দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশবিভাগ পর্যন্ত কাল-পর্ব ধরে জননী উপন্যাসটি রচিত হলেও সমসাময়িক কালের গ্রাম-বাংলার সমাজজীবনের ছবি তাতে পাওয়া যায় না। উপন্যাসের পটভূমি সম্ভবত আরো আগের অর্থাৎ বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের গ্রাম; লেখকের বর্ণনায় গ্র্যান্ড ট্র্যাঙ্ক রোডের পাশে ছোট্ট এই গ্রাম মহেশডাঙা। গরীব কৃষক ও গ্রামীণ বৃত্তিজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অনটনের ও নানা সমস্যার চিত্রকে উপজীব্য করে এ-উপন্যাসটি রচিত। 'জননী' উপন্যাস মূলত মহেশডাঙা গ্রামের দরিদ্র লাঞ্ছিত কয়েকটি পরিবারের, বিশেষ করে, উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র দরিয়াবিবির দুঃখ দুর্দশাপূর্ণ সাহসিক জীবন সংগ্রামের কাহিনী। দরিয়া আর আজহারের জীবন কাহিনীর পাশাপাশি এ উপন্যাসে পল্লী পরিবেশে নব জীবনের নানা ভাঙ্গা-গড়া, অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, অন্তর্দাহ ও নানা নিপীড়নের বাস্তবচিত্র অঙ্কিত হয়েছে ।
Shawkat Osman (Bengali: শওকত ওসমান; Sheikh Azizur Rahman; 1917 – 1998) was a Bangladeshi novelist and short story writer.Osman's first prominent novel was Janani. Janani (Mother)is a portrait of the disintegration of a family because of the rural and urban divide. In Kritadaser Hasi (Laugh of a Slave), Osman explores the darkness of contemporary politics and reality of dictatorship.
Awards Bangla Academy Award (1962) Adamjee Literary Award (1966) President Award (1967) Ekushey Padak (1983) Mahbubullah Foundation Prize (1983) Muktadhara Literary Award (1991) Independence Day Award (1997)
শওকত ওসমানের জননী আদতেই একটি চমৎকার অর্থবহ উপন্যাস। মাকে নিয়ে লেখক লিখেছেন তো বটেই সেই সাথে বাঙ্গালীর রক্তে মিশে থাকা কিছু বিষাক্ততা নিয়ে কলম তুলেছেন।দেশভাগের পূর্বে অবিভক্ত বাংলায় সম্পূর্ন গ্রামীন প্রেক্ষাপটে গোটাকয় চরিত্র নিয়ে লেখা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জননী দরিয়াবিবি। শওকত ওসমানের জননী দরিয়াবিবিকে লেখক বাংলার সকল মায়ের প্রতিকৃতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। মায়ের জন্য তার প্রতিটি সন্তানই পরম স্নেহের,সে হোক বৈধ কিংবা অবৈধ সন্তান। এই উপন্যাসে শওকত ওসমান দেখিয়েছেন সেই অবিভক্ত বাংলার মাটিতে দানা বাধা ধর্মকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর কোন্দল, ধর্ম ব্যবসায়ীদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সমাজে মানুষে মানুষে ভেদাভেদকারী গোষ্ঠী সমাজকে কীভাবে কলুষিত করতে পারে তার জ্বলন্ত কাল্পনিক রূপে বাস্তব চিত্র। লেখক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছেন একজন অবলা অভাবী ও অকূল পাথারে ভাসমান নারী যখন তার দুর্দিনে থৈ খুঁজে পায়না তখন পরিজনের নামে লেবাসধারি মুখোশ পরিহিত উপকারের নামে নিজের কাম চরিতার্থ করে এমন ভণ্ড মিথ্যুক আর কাপুরুষ দিয়ে পৃথিবীটা ছেয়ে গেছে। দেশভাগের পর এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার এতবছর পর এসেও এই ধর্ষক ভণ্ড চরিত্রের লোকদের দৌরাত্ম্য কমেনি বরং বেড়েছে সেই সাথে কমেনি ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রতাপ। বাঙ্গালীর চিরাচরিত রক্তে মিশে থাকা বিষাক্ত মানসিকতা সেই প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাঙালির বৈশিষ্ট্যে দগদগে ঘা এর মত প্রমাণিত হয়েছে উপন্যাসে। শওকত ওসমানের লেখনী জটিল এবং শক্তিশালী, লেখার ধরনটা মুগ্ধকর; সংলাপ ছিলো সাধারণ কিন্তু ভাবপ্রকাশের ধরণ ছিল গভীর ও সাধু ভাষায়। বইয়ের শেষটুকু বইটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।মা তো মা ই, মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া প্রত্যেকটি সন্তানই তার জন্য অমুল্য।লেখক তার বলিষ্ঠ হাতে লিখে গেছেন একজন মা তার সন্তানের প্রয়োজনে যেন সব পারে; সে কখনো প্রসূতির ভূমিকায়, কখনো বা ধাত্রীর ভূমিকায় আবার কখনো জল্লাদের ভূমিকাও পালন করতে পারে। বিষাক্ত এই পৃথিবীতে মায়ের মমতার পরিপূরক কিছু খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুক।
