তালাল আসাদের সাক্ষাৎকার মানেই অগ্রজ ও অনুজ পণ্ডিতের দিলখোলা আলাপ। চিন্তার মুসিবত এ ধরনের আলাপের নির্বাচিত সংকলন। এ বই তাঁর রচনাবলির কার্যকর পর্যালোচনা। গত কয়েক দশকের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সংক্ষিপ্ত কিন্তু চৌকস সালতামামি আছে এখানে। ‘আধুনিকতা’, ‘পশ্চিম ও অ-পশ্চিম সম্পর্ক’, ‘ধর্ম’, ‘ইসলাম-প্রশ্ন’, ‘সেকুলার’ ইত্যাদিসহ অনেক জরুরি প্রসঙ্গ এ বাতচিতে আলোচিত হয়েছে। তালাল আসাদের মূল গ্রন্থাবলির নানামাত্রিক পাঠের পাশাপাশি এ বই বুদ্ধিবৃত্তিক বহু প্রশ্ন মোকাবিলায় রসদ জোগাবে।
বইয়ের রিভিউয়ের আগে তালাল আসাদ কে, সেটা বলি। তালাল আসাদ হচ্ছেন একজন প্রসিদ্ধ নৃবিজ্ঞানী। তালাল আসাদ আশির দশক থেকে ধর্ম, সেকুলার, ইসলাম, ঐতিহ্য, আধুনিকতা, ক্ষমতা চর্চা ইত্যাদি বিষয়ের দিকে মনোনিবেশ করেন। উনার প্রকাশিত বেশ কিছু মশহুর বই আর প্রবন্ধও আছে। বুঝতেই পারছেন, নি:সন্দেহে বিশাল গুণী একজন মানুষ।
এবার আসি বইয়ের দিকে। 'চিন্তার মুসিবত তালাল আসাদের বাতচিত' দেখেই বুঝতে পারছেন বইয়ে বিস্তর বাতচিত অর্থাৎ সাক্ষাৎকার আছে। হ্যাঁ, পুরো বইটাতে তালাল আসাদের চিন্তাভাবনা, ধর্ম, আধুনিকতা, সেকুলারিজম, ইসলাম এবং পশ্চিমা সমাজ নিয়ে তার বিভিন্ন চিন্তার সাক্ষাৎকার আছে।
বইটার কিছু আলোচনা খুবই ইন্টারেস্টিং। তালাল আসাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক উন্নত সেই ব্যাপারে আমার না বললেও চলবে। তবে পাঠকের অনেক চিন্তাভাবনা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, সেই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই। পাঠক অনেককিছু নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে।
তবে বইটা পুরোপুরি উপভোগ করা একটু কষ্টকর হয়ে যায়। কিছু আলোচনা বেশ কঠিন ও কাঠখোট্টা কিসিমের। আর অনেক জায়গায় মনে হয়েছে একই বিষয় নিয়ে আলোচনা বেশি দীর্ঘ করা হচ্ছে। ফলে পড়ার গতি ঝিমিয়ে যায়।
তারপরেও, সবমিলিয়ে, বইটা খারাপ লাগেনি। অনেক চিন্তার জায়গা করে দিয়েছে। পড়ে দেখতে পারেন। আপনার হয়তো অনেক বেশি ভালো লেগে যেতে পারে।
এই বইটি তালাল আসাদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের লিখিত বাংলা অনুবাদ! বই নিয়ে কথা বলার আগে এই বইয়ের একটি অংশ উল্লেখ করি -
"১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিকদের সামনে মালিনোস্কি বক্তৃতা দিতে গিয়ে তালাল আসাদ বললেন, যুক্তি দিয়ে ভুল ধরিয়ে দিলেই যে মানুষ তাদের মত বদলাবে, আধুনিক যুক্তিবাদের এই ধারণা ভুল। সমাজে বিভিন্ন বর্গের মানুষের বিশ্বাস বেঁচে থাকে কেবল তাদের স্বার্থের কারণে, এই তত্ত্বও বড়ই সরল। মানুষের আচরণ নির্ধারিত হয় যে অভ্যাসের পরম্পরায়, তা বুঝতে হলে ধর্মীয় নিয়মকানুনের সঠিক অর্থোদ্ধারের চেষ্টা না করে, নৃতাত্ত্বিকদের দেখা উচিত—ধর্মীয় রীতিনীতি কী করে, কী করায়।”
বইটির এই লাইন দেখে আমার বইটি পড়ার আগ্রহ জেগেছে। সাক্ষাৎকারগুলোতে তালাল আসাদের যে সকল বই আছে তা নিয়ে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা হয়—সেকুলার, সেকুলারিজম, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ইসলাম, ইসলামিজম—এছাড়াও বিভিন্ন মতবাদকে নৃবিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। এছাড়াও তার ব্যক্তি জীবন, তার মা-বাবা, তার কাজ, তার জন্মস্থান ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব নিয়েও আলোচনা আছে। পাকিস্তানের আলাপ করার সময় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কয়েকটি বাক্য বলেন।
সাক্ষাৎকারগুলো পড়লে দেখবেন তিনি এখানে অনেকের সমালোচনা করেছেন, বিশেষ করে সালমান রুশদীর; এছাড়াও লাকা, ফুকো, আলথুসারেরও অনেক ক্রিটিক করেছেন।
উনার বক্তব্যে ও বইয়ে উনি সবচেয়ে বেশি সেকুলারিজমের সমালোচনা করেন, আর তিনি ইসলামিজমকে (শরিয়াকে) দেখেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে—অর্থাৎ শরিয়া (খেলাফত) নাকি সাম্রাজ্যবাদকে থামাতে পারবে! অবশ্য কয়েক জায়গায় তিনি শরিয়ার কিছু খামতির কথাও উল্লেখ করেছেন। যদিও উনি সরাসরি এর বিকল্প কিছু প্রস্তাব করেননি, এদিক থেকে উনাকে আমার কনফিউজিং মনে হয়েছে—উনি একদিকে সেকুলারিজম, গণতন্ত্র এগুলোকে সাম্রাজ্যবাদের অংশ হিসেবে দেখেন, এর বিকল্প হিসেবে সমাজতন্ত্র বা জাতীয়তাবাদকে না এনে শরিয়াকে বিকল্প মনে করেন; কিন্তু স্পষ্টভাবে বলতে না পারা, আবার শরিয়ার খামতির কথাও মাথায় রাখা—অনেকটা কনফিউজিং।
উনার আলোচনা ভালো লেগেছে, কিন্তু পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। যাই হোক, সকলে একবার হলেও উনাকে পাঠ করা উচিত—বিশেষ করে তিনি নতুনভাবে চিন্তা করতে শিখাবেন—ধর্ম, সেকুলারিজম, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ইসলাম ও ইসলামিজম নিয়ে।