Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.
জেলেপাড়ার মানুষের দুর্বিষহ জীবনযাপন, জীবনের অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্যের চরম লীলাখেলা, সাধারণ সমাজে জেলেপাড়ার মানুষের অসম্মান কিংবা গরীব সর্বহারা জেলেদের মহাজন কতৃক শোষিত হওয়ার নির্মম চিত্র ফুটে উঠে হরিশংকর জলদাসের ' জলপুত্র' বইটিতে। জেলেপল্লীর দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলোর নিদারুণ কষ্টের মধ্যে যে আত্মতৃপ্তি অনুভব করতো, একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে যেত লেখক এটিও ফুটিয়ে তুলতে ভুলে যাননি। আর সমাপ্তিটা এতই সুন্দর ছিল যে আমি মুগ্ধ। Might is right বলে একটা কথা আছে জানেন তো! অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই বেঘোরে প্রাণ খোয়ানো লাগবে।নির্মম বাস্তবতা।
সব থেকে ভালো লাগে বইয়ে অনেকগুলো চরিত্র উঠে আসলেও প্রত্যেক চরিত্রের প্রতি লেখক যত্নবান ছিলেন এবং প্রতিটা চরিত্রেই লেখক স্পষ্ট ইতি টেনেছেন।তবে প্রথমদিকে একটু খেয় হারিয়ে ফেলছিলাম।
মধ্যবয়সে এসে যখন আমাদের দেশের লেখকরা ছাইপাশ লেখা শুরু করে, তখন হরিশংকর জলদাস মাত্র কলম ধরেছেন লিখবেন বলে। এটা তার প্রথম উপন্যাস। অসাধারণ কিছু নয়। কিন্তু কেন যেন হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কারণটা কি জেলেপল্লীর নিপীড়িত জীবন? উত্তরটা আমার কাছে মনে হয় বাচনভঙ্গি। চমৎকার ভাবে জেলেপল্লীর হাসি, কান্না, দুঃখ-দুর্দশার চিত্র তাদের আঞ্চলিক ভাষায় তুলে ধরেছেন তিনি। এ্জন্যই বোধকরি কাহিনী সরল হওয়া সত্ত্বেও এতটা মর্মস্পর্শী। নবীণ লেখকদের মতো তাড়াহুড়ো করেন নি। কাহিনী গুছিয়েছেন, গল্পের মাঝে জাল, বিয়ারী, সাগর, নৌকা, মাছ সব বিষয়েই অল্পবিস্তর তথ্য দিয়ে পাঠকের মধ্যে জ্ঞানের প্রসার ঘটিয়েছেন। মোট কথা, গল্পের প্রয়োজনে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই তিনি এনেছেন। স্বামীহারা ভুবনেশ্বরীর সংগ্রাম একমাত্র জলপুত্র গঙ্গাকে নিয়ে জেলেপল্লীতে উপযুক্ত মানুষ করা। এই উপন্যাসের ভেতর দিয়ে ভুবনেশ্বরীর জীবনে এসে দখল নেয় সাগরের উথাল পাথাল ঢেউগুলো। সেই ঢেউয়ে ডুবে যান ভুবনেশ্বরী, আবার ভেসে ওঠেন। ভুবনের কোলে কোলে বেড়ে ওঠে পিতৃহীন গঙ্গা। গঙ্গা চায় ঢেউগুলো রুখে দিতে। চায় সমুদ্রের মতো গর্জন করে উঠতে। তারপরে কি হয় জানতে পড়ে ফেলুন ২০০৭ সালে যুগান্তর পত্রিকার ঈদসংখ্যার জন্য পাওয়া পান্ডুলিপি গুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পান্ডুলিপি "জলপুত্র"।
‘কসবি’ আর ‘রামগোলাম’ আগে পড়ার সুবাদে কিনা জানি না ‘জলপুত্র’ নিয়ে খুব বেশি অভিভূত হতে পারলাম না। আগের দুটো বইতে পার্শ্বচরিত্রের বিস্তার ‘জলপুত্র’ এর থেকে কম ছিল। একারণে ছোটো আকারের বই হিসেবে এসব আর্ক পড়তে খারাপ লাগেনি কিংবা অসমাপ্ত বলে মনে হয়নি। কিন্তু জলপুত্রে এসে মনে হয়েছে উপন্যাসের কলেবর আরো বড় হওয়া প্রয়োজন ছিল। জেলেসমাজের পরিচিতির সাথে জেলেজীবনের পরিচয় দিতে যেয়ে লেখক উপন্যাসের বেশ খানিকটা অংশ ব্যয় করেছেন। উপন্যাসের চরিত্রের জীবনপ্রবাহের থেকেও পাঠককে জীবনরীতি শেখানোর চেষ্টা বেশি চোখে পড়েছে আমার। এটা অপ্রয়োজনীয় ছিল, এমন নয়। তবে উপন্যাসের কলেবর আরো শখানেক পৃষ্ঠা বেশি হলে এই ব্যাপারটা আলাদা করে চোখে পড়ত না।