اگر کوئی ناول پہلے سو صفحات میں بور کرے اور آخری سو صفحات میں جا کر پڑھنے والے کو جکڑ لے تو ایسے ناول کو اچھوں میں جانیں یا نہیں!؟۔ شوکت عثمان کے اس ناول کو بنگلہ دیشی ادب کے نمایاں کاموں میں گنا جاتا ہے۔ فنی لحاظ سے ناول کی بُنت اچھی ہے اور آہستہ آہستہ پلاٹ کھلتا اور کردار سامنے آتے ہیں۔ مسئلہ صرف اتنا ہے کہ کہانی بے حد سست روی سے آگے بڑھتی ہے اور بے جا طوالت ہے جس سے بوجھل پن پیدا ہوتا ہے۔ جو بات سو ایک سو پچاس میں کہی جاسکتی ہے اسے تین سو صفحات تک طول دینا سمجھ سے بالا تر ہے۔ کہانی کا اختتام البتہ متاثر کن اور بےچاری دریا بی بی کا انجام خاصا جذباتی قسم کا رہا جس کی وجہ سے ناول کو اچھوں میں ہی جانیں۔
শওকত ওসমান অতি সহজ-সরল করে বাংলার গ্রামের চিরায়ত চিত্রকে "জননী"র মাধ্যমে পাঠকের কাছে নিয়ে এসেছেন।
জননী দরিয়াবিবি যেন বাংলার সকল মায়ের মাতৃরূপে উপন্যাসে প্রতিনিধিত্ব করেছে।মোনাদির,আমজাদসহ দরিয়াবিবির সন্তানদের প্রতি তার মমতা যেন উপন্যাসে ভিন্নমাত্রা এনে দিয়েছে।
দেশভাগপূর্ব অবিভক্ত বাংলার গ্রামীণ সমাজের অর্থনৈতিক সংকট,হিন্দু-মুসলিম রেশারেশিসহ একটি পূর্ণ গ্রামীণ পটভূমিকে কেন্দ্র করে কতো চমৎকার লেখনী হতে পারে তার দৃষ্টান্ত "জননী"।
আসেন,কিছু নেগেটিভ কথা বলি। উপন্যাসে কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্তি সরাসরি না হলেও হয়েছে আর ঘটনা বুঝতে মাঝেমধ্যে কিঞ্চিত সমস্যা হয়েছে।
অনবদ্য, অসাধারণ। দরিয়ার মতোই বিশাল দরিয়াবিবির চরিত্র।মা মুরগীর মতো আগলে রাখে সংসার, খাঁ বংশের ঠাঁট। কিন্তু নুন আনতে যেখানে পান্তা ফুরায় আত্মমর্যাদা সেখানে বিলাসিতা।
৩.৫/৫ বেশ শীত পড়েছে। কুয়াশার চাদর চারদিকে। এমন দিনে কম্বলের নিচে বসে বসে গল্পের বই পড়া আর গরম চায়ে চুমুক দেয়ার আয়েশের তুলনা আর কিছুতে হয় না। এই আয়েশী দিনগুলোর অবসরেই পড়ে ফেললাম বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পরিচিত জননী দরিয়াবিবির কাহিনী। জননী -মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জননী- শওকত ওসমান দুইই খুব বিখ্যাত উপন্যাস। জননীর অন্যান্য রূপ মা-ম্যাক্সিম গোর্কি বা মা- আনিসুল হক ও কম জনপ্রিয় নয়। সম্ভবত মাকে উপজীব্য করে গড়ে তোলা কাহিনীর সাথে পাঠককুল যতটা সংশ্লিষ্ট হতে পারেন, অন্য কিছুতে ততটা নয়। ফিরি যে উপন্যাস নিয়ে কথা বলতে চাইছি সেটিতে। জননী পড়তে চেয়েছি অনেক দিন ধরে। তারপর শীতের মরসুমে গ্রামের খেজুররসের হাতছানিতেই বইটি পড়ে ফেললাম। চমৎকার সাবলীল ভাষায় পূর্ব বাংলার অপার্থিব সৌন্দর্য আঁকতে কোন কার্পণ্য করেননি লেখক। ধানক্ষেত, নদী, চাষীদের জীবন, মাটির নিকোনো ঘর উঠান, প্রতিবেশীদের হার্দিক চিত্রাঙ্কনে সাঁঝের প্রদীপরূপে পাঠকগণও উপস্থিত থাকেন উপন্যাসের পটভূমিতে। দরিয়াবিবির দুই বিয়ে। প্রথম পক্ষের সন্তান মোনাদির। প্রথম বিয়ে ভাঙার পরে খাঁ বংশের সন্তান আজহার খাঁয়ের সাথে শাদি হয় তার। আজহার খাঁ উচ্চবংশীয় হলেও অর্থে দরিদ্র। তাই তার সংসারটা নিপুণভাবে চালাতে দরিয়াবিবিকে হিমশিম খেতে হয়। তবুও পোষাপ্রাণীদের প্রতি মমতার তার কোন অন্ত থাকে না। কারণ এই প্রাণীগুলোর বিনিময়েই সময়ে সময়ে স্বস্তি আসে দরিদ্র পরিবারটিতে। এই পক্ষের সন্তানদের মধ্যে রয়েছে আমজাদ, নইমা আর পরবর্তীতে শরী। আজহার খাঁ এর উদাসী প্রকৃতি কিন্তু সৎ স্বভাব তাকে স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে দেয় না। অদ্ভুত এক চরিত্র চন্দ্র কোটাল। কোথা থেকে এত দারিদ্র্যের মধ্যেও গান আসে তার, প্রাণে আনন্দ আসে আজহার তা বুঝতে পারে না। চন্দ্র কোটাল চরিত্রটি অত্যন্ত সাহসী চরিত্র, যে অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা তার থাকে তা ওই প্রেক্ষাপটের একজন মানুষের মধ্যে সত্যিই বিরল। দরিয়াবিবি উপন্যাসের মূল চরিত্র হলেও আমার কাছে আজহার খাঁকে মনে হয়েছে উদার বেশি কারণ স্ত্রী এর প্রথম পক্ষের সন্তানের প্রতি তার মমতার অন্ত থাকে না। ইয়াকুব এর আগমন এবং দারিদ্র্য, মোনাদিরের চলে যাওয়া দরিয়াবিবির চরিত্রে আমূল পরিবর্তন আনে। সে হারিয়ে বসে আত্মমর্যাদাবোধ, এর