আকারেই শুধু বড়-মাপের উপন্যাস নয় ‘মানবজমিন’, প্রকারেও ব্যাপ্ত, বিশাল বৈচিত্রময়। এ-যুগের অন্যতম শক্তিমান কথাকার শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এ-যাবৎকাল প্রকাশিত যাবতীয় প্রধান রচনার প্রবল এক প্রতিস্পর্ধী এই মহান উপন্যাস, আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের তাবৎ স্মরণীয় কীর্তিমালারও। ঐতিহ্যের সঙ্গে শিকড়ের যোগ এই দুর্লভ সৃষ্টির, সাম্প্রতিকের সঙ্গে আত্মার, আগামীর দিকে বাড়ানো এর কুঁড়ি-ধরানো ডালপালা।
অসংখ্য ঘটনা, অজস্র চরিত্র, অফুরান সমস্যা এই উপন্যাসে। তবু কোথাও জট পাকায়নি। পরিণত লেখকের দক্ষ হাতের সুঠাম নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি চরিত্র ও কাহিনী সুস্থির, স্বতন্ত্র লক্ষ্যাভিমুখী। লোভ, ঘৃণা, প্রেম, রিপুর তাড়না, বাঁচার ইচ্ছে, উচ্চাকাঙ্খা – এমন যে-সব কিছুর দ্বারা কুম্ভীপাকে নিয়ত সিদ্ধ হচ্ছে মানুষ, তারই উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাস। গড়ে উঠেছে মানুষে-মানুষে সম্পর্কের ভাঙচুর ও জোড়-মেলানো নিয়ে।
অসংখ্য চরিত্রের ঘাত-প্রতিঘাতে দ্বন্দ্বময় এই উপন্যাসের অন্যতম নায়ক দীপনাথ, যাবতীয় চরিত্রের মধ্যে এক সাধারণ যোগসূত্রের মতো যে কিনা আবর্তিত, যার লড়াই চলেছে কর্মক্ষেত্রে। এক সওদাগরি আপিসের বিগ বসের পি.এ. দীপনাথ, আসলে এক বেতনভোগী ভৃত্য। এই দীপনাথের সঙ্গেই তার বসের বউ মণিদীপার এক বিচিত্র সম্পর্ক গড়ে উঠল। আপাতভাবে রাগের, কিন্তু অন্তঃশীল অনুরাগের। বস তাকে বিয়ে করার প্রস্তাবও দিয়েছিল। কিন্তু দীপনাথ কি সে-প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারবে?
এ-উপন্যাসের আরেকটি প্রধান চরিত্র তৃষা। মৃত ভাসুর তৃষাকে সব সম্পত্তি লিখে দিয়ে গেছে। লোকে বলে, তৃষার একমাত্র পুত্রের জনক তার ভাসুর। এমন-কি তৃষার স্বামীও। তৃষার বিরুদ্ধে তাই স্বামীর লড়াই।
দুরারোগ্য ব্যাধির বিরুদ্ধে যার প্রতিমুহূর্তের একলা যুদ্ধ, সেই প্রীতম, দীপনাথের ভগ্নীপতি, এ-উপন্যাসের আরেক প্রধান চরিত্র। প্রীতমের স্ত্রী স্বামীর প্রতি সেবাপরায়ণা, কিন্তু আগে থেকেই অরুণ নামে এক যুবকের সঙ্গে তার সম্পর্ক।
মুখ্যত এই তিন চরিত্রের লড়াই ‘মানবজমিন’। আর লড়াইয়ের অবসানে তিন রকমের যে-পরিণতি, তার মধ্যেই ফুটে উঠেছে অসামান্য এই উপন্যাসের অমোঘ সেই বার্তা, মানবজমিনে যা করতে শেখায় নতুন আবাদ, ভালবাসা ও বিশ্বস্ততার সোনা-ফলানো আবাদ।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
সংক্ষিপ্ত পাঠক-জীবনের একটি নির্দিষ্ট অপরাধবোধ হতে মুক্তি পেলাম আজ। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটিও বৃহৎ উপন্যাস না পড়ে থাকার যেই আগুনে জ্বলে উঠতাম মাঝেমধ্যেই, সেই আগুন প্রশমিত হলো অনেকটা। হ্যা, জনপ্রিয়তার নিরিখে হয়তো বা 'দূরবীন' ও 'পার্থিব'কে শীর্ষেন্দু-পাঠকেরা নির্দ্ধিধায় অনেক ক'মাইল এগিয়ে রাখবে। তবে আস্ত একটি উপন্যাস হিসেবে 'মানবজমিন' নেহাতই ফেলনা নয়। লেখকের একমাত্র সাহিত্য আকাদেমি বলে কথা।
যা আকাদেমির আধুনিক রকমফের অনুযায়ী কোনো লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট আওয়ার্ড নয়। বরং একজন বরেণ্য সাহিত্যিকের মুখ্য সাহিত্যকীর্তির প্রতি সময়োচিত মাল্যদান। তাই বলাই বাহুল্য, এই জিনিস হেজিপেজি সাহিত্য নয়! আর নয় বলেই, আজকে আমি এতটা আপ্লুত। এক-ব্যাগ চিরন্তন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে বসে আছি অনেক, অনেকক্ষণ। লেখকের গদ্য, দ্রুতগামী। স্টেজ-প্লে মাফিক, সরস, সংলাপ। একচেটিয়া, স্বভাবস্বরূপ হিউমার। সাথে ঠোঁটকাটা বাস্তব সিঞ্চন। দা শীর্ষেন্দু ক্ল্যাসিক!
অগত্যা, এই জিনিস না পড়ে উপায় থাকে না। কোনো সস্তা জমাটি পেপারব্যাক মাফিক, উল্টে যেতে হয়, পাতার পর পাতা। আশ্চর্য হতে হয়। মন বলে, এত সহজ? একখানি জটিল হিউম্যান ড্রামার দোরগোড়ায় দাড়িয়ে, চিড়িয়াখানার জালের ফাঁকে ধরতে হয় আতস কাঁচের ছায়া। প্রতিটি পাতায় খেলে ওঠে বিক্ষণের প্রকাশ। স্থান পায়, মানুষ-মনের যাবতীয় বিষাদ। বিদ্বেষের সূক্ষ হিসেব! সত্যিই তো! এ কেমন সমাপতন? শক্তিশালী সাহিত্যিকের কেমন নির্লজ্জ ক্ষমতাপ্রদর্শন!
ভাবতে-ভাবতে থিতু হলে, মানসচক্ষে দৃশ্যমান হয় অন্তর্নিহিত কোমলতা। শক্ত রুক্ষ খোলস মাঝে মাথাচাড়া দেয় অস্থির তারল্য। তাও বলি, আজকের হিসেবে 'মানবজমিন'কে নির্দ্ধিধায় 'ডার্ক ফিকশন' হিসেবে অভিহিত করা চলে। কোনো সামাজিক কাহিনীর শীর্ণ গন্ডিতে আবদ্ধ না হয়ে, এক অন্ধকার গলিতে সেধিয়ে যায় উপন্যাসটি। একগুচ্ছ চরিত্রের স্মরণীয় ভীড়ে হনন হয় নৈতিকতা। সমস্ত ধূসরতা প্রকট হয়, এক অতি ভীষণ পন্থায়। যা দৃষ্টিকটু তবুও বাস্তবানুগ। যা কৃষ্ণকায় মেঘের ন্যায় উজিয়ে তোলে কালবৈশাখীর ঝড়।
উপন্যাসে নেই কোনো প্রথাগত বিভেদ। কে নায়ক, কেই বা নায়িকা? চরিত্র অনেক। সময়ে-অসময়ে, স্পটলাইট বর্তায় একেকজনের মাথায়। মানবধর্মের এই তো নিয়ম। তবুও পাঠক-মন মাধ্যম খোঁজে। উপন্যাসের আয়নায় দেখতে চায় নিজের স্বরুপ। আমিও বাদ যাই কেন? সকলের মাঝে আমারও দীপনাথকেই পছন্দ হয় সবচেয়ে বেশি। ভালো লাগার একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন খুঁজে পাচ্ছি আজকাল। বিশেষত পুরুষ চরিত্রদের প্রতি। দীপনাথ মানুষ ভালো। সহিষ্ণু অথচ ত্রুটিশীল। প্রাণে শান্তির বিকট অভাব। কনফিউজড, এস্কেপিস্ট। মহত্বের প্রতি সামান্য ঝোঁক। পলায়ন প্রবণ। বইয়ের ভাষায় 'ক্রনিক পেসিমিস্ট।'
মজার ব্যাপার। আমি নিজে যখন আরও ছোট, সদ্য সদ্য হোয়াটসঅ্যাপ করে নিজেকে হনুমানের জ্ঞাতিগুষ্টি ভাবছি, সেই সময়, কোন এক বিদেশি পেপারব্যাক থেকে ওই 'ক্রনিক পেসিমিস্ট' শব্দবন্ধনীটি চুরি করে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। বয়সসন্ধির প্রকোপে তখন আকাশে মেঘ ডাকলেও বুকে চিনচিনে ব্যথা ওঠে। ইংরেজি শব্দটি তখন আমার বেড়ে-পাঁকা স্বত্তার কাছে হস্ত মাঝে চন্দ্র রূপে অবতীর্ণ হয়েছিল। আজ অনেক বছর বাদে, একটু অপ্রস্তুত হলেও, বইতে দীপনাথ সম্বন্ধে ওই একই শব্দের পুনরাবৃত্তি পড়ে বেশ পুলক বোধ করলাম।
একদিন দীপ তার সব কাজকর্ম ফেলে রেখে একা বেড়িয়ে পড়বে। হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে কোনো মস্ত দূরারোহ পাহাড়ের পাদদেশে। তারপর শুরু করবে তার ধীর ও কষ্টকর আরোহণ। কোনোদিনই শীর্ষে পৌছাবে না সে। অনাহারে, শীতে, পথশ্রমে একদিন ঢলে পড়বে পাহাড়ের কোলে। বড় একা, নিঃসঙ্গ মৃত্যু ঘটবে তার। কিন্তু বড় সুখী হবে সে।
লেখক মশাই এখানেই বুঝি অনেকাংশে সফল। অশেষ দক্ষতায়, পুতুলনাচের ওস্তাদ মাফিক নাচিয়ে গেলেন সকলকে। তা সে, বইয়ের চরিত্রই হোক বা পাঠক নিজে। উনি যা চাইলেন তাই হলো কেবল। দীপনাথের প্রতি সহানুভূতি, শ্রীনাথের প্রতি রাগ, প্রীতমের প্রতি মমতা। এমনকি, মণিদীপার প্রতি অমোঘ আকর্ষণ। সবটাই প্রায় রোবট স্বরূপ অনুকরণ করে গেলাম আমি। আমার সমস্ত স্বাধীন স্বত্বা, স্বযত্নে রক্ষিত রইলো লকারের অলিন্দে। কতকটা যেন মন্দিরে জুতো খুলে ঢোকার সমান। গপ্পো শেষে ফেরত নিলেই হলো। ক্ষতি কি?
