাতের অসহায় ভালোবাসার যেমন মৃত্যু ঘটে তেমনি।
This entire review has been hidden because of spoilers.
ধর্মীয় বিধান আর সামাজিক বিধান আমাদের অলক্ষ্যে নিয়ন্ত্রন করে, আমাদের মূল্যবোধ গড়ে ওঠে সেসবের ভিত্তিতেই, তাই একটা সম্পর্কের সামাজিক মর্যাদা সময় সময় ধর্মীয় মর্যাদার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এক কথায় দারুণ সাহসী বই, ঘোর লাগা ট্রাজেডি!
আবুল বাশারের গভীর চিন্তার এক অপরূপ উপস্থাপন 'ফুলবউ'। ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে নিজের স্বার্থের মেলবন্ধনে সমাজে জন্ম নেয় কতসব কুৎসিত প্রথা আর তার জালে আটকে যায় অবলারা। সংস্কারের প্রত্যাশায় জেগে উঠে কেউ কেউ কিন্ত পারে না টপকাতে বেড়াজাল। রাজিয়ার আটকে যাওয়া আর মিল্লাত,রিয়াজদের উদ্ধার করার দৃঢ়তাও হার মেনে যায়.... স্বপ্নের ডানা কাটা পড়ে অপমৃত্যু আর নিরুদ্দেশে।
রাজিয়া চলে গেল কেন? নবিনা বিয়ের খবর মবিন কে দিল কেন? মিল্লাত এত ভিরু বেশে থাকলো কেন মবিনের সামনে? এমন অনেক প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে যায় বইটি।চরিত্র গুলো যা করছে,কেন করছে ঠিক বোধগম্য হল না।
This entire review has been hidden because of spoilers.
বইটি বিভিন্ন সময়ে তিনবার পড়া শুরু করে আগাতে পারিনি, অখন্ড মনোযোগ লাগে। এবার যখন পড়ে শেষ করলাম মুগ্ধতার একটা আবেশ রয়ে গেল মনে। মবিনের দ্বিধাগ্রস্থতা, রিয়াজের প্রাজ্ঞতা, নবীনার অসহায়ত্বকে ছাপিয়ে রিজিয়ার কথা মনে থাকবে অনেকদিন। স্মার্ট, অসম্ভব স্মার্ট এক চরিত্র।