জন্য অনেকটাই দায়ী অন্ধ সন্তানস্নেহ। মোনাদিরের প্রতি। সত্যি বলতে দরিয়াবিবি যতটা মোনাদিরের মা, ততটা কি আমজাদ, নইমা বা শরীর মা হয়ে উঠতে পেরেছিল? গল্পের শেষটা খুব মন খারাপ করা। ইংরেজ শাসন এবং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কথা আনুষঙ্গিক হিসেবে এসেছে উপন্যাসে, এসেছে গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং ভাঁড়নাচের কথা। স্বল্প চরিত্রের এই উপন্যাসটি একটা সময়ের দলিল, পাশাপাশি মানুষের মনস্তত্ত্ব, মায়ের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং স্খলনের একটি মূর্ত চিত্র।
উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো একটু বেশী শক্তিশালী।একটু বেশি মানবতাবাদী যেন। চন্দ্রকোটালের স্ত্রীর উক্তি টা এখনো কানে বাজে,"গাঁয়ে হিন্দু-মুসলমানের ঝগড়া তো ভাইয়ের সঙ্গে কী।যতসব অপসিষ্টি,হতচ্ছাড়া লোক।" কিংবা,"জমিদারে জমিদারে ঝগড়া। বড়লোক বড়লোকে দলাদলি তোদের কি?" একটা স্পয়লার দেয়ার লোভ সামলাতে পারছিনে। গল্পের ইয়াকুব চরিত্রটা যেন পদ্মা নদীর মাঝির "হোসেন মিয়া" চরিত্রটার মতই,কিন্তু আরো যেন বেশী শক্তিশালী,একটু বেশি মানবিক-রক্তে মাংসের। আরেকটু কম রহস্যময়, আর গল্পের প্রয়োজনে একটু বেশীই প্রয়োজনীয়। কিন্তু,সবকিছু ছাপিয়ে উপন্যাসটাকে নদীর ধারার মত সামনে প্রবাহিত করে নিয়েছেন দরিয়াবিবি। চন্দ্রকোটালের মত বলতে চাই, "দরিয়াবিবি.. .সেলাম... সেলাম।"
গল্পটা মহেশডাঙা গ্রামের।গল্পটা একজন মায়ের।দরিয়াবিবির।দরিয়াবিবি একজন সংগ্রামী নারী।সংগ্রামী মা।কতটা সংগ্রামী হতে পারে,সেটা বলে দিতে ইচ্ছে করছে।কিন্তু,উপন্যাসের লাস্ট ১৫-২০ পাতায় প্রকাশ পাওয়া সেই কস্টকর মাতৃত্বের বোঝাপড়া আর যুদ্ধের কাহিনীতে আমি বার বার শিওড়ে উঠেছি।পাঠকদের জন্যেই রেখে দিলাম সেটা।
পড়া শেষ করলাম শওকাত ওসমানের "জননী"। কোথা থেকে শুরু করবো আসলে বুঝতে পারছিনা। কালকে বইটা শেষ করার পরে কিছুক্ষণ দম মেরে পড়ে ছিলাম। বইয়ের মূল চরিত্র দরিয়াবিবি। গ্রাম্য বধু। অভাবের সংসার। সংসারের সব কাজ একাই সামলান। তাঁর স্বামী আজহার আলী কৃষি কাজ করেন। বছরের কিছু সময় নিরুদ্দেশ হয়ে থাকেন গ্রামের বাইরে ছুতারের কাজ করেন, ব্যবসা করার চেষ্টা করেন। বড় সাধাসিধে মানুষ। কারো সাতে-পাঁচে নেই। চন্দ্রকোটাল এক পাগলাটে নওজোয়ান। পুরো উপন্যাসে তাঁকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর আইডিয়োলজির জয়জয়কার দেখানো হয়েছে উপন্যাসে। ধর্ম সব খারাপ। গরীব মানুষের কোন ধর্ম নাই, সব শালা বড়লোকদের ধান্দাবাজি। গল্পের প্রধান পটে গ্রাম্য রাজনীতির ছাপ টেনে নিয়ে আসার আসলে কোন যৌক্তিকতা ছিলো বলে আমার মনে হয়না। উপন্যাসটা রাজনৈতিক নয়। কিন্ত লেখক তাঁর রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় মতবাদকে প্রচার করার সুযোগের অসদ্বব্যহার করেননি। গল্পের এক অংশে আমার বরং মনে হয়েছিলো গল্পের "জননী" আসলে হয়তো দরিয়াবিবি নন। বিধবা আমিরন চাচীকেই বরং এক পর্যায়ে অধিক শক্তিশালী মনে হয়েছে চরিত্রগত দিক দিয়ে। তবে পুরো উপন্যাস শেষ করার পরে আমার উপলদ্বি, জননী কোন একক চরিত্রকে নামকরণ হয়নি। উপন্যাসের প্রতিটা নারী চরিত্রই এই উপন্যাসের "জননী"। বিধবা আমিরন চাচীর একলা হাতে ছিমছাম একটা সংসারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, বন্ধ্যা হাসু বৌর একটা বাচ্চার জন্যে তীব্র হাহাকার, অতি আদিম শ্বাশুরী রূপে সাকেরের মা এবং অবশ্যই দরিয়াবিবি, যে কিনা নিজ সংসারের জন্যে, নিজ সন্তানের জন্য শেষ পর্যন্ত নিজপর সর্বস্ব বিলিয়ে দেয় এক পর্যায়ে। উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে যার চরিত্রায়ন হয় একাধারে প্রসূতি, ধাত্রী এবং জল্লাদ রূপে।
This entire review has been hidden because of spoilers.
অনবদ্য! A single family and some people who came along in the picture with the family, just perfectly portrayed the typical rural life of Bangladesh, poverty-striken but yet abundant, complicated but yet so simple. As many other good books, melancholy will just engulf the reader. Another gem for adorning the collection.