তাই সম্মোহিত হয়ে পড়ে গেলাম 'মানবজমিন'। একটু একটু করে, প্রায় হপ্তাখানেক ধরে। শীর্ষেন্দুর গদ্যের টানে, গোগ্রাসে গেলার হাতছানি ছিল, বলাই বাহুল্য। তবুও...একটু রয়ে-সয়ে পড়ে দেখার সুযোগ এড়াতে পারলাম না এবারে। এসব বইকে একটু সময় দেওয়া সাজে। অবশ্য, বলতে ক্ষতি নেই, উপন্যাসটিতে প্রথাগত সব গদ্যগুণ খুঁজে পাইনি আমি। এই বই নিয়ে, ভার্সিটিতে পাতার পর পাতা থিসিস লেখা যায় না। রচিত হয় না প্রবন্ধ-নিবন্ধের হরেক মেলা। সাহিত্যের সাতটি রঙে রাঙানো কোনো আকাশছোয়া উপন্যাসের খোঁজে এলে, 'মানবজমিন' হয়তো আপনাকে হতাশ করে বসবে।
তবুও, এই বই নিয়ে আমার উচ্ছাসের অন্ত নেই। কারণ একটাই। বিশুদ্ধ কার্যকরী সব ক্যারেক্টার মোমেন্টস! বইয়ের তিন মুখ্য নারী চরিত্রই ভীষণ স্মরণীয়। তৃষা, বিলু ও মণিদীপা। তিনজনেই স্বাধীনচেতা। তিনজনেই সংগ্রামশীল ও আদ্যোপান্ত জেদি। তারা নিখুঁত নয়। তাদের মাধম্যে, কোনো গতে-ধরা স্টেরিওটাইপের চর্বিত-চর্বন করেননি লেখক। বাদী মানসিকতার পুরনোপন্থী বেড়াজাল এড়িয়ে স্রেফ তিনজন ধূসর নারী-চরিত্র এঁকেই ক্ষান্ত দিয়েছেন তিনি। কাউকে আলাদা করে ভালবাসতে বলেননি আর। বললে বুঝি, গল্প লেখায় আর পাখি-পড়ানোতে কোনো পার্থক্য রইতো না আর।
সুতরাং, এই অন্ধকার সেঁচে বুঝে নিতে হয় ভালো লাগার চূড়ান্ত হিসেব। কেস ইন পয়েন্ট - তৃষার নিস্পৃহ ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে শ্রীনাথের নিষ্ফল আক্রোশ। বইয়ের চরম দ্বন্দ্ব। যা একপাক্ষিক হলেও আদ্যোপান্ত টেন্স। উপন্যাসটির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অঙ্গ। তৃষার ক্ষেত্রে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রায় মাফিয়া ছবির ন্যায় উপস্থাপিত করেছেন গ্রাম্য রাজনীতির আলোহীন প্রতিচ্ছবি। যা পুরোটাই ভীষণ জমজমাট। এছাড়াও রয়েছে রুগ্ন প্রীতমের শয্যাশায়ী মননে অসুস্থ চিন্তার খোরাক। বা প্রেমের সোপানে কপাল ঠেকিয়ে, দীপনাথের অস্থিরসংকল্প শান্তিসঞ্চয়। যা করুণ, তবুও আশাবাদী। যার সম্মুখ-সমরে গুড়িয়ে যায় নৈর্ব্যক্তিকতার কঠিন প্রাচীর।
তাই এই খেলায় কোনো হারজিত নেই। নেই কোনো বিজয়ী ভিক্ট্রি ল্যাপ। ম্যারাথন শেষে, দেখা মেলে না ফিনিশিং লাইনের। অতএব, চিরায়ত হিসাব-কিতাব তুলে রাখুন তাকের ওপরে। দেখুন চারিদিকে। কলকাতার পেশাদারী বাকবিতন্ডা ও শিলিগুড়ির রৌদ্রোজ্জ্বল স্নিগ্ধতার মাঝে, এই খেলা স্রেফ আত্মসন্ধনের ভ্রান্তিবিলাস যেন। প্রতিটি খেলোয়াড়ে খোঁজে কেবল বেঁচে থাকার বীজমন্ত্র। অবরুদ্ধ কন্ঠে বলে ওঠে, আত্মানং বিদ্ধি! এক অর্ধ পালিয়ে বেড়ায়, তো আরেক জড়ায় সংসারে প্রতিনিয়ত। জগতের নিয়মে হাসে অন্তর্যামী। সম্ভাবনার অপমৃত্যুই হয়ে ওঠে গল্পের উপজীব্য।
মন বলে, আবাদ করলেই ফলত সোনা... মন জানে, সেটাই সত্যি। ঠিকই তো, এই দুনিয়ায় কি আদতেই কেউ কাউকে চালনা করতে পারে?
লেখক চাইলেই আরও একশ কি দুশো পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারতেন। মাইরি বলছি, আমি পড়তাম। এক নাগাড়ে সাড়ে-পাঁচশ পাতা পেরিয়েও বইয়ের চরিত্রদের ছাড়তে মন চাইছে না আজ। কোনো বড় উপন্যাসে এর চেয়ে বেশি ইতিবাচক অনুমোদন দেওয়া যায় কি? কে জানে। স্রেফ সাহিত্যের মাপকাঠিতে বইটির মূল্যায়ন করলে বক্তব্য বাড়ে। আপাতত, একটি চূড়ান্ত সার্থক ক্যারেক্টার ড্রামা হিসেবে 'মানবজমিন' আমার পাঠক-মনে অনেকটা জায়গা জুড়ে রইল। ভবিষ্যতেও যে থাক��ে, তা সহজেই অনুমেয়। ডাক্তার-বদ্যিও জানে এই জ্বর সহজে ছাড়বার নয়।
কেবল মাত্র দুই তিন মানব চরিত্রের মন জমিনের চরিত্র চিত্রণ। আমি নিজেও ছন্নছাড়া বলে বোধ হয় দীপনাথকেই বেশি টেনেছে। মনে হয়েছে তাকে ঘিরেই উপন্যাস। বই পড়তে পড়তে যে খুব কখনো ইমোশনাল হয়েছি মনে পড়েনা, এমনিতেই পড়ে গিয়েছি, এর পরে কি হবে, এর পরে কি হবে-এরকম সাসপেন্স ও ছিল না। মনেই হচ্ছিল দিন চলে যাবে। আর দুর্ভাগ্যবশত পিছনের ফ্ল্যাপে কাহিনীর পুরোটাই বলে দেওয়া। যারা উপন্যাসে অনেক কিছু খোজেন তাদের বইটি ভালো নাও লাগতে পারে। আমার মত যারা চিবিয়ে চিবিয়ে উপন্যাস পড়তে চান-তাদের অবশ্যপাঠ্য।
উপন্যাসটাকে প্রথমে মোটা দাগে ২ ভাগে ভাগ করা যাক, নারী চরিত্র আর পুরুষ চরিত্র। উপন্যাসের নারী চরিত্ররা অর্থলোলুপ, কামসিক, পরকীয়ায় অভ্যস্ত, এবং কাছের (বা তথাকথিত কাছের) মানুষদের অবজ্ঞা করতে পটু। অন্যদিকে পুরুষ চরিত্রের অধিকাংশই অত্যন্ত সুচরিত্রের অধিকারী, পরিস্থিতির শিকার, নারীদের অবজ্ঞা সইতে সইতে তারা তাদের নিজেদের জীবনকে অর্থহীন তো করেছেনই, উপরন্তু তাদের কাছে জীবনের অর্থও গেছে ক্ষয়ে। তো উপন্যাসের শেষ নাগাদ আপনি বুঝবেন যে নারীরা স্বার্থপরতা, গোপন যৌনজীবন, সমাজে নিজেদের কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত করা এইসব কর্মের ফল হিসেবে প্রকারান্তরে তাদের পুরুষ সহধর্মীদের কাছে হার মানেন এবং উপন্যাসে খানিকটা প্রমাণ করার চেষ্টা করা হল যে নারীর নিজের পায়ে দাঁড়ানো, নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেষ্ট হওয়া, নিজেকে সমর্থ করে তোলার সকলই হচ্ছে নারী-জাতির নষ্টের পথে যাওয়ার এক আমোঘ নিয়তি।
এবার একটু সহজ ভাষায় বলি!
প্রথমেই, বিলু। গল্পের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যাকে ১০০ ভাগ ঘেন্না করেছি সে হচ্ছে বিলু। সে এক বাচ্চার মা। সে অনুভূতিহীন ( অবশ্য অরুণের মত ধনী-সুঠাম-সুন্দর-প্রতিষ্ঠিত-ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন আকর্ষণীয় যুবা হলে ভিন্ন কথা!), তার মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা বা সোজা কোথায় empathy জিনিসটাই নেই। সে অত্যন্ত স্বার্থপর, তাকে বিশ্বাস করা আর শেয়ালকে মুরগী দিয়ে ভুলে যে বলা একই কথা, সে আবার উভচর! তার স্বামী নাম্নী ব্যক্তি প্রিতম যতদিন সুস্থ ছিল ততদিন সে প্রিতমকে dictate করেছে, প্রিতমও খুবই ভোলাভোলা নন্দলাল 'আহা বিলু আমার মা-বাবা-ভাই-বোন কাউকেই সহ্য করতে পারে না, তাই আজ থেকে আমার জীবন থেকেও তারা বাদ' বলে বিলুর আচলে গড়াগড়ি দিয়েি জীবনটা পার করতে চেয়েছিল।। বিলু ঝগড়ুটে, তার কথা তেতো, মোটকথা আপনি আপনার জীবনে যে জাতীয় মহিলাকে কখনোই দেখতে চান না, বিলু তাই। কিন্তু এখানেই ঘটনার শেষ নয়, যেই মাত্র প্রিতম মারাত্বক অসুখে পরে গেল, বেশ কিছুদিন ভুগে ভুগেও কিছুতেই সে পটল তুলছিল না, বরং আশা করছিল বউ আমার সতীসাধ্বী, আমার সেবা করেই জীবনটা পার করে দেবে, বিলু সুন্দর করে অরুণের সাথে হোটেলে হোটেলে বেড়াতে লাগলো। সেই অরুণ যার কিনা বিয়ে ঠিক হয়েছে, আর সে বিলুকে নাটুকে ডায়ালগ দিচ্ছে 'মাঝখানে এই কটা দিনই তো আমাদের!' বাস রে বাস! আরেহ বাবা,সোজা কথা বলতে পারছেন না প্রিয় লেখক? বিলু চরিত্রহীনা, অরুণ সুযোগসন্ধানী আর ১০ জন পুরুষের মতই লোলুপ, আর প্রিতম হচ্ছে সবচেয়ে বড় নাটুকেবাজ। বউ পছন্দ করে না বলে মা-বাবা ছেড়ে দিতে পারবে কিন্তু তবু সে সাধু লোক!
এরপর আসবেন আরেক নায়িকা তৃষা! স্বামীকে পছন্দ নয়, ভাসুরকে পছন্দ। তাই স্বামীও গোবেচারা অবিবাহিত চরিত্রহীন ভাইয়ের কাছে বউ-বাচ্চা রেখে রেখে কলকাতা গিয়ে পড়ে থাকতেন। তৃষা সম্পত্তি লোভী, ব্যভিচারিণী, এবং dictator. আজকালকার মেয়ে হলে বলা যেত BDSM তৃষার মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। ভাসুরের সাথে পরকীয়া সম্পর্কের উপহার স্বরুপ তাকে বিশাল সম্পত্তি দেয়া হলো এবং তার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এই 'এই সম্পত্তি আমি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জন করেছি!'🤣🤣 তার এক স্বামী, শ্রীনাথ, সে লোক আরো এক কাঠি সরেস! পৃথিবীর কোন কিছুই আমাকে স্পর্শ করে না, কিন্তু আমি এই পাওয়া সম্পত্তি ছেড়ে যেতেও পারছি না, যাব যাব করছি কিন্তু কিছুতেই না যাওয়া হচ্ছে না! আমার ছেলেমেয়েরা আমার কেউ নয় (অন্তত যেগুলো আমার নিজের সেগুলোও না), তার চেয়ে আমি কোলকাতায় call girl service better handle করতে পারি। এমন মারাত্বক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তৃষা কে না! হায়রে আমন ধান! দীপনাথ-মনিদিপা-বোস-শতম- বা আর যে কজন চরিত্রই আনা হয়েছে প্রত্যেকে এটাই দেখিয়েছে নারীরা কতটা শক্তিশালী, চরিত্রহীনা, কত charismatic ইত্যাদি ইত্যাদি। Basically it's an alternate world, where rape against women doesn't happen, even if it happens, it's conducted by a women's order. This is the fantasy world where every women work for her own freedom, wealth, and decency but everything is presented in a crooked way to say that women want freedom for evil intentions, there's always good men, but never a good women with a desire to have her own life. She must leave job, asset, idealism everything to men and be submissive. Eternal happiness will come only then.