পার্শ্ব কাহিনীর সুতো বেশ ছড়িয়ে গেছে, কিন্তু শেষতক খুব ভালো গুটিয়ে আসেনি। শেষে এসে তাই পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারলাম না।
"জলপুত্র" হরিশংকর জলদাসের প্রথম উপন্যাস এবং লেখনীর জগৎ এ আজ তার যা কিছু সফলতা তা এর মধ্যে দিয়েই শুরু। জেলেপল্লী তে জন্ম বলেই কিনা তার অধিকাংশ লেখাতে জেলে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব দেখতে পাওয়া যায়।
জলপুত্র উপন্যাসটিও জেলে সম্প্রদায় নিয়েই লেখা। বিশেষ করে সমুদ্রভিত্তিক জেলেদের জীবনের উপর ভিত্তি করে লেখা। তার মত এমন সমুদ্রভিত্তিক জেলে দের নিয়ে কেউ উপন্যাস লিখেছে বলে জানা নেই।
উপন্যাসটিতে জেলে সম্প্রদায়ের কিছু পাবার আনন্দ, সমাজ থেকে প্রতিনিয়ত অপমানিত হবার বেদনা, না পাওয়ার হতাশা, কিছু করতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে বেশিরভাগ সময়ে কাহিনী এগিয়েছে। জেলে দের বেশির ভাগ আচার অনুষ্টান হিন্দু সম্প্রদায়ের মত হলেও নিচু জাত বলে হিন্দু / মুসলিম দুই সম্প্রদায় থেকেই তারা ঘৃনার বা অপমানের পাত্র। তাছাড়া তাদের নিজেদের মধ্যেও সম্পদশালী দের গরীবদের প্রতিনিয়ত ঠকানোর কথাও উঠে এসেছে।
উপন্যাসের প্রথম ভাগে দেখা যায় এক স্বামীহারা জেলেনারীর সমাজে টিকে থাকার সংগ্রামের কথা এবং শেষাংশ এ দেখা যায় এক জেলেপুত্রের নিজেদের (জেলেদের) অধিকার সচেতন করে তোলার প্রচেষ্টার কথা, পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে জেলেদের জীবনে ঘটে যাওয়া সুখদুঃখ এর কথাও বলা হয়েছে এই উপন্যাসে।
উপন্যাস টিতে প্রচুর পরিমানে আঞ্চলিক ভাষার প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায় এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভাষা ঠিক বোধগম্য হয়ে উঠে না। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় পরিস্তিতি বিবেচনায় আঞ্চলিকতা না থাকলে তা যথাযথ হত না।
পরিশেষে বলা যেতে পারে "জলপুত্র" সমুদ্রভিত্তিক জেলে দের জীবনের নির্মম বাস্তবতা এর উপাখ্যান এর সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় ! জেলেভিত্তিক উপন্যাস পদ্মা নদীর মাঝী যদি ৫/৫ পেতে পারে তাহলে একে ৪/৫ দিতে আমার আপত্তি নেই।
যত টা খারাপ লাগবে ভাবসিলাম তত টা লাগে নাই। টিপিকাল বাংলা নাটক এর মত কাহিনি। আর লেখকের লেখার স্টাইল ও ঠিক জুইতের না। প্রচুর চরিত। কে কোন্টা মনে রাখা যায় না। তবু কিছু কিছু জায়গা আনপ্রেডিক্টেবল ছিল, যার কারনে বই টা শেষ করা গেসে। নো ওয়ান্ডার এই বই বাংলা একাডেমির আতেল দের পুরষ্কার পাওয়ার মত ভাল্লাগসে। ছোট বেলায় বাংলা বই এ এরকম শয়তান চেয়ারম্যান বনাম শিক্ষিত তরুন মাস্টার এর গল্প থাকতো, যার শেষ হইত গ্রামবাসী তিব্র চেতনা নিয়া আগায় যাইতেসে নতুন দিনের দিকে ইত্যাদি দিয়া। এই বই ও সেরকম ই।নট রেকমেন্ডেড।
"ডরাইলে নো অইবো। জাইল্যার মাইয়াপোয়ার কোনো শরম নাই। বাঁচি থাইবাল্লাই মানুষোত্তোন বহুত কিছু গরন পড়ে । আঁরা তো চুরি নো গরির, খানকিগিরি নো গরির! শুধু বাঁচি থাইবাল্লাই, পোয়া-মাইয়ারে বাঁচাই রাইবাল্লাই মাছ বেচিদ্দে! তুই বুগত্ সাহস বাঁধো । বিয়াগ্গিন ঠিক অই যাইবো গই ।"