দরিয়াবিবি একজন নারী, একজন মা। মা যে কতটা সংগ্রামী হতে পারে সেটা উপন্যাসেই তুলে ধরেছেন শওকত ওসমান। ইয়াকুবের চরিত্রের মাধ্যমে উঠে এসেছে আদিম কাল থেকে চলা আসা কিছু লম্পট মানুষের মুখাবয়ব। তবে চন্দ্র কাকার চরিত্রটা আমার কাছে ভালো লাগছে৷উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্রই সংগ্রামী।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যোদ্ধা মা, এই কথাটিই প্রমাণিত হয়েছে এই উপন্যাসে।ভেবেছিলাম এটাকে 4★ দিব, কিন্ত উপন্যাসের শেষটা আমাকে 5★ দিতে বাধ্য করেছে। "শুধু প্রসূতি,ধাত্রী নয়।আর এক কর্তব্য সম্পাদনা বাকি আছে।দরিয়াবিবি যে জল্লাদ।"
গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে রচিত জননী উপন্যাস সময়ের বিচারে অনেকটা সেকেলে৷ ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের গ্রামীণ বাঙালির জীবন, সামাজিক ও ধর্মীয় মুল্যবোধ, গোড়ামী ও ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েনের উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে এই উপন্যাসে৷ উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্র উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও প্রধান চরিত্র দরিয়াবিবি৷ দুঃখ-দুর্দশাপূর্ণ সাহসিক জীবন সংগ্রাম এবং সন্তানদের প্রতি সমান ও অকৃত্রিম ভালোবাসা উপন্যাসে অনন্য স্থান দিয়েছে দরিয়াবিবিকে৷ উপন্যাসের শুরু হয় গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে৷ যে রাস্তায় জড়িয়ে আছে দরিয়াবিবির দ্বিতীয় স্বামী আলী আজহার খাঁ এর পূর্বপুরুষের ইতিহাস। আলী আজহার একজন গরীব মামুলি চাষী৷ চাষাবাদে সংসার চলে না বলে বছরের বিভিন্ন সময় রাজমিস্ত্রীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে৷ দরিয়াবিবির প্রথম স্বামী মারা যাবার পর সন্তান মোনাদির সহ নিঃস্ব অবস্থায় প্রথম স্বামীর ঘর ত্যাগ করে। এবং কিছুদিন বাদে আলী আজহারের সাথে ঘর বাঁধে৷ যে ঘরে আরো দুটি সন্তান আসে— আমজাদ ও নাঈম���। উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র চন্দ্র কোটাল৷ যার ঘাড়ে চড়ে পাঠক অনায়েসে ঘুরে আসতে পারবেন আদী ও নিখাদ গ্রামীণ জীবনে৷ চন্দ্র কোটালের ঘাড়ে চড়ে এই ভ্রমণ আপনাকে সুখকর, তৃপ্তির অনুভূতি দিবে৷ হারিয়ে যাবেন অন্য রাজ্যে৷ দেশভাগ পূর্ববর্তী গ্রামীণ জীবন মোলায়েম ও আকর্ষণীয় ভাবে চিত্রিত হয়েছে উপন্যাসে৷ যেমন অনুভূতি হয়েছিল বিভূতিভূষণের আরণ্যক পড়ে৷ লেখকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে পারবেন হিন্দু-মুসলমানের ভিতরে সংঘাত। হিন্দু-মুসলমান ভাই-ভাইয়ের বিভাজন৷ উপন্যাসে দরিয়াবিবির একই সাথে দুইটি দিক ধরা দেয়৷ নারীত্ব ও মাতৃত্ব। স্ব��মী বিয়োগের পরে দরিয়াবিবি অকূল পাথারে পড়ে ইয়াকুবের সান্নিধ্যে বেশি আসে৷ অর্থ আর আত্মসম্মানের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ইয়াকুব বিষ বাসনা নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়৷ সন্তানদের লালন পালনের জন্য ইয়াকুবের কাছে হাত পাততে যেমন মাতৃত্বের, মমতার ছাপ দেখতে পাই, তেমনি চরিত্রহীন ইয়াকুবের কুনজর লক্ষ্য করেও দরিয়াবিবির কিছুটা প্রশ্রয় দেয়াও দৃষ্টিগোচর হয়৷ নিয়মিত পতিশয্যা ভোগ করা দরিয়াবিবির একটি দৈনন্দিন অভ্যাস ছিল বিধায় মাঝে মাঝে সে চাহিদা মাথা চারা দিয়ে উঠত। অন্তিম সর্বনাশের মুহূর্তে দরিয়াবিবির চুপ থাকা কিংবা শরীর শীতল হবার ঘটনা ইঙ্গিত দেয় দরিয়াবিবির আংশিক সম্মতির। তিনজন পুরুষের চারটি সন্তানকে দরিয়াবিবি তার গর্ভে ধারণ করে। দুইজন পুরুষ বৈধতা দিলেও তৃতীয় জনের কোনো বৈধতা নেই। অনৈতিক উপায়ে, সমাজ বহির্ভূত নিয়মে দরিয়াবিবির সাথে তার সঙ্গম হয়। এবং চতুর্থ সন্তানকে ঘিরে গল্প করুণ পরিনতিতে রূপ নেয়৷ মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির ‘মা’ কিংবা গোর্কির বিপ্লবী ‘মা’ কিংবা আনিসুল হকের ‘মা’ কিংবা মানিকের ‘জননীর’র- মা প্রত্যেকে বিষয় ও আঙ্গিকে পৃথক হলেও শওকত ওসমানের ‘জননী’র মা ভিন্নতর মাত্রায় তাদের চেয়ে আলাদা ও অনন্য৷ উপন্যাসের শেষ কয়েক পৃষ্ঠা পড়লেই তা সকলের কাছে প্রতীয়মান হবে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর জননীর পর শওকত ওসমানের জননীর কথা পড়লুম। কিছু কিছু পরিস্থিতিতে মানুষের মৃত্যু খুব খারাপ নয়। দুঃখের বিষয় হলো মানুষ নিজের পরিবারের কথা ভেবে কখনো আত্মঘাতী হয় না বেশিরভাগই সমাজের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করে মরে । তাও যেখানে মৃত্যু সত্যিই প্রয়োজন সেখানে সমাজ কিংবা নিজের পরিবার, সবই ঠুংকো