This is the shittiest book I've read of Shirshendu ever. সেই দেশে যেখানে মেয়েরা ঘর থেকে বেরুতে গেলে সম্মান ও জীবন নিয়ে ফিরবে কিনা তার .৫% ভরসা নেই, সেই দেশে এইসব ফ্যানটাসি মানায় না।
তৃষা, মণিদীপা এবং বিলু এই তিন নারী চরিত্রের বিদ্রোহী সত্ত্বার উপাখ্যান হলো মানবজমিন উপন্যাসটি । যারা সমাজের দেখিয়ে দেয়া গন্ডিকে অতিক্রম করে, মানব জীবনের কিছু চেনা সত্যিকে পাশ কাটিয়ে আলাদা কিন্তু স্বীয় সুখ জমিনের সন্ধানের প্রয়াস করেছে।
তৃষা শুধু একজন বিদ্রোহিনী শুধু নয় একজন সম্রাজ্ঞীও। যার নির্মম ব্যক্তিত্বর কাছে হারতে হয়েছে সবাইকে। শুধু বার বার হেরে যেতে হয় তার নিজের সন্তান সজলের কাছে। সমাজের প্রথা মেনে তৃষা জীবনের সুখ শিকারের শুরুটা হয়েছিল স্বামী শ্রীনাথকে দিয়েই। কিন্তু সাদামাটা শ্রীনাথ তার উচ্চাকাংখী তৃষাকে কখনো কাংখিত সুখ আর অবারিত আধিপত্যের ছোয়া দিতে পারেনি। আর এই মনস্তাত্বিক দৈন্যতাকে আশ্রয় করে শ্রীনাথের বড় ভাই সুপুরুষ মল্লিনাথের সাথে তৃষার নিষিদ্ধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আশপাশের মানুষ একটা সময় এটাও বিশ্বাস করতে শুরু করে সজল শ্রীনাথ নয় মল্লিনাথের সন্তান। শুধু তৃষা নয় মল্লিনাথও উজাড় করে দেয় নিজেকে। মৃত্যুর পর তার বিশাল সম্পত্তি তৃষার নামে করে দিতে দ্বিতীয়বার ভাবে না। আর সেই সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় শ্রীনাথের ছোট ভাই সোমনাথের সাথে তৃষার ঘাত-প্রতিঘাত। কখনো গুন্ডা লেলিয়ে তৃষা সোমনাথকে মার খাওয়ায় আবার কখনো তৃষার ঘরের বারান্দায় ঘটে বিষ্ফোরণ। সবকিছুর মাঝেও তৃষাকে একাকীত্ব গ্রাস করে। নিজের ছেলেও হয়ে উঠে। তখন কাউকে না পেয়ে শ্রীনাথের সেজ ভাই দীপনাথের মাঝে তৃষা একজন বন্ধুকে খুজে ফেরে। তৃষা কি পারবে তার সাম্রাজ্য আগলে রাখতে? নিজের ছেলেকে নিজের করে ফিরে পেতে? নিজের আপন জন যে যুদ্ধ তার বিরুদ্ধে শুরু করেছে সে যুদ্ধ জয় করতে?
দীপনাথের বসের বোসের স্ত্রী মনিদীপা শুরু থেকেই বেপোরয়া, নিজের স্বাধীন সত্ত্বাকে উন্মীলিত করার জন্য উন্মুখ । কিন��তু দীপনাথ বার বার তার রাশ টেনে ধরে। দীপনাথের ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা মনিদীপা আর একবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আর মনিদীপার মোহ দীপনাথকে একটু একটু করে গ্রাস করতে শুরু করে। বোসের সাথে বিয়ে নামের যে বোঝা তাকে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয় তার হাত থেকে দীপনাথের হাত ধরে সেই বোঝা থেকে মুক্ত হতে চায়। একটা সময় বোস নিজেই ওদের মাঝখান থেকে সরিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। দীপনাথ কি তার ডাকে সাড়া দিবে? দুটি জীবন কি নতুন একটা শুরু করতে পারবে ?
দীপনাথের বোন বিলু , এক অর্থব স্বামীর স্ত্রী। স্বামী প্রীতমের প্রতি কর্তব্য পালনে কখনো এক বিন্দুও অবহেলা করে নি, তবুও সে অসম্পূর্ণা। প্রীতম ভালবাসার গভীরতা বিলু কখনো অনুভর করেনি, করার চেষ্টা করেনি। সন্তান লাবুর প্রতিও বিলুর এক যান্ত্রিক ভালবাসা প্রীতমকে বার বার বিচলিত করে তোলে। বিলুর সত্ত্বাজুড়ে আরেকটি পুরুষ প্রীতমের জায়গা দখল করে বসে ছিল, কলেজ জীবনে বন্ধু অরূণ। প্রীতম অসুস্থ হবার পর বিলু যখন জীবনের একঘেয়ে স্বামীর সেবা-শুশ্রূষা সাথে সাথে জীবনের রূঢ় বাস্তবতা দিশেহারা হয়ে ওঠে তখন অরূণ এসে সবটুকু সপে দিয়ে বিলুকে আবার কাছে টেনে নেয়। বিলু কি কখনো বুঝবে প্রীতমে ভালবাসার আকাশে বিলু কতটা উজ্জ্বল? ক্ষনিকের মোহ অরূণকে ছেড়ে সে প্রীতমকে আবার কাছে চাইবে?
পাঠ্য প্রতিক্রিয়াঃ নিঃসন্দেহে মানব জমিন উপন্যাসটি শীর্ষেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটী শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। লেখকের উপন্যাসগুলিতে একসাথে একাধিক কেন্দ্রীয় চরিত্রে অবতারণা পাওয়া যায়। এখানেও সেই ব্যাপার টা অক্ষুন্ন। অনেকগুলো সম্পর্কের জটিলতা এবং গভীরতা লেখক অত্যন্ত সুনিপুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসটিতে জীবনের রূঢ় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন পাঠকেরা। এই উপন্যাসটি পাঠকদের মনে অনেকদিন দাগ কেটে রাখবে।
পড়ার সময় উপন্যাসটিতে এটা স্পষ্ট অনুভব করা যায় যে সুখ নামের স্বাধীন সত্ত্বাটিকে চাইলে ক্ষমতা আর বিদ্রোহ দিয়ে খাচায় বন্দী করা যায় না। সুখকে খোজা যায় না, খুজলে জীবনের জটিলতা শুধু বাড়ে। সুখ অপার্থিব।
এই বইটা অনেক সময় নিয়ে শেষ করলাম। কিছু কিছু বই থাকে যেগুলো পড়লে কেমন এক বিষণ্ণতা এসে ভর করে! যেমন মুরাকামির নরওয়েজিয়ান উড, বইটা যে খুব দুঃখ-কষ্টের করুণ গাঁথা এমন নয়, কিন্তু কোথায় যেন একটা বিষণ্ণতা, বুকের ভেতর চিনচিনে একটু ব্যথা! মানবজমিন সেরকমই একটা বিষণ্নতার বই। এধরনের বইগুলি শেষ করতে আমি বেশ সময় নেই।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের খুব বেশি বই আমি পড়িনি। কিন্তু যেকয়টাই পড়েছি তাতে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে ওর বইয়ের চরিত্র গুলো ধূসর হয়। সাদাকালোর মিশেল। চাইলেই কোনো চরিত্রকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলা যায়না। চরিত্রগুলো পছন্দ আর অপছন্দের মাঝখানে একটা জায়গায় এসে স্থির হয়। মানবজমিনের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটাই ঘটেছে। বইয়ের সব চরিত্রগুলো জীবনের ভারে নুয়ে পড়েছে যেন! এই বইয়ের অন্যতম আকর্ষণ এর নারী চরিত্রগুলো। সাধারণত গল্প উপন্যাসে যেমন নারী চরিত্র দেখা যায়- আবেগী, কোমল, রোমান্টিক। মানবজমিনের মুখ্য নারী চরিত্রগুলো সেখানে অনেকটাই বাস্তবমুখী, নিরুত্তাপ আর ক্ষেত্রবিশেষে কঠিন!
এই উপন্যাসের এক চরিত্র তৃষা। প্রচন্ড মনোবল, ব্যক্তিত্ব আর ন্যায় অন্যায়ের মাঝে দোদুল্যমান এক ব্যাতিক্রমী নারী। তৃষার স্বামী শ্রীনাথ। স্বভাবে সে তৃষার বিপরীত। তাদের স্বভাবের অমিল সম্পর্কের মাঝে তৈরি করেছে যোজন যোজন দূরত্ব। আরো আছে প্রীতম। মরণরোগ বাসা বেঁধে আছে তার শরীরে। কিন্তু প্রীতম তার ইচ্ছাশক্তির ছোবলে শরীরের রোগ-জীবাণুকে পরাস্ত করার প্রবল বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে। প্রীতমের স্ত্রী বিলু। প্রীতমের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ কিন্তু প্রীতমের ভালোবাসার গভীরতা অনুধাবনে উদাসীন। বইয়ের মুখ্য চরিত্র দীপনাথ। এক হোমরাচোমরা অফিস এক্সিকিউটিভের পি.এ। দীপনাথের পাহাড়ের প্রতি আছে এক অদ্ভূত ভালোবাসা! তার স্বপ্ন একদিন সংসারের সব সুতো ছিড়ে দিয়ে সে শেতশুভ্র পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নিবে। দীপনাথের সাথে এক বিচিত্র সম্পর্কে বাঁধা পড়ে যায় তার বসের স্ত্রী মণিদীপা। এই উপন্যাসের সবচেয়ে কনফিউজড আর আনরিজনেবল চরিত্র আমার মনে হয়েছে মণিদীপাকে। বারবার মনে হয়েছে আত্মসম্মান আর আত্মঅহমিকার মাঝখানের সূক্ষ্ম লাইনটা সে গুলিয়ে ফেলছে। এছাড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো কিছু চরিত্র এই উপন্যাসে ঠাঁই পেয়েছে। দীপনাথ চরিত্রগুলোর মাঝখানের এক কমন গ্রাউন্ড। মানবজমিন পড়তে পড়তে আমার একেকবার মনে হয়েছে দীপনাথকে বোধহয় বেশিই গ্লোরিফাই করা হয়ে যাচ্ছে! সেই তো সাধারণ, কিছুটা ভালো, কিছুটা মন্দেরই এক মানুষ দীপনাথ! তবু ক্যানো দীপনাথে সবাই এত মন্ত্রমুগ্ধ! নাকি পাহাড়ের বিশালতাকে ভালোবাসতে পারলেই কেউ অসাধারণ হয়ে যায়! হবে হয়তো। তবে একসময় এও মনে হয়েছে যে দীপনাথ আসলে সাধারণই। কিন্তু দীপনাথকে কেউ কখনো খুব কাছ থেকে দেখেনি। দীপনাথ নিজের বৃত্তে কাউকে ঢুকতে দেয়নি। বৃত্তের বাইরে থেকে দেখা দীপনাথ তাই অনেকের কাছেই অসাধারণ।
এই উপন্যাসটা বেশ সময় নিয়ে পড়েছি বলেই হয়তো কেমন আপন হয়ে গেছিলো। শেষের দিকে এসে মনে হচ্ছিলো চরিত্রগুলো সব আমার চোখের সামনে দিয়েই বড় হচ্ছিলো, বুড়ো হচ্ছিলো। বই শেষ করেছি দীপনাথের প্রতি একবুক ঈর্ষা নিয়ে। বইয়ের অন্য চরিত্রগুলো যখন সম্পর্কের জটিলতার সুতোয় জড়িয়ে হাসফাঁস করছে সেখানে সম্পর্কের বাঁধন থেকে মুক্ত দীপনাথ কত নির্ভার! আমি সবসময় দীপনাথ হতে চেয়েছি। সম্পর্কের সুতোয় না জড়ানো, নির্ভার, একা কিন্তু মুক্ত দীপনাথ! এরকমই তো হওয়া চাই! যেন পাহাড় একদিন ডাকলেই চলে যাওয়া যায়।
দীর্ঘশ্বাস আর একবার বুক ভেঙে বেরিয়ে এল, ঠিক এক মাস পর যখন রাত্রে কলকাতা-বােমবাই ফ্লাইটে আমেরিকার পথে পাড়ি দিল দীপনাথ। নীচে অন্ধকার ভারতবর্ষ । বিশাল এবং বিপুল। এই দেশের সীমা আগে কখনো ডিঙোয়নি দীপনাথ। এখন ডিঙোতে চলেছে। এই দেশকে সে কখনাে আপন বলে ভাবতে পারেনি, এখানে তার কোনো পিছুটানও নেই। তবু বুকের মধ্যে এক-একটা পাক দেয় মাঝে মাঝে।
কী ফেলে যাচ্ছে সে? কাকে রেখে যাচ্ছে? ছেলেবেলা থেকে সে পিসির কাছে মানুষ। নিজের মা-বাপকে ভাল করে চেনেনি। ভাই-বােনের সঙ্গে সে রকম সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। না ছিল গভীর কোনাে অবিচ্ছেদ্য ভালবাসা। মণিদীপা? তাকে সে নতুন করে কি সম্প্রদান করে আসেনি বোস সাহেবের হাতে?
