(বইমেলাতেই কিনেছিলাম বইটা, সময়াভাবে তখন পড়া হয়নি। আজ এক বসায় পড়ে ফেললাম। ব্যতিক্রমী এক অনুভূতিতে ছেয়ে গেল মন, তাই ভাবলাম একটা রিভিউ লিখে ফেলি।)
~কাহিনি~
কসবি শব্দের অর্থ পতিতা বা দেহপসারিণী। এই বইয়ের কাহিনিও তাদেরকে ঘিরেই। পুরো গল্পই আবর্তিত হয়েছে চট্টগ্রামের সাহেবপাড়া নামের নিষিদ্ধপল্লীর জীবনযাত্রা এবং সেখানকার কিছু মানুষকে ঘিরে। কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে ঠিক সেই অর্থে কেউ নেই, একেক সময় একেকটি চরিত্র ঘটনার ঘনঘটায় হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। এতে পাওয়া যাবে কৃষ্ণা নামের এক হতদরিদ্র মেয়ের দেবযানী নামধারী শীর্ষ-পতিতা হয়ে ওঠার গল্প; কালু সর্দার ও মোহিনী মাসির মাঝে পতিতাপল্লীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতার লড়াই; কৈলাস নামের এক শিক্ষিত যুবকের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও পল্লীর মেয়েদের জীবন বদলে দেবার নীরব আন্দোলনের কাহিনি, ইত্যাদি। অসংখ্য চরিত্রের ছোটবড় নানা আখ্যান সুনিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে বইয়ে, সেই সঙ্গে দেয়া হয়েছে একটি যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি, যা পাঠককে ভাবাতে বাধ্য করবে, নতুন চোখে দেখাবে সমাজের অবহেলিত ও ঘৃণিত একটি শ্রেণিকে।
~প্রতিক্রিয়া~
এক কথায় বলব, ভাল লেগেছে... খুবই ভাল লেগেছে। রিভিউ লিখছি, এটাই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বলে রাখা ভাল, এটাই আমার পড়া হরিশংকর জলদাসের প্রথম বই। তিনি যে অত্যন্ত শক্তিশালী লেখক, তা অনেকদিন থেকেই জানি; আজ বই পড়ে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। আর দশজন লেখকের মত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত নিয়ে কাহিনি রচনা করেন না তিনি, বিষয় হিসেবে বেছে নেন সমাজের নিচু স্তরের অবহেলিত শ্রেণিগুলোকে। ইতিপূর্বে প্রকাশিত রামগোলাম, জলপুত্র, মহীথর, ইত্যাদি উপন্যাসগুলো তাঁর শক্তিমান লেখনীর উজ্জ্বল উদাহরণ বলে জানি। তারপরেও বিষয়বৈচিত্র্যে কসবি যে অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ ছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাতে তিনি শুধু উৎরে যাননি, রীতিমত অসাধারণ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন। কেন্দ্রীয় কোনও চরিত্র ছাড়াই হাজারো ডালপালা মেলা কতগুলো কাহিনিকে এত চমৎকারভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে উপস্থাপন করেছেন যে, প্রশংসা না করে পারা যায় না। এই বই পড়ে নিষিদ্ধপল্লীর জীবনযাত্রা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবেন পাঠক, খুলে যাবে তাঁদের চোখ। সমব্যথী হবেন অসহায় সে-সব মেয়েদের।
বইয়ের ভাষা অত্যন্ত ঝরঝরে, কোথাও আটকে যেতে হয় না। বেশিরভাগ সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার কাহিনিকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। সম্ভবত এ-কারণেই কোথাও কোথাও পতিতা বা অন্যান্যদের কণ্ঠে শুদ্ধ ভাষা লক্ষ করে একটু হোঁচট খেতে হয়েছে। কয়েকটি চরিত্র শুরুতে সম্ভাবনা জাগালেও শেষ পর্যন্ত প্রস্ফুটিত হতে পারেনি, তবে তাতে কাহিনির খুব যে ক্ষতি হয়েছে তা নয়, তবে চরিত্রগুলো নিয়ে আরেকটু কাজ করলে বইটি আরও সমৃদ্ধ হতো। পতিতা বিষয়ক কাহিনি বলে এতে খিস্তিখেউর ও অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ আছে প্রচুর পরিমাণে, তবে সেটা লেখনীর দক্ষতায় মানিয়ে গেছে পুরোপুরি। শারীরিক মিলন বিষয়ক কিছু বর্ণনাও আছে, ফলে এটি কোনও অবস্থাতেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের পড়া উচিত হবে না। বইয়ের ভিতরে কোথাও এ-সংক্রান্ত সতর্কবাণী থাকা উচিত ছিল বলে মনে করি।
বইয়ে বানান বা মুদ্রণপ্রমাদ নেই বললেই চলে, সম্পাদনার মান একেবারে প্রথম শ্রেণির। গত কয়েক বছরে এমন নির্ভুল বই খুব কমই দেখেছি। ছাপা, বাঁধাই... সবই উন্নত মানের। সব্যসাচী হাজরার প্রচ্ছদটিও কাহিনির সঙ্গে মানানসই, অর্থবহ ও হৃদয়গ্রাহী। সব মিলিয়ে দুর্মূল্যের বাজারে ১৬৮ পৃষ্ঠার বইয়ে মুদ্রিত মূল্য ৩০০ টাকা বেশি বলা যাবে না মোটেই; তা ছাড়া মেলায় ২৫% কমিশনে আমি এই বই কিনেছি ২২৫ টাকায়। পরিশেষে বলব, ভিন্নধর্মী বইয়ের পাঠকদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য।
আমার রেটিং - ৪.৫/৫।