উপন্যাসটি আদতে কেবল কালির আঁচড়ে বোনা কয়েকটি অক্ষরপুঞ্জ নয়, এ যেন এক নিদারুণ জীবন্ত প্রতিচ্ছবি; যেখানে গ্রামীণ বাংলার নিগূঢ়তম সত্যগুলো উন্মোচিত হয়েছে চরম নির্মোহতায়। ১৯৫৮-র ধূসর পৃষ্ঠায় যে সৃষ্টি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, তা নিছকই এক সাহিত্যকর্ম নয়, বরং তা শওকত ওসমানকে বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় নক্ষত্রমণ্ডলীতে এক দেদীপ্যমান স্থানে চিরতরে অধিষ্ঠিত করেছে। আর এর প্রাণকেন্দ্রে যে চরিত্রটি ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে, সেই দরিয়া বিবি শুধু একজন নামসর্বস্ব নারী নন, সে তো যেন এই বাংলার প্রতিটি মায়ের শাশ্বত, অবিচল প্রতিচ্ছবি, যার অস্তিত্ব জুড়ে কেবল মাতৃত্বের অনন্ত স্ফুলিঙ্গ। 'জননী' উপন্যাসের পরতে পরতে শওকত ওসমান এক নিদারুণ দক্ষতায় বাঙালি মায়ের সেই সর্বজনীন, অবিনশ্বর রূপটিকে উন্মোচন করেছেন। দরিয়া বিবির কাছে তার প্রতিটি সন্তানই পরম স্নেহের আধার, সে জন্মগতভাবে বৈধ হোক বা অবৈধ — মায়ের ভালোবাসার অমোঘ টানে সকল ভেদাভেদ যেন এক লহমায় অর্থহীন হয়ে যায়। এই উপন্যাসের প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছে মাতৃত্বের সেই অদম্য, অপ্রতিরোধ্য শক্তি আর এক অলঙ্ঘনীয় আত্মত্যাগের ইতিকথা। লেখক তার বলিষ্ঠ, নির্ভীক কলমে দেখিয়েছেন, কীভাবে একজন মা তার সন্তানের ক্ষুদ্রতম প্রয়োজনেও প্রসূতি, ধাত্রী, এমনকি প্রয়োজনসাপেক্ষে এক অকম্পিত জল্লাদের ভূমিকাও পালন করতে সক্ষম হন। এই বিষাক্ত, কলুষিত পৃথিবীর কর্দমাক্ত পথচলায় মায়ের মমতা যেন এক অপরিহার্য, শীতল আশ্রয়, যার তুলনা মেলা ভার।
তবে 'জননী' কেবল মাতৃত্বের জয়গান গেয়েই ক্ষান্ত হয়নি, এ যেন অবিভক্ত বাংলার সেই গ্রাম্য সমাজের গভীরে প্রোথিত অন্ধকার দিকগুলোকে এক নির্মম বাস্তবতার ছায়ায় তুলে ধরেছে। শওকত ওসমান তার তীক্ষ্ণ, সুগভীর পর্যবেক্ষণে সেই সময়ের ধর্মকেন্দ্রিক গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বিষবাষ্প আর ধর্ম ব্যবসায়ীদের আগ্রাসী উত্থানের মর্মান্তিক ছবি এঁকেছেন। কীভাবে এই তথাকথিত ধর্মগুরু আর সমাজের স্বঘোষিত মাতব্বররা মানুষে মানুষে বিভেদের বিষবৃক্ষ রোপণ করে এবং পুরো সমাজকে এক ভয়াবহ কলুষতার দিকে ঠেলে দেয়, তার এক জ্বলন্ত, কাল্পনিক অথচ বাস্তব চিত্র এই উপন্যাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় বিধৃত। অদ্ভুতভাবে, সেই চিত্র আজও আমাদের বর্তমান সমাজে এক ভয়াবহ প্রাসঙ্গিকতা বহন করে চলেছে।
এই উপন্যাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যখন একজন অবলা, অভাবী আর অকূল পাথারে ভাসমান নারী তার দুর্দিনে একবিন্দু আশ্রয় খুঁজে পায় না, তখন ‘ইয়াকুবের’ মতো পরিবারের নামধারী বা তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীর মুখোশ পরা ভণ্ড, মিথ্যুক আর কাপুরুষেরা কীভাবে সেই অসহায়তার সুযোগ নিয়ে উপকারের ছদ্মবেশে নিজেদের পাশবিক কামনা চরিতার্থ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। এই চরিত্রগুলো কেবল সেই সময়ের সমাজের নির্মম প্রতিচ্ছবি নয়, দেশভাগের পর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার এতগুলো যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তাদের দৌরাত্ম্য যেন একবিন্দু কমেনি, বরং উল্টো বেড়েছে। ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রতাপও যে একইরকম ভয়াল রূপে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসেছে, তা আজ আমাদের সমাজের এক অনস্বীকার্য, কঠিন বাস্তবতা।
শওকত ওসমান তার 'জননী'তে বাঙালির চিরাচরিত রক্তে মিশে থাকা সেই বিষাক্ত মানসিকতাকে নগ্নভাবে উন্মোচন করেছেন। সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে এই বিষাক্ততা যেন এক দগদগে, অসহ্য ঘায়ের মতো প্রমাণিত হয়েছে। লেখক তার নির্ভীক, কুঠারসদৃশ লেখনীর মাধ্যমে এই জটিল সামাজিক অবক্ষয়কে অত্যন্ত তীক্ষ্ণতা ও কুশলতার সাথে তুলে ধরেছেন। শওকত ওসমানের লেখনী জটিল হলেও অদম্য শক্তিশালী, তার লেখার ধরন যেন এক সম্মোহনী জাদু সৃষ্টি করে। উপন্যাসের সংলাপগুলো ছিল প্রাত্যহিক, আটপৌরে, কিন্তু তাদের ভাবপ্রকাশের ধরণ ছিল গভীর, সুদূরপ্রসারী এবং সাধু ভাষার এক অনুপম মিশ্রণে গড়া, যা পাঠককে এক অলৌকিক, ভিন্ন জগতে টেনে নিয়ে যায়।
এই বইয়ের শেষটুকু উপন্যাসটিকে এক অকল্পনীয় উচ্চতায় স্থাপন করেছে। মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া প্রতিটি সন্তান তার জন্য অনস্বীকার্যভাবে অমূল্য।*****মর্মান্তিক পরিণতি পাঠকহৃদয়কে গভীরভাবে বিদীর্ণ করে এবং 'মা' নামের এই অসাধারণ, সর্বংসহা সত্তার প্রতি এক অসীম, অবিনশ্বর শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলে।
'জননী' উপন্যাস শুধু এক নিছক কাহিনি নয়, এটি এক চিরন্তন, অমোঘ সত্যের প্রতিধ্বনি। শওকত ওসমান তার বলিষ্ঠ হাতে যেন লিখে গেছেন যে, এই বিষাক্ত, প্রতারণাময় পৃথিবীতে মায়ের মমতার পরিপূরক কিছু খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুক, তাদের আত্মত্যাগ, ভালোবাসা ও সংগ্রামের জয় হোক—এই কামনাই এই উপন্যাসের মূল সুর, যা পাঠকের হৃদয়ে চিরকাল অনুরণিত হয়।