"স্বামী সমুদ্রে নিখোঁজ হলে স্ত্রী বারো বছর সধবাজীবন যাপন করবে। বারো বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলে স্বামীফেরার সকল আশা জলাঞ্জলি দিয়ে, শাখা ভেঙে, কপাল থেকে সিঁদুর মুছে সাদা কাপড় পরবে স্ত্রী। এটা জলদাসসমাজের বিধান।"
উদ্বৃতিগুলো জলদাস দাদার বই থেকে নেওয়া । হরিশংকর জলদাস, জেলে এবং জাত প্রথা নিয়ে একাই লড়ে যাচ্ছেন। তার লেখালেখিতে আসা জলপুত্র হওয়ার কারনে তার উপর হওয়া শোষণ, উৎপীড়ন,অপমানের প্রতিবাদ করতে। অদ্বৈত মল্লবর্মণের পর একমাত্র জলপুত্র জিনি জেলেদের নিয়ে লিখছেন। তার প্রথম উপন্যাস "জলপুত্র"। জেলে জীবন নিয়ে লেখা। চট্টগ্রাম এর আঞ্চলিক ভাষার আদিক্য রয়েছে, যা উপন্যাসকে করেছে প্রানবন্ত। নিজে একজন জলপুত্র হওয়ায় জেলেজীবনকে উপস্থাপন করেছেন খুব সুনিপুণ ভাবে। এই উপন্যাসের একদিকে আছে ভুবনেশ্বরী নামের এক জেলেনারীর বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা,অন্যদিকে আছে জলপুত্রদের অধিকার সচেতন হয়ে উঠার বৃত্তান্ত। জেলেদের মন সমুদ্রর মতোই দৃঢ়, তার উদাহরণ ভুবনেশ্বরী,
"মাছের দুর্গন্ধময় পানি টপাটপ গড়িয়ে পড়তে লাগল। তক্তা বেয়ে পড়া সে পানি ভুবনের হাত, শরীর ভিজিয়ে দিতে থাকল। ঘাড়-মাথার ব্যথাকে, মেছোগন্ধময় পানিকে উপেক্ষা করে ভুবন সামনের দিকে পা বাড়াল। চোখ তার দূরে প্রসারিত।
মনে মনে ভুবন বলছে, ‘বাঁচি থাওন পড়িবো, বাঁচাই রাওন পড়িবো।"
হরিশংকর জলদাস রচিত ‘জলপুত্র’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্য জগতের নতুন এক সংযোজন। ২০০৮ সালে রচিত এই উপন্যাসটিতে জেলেদের প্রাপ্তি-হাহাকার, আনন্দ-বিলাপ, মৃত্যু আর জেগে ওঠার চালচিত্র উঠে এসেছে। বাস্তবতার আলোকে লিখিত উপন্যাসটি অর্জন করে ২০১২ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার।
"জলপুত্র" হরিশংশংকর জলদাসের প্রথম উপন্যাস। এ উপন্যাসের ভূমিকা লিখতে গিয়ে লেখক বলেছেন- " প্রান্তসমাজে জন্ম আমার। একেবারে কিশোর বয়স থেকে সমুদ্র সংগ্রামে বাবার সহযোদ্ধা। জলচর থেকে স্থলচর হবার জন্য আমার কানের কাছে বাবা অবিরাম মন্ত্র পড়ে যেতেন। এস.এস.সি পাশ করে প্রাথমিক শিক্ষক হবার প্রবলবাসনা মনের ভিতর আকুলি বিকুলি করতো। ভাগ্যক্রমে এম.এ পাশ করা গেল। সরকারী কলেজে চাকরীও পাওয়া গেল। কিন্তু ভদ্র সমাজে চাকরী করতে এসে বির্বন প্রান্তিক সমাজে জন্মগ্রহন করার অপরাধের দায়মুমুক্তি ঘটেনি। উদ্ধর্তন কর্মকর্তা পিতৃদত্ত নাম ধরে না ডেকে আড়ালে আড়ালে জাউল্যার পোলা বলে ডাকতেন। সহকর্মীর সে কথা কানে পৌঁছালে একটি প্রশ্ন আমার মধ্যে জেগে উঠলো, তাহলে জেলেরা কি সত্যি নিন্দনীয়। তারপর আমার ভিতরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো "জলপুত্র" এর বীজ"।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামের পতেঙ্গাগ্রামের জলপুত্র হরিশংকর জলদাস তার স্বসমাজের জীবন ও সামাজিক অবস্থানের পূর্ণমূল্যায়ন করেছেন এ উপন্যাসে। জলপুত্র এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে তার জীবনভিজ্ঞতার নির্ভেজাল ও বাস্তব সত্য।
