ছোটবেলায় এই বইটা আমার ছিল না। সম্ভবত ক্লাস ফোরে পড়তাম, যখন পড়েছিলাম। কারন, যার কাছ থেকে ধার নিয়েছিলাম, সেই আপু ক্লাস ফাইভে পড়তেন আর মনে আছে যে তার এক ক্লাস নিচে পড়তাম। তার কাছ থেকে ‘পুতুল’ ও ধার নিয়েছিলাম। আরো মনে আছে, পিপলী বেগম ফেরত দিয়ে আরো তিনবার আপুর কাছ থেকে এনে পড়েছিলাম। ঐ সময়ে আশেপাশের যাবতীয় ক্ষুদে পাঠকদের মতো বই জমানো বা কেনার চেয়ে পড়াটা অনেক জরুরী ছিল। আর এক মাত্র একবার পড়লে আশ মিটতো না।
আজকে ছাব্বিশ মিনিটে পিপলী বেগম শেষ করে মাথায় এই কথাগুলো ঘুরছিল। সহজ একটা জীবন ছিল আমাদের। সেখানে সহজ এক ভঙ্গিতে গল্প বলে আমাদেরকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন হুমায়ূন আহমেদ নামক এক জাদুকর। কতো সৌভাগ্যবান ছিলাম আমরা! ভালো লাগে যখন দেখি এখনো ছোট একটা মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে তাঁর বই পড়ছে, নিজের সংগ্রহে রাখছে এবং শেষমেশ হুমায়ূন ভক্ত বনে যাচ্ছে।
এখানে তিন মেয়ের ব্যস্ত ডাক্তার বাবা ছুটি নিয়ে মেয়েদেরকে সময় দিতে গিয়ে পিপলীর গল্প শোনান তাদেরকে। রাতে বাবা গল্প পাচ্ছিলেন না, নাছোড়বান্দা মেয়েদের মা আটকা পড়েছিল জলকবলিত শহরে আরেকজনের বাসায়। সুতরাং, তিনি গল্প শুনতে চাওয়া কন্যাদেরকে গল্প না বললে উদ্ধার করার কেউ ছিল না। গল্পের শুরুতেই বাগড়া দেয় ছোট মানুষেরা যে পিঁপড়ে নিয়ে গল্প কেন। এখান থেকেই শুরু হয় আলতো করে এটা বলার চেষ্টা লেখকের যে এই পৃথিবী শুধু আমাদের বা বনের রাজা বাঘের না। পিঁপড়াদেরও এই পৃথিবীতে গল্পের নায়ক হবার অধিকার আছে! বারবার প্রশ্ন করে করে বাবাকে গল্প বলার সময়ে তিন কন্যা বেশ জ্বালায়, কিন্তু, সেটাই মজার। কারন, উত্তরগুলো থেকে গল্প এগোতে থাকে। আমরা পিপলীর গল্পের পাশাপাশি শিখতে থাকি একটি রাজ্যের অনুগত ও কর্মঠ প্রজাদের কথা, জানতে পারি কিভাবে তারা সবাই সংগৃহীত খাবার ভাগ করে খায় বলে কেউ অভুক্ত থাকে না, তাদের কাজের ধরনের শৃঙ্খলা কি করে তাদের জীবনের অংশ এসব। আর তাদের দেখা না দেওয়া রহস্যময় রানীর কথাও জানতে পারি যিনি নিয়ম ভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তি দেন। পড়তে পড়তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিঁপড়াদের ঐ রাজত্বের অন্যরকম এক জীবনের ছবি।
বইয়ের শেষটা সবচেয়ে সুন্দর। পিপলী বিপদে পড়ায় ছোটবেলায় অনেক মন খারাপ করেছিলাম। কিন্তু, এরপর যেভাবে শেষ হয় তাতে মুগ্ধ হয়ে বইটা আবার প্রথম থেকে পড়া শুরু করতাম। পিপলীর মতো হঠাৎ নিজেকে বড় আর গম্ভীর লাগতো খুব।
বইটার উৎসর্গপত্রে লেখা, ‘যেসব বাবা-মা তাঁদের ছেলেমেয়েদের বই থেকে গল্প পড়ে শোনাতে ভালোবাসেন, পিপলী বেগম তাঁদের জন্য’ রিভিউতে এটা লিখলাম এসব বাবা-মা’র দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য। তারা যদি বাচ্চাকে কি বই পড়ে শোনাতে চান তা নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, এই বই বেছে নিতে পারেন। আর নিজে বানিয়ে গল্প বললে নীলুর বাবার মতোই তাদেরকে বলতে ভুলবেন না যে গল্পে সব সত্যি কথা বলা হয়!