বই - জননী লেখক - শওকত ওসমান প্রকাশনী - সময় প্রচ্ছদ মূল্য - ২৫০৳ পৃষ্ঠা সংখ্যা - ২০৮ গুড রিডস রেটিং - ৪.১৬/৫
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশভাগপূর্ব অবিভক্ত বাংলার গ্রামীণ সমাজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট, শাসকের চক্রান্তে হিন্দু-মুসলিম দলাদলি, গ্রামীণ জীবণের সংগ্রাম সহ একটি পূর্ণ গ্রামীণ পটভূমিকে কেন্দ্র করে চমৎকার একটি উপন্যাস শওকত ওসমানের "জননী"।
উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে মহেশডাঙা গ্রামের কয়েকটি দরিদ্র পরিবারের, বিশেষত, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দরিয়াবিবির দুঃখ-দুর্দশাপূর্ণ জীবন সংগ্রামের কাহিনীকে কেন্দ্র করে। দরিয়াবিবি যেন উপন্যাসে প্রতিনিধিত্ব করেছে গ্রামবাংলার সকল মায়ের। দরিয়াবিবির বর্তমান সংসারের এক পুত্র আর দুই কন্যা, আর আগের সংসারের এক পুত্র মোনাদির। মা মুরগীর মতো সে আগলে রাখার চেষ্টা করে তার সন্তান আর সংসার।
তার স্বামী আজহার আলী কৃষি কাজ করে। বছরের কিছু সময় নিরুদ্দেশ থাকে, গ্রামের বাইরে ছুতারের কাজ করে, ব্যবসা করার চেষ্টা করে। বড় সাধাসিধে মানুষ, আর সংসারের প্রতি উদাসীন, যাকে কিনা দরিয়াবিবির মতো তেজস্বী নারীর স্বামী চরিত্রে কিছুটা বেমানান লাগে।
চন্দ্রকোটাল এক পাগলাটে নওজোয়ান। 'ধর্ম সব খারাপ। গরীব মানুষের কোন ধর্ম নাই, সব শালা বড়লোকদের ধান্দাবাজি' - এইই তার ধারণা। চন্দ্রকোটালের স্ত্রীর উক্তি এখনো কানে বাজে যেনো, "গাঁয়ে হিন্দু-মুসলমানের ঝগড়া তো ভাইয়ের সঙ্গে কী। যতসব অপসিষ্টি,হতচ্ছাড়া লোক।" অথবা, "জমিদারে জমিদারে ঝগড়া। বড়লোক বড়লোকে দলাদলি, তোদের কি?"
ইয়াকুবের চরিত্রের মাধ্যমে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন আদিম কাল থেকে সমাজে বাস করা লম্পট মানুষের মুখাবয়ব।
জায়গায় জায়গায় গ্রামীণ পরিবেশের বর্ণনা পড়তে বিরক্ত লাগতে পারে, তবে উপন্যাসের সমাপ্তিটা যে কোনো পাঠককে বিস্ময়াভিভূত করে ছাড়বে বলেই আমার বিশ্বাস।
উপন্যাসের নাম " জননী", স্বাভাবিকভাবেই মূল চরিত্র একজন নারী। তবে এই উপন্যাসের প্রায় প্রত্যেকটি নারী চরিত্রকে শক্তিশালী মনে হয়েছে আমার। "জননী" কোন একক চরিত্রকে নামকরণ হয়নি, বরং উপন্যাসের প্রতিটা নারী চরিত্রই এই উপন্যাসের নামকরণের স্বার্থকতার প্রমাণ রেখেছে যেনো।
বিধবা আমিরন চাচীর একলা হাতে ছিমছাম একটা সংসারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, স্বামীর মৃত্যুর পর দেবর যার সম্পত্তি দখল করতে চায়, আর মা হিসেবে সে চায় যেকোনো মূল্যে মেয়ে আম্বিয়ার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। বন্ধ্যা হাসুবৌয়ের একটা বাচ্চার জন্যে তীব্র হাহাকার, অতি আদিম শ্বাশুড়িরূপে সাকেরের মা। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে বন্ধ্যা হওয়া সত্ত্বেও সে ঠিকই পুত্র সন্তানের মা হয়। এবং অবশ্যই সবকিছু ছাপিয়ে উপন্যাসটাকে নদীর ধারার মত প্রবাহিত করে নিয়ে গেছে দরিয়াবিবি, যে কিনা নিজ সংসারের জন্যে, নিজ সন্তানের জন্য শেষ পর্যন্ত নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয় এক পর্যায়ে। উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে যার চরিত্রায়ন হয় একাধারে প্রসূতি, ধাত্রী এবং জল্লাদ রূপে।
ভাষার উন্নত গাঁথুনি নিঃসন্দেহে উপন্যাসটিকে একটি অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
শেষে এসে চন্দ্রকোটালের মতো বলতে চাই, "দরিয়াবিবি.. .সেলাম... সেলাম।"
কয়েক মাস আগে পড়েছিলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’। আর সম্প্রতি শেষ করলাম শওকত ওসমানের ‘জননী’। দুই জননীর মধ্যে স্পষ্ট ফারাক আছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী মফস্বল ও শহরের, আর এই জননী পুরোপুরি গ্রামের। গ্রামের কঠিন জীবন-সংগ্রামই তাকে মাহাত্ম্য দান করেছে।
শওকত ওসমানের ‘জননী’র নাম দরিয়াবিবি। মহেশডাঙার দরিদ্র কৃষক আজহার খাঁর স্ত্রী সে। অন্তঃপুরের আর সাধারণ মুসলিম নারীর মতোই তার জীবন। তবে দরিদ্র আজহার খাঁ যখন জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত, তার কিছুটা আঁচ দরিয়াবিবিকে সইতে হয় বৈকি। এছাড়া আজহার খাঁর খামখেয়ালি আচরণও দরিয়াবিবির কঠোর পর্দার নিয়মকানুনকে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্থ করে। দরিয়াবিবি তার সন্তানদের শিক্ষিত করতে চায়, মানুষ করতে চায়। তবে দারিদ্র্যের কষাঘাতে তার এই স্বপ্ন পদ্মপাতার জলের মতো মনে হয়। এজন্য তাকে সাহায্য নিতে হয় পরিপার্শ্বের বিভিন্ন ব্যক্তি। কিন্তু তার বিনিময়ে যে তাকে মূল্য দিতে হবে তা কি বুঝতে পেরেছিল অবলা গ্রাম্য জননী?