বাংলা সাহিত্যের জেলেজীবন নির্ভর যেসব উপন্যাস আছে সেসব উপন্যাসে জেলেদের জীবিকা নির্বাহ করার উৎস হল নদী। জেলেদের সুখ-দুঃখের ভাগীদার এখানে নদী। আর হরিশংকর জলদাসের ‘জলপুত্র’ উপন্যাসে জেলেরা যায় সমুদ্রে। এখানে সমুদ্র বিশেষ একটি ভূমিকা পালন করেছে। সমুদ্রই ওদের জীবন নিয়ন্ত্রণ কর্তা। এ উপন্যাসে জেলেদের বারো মাসের বর্ণনা আছে। আছে দুঃখ ও সুখের কথা। জেলেদের পূজা-পার্বণ উঠে এসেছে এখানে।
চট্টগ্রামের গ্রামগুলোর নাম করতে গিয়ে লেখক উপন্যাসে বর্ননা করেছেন এভাবে-"শ্রাবনমাসের জন্য নাউট্যাপোয়াদের ভাড়া করে আনা হয়। ভাড়া মাসে দেড়শো থেকে দুশত শরীর খারাপ না করলে প্রতিরাতেই পুঁথি পাঠের সংগে তাদের নাচতে হয়। বন্দর বুরুমচরা, করল, কোলা এসব গ্রাম থেকে এদের আনা হতো"। কিংবা জেলে পল্লীর বর্নণা দিতে গিয়ে যখন বলেন " উত্তর পতেংগা হতে মিরসরাই পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের কূলে কূলে অনেক জেলেপল্লী। উত্তর পতেংগা, হরিশহর, কাট্টালী, খেঁজুরতলী, ভাটিয়ালী, কুমিরা, সীতাকুন্ডু মিরসরাই ইত্যাদি গ্রামের জেলেপাড়া গুলো সমুদ্রের কোল ঘেষেই গড়ে উঠেছে"।
উপন্যাসে এসেছে জেলেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন। দেখানো হয়েছে একাবারে প্রান্ত সমাজেও অবস্থিত 'মাৎস্যন্যায়' প্রথা। যে গৃহস্থ মহিলা নিজে বঞ্চিত হচ্ছে তার চাইতে উপরের কারো কাছে, সেও সুযোগ বুঝে তার নিচের অবস্থানের জেলেনির টুকরি থেকে অবলীলায় দু'এক টুকরা মাছ বেশি তুলে নেয় -" মক্ত মাআনা দইজ্যাত্তুন মাছ দরি আনচ। দুউগা চাউরগা বেশি লইলে কোঁ কোঁ কা গরচ্ ?"
নিখুঁত বর্ণনায় উঠে এসেছে গঙ্গা আর মনসা মায়ের পূজা, পুঁথি পাঠের আসরের সাথে অবশ্যম্ভাবী 'নাউট্যাপোয়া'দের কথা। হুমায়ুন আহমেদের দেখানো রূপবান কিশোর ঘেঁটুপুত্ররাই এই নাউট্যাপোয়া। পার্থক্য শুধু এই - ঘেঁটুপুত্ররা ছিল জমিদার জাতীয় একজনের বাঁধা, আর নাউট্যাপোয়াদের পালা করে ভোগ করে জেলেদের সমাজের একটু উঁচু অবস্থানের মানুষরা। তাদের ভাষায় - " প্রেমদাইশ্যা আজিয়া সুবইল্যার লগে ফুতক। কালিয়া পুথিপাঠ অইতো নো। গোডা রাইত চন্দ্রমোহন তুই প্রেমদাইশ্যারে খাইতে পারিবি।"
উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক নারীর জীবন সংগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এ কাহিনি। বালিকা বধূ হয়ে আসা ভুবনেশ্বরীর গল্প এটি। তার ঊনিশ বছরের ভরা যৌবনবতী শরীরের আকর্ষণকে ম্লান করে দিয়ে স্বামীকে টেনে নিয়ে গেছে চির যৌবনা দইজ্যা - দরিয়া। এক উথালপাথাল ঢেউয়ের দিনে তার স্বামী আর ফিরে নি। লাশ পাওয়া যায় নি, তাই রীতিমাফিক বার বছর সধবার বেশে অপেক্ষায় কাটাতে হবে তাকে। একমাত্র শিশুপুত্র গঙ্গাপদ আর বৃদ্ধ শ্বশুরকে নিয়ে তার জীবন। কখনো মুখ বুজে মার খাওয়া, কখনো তেড়ে ওঠা, শেষ পর্যন্ত অনাগত জলপুত্রের প্রত্যাশায় তার জীবন বহমান। এ বহমান জীবনে জড়িত প্রতিটা ব্যক্তি এখানে খোলস ছেড়েছে বা গুটিয়েছে যে যার চাহিদা মাফিক আর উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে।