অনেক হিসেব কষল দীপনাথ। না, কেউ নেই, যার জন্য আবার তার এই দেশে ফিরে আসতে হবে। তবে কেন এই বুকের মধ্যে অকারণ উথাল-পাথাল?
পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে পাড়ি দিতে দিতে অন্ধকার ভারতবর্ষের দিকে চেয়ে ছিল দীপনাথ। দক্ষিণে সমুদ্র, পশ্চিমে সমুদ্র, উত্তরে সেই হিম পাহাড়ের ঢেউ । মাঝখানে মােটা থেকে সরু হয়ে আসা এক দেশ। এ দেশ তাে তার নয়। সে যেখানেই বীজ বপন করবে সেইখানেই বৃক্ষের উৎপত্তি দেখবে। তবে?
সব মানুষই এক অসমাপ্ত কাহিনী । কোনাে মানুষই তার জীবনের সব ঘটনা, সব কাজ শেষ করে যায় না তাে! তার নিজের জীবন এখনাে অনেকখানি বাকি। অনেকখানি বাকি ছিল প্রীতমেরও। ওই নীচে অন্ধকার ভূখণ্ডে আরাে কত কাহিনী রচিত হচ্ছে, যার সবটুকু শেষ হওয়ার নয়। জীবনের অনেকটা বাকি থাকতে থাকতেই অনেকে খেলার মাঠ ছেড়ে চলে যাবে। দেনা-পাওনার হিসেব মিলবে । এই খেলার একজন খেলুড়ি তাে সেও! কারাে জন্যই তার দুঃখ করার কিছু নেই।
তবু বুকের মধ্যে মৃদু ঢেউ। দোল দিচ্ছে। ঘা মারছে। বলছে, কপাট খােললা । উত্তরে এই অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। পাহাড়ও বহু বহু দূর। তবু দীপনাথ টের পায়, স্বদেশ নয়, শেষ পর্যন্ত এক মহা পর্বতই কোল পেতে বসে থাকবে তার জন্য। য��দিন তার কোলে যাবে দীপনাথ, সেই দিন পরম পিতার মতাে সেই পাহাড় নিজের তুষারঝুপের পরতে পরতে দীপনাথকে মিশিয়ে নেবে। আদরে সােহাগে। দুঃখ, দৈন্য, দুর্দশা, অপমান, স্মৃতিভার থেকে শীতল মুক্তি।
কাগজের ন্যাপকিনটা হাতে ধরা ছিল দীপনাথের। সন্তর্পণে সেইটে তুলে দু'চোখের কোল মুছে নিল।
এই একটা উপন্যাস পড়লাম যেখানে একটা চরিত্র বাদে বাকি প্রত্যেকটা চরিত্র ফ্লড। প্রীতম বাদে বাকি প্রত্যেকটা চরিত্র ত্রুটিপূর্ণ........
দীপনাথ আর মনিদীপাকে ইচ্ছা করছিল দড়ি দিয়ে বেঁধে একসাথে জোড়া লাগায় রাখি! তৃষা আর শ্রীনাথের মান অভিমান ভুলে গিয়ে একটা সুন্দর মিলন দেখতে চাচ্ছিলাম! খুব চাচ্ছিলাম প্রীতম যেন পরিপূর্ণ হবে সেরে ওঠে এবং বিলুর মুখে ঝামা ঘষে দেই!
প্রীতম বাদে বাকি প্রতিটা চরিত্রের উপরেই ভীষণ রাগ উঠে। পুরুষ মানুষ শ্রীনাথ এতটা দুর্বল চিত্তের কিভাবে হয় বুঝি না। দিপনাথ আসলেই একটা মেরুদণ্ডহীন। নিজের ভালোবাসাকে ছিনাই নিতে পারেনা যেখানে মনিদিপা নিজের থেকে কাছে আসতে চাইতেছে। বিলু একটা অসভ্য দ্বিচারিনী। বোস আরেকটা কাপুরষ যে কিনা অন্য লোককে প্রস্তাব দেয় নিজের স্ত্রীকে বিয়ে করার। মনিদিপা তো একটা অসহ্য চরিত্র। পায়ের তলায় মাটি নেই কিন্তু বড় বড় কথা। তৃষার জন্য প্রথম অনেক রাগ হয়। কিন্তু আস্তে আস্তে তার প্রতি একটা ভালো লাগা খারাপ লাগা দুটোই তৈরি হতে থাকে। সে নিজেও আসলে অনেক অসহায়। এ কারণেই তৃশা শ্রীনাথের মিলন চাচ্ছিলাম।
চরিত্রের বুনন অনেক সুন্দর। প্রতিটা চরিত্রের সাথেই ইমোশন ফিল করবেন। এবং এখানেই লেখকের সার্থকতা নিহিত। লেখাও অনেক সাবলীল।যেহেতু বড় উপন্যাস তাই কোথাও কোথাও পড়ে যায় আবার কোথাও কোথাও ওঠে।
কিন্তু তৃষা-শ্রীনাথের কোনো ইতি টানা হলো না কেন? ওটা কি ভুলে গেছেন নাকি?
3.5 "" তুমি কি জানো দীপু,মেয়েরা যে যত বড়ই হোক,প্রত্যেকের ভেতরে এই মজ্জাগত আকাঙ্ক্ষা থাকে?জানো না তো?তা হলে আমার কাছ থেকে শোনো।স্বামী বা প্রেমিক,ছেলে বা ভাই,কোনো একজন না একজন পুরুষের কর্তৃত্ব সব মেয়েই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বেচ্ছায় মেনে নেয়।নইলে তার মন ছটফট করে,ভেতরটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে ভরে থাকে।"
একেবারেই ক্লাসিক শীর্ষেন্দু এবং তাঁর patriarchal চিন্তাধারা।নারী চরিত্রগুলো দৃঢ় হতে হতেও হয়না।তারা হয়ে যায় দ্বিচারিণী,তারা চায় পুরুষের প্রভুত্ব।তারা হয়ে যায় ব্যাটাছেলে।😅
তবুও তো এই এত্ত বড় একটা উপন্যাস পড়ে ফেললাম,শুধুমাত্র তাঁর লেখনির সম্মোহন শক্তিতে,তাঁর হরেক রকম চরিত্র তৈরি এবং তাদের ভেতরে প্রাণ প্রদানের দক্ষতার গুণে। উপন্যাস সম্পর্কে কয়েকলাইন বলতে হলে বলবো এর ভেতরকার গল্পগুলো অপ্রাপ্তির,অপূর্ণতার,হাহাকারের। বড় চাকুরে দীননাথ,নরম দুর্বল শ্রীনাথ,শক্ত কঠিন তৃষা,লড়ুকে প্রীতম এদের সবার জীবনকথাই অনেকটা এক- যাহা চাই,তা পাইনা যাহা পাই,তা চাইনা যাহা চাই এবং পাই,তাহা আপন করতে পারিনা-সামাজিকতার দেয়ালে ঠোক্কর খাই,নৈতিকতার জালে আটকে পড়ি।
উপন্যাসটি পড়ার সময় এবং বিশেষ করে শেষ করার পর নিজের মধ্যে বেশ হতাশা কাজ করেছে। এর পূর্বে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যয়ের যতগুলো বই পড়েছি সেগুলোর সাথে এই উপন্যাসটিকে যেন কিছুতেই মিলাতে পারছিলাম না। উপন্যাসটির কোন চরিত্রের মধ্যেই চূড়ান্তভাবে নীতি ও আদর্শ খুজে পাইনি। তৃষা এই উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র। সে স্বামীকে পুরুষই মনে করে না, ভাশুরকেই জীবনের একমাত্র প্রেমিক পুরুষের স্থানে বসিয়েছে। স্বামী শ্রীনাথের প্রতি বার উপেক্ষা, অবহেলা, সোমনাথ ও তার স্ত্রীকে পোষা গুন্ডা দিয়ে মার খাওয়ানো আবার নিজ স্বার্থে রাজনৈতিক নেতাকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে ভোজন করানো প্রভৃতি তাকে একটি জঘন্য চরিত্র হিসেবে উপস্থান করেছে। অন্তত আমার ভালোলাগার তালিকায় এমন কোন চরিত্র স্থান পাওয়ার কথা ভাবতেই পারিনা। বার বার দীপনাথের কথা এসেছে এবং ধরে নেওয়া যায় দীপনাথই এই উপন্যাসের নায়ক। দীপনাথ সৎ, বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ সব মিলিয়ে অনেক গুণের সমন্বয়ে একজন মানুষ। উপন্যাসের গুরুতে তার প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয় কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায় তার মধ্যে চারিত্রিক দৃঢ়তা বলে কিছু নেই। হঠাৎ করে বিথী নামের সম্পূর্ণ অপরিচিত চল্লিশোর্ধ কামোত্তোজেক এক নারীর সাথে সে শারিরীক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং সেটা একবার নয় একাধিকবার। অথচ মনিদীপাকে সে বার বার প্রত্যখ্যান করেছে যে কিনা সত্যিকার অর্থেই দীপনাথকে ভালোবেসেছিল। আমার মনে হয়েছে দীপনাথকে নিয়ে লেখক নিজেই কিছুটা বিভ্রান্ত ছিলেন। প্রীতমের প্রতি বিলুর গভীর ভালোবাসা ছিল কিন্তু যখনই জানতে পারল অরূণ বিয়ে করতে যাচ্ছে তখনই তার সাথে দৈহিক সম্পর্কে জড়িয়ে তাকে নিজের করে রাখার চেষ্টা- এই চরিত্রটিকেও ম্লান করে দেয়। শ্রীনাথ সম্পর্কে তো বলার কিছুই নেই। সে স্ত্রীর উপর প্রতিশোধ নিতে কলকাতার পতিতালয়ে গিয়ে মাতাল হয়ে সুখ খোঁজে এবং গ্রামের মানুষের কাছে নিজের স্ত্রীর কুৎসা রটিয়ে আনন্দ পায়। বরং শ্রীনাথের পুত্র সজলের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় একটি সুস্পষ্ট আদর্শকে। সব মিলিয়ে উপন্যাসটি পড়ার সময় বার বার মনে হয়েছে বর্তমান সময়ে ভারতীয় বিভিন্ন বাংলা টিভি সিরিয়ালে পরকীয়ার ব্যপারটিকে যে বিরক্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয় তার সূচনা আসলে অনেক আগেই বাংলা সাহিত্যের হাত ধরে শুরু হয়েছে। অবশ্য লেখক উপন্যাসটিতে সমাজের কিছু অপ্রিয় বাস্তবতা এবং তার পরিনতি কি- সেটাই তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেদিক দিয়ে বলা যায় উপন্যাসটি সফল। কিন্তু আমি সব সময় ইতিবাচক চিন্তায় বিশ্বাসী বলেই হয়তো উপন্যাসটিকে ভালোবাসতে পারিনি। উপন্যাসটিতে যদি অন্তত একটি ইতিবাচক চরিত্র থাকত যার মধ্যে হতাশা নেই, বিষন্নতা নেই যে সর্বদা আলোর অভিমুখী তাহলে হয়তো এত খারাপ লাগত না।