শওকত ওসমান এই উপন্যাসে দুটি বিশেষ বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। এক. হিন্দু-মুসলিম সমস্যা। মহেশডাঙার হিন্দু মুসলিমরা পরস্পরের বন্ধু হিসেবে জীবনযাপন করতো। কিন্তু দুই জমিদারের রেষারেষি তাদের প্রাত্যহিক সহজ-সরল জীবনেও প্রভাব ফেলে। তবে গ্রামের লোকেরাও পরে বুঝতে পারে যে তাদের মতো উলুখাগড়ার কথা আদতে জমিদাররা কখনও ভাবে না। পারস্পরিক কোন্দলের ইতি ঘটেও সেখানে। এক জায়গায় চন্দ্র কোটালের স্ত্রী এলোকেশী তাকে বলছে, ‘জমিদার জমিদারে ঝগড়া। বড়লোক বড়লোকে দলাদলি। তোদের কী? গাঁয়ে হিন্দু মুসলমানে ঝগড়া তো ভাইয়ের সঙ্গে কী!’
দুই. পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। দরিয়াবিবির প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পরে তাকে তার দেবরদের কাছে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এমনকি ফেলে আসতে হয় তার সন্তান মোনাদিরকে। আর আজহার খাঁর মৃত্যুর পর দরিয়াবিবির উপর ইয়াকুবের কর্তৃত্ব পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিষ্ঠুর আধিপত্যকেই নির্দেশ করে।
প্রকৃতপক্ষে, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গ্রামের চিত্র দেখানোর মাধ্যমে ঔপন্যাসিক এক নারীর মাতৃমূর্তি অঙ্কন করেছেন। উপন্যাসের শেষাংশ পড়তে পড়তে যেকোনো সংবেদনশীল পাঠকের মন আর্দ্র হয়ে উঠবে।
শুরুতেই বলে নেয়া ভালো,আমার মতো যারা বই পড়ে দু:খ পেতে ভালোবাসে তাদের জন্যই এই বই।
কাহিনী সংক্ষেপ: মহেশডাঙা গ্রামের এক দরিদ্র জরাজীর্ণ পরিবারের দৈন্যতার চিত্র ফুটে উঠেছে বইয়ের কাহিনীতে। স্বামী আজহার খা, স্ত্রী দরিয়াবিবি আর ৩ সন্তান নিয়ে পরিবার।
আজহার খা যে ভীনদেশীয় বংশধর তা শারীরিক গঠন আর মুখাবয়ব দেখেই গ্রামের অন্যরা বুঝতে পারে এবং খানিক সমীহ করেও চলে। এই সমীহকারীদের মধ্যে দুজন হিন্দুও আছে। একজন চন্দ্রকোটাল, আরেকজন শৈরমী। চন্দকোটালের সাথে আজহার খায়ের এবং দরিয়াবিবির সাথে শৈরমীর সুমধুর বন্ধুত্ব ফুটিয়ে তোলা প্রমাণ করে দেয় লেখকের অসাম্প্রদায়িকতার স্পষ্ট দিকটি। বিপদে আপদে এই দুই হিন্দু কখনো এই মুসলিম পরিবারকে ছেড়ে যায়নি, সর্বদাই পাশে থেকেছে।
গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনায় লেখক কোন কার্পণ্য করেননি:
"ছবির মতো স্তব্ধ তালগাছের সারি, নিচে শাদা গেয়ো পথ, হয়তো দুএকটি পথিক, পথশ্রান্ত শাদা বাছুর, মেঘ আর পাখির ঝাক মোনাদিরের বালকমনের পর্দায় বিচিত্রার ইশারা রাখিয়া যায়।"
আবার দারিত্রতা সূক্ষভাবে ফুটিয়ে তুলতে লেখক কলম চালিয়েছেন তীব্রভাবে:
"আজহার খার লুঙ্গি ছিড়িয়া গিয়াছিল। নামাজ শুদ্ধ হয় কিনা সন্দেহ। সিজদার ��ময় হাটু বাহির হইয়া পড়ে। সে নিজে লুঙ্গি না কিনিয়া মোনাদিরের হাফপ্যান্ট ও শার্ট কিনিয়া দিল।"
সব গল্পেরই একজন ভিলেন থাকে। এই গল্পেরও আছে। তার নাম ইয়াকুব। নারী দেহলোভী ইয়াকুব। ঘরে দুই স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আরেক বিবাহ করতে চেয়েছিলো কিন্তু পারেনি পরিবারের চাপে। ক্ষুধার্ত শিকারি চক্ষু কি আর ক্ষান্ত হয়? তার দৃষ্টি পরে দরিয়াবিবির উপর। দরিদ্র পরিবারে ভালো ভালো খাবার কিনে দিয়ে, আর্থিক সহায়তা করে ইয়াকুব তার কামনার পথ সুগমের চেষ্টায় অবিরত থাকে।
শেষমেশ কি ঘটে? দরিয়াবিবির শক্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কি দারিদ্রতার কাছে ধরা দেয়? নাকি নৈতিকতার দৃষ্টান্ত লেপে দেয় দারিদ্রতার মুখে? এসকল প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারবোনা....