শুক্কুরের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জেলেদের সংগঠিত করে গঙ্গা। ফলশ্রুতিতে গঙ্গা নিহত হলো। যে তরুণটি এ অন্ধকার সমাজটিকে আলোর দিকে হাঁটতে শেখাত, অধিকার আদায়ের কথা বলতে শেখাত সে চলে গেল। জেলেসমাজ স্তিমিত হয়ে পড়ল। তারা আবার আরেকজন গঙ্গার জন্য অপেক্ষা করবে আর ততদিন পর্যন্ত শোষিত হতে থাকবে। আর গঙ্গার অনাগত সন্তান হয়তো এসে এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজটাকে টেনে তোলার প্রয়াস পাবে। উপন্যাসের শেষ লাইনে এসে পাঠক আবার প্রস্তুতি নেয় নতুন সংগ্রামের, দিনবদলের নতুন আশায়। কারণ, জেলেপাড়ার কাদায় এখন রক্তের অঞ্জলি, শক্তির আবাহন। "সে দৃষ্টিতে উজ্জ্বল আলো"।
পাঠ-পর্যালোচনাঃ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করে কিছুদিন আগে পড়েছি লেখকের "দহনকাল" উপন্যাসটি। তারই ধারাবাহিকতায় এবার লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করে পড়লাম " জলপুত্র"। ‘দহনকাল’ হলো জলের কাব্য আর জলপুত্র’ হচ্চে ডাঙার কাব্য।
নদীর কথা কিংবা নদী তীরবর্তী জেলে সমাজের জীবনচর্চা এবং আর্থসামাজিক অবস্থান নিয়ে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস অনেকগুলি রচিত হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রতীরবর্তী মানবজীবনের আলেখ্য জলপুত্র উপন্যাসের কাহিনী যেরুপ বাস্তবতা ও মননের সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে ইতোপূর্বে বাংলা উপন্যাসে খুঁজে পাওয়া বিরল। প্রকৃতপক্ষে বাংলাসাহিত্যে সমুদ্রকেন্দ্রিক উপন্যাস ছিল না। হরিশংকর জলদাস সমুদ্রকেন্দ্রিক উপন্যাসের প্রথম ও যথার্থ স্রস্টা।
"জলপুত্র" বইটি পড়তে গিয়ে বিশেষ করে মানিক বাবুর লেখা বারবার মনে চলে আসে। এর কারণ এই নয় যে, এ বইতে "পদ্মা নদীর মাঝির" প্রভাব ব্যাপক, বরং আমাদের মনে সেটার শক্ত অবস্থানের কারণেই। অন্যান্য সকল উপন্যাসের জেলে জীবন নদী কেন্দ্রিক, কিন্তু এটি সাগর কেন্দ্রিক। তাই শুধু ইলিশ মাছের মত মৌসুম ভিত্তিক নয়, বরং এটি সারাবছরের নিরন্তর সংগ্রামের ছবি। এখানে শুধু জেলেরা মাছই ধরে না ; মেয়েরাও সে মাছের বেচাকেনায় বেড়িয়ে পরে।
জলপুত্র উপন্যাসের ভাষা ব্যবহারের মধ্যে একটা গতিশীলতা ও আর্কষনী শক্তি আছে। উপন্যাসের সূচনা ঘটেছে মান্য চলিত ভাষা দিয়ে "উথাল-পাথাল বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে আছে উনিশ বছরের ভুবনেশ্বরী"। এবং উপন্যাস শেষও হয়েছে এই মান্য চলিত ভাষা দিয়েই-" গঙ্গার শিয়রের কাছে জল কাঁদায় বসে আছে ভূবনেশ্বরী স্তব্ধ, নিথর, পাথরের মত। দৃষ্টিতার উঠানে জড়ো হওয়া অসংখ্যা মানুষকে ছাড়িয়ে দুরে বহুদুরে প্রসারিত। সে দৃষ্টিতে প্রতীক্ষার উজ্জ্বল আলো। অনাগত জলপুত্র বনমালীর জন্য"।
"জলপুত্র" উপন্যাসটি জেলে জীবনের আরো গভীরে ঢুকে গেছে প্রতিটি পরিচ্ছদেই। এর প্রথম কারণ - লেখক স্বয়ং এই সমাজের পাঁক হতে উঠে আসা। তাই এ সমাজ দেখা এবং দেখানোর জন্য তাঁর নিজের জীবনের খেরোখাতাই যথেষ্ট। দ্বিতীয় কারণ - স্থানীয় ভাষার নিপুণ ব্যবহার। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মধ্যেও কিন্তু ব্যাপক ভেদ আছে। শিক্ষিত কথ্য রূপ আর অশিক্ষিত কথ্য রূপে যেমন আছে শব্দগত প্রভেদ, তেমনি একেবারে প্রান্তজনদের ভাষার মধ্যেও আছে বেশকিছু মুসলিম আর হিন্দু শব্দগত বিভেদ। হরিশংকর জলদাস নিখুঁতভাবে এ ভাষা তুলে এনেছেন, আর সে সাথে যোগ করেছেন একেবারে শিক্ষাবিবর্জিত এ জনপদের সকল অশ্রাব্য বুলি। চট্টগ্রামের একটা প্রচলিত রীতি এই যে, যে কোন নামকে তারা ই-কার এবং য-ফলা যোগে সংক্ষিপ্ত করে ফেলে ; আবার কারো কারো অভ্যাস বা খাসলত থেকেও নামকরণ হয়। আবুল হয়ে যায় আবুইল্যা, সুবল - সুবইল্যা, ফজরের বাপ হয়ে যায় ফইজ্যার বাপ, সব সময় চাওয়া-চাওয়ির অভ্যাস থাকায় অমৃতলালের নাম হয়ে যায় মাগইন্যা। এসব নামগুলো এ উপন্যাসের আরেক আকর্ষণ যা বইটির পাঠের আনন্দ বাড়িয়ে দিয়েছে।