এই উপন্যাসটির যখন মধ্যভাগে ছিলাম তখনো ভেবেছি বইটি নিয়ে বড় সর কিছু লিখবো। কিন্তু হায়! আজ বিকেলে বইটি শেষ করার পর কয়েকবার চেষ্টা করেও লিখে সাজিয়ে উঠতে পারিনি। এতো সুন্দর করে লেখক কিভাবে লিখে? কিভাবে বলে যায় গল্প? ৫৬৫ পেজের বইটির প্রতিটি চরিত্র এতটা আপন হয়ে এসেছিলো যে শেষের ১০০ পেজের পর আর পড়তে ইচ্ছে হচ্ছিলো না। কিন্তু শেষ তো করতেই হবে। আর শেষের ১০০পেজে গল্পের পরিণতি সত্যি অসাধারন। বইটা শেষ করা�� পর প্রতিটা চরিত্র মাথার ভিতর ঘুরঘুর করছে। এতো বুদ হয়ে কেঁটেছে মানবজমিন নিয়ে আমার সময়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর পার্থিব উপন্যাসটির পর এটি আরেকটি শ্রেষ্ঠ মাস্টারপিস এবং বই টি অবশ্যই পড়া উচিত। বলতে গেলে শীর্ষেন্দু বাবুর সব বই ই ভালো। প্রিয় এই লেখক বেঁচে থাক অনন্ত কাল।। দিনশেষে মনে করিয়ে দিতে হয় মানবজমিন সাহিত্য আকাদমি পুরুস্কার পাওয়ার যোগ্যই ছিলো।
যারা এত এত পৃষ্ঠার উপন্যাস লেখেন, তাঁদের মাঝে মাঝে খুব হিংসে হয়। কিছু কিছু অনুভূতি যেগুলোর সংজ্ঞা আমরা হয়ত দিতে পারিনা, লেখক কি সুন্দর করে একটা একটা করে শব্দের গাঁথুনিতে আটকে ফেলেন। কোন চরিত্রের প্রতি তাঁর কোন পক্ষপাতিত্ব নেই। খুব ভালো করে জানেন, ঠিক কোথায় গিয়ে থামতে হবে। ৫৬৪ পৃষ্ঠার উপন্যাসটার কাহিনিও আহামরি তেমন কিছু নয়। তারপরেও পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ছুটে যেতে ভালোই লাগছিল। পনেরো বিশটা চরিত্র নিয়েই গল্প এগোয়। গল্প আর কি!...আমাদের মত সাধারণ কিছু মানুষের জীবনের কয়েকটা বছরের দিনাতিপাত নিয়েই এই মোটা বইটা। কাহিনীটা মনে হল যেন অসমাপ্ত। ঠিক জীবনেরই মত। মানুষের জীবনে মৃত্যু বই সমাপ্তি বলেতো কিছু নেই। There is nothing called a happy ending until you die satisfied. And that is very rare indeed (এই দুইটা আমার লাইন, বইয়ের না :v) বইটা লেখকের মাস্টারপিস নয়। তারপরেও পড়তে ভালো লাগছিল।
কিছু জাগতিক লাভ হল, অনেকগুলো বাংলা আর ইংরেজী শব্দ শিখলাম :D বরাবরই বাংলা আর ইংরেজি ডিকশনারি হাতের কাছে রেখেছিলাম! মহাজাগতিক লাভের কথা আজ থাক :p
হাতে সময় থাকলে পড়তে পারেন। না পড়লেও তেমন ক্ষতি নেই...
এক পার্থিব ভালো লাগসিলো। সেই ধারাবাহিকতায় দূরবীন তারপর এখন শেষ করলাম এই মানবজমিন৷ শিক্ষা সফর হয়ে থাকলে শীর্ষেন্দুর আর কোনো বই ধরবো না। এক পাল অসুস্থ আর উদ্ভট মানসিকতার যুক্তিহীন কার্যকলাপ পাতার পর পাতা পড়ে যাওয়ার কোনো মানে আছে? লেখক একটু সুন্দর করে লিখে রাখসেন দেখে এগুলা পড়তে হবে! এগুলা নাকি আবাট জীবনের গল্প।
কিছু কিছু বই থাকে যেগুলো বাস্তব জীবনকে কেন্দ্র করে লেখা হয় মানবজমিন বইটি তার মধ্যে একটি। এই বইটিতে জীবনের এমনি কিছু কাহিনিকে তুলে ধরা হয়েছে যেগুলা আসলেই ঘটে যাওয়া ঘটনা। যেগুলো অসমাপ্ত।নিয়তির কারণে পরিপূর্ণতা পাই না। এই গল্পের তিনটি চরিত্র তৃষা, দীপনাথ, প্রীতম ঠিক তাদেরই উদাহরণ তাদের জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তে কিছু সত্য বাস্তবতাকে নিয়ে প্রতি মুহুর্তে লড়াই করে বেচেঁ থাকে । কেউ নিজের সঙ্গে, কেউ কর্মক্ষেত্রে, কেউ রোগের সাথে, তাদের জীবনের কিছু মুহূর্ত তারা হইত পরিবর্তন করতে পারে না কিন্তুু তারা বাস্তবকে মেনে নিয়ে লড়াই করে । দীপনাথ কথাটা ঠিকই বলে "বেচেঁ থাকার ইচ্ছাটা হল জৈবের মতো।" আর আসলেই সব মানুষই এক অসমাপ্ত কাহিনী। কোন মানুষই তার জীবনের সব ঘটনা, সব কাজ শেষ করে যায় না তো। কিছু জিনিস অপূর্ণ থেকে যায় এবং এভাবেই বাকি জীবন কেটে যায়।
বেশ বড়সড় উপন্যাস, অনেকগুলো চরিত্র। সকলেই একে অপরের সাথে জড়িত। প্রধান চরিত্র দীপনাথই। তবে অন্যান্য চরিত্রের ব্যাপ্তিও কম নয়। দীপনাথ নিজেকে ভাবেন নীতিবান, যদিও এক দুইবার বাইরে কোন অগম্যা নারীর সাথে সময় কাটানো নিয়ে তাকে খুব বেশি বিচলিত হতে দেখা যায় না। মণিদীপা, তৃষা, বিলু তিনজন নারী চরিত্র পুরোটা উপন্যাস জুড়েই বিদ্যমান। দুঃখের বিষয় এদের চারিত্রিক দুর্বলতাগুলোই কেন যেন চোখে আঙুল দিয়ে বারবার দেখানো হচ্ছিল! তৃষা, সম্পর্কে দীপনাথের বৌদি, যার রয়েছে একটি বিতর্কিত অতীত, সে নিজ ক্ষমতার জোড়েই দাপটের সাথে ভাসুরের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করছে, তারও মনে হয় মেয়েদের নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তসমর্থ পুরুষ দরকার! কমিউনিজমে বিশ্বাসী মণিদীপা আস্ফালন আর অহংকারে শেষমেশ রূপান্তরিত হয়েছে একটি হাস্যকর চরিত্রে। বিলুকে হৃদয়হীন এবং শরীরসর্বস্ব করে আঁকা হয়েছে এবং ক্রমাগত তার বিপরীতে তার স্বামী প্রীতম কতো ভালো, কতো পূণ্যবান তা এসেছে। দীপনাথের বোনের স্বামী এই প্রীতম যে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, যার স্ত্রী বিলু ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে একটি চাকরি করতে চেয়ে হয়েছে দীপনাথের ও বিরাগভাজন। হ্যাঁ, অরুণের সাথে সমাজবহির্ভূত একটি সম্পর্কেও জড়িয়ে ছিলো সে। দীপনাথের ভাই এবং তৃষার স্বামী শ্রীনাথ ক্রমাগত সন্দেহে এবং স্ত্রী এর ক্ষমতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে অক্ষম ক্রোধে এবং ঘৃণায় পাগলপ্রায়! এছাড়াও বোসসাহেব, বীথি, সুখেন, সজল, সোমনাথ, শমিতা, দীননাথ ইত্যাদি চরিত্র নিয়ে বিশাল কলেবরে সাজানো ধীরলয়ের উপন্যাস মানবজমিন। শীর্ষেন্দুর গদ্য ভালো, কিন্তু এই বইতে কিছুটা শ্লথ লেগেছে৷ প্রতিটি প্রধান নারী-পুরুষের চরিত্র দিয়ে বারবারই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন নারীরা পুরুষের নিচে এবং তাদের একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থাকা উচিৎ! আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আজকালকার দিনের লেখক হলে শীর্ষেন্দু কি এতটা জনপ্রিয়তা পেতেন? আমার বরং দুইটা দৃশ্যের জন্য আসা অঞ্জুকে ভালো লেগেছে ঢের বেশি। যে মুখে কিছু বলেই থেমে থাকে না, কাজেও করে দেখায়। নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিজেই তৈরি করে নেয়। তবে শেষটুকু বেশ হৃদয়ছোঁয়া। সকলেই তো আর এম্বিশাস নয়, বিদ্রোহী নয়। জীবনের চাপিয়ে দেওয়া সব অবিচার মেনে নিয়েই কেউ কেউ জীবন পার করে দেয়। বইয়ের প্রতিটা চরিত্র যেন তার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
শীরষেন্দুর প্রায় সব উপন্যাসের মধ্যেই একাধিক চরিত্রের দেখা পাওয়া যায় এবং উপন্যাসের গভীরে যেতে যেতে আমরা সেই চরিত্রগুলোর একজনের সাথে অপরজনের সম্পর্ক জানতে পারি। ব্যাতিক্রম ঘটে নি মানবজমিনের ক্ষেত্রেও। এখানেও দেখা গেছে কিছু প্রধান চরিত্র এবং তার সাথে কিছু অপ্রধান চরিত্রের সেতুবন্ধন, তাদের ভেতরকার টানাপোড়েন, অভিমান, ভালবাসা! উপন্যাসটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তিনজন প্রধাণ নারীচরিত্র। যারা কিনা সমাজের সচরাচর চলে আসা প্রথা থেকে সরে আসার সাহস দেখায়। নিজস্বতা নিয়ে যারা বেঁচে থাকতে জানে। কিন্তু এই প্রভাব খাটাতে গিয়েই কি তারা আসলে সুখী হতে পারে শেষ পর্যন্ত? তৃষা, বিলু আর মণিদীপা এই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজে উপন্যাস জূড়ে। বিলুর স্বামী প্রীতম উপন্যাসের আরেকটি প্রধাণ চরিত্র। এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে যে শয্যাশায়ী। প্রচন্ড রকমের শান্ত, নির্ভেজাল ভাল মানুষ প্রীতমের মন জুড়ে আছে বিলু আর তার মেয়ে লাবুর প্রতি ভালবাসা। কিন্তু একটা সময় সবার অবহেলা পেতে পেতে অভিমানী প্রীতমের সেই ভালবাসায় কি একটু চিড় ধরে? আর আছে দীপনাথ! উপন্যাসের প্রধাণ নায়কও। এক মা��্টিন্যাশনাল কোমপানির কর্মকর্তার বেতনভোগী পিএ। সবার জীবনের অংক মেলানোর চেষ্টায় যে ব্যাস্ত। বসের স্ত্রী মনীদীপার প্রতি যার কাজ করে এক অদ্ভুত টান। এক অন্যরকম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তারা। দীপনাথের চরিত্রের গভীরতা ব্যাপক।প্রথমে ব্যাক্তিত্বহীন মনে হলেও শেষে তার চরিত্রের ব্যাক্তিতটাই বেশি চোখে পড়ে। সবার জীবনের মিল ঘটানোর এক ব্যারথ চেষ্টায় মত্ত দীপনাথ শেষমেষ তার স্বপ্নের পাহাড়ের ডাকেই ছুটে চলে...