মা-সংক্রান্ত কোনো উপন্যাসের কথা বললে সর্বপ্রথম মাথায় আসে ম্যাক্সিম গোর্কির সেই ভুবনবিখ্যাত "মা"-এর কথা। বাঙালি পাঠক হলে এর পরপরই অবশ্য আনিসুল হকের " মা" উপন্যাসের কথা স্মরণে আসতে বাধ্য। ম্যাক্সিম গোর্কির "মা" কিংবা আনিসুল হকের "মা"-তে যে বিপ্লবী আত্মত্যাগী মায়ের উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়, তা মাতৃত্বের ইতিহাসে প্রচলিত কোনো ঘটনা না। কিন্তু শওকত ওসমানের "জননী" উপন্যাসে জননীর যে রূপ আমি দেখেছি, তা প্রকৃতিগত হিসাবে উক্ত মায়েদের চেয়ে নিঃসন্দেহে স্বকীয়।
এই জননী হয়তো রুশ বিপ্লব কিংবা একাত্তরের যুদ্ধে সন্তানকে উৎসর্গ করেননি। কিন্তু সন্তানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যা উৎসর্গ করে গেছেন, তা কল্পনা করতে গা শিউরে ওঠে৷ হয়তো পুরোটাই উপন্যাসের কাহিনী, বাস্তবে এরকম ঘটনা খুব কমই ঘটে৷ কিংবা কে জানে? সমাজ-বাস্তবতায় বিপন্ন, নগ্ন শ্রেণিশোষণে উৎপীড়িত, দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত এই বাংলার গ্রামীণ সমাজের চারদেয়ালে বন্দী ক'জন মায়ের খোঁজ আমরা রাখি? ক'জন মায়ের ত্যাগের ইতিহাস আমরা জানি?
শওকত ওসমানের "জননী" বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে তো বটেই, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের মধ্যে একটি অনন্য সৃষ্টি। অতিনাটকীয় ঘটনার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও এই উপন্যাস "শিল্পপিয়াসী" পাঠককে ধরে রাখবে দীর্ঘক্ষণ। সমাজ-বাস্তবতার কদর্য চিত্র ও ভাষার উন্নত গাঁথুনি নিঃসন্দেহে উপন্যাসটিকে একটি অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
ব্রিটিশ ভারতের বাংলার এক গ্রাম্য জীবনের দারিদ্রক্লিষ্ট জীবন এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। ধর্ম যেখানে হিন্দু, মুসলিম মহল্লার মাঝে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাড়িয়ে থাকে নির্ঘুম। তুচ্ছ ঘটনাকে দুর্ঘটনাতে পরিণত করতে এই দেয়ালের চেষ্টা থাকে অবিরাম। পিছন থেকে কাঠি নাড়ে টাকা। ধর্মান্ধ হিন্দু মুসলিমেরা যখন বুঝতে পারে তাদের নির্বুদ্ধিতা, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ধর্মের এই দেয়াল ভেঙ্গেও মানবিকতা বেচেঁ ছিল মানুষেরই মনে। তাইতো শৈরমির মৃত্যুর পর রক্তের সম্পর্কহীন ভিন্নধর্মী এই মানুষটিকে স্মরণে রাখতে এক অসহায় রমণীর প্রচেষ্টা মনে নাড়া দেয়ার মতোই।
এতসব ঘটনার ঘনঘটায় দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করা কয়েকজন সাহসী নারীর চরিত্র ফুটে উঠেছে কাব্যিক নিপুনতায়। এলোকেশী, আম্বিয়ার মা, দরিয়াবৌ এরকমই কিছু চরিত্র। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর জননী উপন্যাসের মতোই এখানেও এক দরিয়াবৌয়ের জীবন যুদ্ধই কেন্দ্রে রেখেই এগিয়ে চলেছে উপন্যাসের প্রেক্ষাপট।
Book 4: জননী (শওকত ওসমান) ========================= Rating: 3/5 মা নিয়ে কম উপন্যাস লেখা হয়নি; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জননী', ম্যাক্সিম গোর্কির 'মা', আনিসুল হকের 'মা', পার্ল বাকের 'দা মাদার', গ্রাৎসিয়া দেলেদ্দার 'দা মাদার', অনুরূপা দেবীর 'মা' এবং শেষে আজকে যে বই নিয়ে কিছু লিখবার চেষ্টা করবো শওকত ওসমানের 'জননী'।
লেখকের বর্ণনায় গ্র্যান্ড ট্র্যাঙ্ক রোডের পাশে ছোট্ট এই গ্রাম মহেশডাঙা। এই গ্রামের দরিয়াবিবির চরিত্র যেন গ্রাম বাংলার শয়ে শয়ে মায়েরা। দরিয়ার মত গভীর, দরিয়ার মত বয়ে যাওয়া দারিদ্র্যকে মোকাবেলা করার মত সাহস, না টুটে যেন সংসার তা ধরে রাখার মত অদম্য মেহনত। দেশভাগের আগের অবিভক্ত বাংলার গ্রামের জীবন ছিল নানা রকম সংকটে ভরা। এমনত অবস্থায় নানা সামাজিক সমস্যা, অভাব-অনটনের গ্রামীণ বাংলা, সব মিলিয়ে গ্রামের পটভূমি ছিল বেশ জটিল। এই সব বাস্তবতার মাঝে দারুণভাবে গড়ে ওঠা একটি গল্পের উদাহরণ হলো "জননী"। প্রথম দিক থেকে ভাষা খানিকটা কঠোর আর শক্ত মনে হলেও, পরে পড়বার সময় এই ভাষার ব্যবহারকেই সাবলীল মনে হয়েছে। ঠিক যেভাবে দেশ ভাগের আগের হিন্দু-মুসলিমের যে বিরোধ তা ফুটিয়ে উঠানো হয়েছে নানান পাতায়। তবে অসাম্প্রদায়িকতার চেতনারও একটি দিক লক্ষ্য করা যায় এই বইয়ে।
দরিয়াবিবি, বাউন্ডুলে স্বামী আজহার যার কাজে কামে কখনো মন বসেনি, সংসারের প্রতি পূর্ন মাত্রায় উদাসীন। আছে পুত্র আর দুই কন্যা আর আছে আগের সংসারের এক পুত্র মোনাদির। দারিদ্রতা দরিয়াবিবির নিত্য সঙ্গী। জীবন সংগ্রামে পর্যদুস্ত এক জননী দরিয়াবিবি। আমিরন বিবি, স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র সম্বল কন্যা আম্বিয়া। দেবর তার সম্পত্তি দখল করতে চায়। কিন্তু আমিরন বিবি মা হিসেবে চায় যেকোনো মূল্যে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। হাসুবৌ, যার স্বপ্ন একটি পুত্র সন্তানের জননী হবে। কিন্তু বন্ধ্যা বলে প্রতিনিয়ত তাকে স্বামী শাশুড়ীর গালাগালি শুনতে হয়। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে বন্ধ্যা হওয়া সত্বেও সে ঠিকই পুত্র সন্তানের মা হয়। কিন্তু কিভাবে?