হরিশংকর জলদাসের জলপুত্র উপন্যাসে জেলে সম্প্রদায়ের অপ্রাপ্তিরর বেদনা, প্রাপ্তির উল্লাস, শোষনের হাহাকার, অশিক্ষার অন্ধকার সবই অসাধারন বিশ্বস্তার সঙ্গে অঙ্কিত হয়েছে। এই উপন্যাসটি একজন জেলেনারীর সংগ্রামশীল জীবনের ইতিহাস যেমন, তেমনি একজন জলপুত্রের অধিকারসচেতন হয়ে ওঠার কাহিনীও বটে। এই উপন্যাস কৈর্বতসমাজ তার সকল প্রকার সংগতি অসংগতি নিয়ে উপস্থিত।
মাওলা ব্রাদার্সের প্রকাশনায়, ২২৫ টাকা দামের এ বইটি আমাদের বাংলা সাহিত্যে টিকে থাকার মত একটা লেখনী বলে আমার বিশ্বাস। বইটি বইপোকাদের ভাললাগার মত এবং ভাল লাগবেও।
বাংলায় লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি 'দলিত' টেক্সট। এর আগে যতগুলি উপন্যাস জেলে অথবা জালিক কৈবর্তদের নিয়ে লেখা হয়েছে - একমাত্র অদ্বৈত মল্লবর্মন ছাড়া সবগুলিরই লেখক মনেহয় উচুঁজাতের হিন্দু বা উঁচুজাতের মুসলমানেরা। সেখানে হরিশংকরবাবুর টেক্সটটি তাঁর অভিজ্ঞতা সেঁচে তুলে আনা বয়ান, এক সমুদ্রকেন্দ্রিক, নারীকেন্দ্রিক আখ্যান।
যাদের বইটা ভাল লাগেনি তাদের সেটা মনে হয়েছে হয়ত গল্পের সহজসরল ধাঁচের জন্য, জালিকদের কথ্যভাষায় সংলাপ ছাড়া বাকি উপন্যাসের ভাষা আর বর্ণনা সাদামাটা। কিন্তু এই চিরাচরিত অমোঘ এবং পরিচিত আখ্যানের মূল বৈশিষ্ট্য হল - উপন্যাসের চরিত্র, যারা কিছুটা একমাত্রিক হলেও লেখকের জীবন থেকে তুলে আনা মানুষজন, রূপকথার গল্পের পাত্রপাত্রী নয় তারা। হরিশংকরবাবুর আরো লেখা পড়বার ইচ্ছে রইল পরবর্তীতে।
কৈবর্ত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, আনন্দ-বেদনা আর মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে এক যুবাপুরুষের প্রতিবাদের উপাখ্যান এই জলপুত্র- জল থেকে যার আবির্ভাব, জলেই যার নিয়তি।
লেখককে ধন্যবাদ এই কারণে যে তিনি জলপুত্রদের নিয়ে কাহিনিটি লিখেছেন। তবে এটিকে শুধু একতরফা উপন্যাস ভেবে ভুল করবেন না। এখানে যেসব চিত্র লেখক ফুটিয়ে তুলছে চেয়েছেন—তা সত্যিকার অর্থে বাস্তব। জেলেদের জীবন ছোটোবেলা থেকে চোখে দেখা হলেও এদের ভেতরের সংগ্রাম দেখিনি। নীচু জাত হিসেবে তাদের প্রতি যে অবজ্ঞা সমাজের উঁচু মহলের লোকেরা করে বেড়ায়, তা একবাক্যে মেনে নেওয়ার মতো নয়।
লেখক তাদের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের বিষয়গুলো খুব সূক্ষ্ম ও সুনিপুণভাবে পাঠকদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। যে দিকটা আমার দারুণ লেগেছে সেটা হলো সংলাপ। বইয়ের সংলাপে চাটগাঁইয়ার ভাষা ব্যবহার কাহিনিকে আরও জীবন্ত করেছে। যাদের এ ভাষা বুঝতে কষ্ট হয় তাদের জন্য অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো বুঝতে কিঞ্চিৎ বেগ পেতে হতে পারে। তবে একবার ধাঁচ বুঝে গেলে বাকিটা আপনাতে বোঝা হয়ে যাবে।