এই কয়েকটি চরিত্র এবং এর সাথে আরো কিছু অপ্রধাণ চরিত্রের জীবনের গল্প নিয়েই মানবজমিন। এটা এমন একটা বই যেটা আপনাকে রূঢ় বাস্তবতার সাথে পরিচয় করাবে। শেষ হওয়ার দেখা দিবে এক অদ্ভুত মন খারাপ!
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মানবজমিন শুধু বাংলা সাহিত্যের একটি দীর্ঘ উপন্যাস নয়, বরং সম্পর্ক, শ্রেণি, সমাজ ও আত্মসন্ধানের বহুস্তরীয় প্রতিচ্ছবি—যা একাধারে গৃহজ জীবনচিত্র আর অপর দিকে এক ধরণের শিল্পিত সমাজপাঠ। এখানে তৃষা, দীপনাথ ও প্রীতম—এই তিনটি চরিত্র জীবনযুদ্ধের ত্রিমুখী ধাক্কায় দাঁড়িয়ে, সমাজের শক্তি-সাম্য ও ভালোবাসা-অপ্রাপ্তির বোধে নিজেদের নির্মাণ করে। উপন্যাসের ক্যানভাসে যে মানব জমিন গড়ে ওঠে, তা যেন এক বিস্তৃত মনোভূমি—যেখানে প্রতিটি চরিত্র একধারে একক, আবার সমগ্র সমাজচিত্রের অংশ।
তৃষার চরিত্রে আছে আত্মমর্যাদা, সমাজের রীতিনীতির বিরুদ্ধে এক প্রকার অবজ্ঞা ও এক ধরণের কঠিন অনমনীয়তা। সে নিছক প্রেম বা পরিবারের জন্য অস্তিত্ব নির্ধারণ করে না, বরং নিজস্ব মূল্যবোধে দাঁড়িয়ে নিজের সত্তা রচনা করতে চায়। দীপনাথ তার বিপরীতে এক অন্তর্মুখী, দ্বিধাগ্রস্ত চরিত্র—অফিস-ঘর-সম্পর্কের জটিলতায় দুলতে থাকা একজন পুরুষ, যে ভালোবাসতে জানে, কিন্তু নিজের ভিতরের জড়তাকে অতিক্রম করতে পারে না। আর প্রীতম, জীবনের শারীরিক দুর্বলতার মাঝেও অনমনীয়ভাবে সংগ্রামী, সে ভালোবাসে, আত্মত্যাগ করে, জীবনের প্রতি তার দায় গভীর।
এই চরিত্রগুলো শুধু একে অপরকে ছুঁয়ে যায় না, তারা একসঙ্গে গড়ে তোলে সামাজিক অভিজ্ঞতার একটি সংলগ্ন টেক্সচার, যেখানে দুর্গাপুর শহর, জমিদারবাড়ির ছায়া, অর্থনৈতিক সংকট, ভালোবাসার ক্ষরণ ও ঘৃণার ছাপ মিলেমিশে এক জটিল মানবভূমি রচনা করে। শীর্ষেন্দুর বর্ণনায় চরিত্র কখনও ‘ফাংশনাল’ হয় না—প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা। এতে ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যের ছায়া দেখা যায়—মার্কেসের One Hundred Years of Solitude–এ যেমন প্রেতাত্মা ও বাস্তবতা মিলেমিশে এক অতিপ্রাকৃত বাস্তবতা তৈরি করে, বা চিমামান্ডা এনগোজি আদিচির Half of a Yellow Sun–এ যেমন নারী-পুরুষের সম্পর্কের ভিতর দিয়েই যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ফুঁটে ওঠে, তেমনি মানবজমিন–এ সামাজিক বাস্তবতা হয় সম্পর্কের কেন্দ্র।
যদিও এখানে কোনো ম্যাজিকাল রিয়ালিজম নেই, শীর্ষেন্দুর কল্পনার জগত বাস্তবেরই গভীরে নিহিত। তার বাস্তবতা যেন এমন এক আবরণ, যা খুললেই দেখা যায় আবেগের সংবেদী স্তর, স্তরের নিচে সম্পর্কের নির্মমতা, প্রেমের পরিত্যক্ত রেশ, পরিবারে পরম সম্পর্কের ছন্দপতন।
তৃষা ও দীপনাথের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়—এটা শুধু ভালোবাসা নয়, এটা একধরনের ‘power dynamic’। তৃষার মধ্যে সেই নারীবাদী শক্তি যা ইসাবেল আলেন্দের চরিত্রদের মতো স্বনির্ভর, বিদ্রোহী ও আত্মনির্ভর। তার সাহস, স্বামীর ওপর বিদ্রোহ, সন্তানকে নিয়েও নিঃসংশয় প্রতিরোধ—এইসব মিলিয়ে তৃষা যেন সেই নারীর প্রতিচ্ছবি, যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর তুলে আনে। আলেন্দে যেমন বলেন, "Women are the revolution."—তৃষার অবস্থান তেমনই এক বিপ্লবের পাঠ।
আদিচির উপন্যাসে নারীদের অস্তিত্ব গৃহযুদ্ধের ভিতর দিয়েও জেগে ওঠে। সেখানকার প্রেক্ষাপট অনেকটা বৃহৎ, কিন্তু অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম একই রকম—অত্যন্ত ব্যক্তিগত অথচ রাজনৈতিক। Half of a Yellow Sun–এ চিরন্তন অনিশ্চয়তার ভিতরেও সম্পর্ক টিকে থাকে বা ভাঙে; যেমন মানবজমিন–এ প্রীতমের শারীরিক দুর্বলতা কিংবা দীপনাথের আত্মদ্বন্দ্ব একরকম সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষ ভালোবাসে, আবার ভেঙেও পড়ে।
শীর্ষেন্দুর উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক তার ফর্ম। এত চরিত্র, এত ঘটনা, অথচ কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। গল্প এগোয় যেন নদীর মতো—একটা উপাখ্যান আরেকটার সঙ্গে মিশে যায়, সবকিছু এক মূল প্রবাহে এসে মিলে যায়। এই গল্প-বুননের দক্ষতায় Chronicle of a Death Foretold–এর মতো বহু স্তরীয় আখ্যানরীতির কথা মনে পড়ে—যেখানে ছোট ছোট ঘটনাগুলো একত্র হয়ে এক মহারূপ নেয়।
উপন্যাসের থিম জুড়ে আছে অস্থিরতা, বিশ্বাসঘাতকতা, শ্রেণি-চেতনা, মর্যাদার ক্ষরণ এবং নিঃশব্দ বিদ্রোহ। যেমন আফ্রিকান সাহিত্যে চিনুয়া আচেবে Things Fall Apart–এ দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজ ভেঙে পড়ে যখন পুরনো বিশ্বাস আর আধুনিক বাস্তবতার সংঘর্ষ ঘটে, তেমনি মানবজমিন–এ শহুরে এবং গ্রামীণ চেতনার মধ্যে সংঘাত, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে নারীর স্বাধীনতাচিন্তা, এবং ভালোবাসার প্রথাগত ধারণার বিপরীতে আত্মপরিচয়ের যাত্রা—এসব মিলে সম্পর্কের ভাষা ভেঙে ফেলে এক নতুন চিত্র নির্মাণ করে।
এমনকি আলবেয়ার কামুর The Plague–এর মতো পাঠেও আমরা দেখি দুর্দিনে সম্পর্কগুলো কীভাবে প্রকাশ পায়, অথবা গ্যাগনীতিক পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও ব্যক্তি তার নৈতিক অবস্থান ঠিক করে। মানবজমিন–এও এর রেশ আছে—প্রেম-সম্পর্কগুলো কেবল হৃদয়ের বিষয় নয়, বরং সমাজের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চাপের ফলাফল।
কাফকার Metamorphosis যেমন জীবনকে অদ্ভুতভাবে পালটে দেয়—তেমনি শীর্ষেন্দুর উপন্যাসেও সম্পর্কের ছকে হঠাৎ ঘটে যাওয়া পরিবর্তন ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে এক নতুন জটিলতার জন্ম দেয়। দীপনাথ বা তৃষা কেউই পরিবর্তনের বাইরে থাকে না, বরং এই পরিবর্তনের কেন্দ্রেই তাদের আত্মজিজ্ঞাসা।
ভাষার প্রশ্নে শীর্ষেন্দুর মুন্সিয়ানা অসামান্য। তার গদ্য চলনে ধরা পড়ে লোকজ ভাবনা, কথ্য ছন্দ, আর একধরনের কাব্যিক গীতিময়তা। একইসঙ্গে গ্রামীণ ও শহুরে জীবনের অনুষঙ্গ গেঁথে তিনি সৃষ্টি করেন এমন এক ভাষা যা স্মার্ট অথচ প্রাচীন, সাবলীল অথচ বহুবর্ণ। এটি অনেকটা আফ্রিকান লেখক এনগুগি ওয় থিয়োং’ওর মতো—যিনি সাধারণ মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি দিয়ে ইতিহাস ও সমাজের অন্দরের পাঠ নির্মাণ করেন।
এই উপন্যাস কেবল একটি গল্প নয়—এটি এক ধরনের নৈতিক দিকচিহ্ন, যেখানে মানুষ—সে নারী হোক, পুরুষ হোক—নিজেকে অনুসন্ধান করে সম্পর্কের আলো-আঁধারিতে। মানবজমিন বিশ্বসাহিত্যের বৃহৎ প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে তার নিজস্ব ঘরানায় স্থির থাকে, অথচ তার অনুরণন পৌঁছে যায় বহুদূর।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এই উপন্যাস একদিকে যেমন আধুনিক ভারতের সম্পর্কজীবনের এক নিখুঁত রূপায়ণ, তেমনি এটি পাঠকের সামনে খুলে দেয় প্রশ্ন—ভালোবাসা মানে কী, দায়িত্ব কাকে বলে, আর সম্পর্কের ভিতরে সত্যিকারের মানুষটি কোথায়? মানবজমিন হয়তো এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর দেয় না, কিন্তু উত্তর খোঁজার পথে পাঠককে সঙ্গ দেয় এক প্রগাঢ় সাহিত্যে-পথিক হয়ে।
এই উপন্যাস না পড়ে থাকলে আপনি শীর্��েন্দুর অন্তরাত্মার নাগাল পাবেন না। পড়ুন। অন্যদের পড়ান।
একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। পড়ার সময় বইয়ের পুরো বিষয়বস্তুর দিকে নজর না দিয়ে প্রায়শ আমি একটা ঘটনা বা একটা নির্দিষ্ট কিছুতে আটকে পড়ি,মাথা থেকে সেটা আর বের করতে পারিনা।