সবমিলিয়ে বইটি উপভোগ্য। মাছ ধরার বিভিন্ন প্রকার জালের নাম, তাদের কাজ, কীভাবে সেটা দিয়ে মাছ ধরতে হয়, ধরার পর বেচা-কেনার পর্ব থেকে সবকিছু বেশ সুস্পষ্ট বর্ণনার মধ্য দিয়ে জীবন্ত হয়ে দেখা দেয়। পুরুষ জেলেদের সাথে মহিলা জেলেনীদের তফাতটাও বেশ চোখে পড়ে। তাছারা জেলেদের কুসংস্কার ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে ওদের ভীতি ও উদ্্যাপন তুলে ধরা হয়।
জলপুত্রদের জীবনের কোনো অংশ লেখক অপূর্ণ ছাড়েননি। উপন্যাসটি পড়ে মজা যেমন পেয়েছি তেমন কিছুটা নস্টালজিয়া যে হয়নি সেটা অস্বীকার করব না৷ কারণ ছোটোবেলায় তাদের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। মাছ ধরার প্রক্রিয়া এবং জীবন-জীবিকা নির্বাহের সংগ্রাম বাদ দিয়ে অবশ্য।
সমুদ্রে মাছ ধরা জেলে সম্প্রদায়কে নিয়ে আবর্তিত হয়েছে জলপুত্রের কাহিনী। নিজের জীবন হাতে নিয়ে যারা মাছ ধরে তাদের ঠগিয়ে শোষণ করার মানুষেরও অভাব নেই চারপাশে। যাদের শোষণের প্রতিবাদ করলেও শাষকের হাতে মার খেতে নয়ত মরতে হয় জেলেদেরকেই। লেখক খুব নিবিড়ভাবে একটা জেলে পরিবারকে বর্ণনা করতে গিয়ে পারিপার্শ্বিক ঘটনা এবং জেলেদের জীবন খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন এ বইট��তে।
অসাধারণ বলব না, খুবই সাধারণ ভাবে লেখা সমুদ্রজীবি জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে চমৎকার একটি কাজ । অদ্য অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার সরাসরি ব্যবহার একটি ভিন্নমাত্রা এনে দিয়েছে । আর লেখক যে বিস্তর পড়াশোনা করেছেন,এবং তার পরিশ্রম আর যত্নের ছাপ পুরো লেখাতেই পেলাম ।
শুরুটা হয়েছে অনভিপ্রেত এক অনিশ্চিত ভূমিকা দিয়ে। ঠিক এভাবে 🌊🌊 "উথাল-পাতাল বঙ্গোসাগরের দিকে তাকিয়ে আছে উনিশ বছরের ভুবনেশ্বরী। দু'চোখে ভীতি। সমস্ত মুখে উৎকন্ঠা। অন্য কোনোদিকে খেয়াল নেই তার। গভীর ব্যাকুলতায় সে আচ্ছন্ন। তার অসহায় চোখ দুটো সাগরের বুকে কী যেন খুঁজে মরছে। তার দৃষ্টি খুঁজে ফিরছে ঢেউয়ের মাথায় কোনো নৌকার অস্তিত্ব। নির্দিষ্ট একটি নৌকার উপস্থিতিই কেবল তার দুর্ভাবনার অবসান ঘটাতে পারে।" না দেখা যায়নি কোনো নৌকার উপস্থিতি। ফিরে আসেনি চন্দ্রমণি। ভুবনেশ্বরীর স্বামী। স্বামীহারা ভুবনেশ্বরী এই ঢেউয়ের মত উথাল পাতাল জীবনস্রোতে এগিয়ে চলে একমাত্র অবলম্বন গঙ্গাকে নিয়ে। তার ছেলে। দিনে দিনে বয়স হয় ভুবনেশ্বরীর। সাথে বেড়ে ওঠে গঙ্গা। তার ছেলে। সত্যিই মানুষের জীবন বড় বিচিত্র! আর প্রান্তজনদের জন্য তো তা আরও কঠিন! এখানে আছে অপ্রাপ্তির বেদনা, প্রাপ্তির উল্লাস, শোষণের হাহাকার, অশিক্ষার অন্ধকার! আর এই প্রতিটি শব্দের দারুন চিত্ররূপ হয়েছে লেখকের নিপুন তুলিতে৷ কিন্তু ভাগ্যবড় কঠিন ছিলো ভুবনেশ্বরীর তাইতো শেষবেলায় তার প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির পালে ভার বেশি, যা উঠে এসেছে এভাবে.... "গঙ্গার শিয়রের কাছে জল-কাদায় বসে আছে ভুবনেশ্বরী-স্তব্ধ, নিথর, পাথরের মত। দৃষ্টি তার উঠানে-জড়ো হওয়া অসংখ্য মানুষকে ছাড়িয়ে দূরে-বহুদূরে প্রসারিত। সে দৃষ্টিতে প্রতীক্ষার উজ্জ্বল আলো- আনাগত জলপুত্র বনমালীর জন্য।"
সাগরপাড়ের জেলেদের জীবন নিয়ে লেখা চমৎকার একটি উপন্যাস। চট্টগ্রামের ছোট্ট একটা জেলেপাড়ার মানুষের দুঃখ, কষ্ট, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের গল্প। হরিশংকর জলদাসের নিজেরও জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন একটা জেলেপল্লীতেই। তাই এ গল্প বানানো হলেও, এর সাথে মেশানো অনুভূতিগুলোতে কোন খাঁদ নেই। যদিও গল্পের প্রেক্ষাপট বেশ অতীতের। টাকার মান তুলনা করলে বেশ বোঝা যায়। বর্তমান কালে জেলে সমাজের গল্পের সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ বলতে পারি না। চাকরির সুবাদে বঙ্গোপসাগরের জেলেদের জীবন নিয়ে আমার আগ্রহ প্রবল। সেই আগ্রহের তেষ্টা অনেকাংশেই মিটেছে এই বইয়ে।
যেহেতু এটা একটা পুরো জেলেপল্লীর গল্প, তাই চরিত্রও অনেকগুলো। নামগুলোও সাধারণ বাঙালির পরিচিত নাম নয়। তাই চরিত্র মনে রাখতে গিয়ে একটু বেগ পেতে হয়। সংলাপগুলো চাঁটগাইয়া ভাষায় লেখা। যারা চাঁটগাইয়ার সাথে একেবারেই পরিচিত নন তাদের বুঝতে কঠিন হবে কিছুটা।
গল্পের গড়ন সুন্দর, চরিত্র ও কাহিনির বিন্যাস উপন্যাসের সার্থকতা বুনেছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। সব মিলিয়ে পড়ার মত একটি বই। ভিন্ন এক সমাজকে জানার একটি বই।
ত্রি-চরণে স্মরি: জলপুত্র চট্টগ্রামের চাঁটগাঁইয়া ভাষা মোটেও বাংলা ভাষা নয়, ভাষাভাষীর হিসেবে পৃথিবীর ৮৮ তম ভাষা, নিজস্ব বর্ণমালা নেই বলে বাংলার বর্ণমালা ধার করে চলে, সেই ভাষাভাষী পিছিয়ে থাকা এক জাতি সাগরের কাছাকাছি থাকা 'জলপুত্র' বা জলের সন্তানসন্তুতি। লেখক নিজেও একজন জলপুত্র, তাই খুব সহজে তাঁদের চিত্র ফুটিয়ে তোলেছেন, চাঁটগাঁইয়া ভাষার আধিক্য একটু বেশিই, অভ্যস্ত না হলে খুব কঠিন হবে মানিয়ে নিতে। মোটের ওপর চরিত্র গঠন, বর্ণনা ও গল্পের আবহে সময়টা ভালো কেটেছে, শেষ বিশাল এক হাহাকার দানা বেঁধেছে, একটা না কি একাধিক!
"জ ল পু ত্র" একটি সমুদ্রভিত্তিক জেলে নির্ভর উপন্যাস। জেলে সম্প্রদায়ের দুর্বিষহ জীবনযাপন, দারিদ্রের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা,সাধারণ সমাজে অসম্মানিত হওয়া, শিক্ষার অভাবে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া সারাটা জীবন, সুধের বড় সংখ্যার টাকায় সুধখোরদের কাছে হেরে যাওয়া,জীবনের নানা পালা-পার্বণ,উৎসব-নিরানন্দ,কুসংস্কার এইসব তুলে ধরেছেন এক সমুদ্রকেন্দ্রীক আখ্যান। এবং এতে আছে একজন জেলেনীর সংগ্রাম ও জলপুত্রের অধিকার সচেতন হয়ে ওঠার কাহিনী। অসাধারণ একটা বই।
বাংলায় যে সম্প্রদায়গুলো সবসময় শোষিত হয়েছে,সমাজের বঞ্চনার স্বীকার হয়েছে তার মধ্যে জেলে সম্প্রদায় অন্যতম। মানিকের পদ্মানদীর মাঝি বা অদ্বৈত মল্লবর্মনের তিতাস একদি নদীর নাম সেই দুঃখী জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি। হরিশংকর জলদাস নদীকেন্দ্রিক জেলেজীবন থেকে সরে এসে, সমুদ্রকেন্দ্রিক জেলের জীবনকে চিত্রায়িত করেছেন। পার্থক্য শুধু এইটুকুই মনে হয়েছে।
হরিশংকর জলদাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমার এলাকায়ই- এটা জানার পরপরে প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে বইটি পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করি উত্তর পতেঙ্গার জেলেপল্লী খুব বেশি দূরে না হয়েও যেন যোজন যোজন দ���রে। জেলেদের জীবনের হাসি-কান্নার গল্পের অংশীদার লেখক নিজেই, অনায়াসেই তাই বাস্তবতার চিত্র পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পেরেছেন।