এই বইয়ের মতোন জীবনযাত্রা হয়তো আমি কল্পনাতেও আনতে পারিনা। কেননা আমার সমাজব্যবস্থা এই সমাজব্যবস্থা থেকে আলাদা আবার ধর্মের দিকেও। কিন্তু কিছু কিছু বিষয় সবখানে মিলে যায়। যেমন :পুরুষের তার বিবাহিত নারীর প্রতি বা আত্মীয়ার (রক্তের সম্পর্কের, বোন বা এমন ধারার কিছু)প্রতি যে একধরনের প্রভুত্ব মানসিকতা থাকে,সেটা সবখানে বিদ্যমান। আবার চাকরির ব্যাপারখানা। আমার দিকের একটা কথা বলি। আমার আব্বু-আম্মু মাশাআল্লাহ যথেষ্ট ভালো। অন্তত তারা যে পরিবেশ থেকে এসেছে, সে পরিবেশ থেকে তারা অন্তত বেরিয়ে এসেছে(আমার দাদা বাড়িতে এখনও মেয়েদের এস.এস.সি শেষ করার আগেই বিয়ের তোড়জোড় চলে, মায়ের গোষ্ঠীতে সেটা চলমান দেখলাম। তাছাড়া মেয়েদের বেশি থেকে রান্নার মেশিন আর ছেলে জন্ম দেয়ার মেশিন ছাড়া কিছু ভাবে বলে মনে হয়না)। তাও তাদের কাছে শিক্ষকতা ছাড়া অন্য কোনো চাকরি মানের মনে হয়না। তাদের ধারণা অন্য কোনো চাকরি মেয়েকে খারাপ করে ফেলবে। বা তারা একধরনের ধারণা পুষে রেখেছেন বিভিন্ন চাকরির প্রতি। এই বইয়েও সেটা দেখলাম। অবশ্য বিলুর মন-মানসিকতা আমি বুঝতে পারিনা। কিন্তু এটা বলা চলে মাঝেমধ্যে ওর জন্য খারাপ লাগতো।
এবার আসি তৃষা চরিত্র নিয়ে। এই বইয়ে আমার কিন্তু ওকেই ভালো লেগেছে বেশি। অনেকে বলবে তৃষা চরিত্র ভালো লেগেছে! সেই তো শ্রীনাথ বা অন্য সবার খারাপ হবার কারণ! তৃষার ভালো না। তাও তার সব কর্ম পরিবারের জন্য। এখন বলতে পারো,"কিন্তু, তার পরিবারের কেউ তো সুখি ছিলো না।" সেটার জন্য একটা কথা মনে পড়ে যায়-"যাদের প্রচুর টাকা থাকে,তারা প্রায়শ একটা কথা বলতো যে টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না বা আমাদের বইয়ে শেখানো হয় যে অর্থই অনর্থের মূল।" কিন্তু একদিনও তারা ওই টাকার পেছনে ছুটা থামিয়ে দেয়না। উদাহরণ অবশ্য বইয়েই আছে। মণিদীপা, যে কিনা বড়লোকদের ঘেন্না করে,কিন্তু সেই তার স্বামী যখন রাশ ধরলো, সে পাগলের মতোন রাস্তা খুঁজতে লাগলো টাকা পাওয়ার।
বইটা আর যা হোক, ভাবনার খোরাক দেবে,রাগ দেবে, কল্পনার মাধ্যম দেবে। আবার হ্যাপিলি এভার আফটার নেই বলে, জীবনের সাথে তুলনা করতে ইচ্ছে করবে। জীবন তো এমনই। একটা কাল পরে গিয়ে ঘটনা বিহীন ভাবে সুখী হওয়া চলে না। চড়াই-উতরাই আসতেই থাকে।
১৯৮৯ সালে সাহিত্য একাডেমির পুরষ্কারপ্রাপ্ত বই ২০২২ য়ে এসে বড়ো মলিন মনে হয়। সময়কেই সম্ভবত দায়ী করা মানায়। মন-মানসিকতার পরিবর্তন, যুগের পরিবর্তন ও সাথে যোগ হয়।
আগাগোড়া এক পরকীয়া, ঝগড়াবিবাদ, চুলাচুলি, অশান্তির কাহিনী। সোজা কথায় এটা একটা ডিপ্রেসিং বিখ্যাত 'খ্যাত' উপন্যাস। শীর্ষেন্দু'র অন্যান্য উপন্যাসে নারী চরিত্র ঘরকন্নায় সীমিত। আর এই উপন্যাসে ক্ষমতাসীন, আত্মনির্ভরশীল, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নারী মানেই দ্বিচারিণী। যত ধরণের 'কু' তাদের কর্মকান্ডে লাগানো সম্ভব ততটা লাগাতে লেখকের বদান্যতা চোখে পড়ার মত।
উপন্যাসের বহু চরিত্রের ভীড়ে অধিবক্তা দীপনাথকে আলাদা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনে হলেও আদতে তারও স্খলন হয়, সেও বুজরুকি, ভান, ছলচাতুরী তে ভরা। অন্যান্য চরিত্র গুলোর কাছ থেকে শেখার কিছু নেই।
তাহলে, মনে হতে পারে এত নেগেটিভ উপন্যাস আমি পুরোটা শেষ করলাম কেন?
-'Sunk cost fallacy' র প্রভাবে। শেষ পর্যন্ত কি হয় তা দেখা। যেভাবেই হোক দেখা। লেগে থাকা। মানবজমিন পড়ে কোনো লাভ না হলেও এই phrase কে জেনে ও কাজে লাগিয়ে মনে হচ্ছে - "যাক! কিছু একটা তো করলাম! "
No doubt this is one of the award winning creations by Sharadindu. But some where missed the known author...the Novel is too lengthy, some times boring.. and lost the interest in the middle as the characters become very much predictable... It is obvious that Trisha would be alone in her fight at end... Deepnath will leave Manideepa...Bilu will have illegal physical relationship with Arun (this character seems to be imposed from the very beginning and it was obvious why this character was drafted) ... the Novel could not meet the expectation. the ending could be something else.. This book may be award wining ..but could not win the heart..a bit disappointing as per standard of the Author of charming novels like Din jay, Hridoy brittanto, Parthibo, Jao Pakhi, Banshiwala, Pidimer Alo, Golaper Kanta and many more where win of life and humanity is portrayed over all odds..
আমি মাঝে মাঝেই একটা কথা বলি- মানুষের জীবন একটা উপন্যাসের মতো। গল্পের প্রয়োজনে চরিত্র গুলো আসে, আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে চলে যায়। তার জায়গায় আসে নতুন এক চরিত্র। এভাবেই চলছে! জীবনের রঙচঙে কারবার একটু একটু করে ডালপালা মেলে ধরে নিজেকে বিস্তার করে। কখনো সখনো ছাড়িয়েও যায়। এই যে টানাপোড়েনের জীবন, তার কত নিখাদ গল্প থাকে। থাকে সম্পর্কের গড়ন, ভাঙচুর, লোভ, আত্মত্যাগ সহ হরেক গল্পের সমষ্টি। এতো সব গল্পের ভীড়ে নিজের জন্য কোথাও একটা ছোট খাটো গল্প জমা করা থাকে।
"মানবজমিন" ও সেরকম ই এক গল্পের সমষ্টি। এ যেন জীবনের সাথে জীবনের লড়াই। এ লড়াইয়ের চমৎকার এক অসমাপ্ত দাগ টেনেছেন জনপ্রিয় লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।
এ উপন্যাসটির ব্যাপ্তি বিশাল হলেও আছে জীবনের গভীর ভাব বোধ। প্রচুর চরিত্রের সমন্বয়ে রচিত এ উপন্যাসের কোথাও একটুও জট পাকায়নি। বরং গল্পের ধারা এগিয়েছে চমৎকার সাবলীল ভাষায়।
তিনটি প্রধান চরিত্রের সমন্বয়ে "মানবজমিন" উপন্যাসটি সামনে এগিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র দীপনাথ। নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের ন্যায় যে জীবন। বিশাল পাহাড়ের ন্যায় যার ব্যাপ্তি। দীপনাথ এক সওদাগরি অফিসের পি.এ। বসের বউ মণিদীপার সাথে দীপনাথের এক বিচিত্র সম্পর্ক গড়ে উঠে। সম্পর্কের ধারা অনেকটা মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ হলেও কেউ কখনো সে দেয়াল ভেঙে সামনে এগুনোর চেষ্টা করেনি। রাগে অনুরাগে সিক্ত এ সম্পর্কে দীপনাথের বস মি. বোস পরিপূর্ণতা এনে দিতে চেয়েছিলেন। দীপনাথের নিঃসঙ্গ জীবনে সত্যি ই পরিপূর্ণতা এসেছিল? নাকি খেয়ালি এক ঘূর্ণিপাকে পাক খেতে খেতে হারিয়ে গিয়েছিল সবার কাছ থেকে?
এ উপন্যাসের চমৎকার একটি চরিত্র তৃষা। মৃত ভাসুরের সম্পত্তি প্রাপ্তি যার জীবনের এক অন্যতম ধাপ। আপাতদৃষ্টিতে দেবী চৌধুরানী না হলেও যার চরিত্রে ছিল এক আশ্চর্য রকমের বলিষ্ঠতা। গ্রামের সবার বিপরীতে থেকেও একা লড়াইয়ে শেষ অব্দি হার না মানা এক গল্পের প্রধান চরিত্র। মৃত ভাসুরের সাথে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগে স্বামী সন্তান বিচ্ছিন্ন এক নারী, যার জীবন উপর থেকে বেশ শক্তপোক্ত মনে হলেও ভেতরটা বেশ নড়বড়ে। শেষ অব্দি তৃষা কি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে? নাকি নিজের অবস্থানটাকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যায় সবকিছু সামলে।
এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত প্রিতম। যার লড়াই প্রতি মুহূর্তের। যে কিনা বেঁচে থাকার চেষ্টায় জীবনের একটা মানে দাঁড় করিয়েছিল। কান্ডে নতুন কুঁড়ি গজিয়ে উঠা মৃত প্রায় শুস্ক বৃক্ষের মতো। প্রীতমের স্ত্রীর সঙ্গে অরুণ নামে এক যুবকের সম্পর্ক গড়ে উঠে। সে সম্পর্কের চোখা ডালপালা বিস্তার করতে করতে একদিন প্রীতমের বুকেও আঘাত হানে। সবকিছু টের পেয়েও চোখ বন্ধ করে থাকা প্রীতমের জীবনে শেষ অব্দি কি ঘটে? প্রীতম কি সুস্থ হয়ে উঠে? নাকি কালের আবর্তনে হারিয়ে গিয়ে এ উপন্যাসের অন্যতম রহস্য হয়ে বেঁচে থাকে সবার হৃদয়ে!
জীবনের শুরু টা বেশ সাদামাটা হলেও প্রয়োজনের তাগিদে রংচঙ মেখে সং সেজে বসে থাকাই যার কাজ, তার অন্য এক নাম মানুষ। মানুষের এই টানাপোড়েনের জীবনে থলেতে জমা হয় একের পর এক গল্প। "মানবজমিন" সেরকম ই এক জীবনের গল্প। উপন্যাসটি শুধু সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে সামনে এগোয়নি। বরং টেনে নিয়ে গেছে জীবনের চমৎকার এক ভাবসম্প্রসারনে। এ ভাবসম্প্রসারনের অন্যতম এক নাম "মানবজমিন"।
লেখকের একটি মাস্টারপিস হিসেবে ধরা হয় মানবজমিন কে।বেশ কয়েকটি জীবনের গল্প নিয়েই মানবজমিন। দীপনাথ এবং প্রায় সমান গুরুত্ববহ চরিত্র দীপনাথের মেঝোভাই শ্রীনাথের স্ত্রী তৃষা। এবং উপন্যাসের আরেকটি বিশাল দৃশ্যপটে বিস্তৃত দীপনাথ এবং শ্রীনাথের আপন বোন বিলু এবং তার স্বামী তারই পিসতুতো দাদা প্রীতম। মূলত এই তিনটি চরিত্রের জীবনের একটি সময়কালের অংশ, বেশ কিছু চিত্র এবং জীবনের নানান উপলব্ধির সমষ্টি এই চমৎকার উপন্যাসটি। শুরুতে বিলুর রুগ্ন এবং প্রায় শয্যাশায়ী স্বামী প্রীতম,মেরুদণ্ডহীন শ্রীনাথ এবং আপাত দৃষ্টিতে একঘেয়ে দীপনাথকে নিয়ে রচিত উপন্যাসটি খুব একটা আকর্ষণ করছিলো না। কিন্তু ক্রমে ক্রমে ক্ষুরধার মস্তিষ্কের তৃষা এবং প্রীতমের প্রচণ্ড মানসিক শক্তিতে ক্রমাগত চালিয়ে যাওয়া লড়াই এবং কিছু মূল্যবোধ আকড়ে থাকা চেষ্টার সমষ্টি নিয়ে বাচা দীপনাথ ক্রমশই আকর্ষণীয় করে তুলেছে উপন্যাসটিকে। বসের তরুণী স্ত্রী মনিদীপার প্রতি আকর্ষণ দীপনাথের জীবনটাকে ভীষণভাবে বদলে দেয়।সেই টানাপোড়েনের মাঝে বীথী নামক একটি চরিত্রের উপস্থিতি তার জীবনের মূল্যবোধের একটি বিশাল অবক্ষয় সামনে এনে দেয়। দীপনাথের প্রাণপ্রিয় প্রীতমের জীবনের পরিবর্তন, এবং ধীরে ধীরে ভেতরটা ক্ষয়ে অন্য মানুষ হয়ে যাওয়া এবং তার প্রচণ্ড দাপুটে বৌদির পরিবর্তন সবকিছু মিলিয়ে দীপনাথ যেনো জীবনের সব মানে হারিয়ে ফেলে। সর্বত্রই সে প্রবল স্রোতের মুখে সামান্য খড়কুটোর বেড়ি দেয়ার একটা প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় তবু তা আর কতোদূর। তৃষা এবং তার স্বামী শ্রীনাথের স্নায়ুযুদ্ধ এবং ব্যাক্তিগত বিরোধ এই গল্পের একটি বিশেষ অংশ যাতে একসময় ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়ে তাদের(?) একমাত্র ছেলে সজল।অসাধারণ ব্যাক্তিত্বের অধিকারিণী তৃষার এই ছেলে তার স্বামী শ্রীনাথের নাকি শ্রীনাথের জেষ্ঠ্য দাদা মল্লিনাথের তা নিয়ে এক বিপুল আলোড়ন চলতে থাকে শ্রীনাথের মধ্যে এবং তা ক্রমে বীজ বপন করে ডালপালা ছড়াতে থাকে সজলের মধ্যেও। মূলত শ্রীনাথ,তৃষা এবং মৃত মল্লিনাথকে ঘিরে একটি ত্রিভুজ জলঘোলা অবস্থা বিচরণ করে এই বাড়ির মধ্যে সর্বদাই কেননা মৃত মল্লিনাথ তার সব সম্পত্তি ভাই,পিতা সবাইকে রেখে মেঝো ভাইএর স্ত্রী তৃষার নামে লিখে দিয়ে যান। দীপনাথ,তার বস এবং মনিদীপার ভেতর চলতে থাকে আরেক ত্রিভুজ চক্র।যেখানে ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণার উপস্থিতিই কখনো কখনো বেশি চোখে পড়ে এবং শেষপর্যন্তও প্রায় ধাধা হয়ে রয়ে যায়। বিলু,প্রীতম আর বিলুর প্রেমিক অরুণকে ঘিরে রচিত হয় আরো একটি চক্র যেখানে প্রীতমের ভালোমানুষিই অনেকটা কাল হয়ে দাঁড়ায়।
তিনটি জীবনের ত্রিভুজ ছাড়াও আরো কিছু পার্শ্ব ঘটনা এবং চরিত্র উপন্যাসটিকে ভিন্ন রূপ দিয়েছে।তবু দীপনাথের কিংবা প্রীতমের শেষ অবধি এমন সিদ্ধান্ত এমনকি তৃষার এই ধীরে ধীরে একাকিত্বের কাছে হেরে যাওয়া কোনটাই কাম্য ছিলো না।বরং বারবার মনে হচ্ছিলো অন্য কিছু হতে পারতো। কেনো এমনটা হতে হবে! উপন্যাসটি শেষ হয়েও অনেক কিছু বাকি রেখে গেছে,এভাবেই তো বহু বহুকাল ধরে চলছে মানবজীবনের গল্পগুলো,যার অনেকটাই শেষ না করেই কেউ কেউ খেলা ছেড়ে চলে যায়। অবশেষে বলবো শুরুতে তেমন ভালো না লাগলেও শেষ হতে হতে ভালো লেগেছে।কিন্তু শেষটায় উপন্যাসটিকে গুছিয়ে আনা যায়নি বরং গল্পগুলো আরো কিছুটা গুছিয়ে এনে শেষ করলে পাঠকমনে তৃপ্তি আসতো আশা করি।
I had a bit of trepidation when I saw the book, and my Dad said he would give it a go first, and I waited.
He took his time. Once he was done, I asked him what he thought of it, and he said he liked it. But he told me to be careful with this one. It won’t give you the closure that you expect it to, he said, don’t read it if you wish for the events to unfold in a definitive way.
Relax, I had told him, I have my experience with those.
This has a kind of unravelling to it that fans of Sally Rooney adore, and it was one of the thoughts that crossed my mind as I was midway through it. I had started it in the hours I have to sit in a metro while commuting, the prose is lucid enough, the structure intriguing enough to pull an occupied mind into it. It took me only 4 days to get through this, and I was not expecting it to, as it was not filled with either likable characters, or motivations decisive and explicit enough to make it such a fast read.
The characters are fleshed out, some of them better than the others; it was bound to be so in a novel with so many characters. The author has tried to draw parallels; he has succeeded mostly, however, the traits remain woefully similar; everyone has given up, or you know, will give up by the end. When you hit pause on reading, it’s not because of any external factors, but because you really do need to take a break from the gloom. The female characters also become somewhat stereotypical, as they all blend into one another in terms of their ideologies, moral dilemmas, and physical characteristics.
It is not enough to say that a character is feeling this for the first time when there are no other instances of how the character had felt before. Here lie most of the novel’s shortcomings, and yet, despite them, the saga moves with the passage of time, granting us a fleeting glimpse of the world we once knew, a window into events that unfold with inevitable familiarity.
“সব মানুষই এক অসমাপ্ত কাহিনী।কোনো মানুষই তার জীবনের সব ঘটনা, সব কাজ শেষ করে যায় না তো! “
শীর্ষেন্দু বরাবরই আমার পছন্দের লেখক।বছর কয়েক আগে দূরবীন পড়ার পর থেকেই যতবার শীর্ষেন্দু পড়েছি কখনো খারাপ লাগা কাজ করেনি। যে অল্প কয়েকটায় পড়েছি বেশিরভাগের বিষন্ন এক সমাপ্তিতেই যেন তৃপ্তি।জীবনের ধ্রুব এক বাস্তবতা মিশে থাকে তার লেখনীতে।লেখকের দূরবীন পড়ার পর আশ্চর্য এক হতাশায় ডুবে ছিলাম, কিন্তু এক ভালোলাগায় মিশে ছিলাম। মানবজমিন শেষ করার পরও ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কেমন এক শূন্য দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকি আর চিন্তা করি কি সব হিজিবিজি ভাবনা।বইটা অনেক সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পড়েছি।মনে হচ্ছে চরিত্রগুলোর সাথে মিশে গেছি। প্রত্যেকের কথা ভাবনায় আসছে। তবু দীপনাথ, প্রীতম,সজল এই চরিত্র গুলো কে বেশিই ভালো লেগেছে।রিভিউ লেখার ইচ্ছে হয় না আমার। তাই এ কেবল বই নিয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করা বলা চলে।
একজন লেখকের স্বার্থকতা কোথায়? গদ্যের ছন্দ এমনভাবে সাজানো যাতে ৫৬৫ পৃষ্ঠার বিশাল বইও একটিবারের জন্যও বোরিং না হয় কিংবা এমন কিছু চরিত্র তৈরি করা যাদের আপনি মনে প্রাণে ঘৃণা করতে বাধ্য হবেন। এতোটাই বাস্তব সেই চরিত্ররা। শীর্ষেন্দুবাবু তার "মানবজমিন"-এ দুটোই করে দেখিয়েছেন। কেমন এক বোধশক্তিহীন ভাবে বইটা শেষ করে রেখে দিলাম। কারো জন্য দুঃখ লাগছে না, লাগছে না আনন্দ! পুরোপুরি দীপনাথ যেন ভর করেছে আমার উপর। কষ্ট শুধু প্রীতমের জন্য। আর কারো জন্য কিছু বোধ হচ্ছে না।
শুরুতে তৃষা, শ্রীনাথ আর বিশেষ করে বিলুকে ভীষণ ঘেন্না হচ্ছিল। খুব করে চাইছিলাম এদের কিছু হোক। হয়েছেও। তবে শেষে এসে কেমন নিরাসক্ত হয়ে গেলাম। চিন্তা কেবল পড়ে রইলো প্রীতমের জন্য।
বইয়ে যা ঘটেছে তা সত্য ঘটনা বলে ধরে নিলে এই বইকে আমি একটা স্টারও দিতাম না। কিন্তু এ যে একজন মানুষের লেখা গল্প মাত্র। হতে পারে বাস্তবতা থেকে টুকে নেয়া কিছু স্মৃতি এতে রয়েছে তবে আগাগোড়া পুরোটাই তো লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত। এরকম শক্তিশালী লেখা, যাতে ভীত নড়ে যায়, অনেকদিন পড়িনি।